রবিবারে রবি-বার – এ মৃদুল শ্রীমানী

মৃত্যুর নিপুণ শিল্প – ১৩
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩০৩ বঙ্গাব্দে (১৮৯৬ খ্রীস্টাব্দ) একটি গানে লিখেছিলেন:
“মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে
আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে ॥
তুমি আছ, বিশ্বনাথ, অসীম রহস্যমাঝে
নীরবে একাকী আপন মহিমানিলয়ে ॥
অনন্ত এ দেশকালে, অগণ্য এ দীপ্ত লোকে,
তুমি আছ মোরে চাহি– আমি চাহি তোমা-পানে।
স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর–
এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে ॥”
বাষট্টি বৎসর বয়সে, ১৩৩১ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে ( ১৯২৪ খ্রীস্টাব্দ) আরেকটি গানে লিখেছেন:
“আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান॥
অসীম কালের যে হিল্লোলে জোয়ার-ভাঁটায় ভুবন দোলে
নাড়ীতে মোর রক্তধারায় লেগেছে তার টান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান॥
ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে,
ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে,
ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।
কান পেতেছি, চোখ মেলেছি, ধরার বুকে প্রাণ ঢেলেছি,
জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান॥”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অজস্র গানে মহাজাগতিক গ্রহ নক্ষত্র নীহারিকার অস্তিত্ব নিয়ে কথা। বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উৎসাহে হিমালয় ভ্রমণে বালক রবি কিছু কিছু গ্রহ নক্ষত্র চিনেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠিক উপরের দাদাটির নাম ছিল সোমেন্দ্রনাথ। তিনি মানসিক সমস্যা বিজড়িত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরেও তাঁর মা সারদা দেবী আরেকটি শিশুসন্তান প্রসব করেন। তিনি অত্যন্ত অল্প বয়সে মারা যান। তাঁর নাম রাখা হয়েছিল বুধেন্দ্রনাথ। এইভাবে নিজের পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে গ্রহ নক্ষত্রের নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিশ্বপরিচয়ের পাতায় লিখেছেন:
“জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহজ বই পড়তে লেগে গেলুম। এই বিষয়ের বই তখন কম বের হয় নি। স্যার রবর্ট বল-এর বড়ো বইটা আমাকে অত্যন্ত আনন্দ দিয়েছে। এই আনন্দের অনুসরণ করবার আকাঙক্ষায় নিউকোম্ব্স, ফ্লামরিয়ঁ প্রভৃতি অনেক লেখকের অনেক বই পড়ে গেছি — গলাধঃকরণ করেছি শাঁসসুদ্ধ বীজসুদ্ধ। তার পরে এক সময়ে সাহস ক’রে ধরেছিলুম প্রাণতত্ত্ব সম্বন্ধে হক্সলির এক সেট প্রবন্ধমালা। জ্যোতির্বিজ্ঞান আর প্রাণবিজ্ঞান কেবলই এই দুটি বিষয় নিয়ে আমার মন নাড়াচাড়া করেছে। তাকে পাকা শিক্ষা বলে না, অর্থাৎ তাতে পাণ্ডিত্যের শক্ত গাঁথুনি নেই। কিন্তু ক্রমাগত পড়তে পড়তে মনের মধ্যে বৈজ্ঞানিক একটা মেজাজ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। অন্ধবিশ্বাসের মূঢ়তার প্রতি অশ্রদ্ধা আমাকে বুদ্ধির উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে আশা করি অনেক পরিমাণে রক্ষা করেছে। অথচ কবিত্বের এলাকায় কল্পনার মহলে বিশেষ যে লোকসান ঘটিয়েছে সে তো অনুভব করি নে।”
