দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২৪৯)

পর্ব – ২৪৯

খোকা বলল, জ‍্যেঠু, তুমি কাল চোখকে জানলার সঙ্গে তুলনা করছিলে, বলছিলে একটা লোক ভিতরে বসে বসে দ‍্যাখে। কিন্তু যখন মানুষ ঘুমায়, তখন সে দ‍্যাখে কি করে?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, খোকা, বড় শক্ত প্রশ্ন করেছ।
খোকা বলল, উঁহু জ‍্যেঠু, পাশ কাটিয়ে গেলে চলবে না। তুমিই জানতে পারো। বলো একটু।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, জানো খোকা, একটা অন্ধ লোক একটা ঘরে বসে আছে। তার ছেলে পিলেরা যুদ্ধ করছে। তার সে সব দেখার ইচ্ছে। আর তার সাথে আছে তার মন্ত্রী। সে সেই ঘরে বসেই যুদ্ধের মাঠে কি কি হচ্ছে সব বলে যাচ্ছে।
খোকা বলল, জানি জানি, অন্ধ লোকটা ধৃতরাষ্ট্র। আর সঙ্গের লোকটা সঞ্জয়।
ছেলের উত্তর শুনে খোকার মায়ের মুখে একটা তৃপ্তির বিভা ছড়িয়ে পড়ল।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, ধৃতরাষ্ট্র বলছেন, ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ।
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।
তখন সঞ্জয় বললেন,
দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব‍্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা।
আচার্যমুপসংগম‍্য রাজা বচনমব্রবীৎ।।
তারপর, জানো খোকা, সঞ্জয় শুধু দেখছেনই না,
পাঞ্চজন‍্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ।
পৌণ্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদরঃ।।
অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ।
নকুল সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ।।
লক্ষ্য করো, যুদ্ধক্ষেত্রে শঙ্খবাদনের শব্দ‌ও শুনতে পাচ্ছেন সঞ্জয়।
খোকার মা বললেন, দাদামণি, গীতা আপনার কণ্ঠস্থ, তবুও আপনি নিজেকে কেন নাস্তিক বলেন, ভেবে পাই না।
খোকার মায়ের কথায় বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে জ‍্যাঠামশায় বললেন,
একসময় কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, নৈনং ছিন্দতি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।
ন চৈন ক্লেদয়ন্ত‍্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ।।
খোকা বলল, জানি জানি, যুদ্ধের মাঠের মধ‍্যে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধ করার জন‍্যে খেপাচ্ছে।
জ‍্যাঠাইমা বললেন, সে কি রে খোকা, কী বলছিস, কৃষ্ণ যে অর্জুনকে উদ্বুদ্ধ করছেন। খ‍্যাপাচ্ছেন বললে হয়!
খোকা বলল, কিন্তু জ‍্যেঠু, স্বপ্ন যা দেখি, কিছু কিছু মনে থাকে। আবার অনেকটা ভুলে যাই। আমি অনেক কিছু দেখি যার কোনো মানেই নেই। অথচ কি নিখুঁত ছবি তৈরি হয়। সিনেমার মতো!
জ‍্যাঠামশায় বললেন,
ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ‍্যাদ‍্য সচরাচরম্।
মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান‍্যদ্ দ্রষ্টুমিচ্ছসি।।
ন তু মাং শক‍্যসে দ্রষ্টুমনেনৈব স্বচক্ষুষা।
দিব‍্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ‍্য মে যোগমৈশ্বরম্।।
খোকা বলল, জ‍্যেঠু, এর মানে কি?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, খোকা বুঝতে পারছ, কৃষ্ণ তাঁর বিশ্বরূপ দেখাতে চাইছেন অর্জুনকে। অর্জুনকে কৃষ্ণ গুড়াকেশ বলছেন।
খোকা বলল, কৃষ্ণ অর্জুনকে গুড়াকেশ বলছেন কেন জ‍্যেঠু?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, যারা রাতে ঘুমান না, তাঁদের গুড়াকেশ বলে। অর্জুন না কি রাতে ঘুমাতেন না। আচ্ছা, তারপর শোনো,
কৃষ্ণ বললেন, তোমার নিজের চর্মচক্ষুর দ্বারা তুমি আমার বিশ্বরূপ দেখতে পারবে না। তোমাকে আমি দিব‍্যচক্ষু দিচ্ছি। সেই চোখ দিয়ে আমার অসামান্য যোগশক্তি উপলব্ধি করো।
খোকা ভেবে দ‍্যাখো, মানুষের চোখ অন্ধকারে বাঘের মতো জ্বলজ্বল করে না, বহু উঁচু থেকে ঈগলের মতো দেখতে পায় না। বিশাল এই মহতোমহীয়ান ব্রহ্মাণ্ডকেও দেখতে পায় না। আবার অণোরণীয়ানকেও ধারণার মধ‍্যে আনতে পারে না। নিজের চোখ দিয়ে দেখতে পায় না বলে মানুষ টেলিস্কোপ আবিষ্কার করল।
খোকা বলল, জানি জানি জ‍্যেঠু, হান্স লিপারসে বলে এক চশমার কারিগর একটা চোঙের দু দিকে কাচ ঘসে লেন্স বানিয়ে দূরের জিনিসকে কাছে দেখার কায়দা বের করেছিল। সে যেন খেলনা গোছের জিনিস ছিল। কিন্তু লোকের মুখে সেই গল্প শুনে গ‍্যালিলিও গ‍্যালিলি সেটাকে অঙ্কের সূত্রে ফেলে দূরবীন বানিয়ে ফেললেন। রবার্ট হুক মাইক্রোস্কোপ বানিয়ে কর্কের কোষ দেখেছিলেন। আর আন্তন ভ‍্যান লিউয়েনহক জীবন্ত কোষ দেখলেন।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, খোকা, আমাদের স্বপ্নের ভিতর অজস্র রহস্য। মগজ নিয়ে আমরা অনেকটা জেনেছি। তবুও আরো অনেকটা জানা বোঝার বাকি। খোকা, আমরা জ্ঞান সমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়োচ্ছি, এমন একটা কথা কে বলেছিলেন বলতে পারবে?
খোকা বলল, আইজ‍্যাক নিউটন।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, জানো খোকা, অতো বড়মাপের প্রতিভা মানুষের সমাজে সচরাচর জন্মান না। সেই তিনি যখন নিজের কাজকে নুড়ি কুড়োনোর সঙ্গে তুলনা করেন, তখন ভাবতে পারো, জ্ঞানসমুদ্র কি জিনিস? তেমনি এক অগাধ সমুদ্র মানুষের অন্তর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কবিতায় আছে,
অন্তর মাঝে শুধু তুমি একা একাকী
তুমি অন্তরব‍্যাপিনী।
একটি শব্দ মুগ্ধ সজল নয়নে,
একটি পদ্ম হৃদয়বৃন্তশয়নে
একটি চন্দ্র অসীম চিত্তগগনে
চারিদিকে চিরযামিনী।
আমাদের কর্টেক্স আর সেরিবেলামে স্নায়ুকোষের সংখ‍্যার বিপুলতার কথা তোমাকে বলেছি।
খোকা বলল, হ‍্যাঁ, মনে আছে। ছিয়াশি বিলিয়ন নিউরন আছে সেখানে।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, কিন্তু তারা যে কী মাপের বড় কাজ করতে পারে, তা জানলে অবাক না হয়ে পারবে না। মানুষের মগজের ক্ষমতা যে কি বিপুল, তা আইনস্টাইনের মতো মানুষ কিছুটা উপলব্ধি করতে পারতেন। এই তো ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল তারিখে তিনি মারা গেলেন। তখন তোমার পাঁচ বছর বয়স। শুনেছি আইনস্টাইনের মগজটা বিজ্ঞানীরা সংরক্ষণ করে রেখেছেন। যদি পরে আধুনিক গবেষণার উপায় তৈরি হয়, তো মগজের ক্ষমতা বুঝতে কাজে লাগবে। আইনস্টাইন নিজেকে অসাধারণ বলে জানতেন। আর জানতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বলতেন, আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।
খোকার মা গান ধরলেন,
আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।
          এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা ॥
কত জনম-মরণেতে    তোমারি ওই চরণেতে
          আপনাকে যে দেব, তবু    বাড়বে দেনা ॥
          আমারে যে নামতে হবে    ঘাটে ঘাটে,
          বারে বারে এই ভুবনের    প্রাণের হাটে।
ব্যাবসা মোর তোমার সাথে    চলবে বেড়ে দিনে রাতে,
          আপনা নিয়ে করব যতই বেচা কেনা ॥

আগামীকাল শেষ পর্ব

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।