সূর্যের সংসারে বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, ও শনির অস্তিত্ব অনেক দিন থেকে মানুষের জানা ছিল। ১৩ মার্চ ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হার্শেল ( ১৫ নভেম্বর ১৭৩৮ – ২৫ আগস্ট ১৮২২) ইউরেনাস গ্রহটি আবিষ্কার করেন। এই গ্রহটি একটি বরফ দৈত্য। সৌরজগতে ইউরেনাস চতুর্থ বৃহত্তম গ্রহ। কিন্তু তার চলনপথে কিছু গোলমাল ধরা পড়ে অনুমান করা হয় যে আরো কোনো দানবিক গ্রহের প্রভাবে এমনটি হচ্ছে। প্রায় পঁয়ষট্টি বৎসর পরে ২৩ সেপ্টেম্বর ১৮৪৬ তারিখে জার্মান জ্যোতির্বিদ জোহান গটফ্রিড গেল ( ০৯ জুন ১৮১২ – ১০ জুলাই ১৯১০) তৃতীয় বৃহত্তম গ্রহ হিসাবে আরেকটি বরফদৈত্য আবিষ্কার করেন। এর নাম দেওয়া হয় নেপচুন।
নেপচুন আবিষ্কারের চুরাশি বৎসর পরে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লাইড ডবল্যু টমবাও (০৪ ফেব্রুয়ারি ১৯০৬ – ১৭ জানুয়ারি ১৯৯৭) ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ তারিখে প্লুটো আবিষ্কার করেন। আবিষ্কারের পর অনেক দিন ধরে প্লুটো সৌরজগতের দূরতম গ্রহ হিসাবে গণ্য ছিল। সম্প্রতি ২০০৬ সালে তাকে বামন গ্রহ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নেপচুন আবিষ্কারের অনেক আগে মঙ্গল ও বৃহস্পতির মধ্যবর্তী এলাকায় সিরিস নামে একটি মহাজাগতিক বস্তু আবিষ্কার করেন ইতালির এক পুরোহিত জ্যোতির্বিদ জিউসেপ্পে পিয়াজি ( ১৬ জুলাই ১৭৪৬ – ২২ জুলাই ১৮২৬)। তিনি সিসিলের এক মানমন্দির থেকে বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করেন। এটিকে প্রথমে গ্রহ বলা হয়েছিল। পরে এই এলাকায় এই ধরনের অজস্র বস্তু আবিষ্কার হতে থাকলে জ্যোতির্বিদগণ এদের সকলকে গ্রহ অভিধায় চিহ্নিত করতে আপত্তি তোলেন। সিরিসকে অ্যাসটেরয়েড বলে চেনানো হয়। অতি সম্প্রতি তাকে সবচেয়ে বড় বামন গ্রহ হিসেবে চেনানো হয়েছে।
সৌর মণ্ডলের গ্রহগুলি যেমন আবিষ্কার হচ্ছিল, তেমনি নতুন নতুন টেলিস্কোপের হাত ধরে সৌরজগতের বাইরে নানাবিধ নক্ষত্র ও নীহারিকা সম্বন্ধে ধারণা পরিষ্কার হচ্ছিল। কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মি নিয়েও ধারণা তৈরি হচ্ছিল। ১৯১২ সালে অস্ট্রিয়ান আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রানজ হেস ( ২৪ জুন ১৮৮৩ – ১৭ ডিসেম্বর ১৯৬৪) কসমিক রে আবিষ্কার করেন। তিনি বলেন মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ভিতর থেকে এবং আরো দূরের গ্যালাক্সি থেকে মহাজাগতিক রশ্মি পৃথিবীতে এসে পৌঁছচ্ছে। ৫৩০০ মিটার উচ্চতায় বেলুনে করে যন্ত্রপাতি পাঠিয়ে তিনি এসব নির্ধারণ করলেন। ১৯১৩ – ১৯১৪ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইনরিশ গুস্তাভ কোলহরস্টার ( ২৮ ডিসেম্বর ১৮৮৭ – ০৫ আগস্ট ১৯৪৬) ভিক্টর হেস এর গবেষণা পুনঃপরীক্ষা করে নিশ্চিত বলে ঘোষণা করেন। কসমিক রে নামটা রবার্ট অ্যান্ডরুজ মিলিকান এর দেওয়া। তিনি ১৯২০ সালে হেস আবিষ্কৃত রশ্মির এই নামকরণ করেন । ১৯২৮ – ১৯২৯ সালে কোলহরস্টার এবং জার্মান পরমাণু বিজ্ঞানী ওয়ালটার বোথে (০৮ জানুয়ারি ১৮৯১ – ০৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭) গিগার মুলার ডিটেকটর দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়ে দেন কসমিক রে হল আসলে তড়িৎগ্রস্ত কণা, বা চার্জড পার্টিকলের স্রোত। আজ আমরা জানি মহাজাগতিক রশ্মি হল প্রায় আলোর বেগে ছুটতে থাকা হাই এনার্জি প্রোটন ও পরমাণু কেন্দ্রক। এরা মহাবিশ্বের সুদূরতম প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে।
কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মির আবিষ্কর্তা ভিক্টর ফ্রানজ হেস ১৯৩৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল সম্মান লাভ করেছিলেন। আর ওয়ালটার বোথে ১৯৫৪ সালে ম্যাকস বর্ন এর সঙ্গে একযোগে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। রবার্ট অ্যান্ডরুজ মিলিকান ইলেকট্রনের ভর ও আধান নিপুণভাবে নির্ণয় করার জন্য ১৯২৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯২৭ সালে ডাচ বিজ্ঞানী জ্যাকব ক্লে ১৮ জানুয়ারি ১৮৮২ – ৩১ মে ১৯৫৫) এবং তাঁর সহধর্মিণী তেতজে জোলস ( ১৮৮১ – ১৯৭২) দেখিয়ে দিয়েছিলেন কসমিক রে অবশ্যই আধানগ্রস্ত কণা। এটা কখনোই ফোটন নয়। পৃথিবীর উচ্চ অক্ষাংশে চৌম্বক প্রভাবে তারা প্রভাবিত হয়। আধানগ্রস্ত কণা না হয়ে ফোটন হলে তা হতে পারত না। কসমিক রে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এরিখ রুডলফ আলেকজান্ডার রেজিনার (১২ নভেম্বর ১৮৮১ – ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫)। বাঙালি বিজ্ঞানীদের মধ্যেও কসমিক রে নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দেবেন্দ্রমোহন বসু (২৬ নভেম্বর ১৮৮৫ – ০২ জুন ১৯৭৫) ও বিভা চৌধুরী ( ১৯১৩ – ০২ জুন ১৯৯১) এ ব্যাপারে অগ্রণী ছিলেন। তাঁরা কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা, নিউট্রন, মেসন, ও মিউওন কণা নিয়ে কাজ করেছেন।
১৯১৪ সালের ২৪ মে (১০ জ্যৈষ্ঠ ১৩২১) তারিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন:
“এই তো তোমার আলোকধেনু সূর্য তারা দলে দলে–
কোথায় ব’সে বাজাও বেণু, চরাও মহাগগনতলে ॥
তৃণের সারি তুলছে মাথা, তরুর শাখে শ্যামল পাতা–
আলোয়-চরা ধেনু এরা ভিড় করেছে ফুল ফলে ॥
সকালবেলা দূরে দূরে উড়িয়ে ধূলি কোথায় ছোটে,
আঁধার হলে সাঁজের সুরে ফিরিয়ে আন আপন গোঠে।
আশা তৃষা আমার যত ঘুরে বেড়ায় কোথায় কত–
মোর জীবনের রাখাল ওগো ডাক দেবে কি সন্ধ্যা হলে?।”
১৯১৯ সালে মহাজাগতিক প্রশ্নে এক অসাধারণ বিপ্লব ঘটে গেল। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফরনিয়ার মাউন্ট উইলসন মানমন্দির থেকে আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এডুইন হাবল ( ২০ নভেম্বর ১৮৮৯ – ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩) একশো ইঞ্চি ব্যাসের হুকার টেলিস্কোপ দিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বেশ ভাল ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তার সীমা নির্ধারণ করলেন। মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথ নীহারিকা নিয়ে কিছু কিছু ধারণা ছিল অনেক আগে থেকেই। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ নীহারিকা নাকি তারার আলোর আভা। অ্যানাকসোগোরাস এবং ডিমোক্রিটাসকে উল্লেখ করে পণ্ডিত আরিস্ততল ( ৩৮৪ – ৩২২ খ্রীস্ট পূর্বাব্দ) তাঁর “মিটিওরলজিকা” গ্রন্থে এই খবর দিলেন।
আন্দালুসিয়ার জ্যোতির্বিদ আভেমপেস ( মৃত্যু ১১৩৮ খ্রীস্টাব্দ) বলতেন ছায়াপথ অনেক তারা দিয়ে তৈরি। তবে পৃথিবীর বাতাসে তাদের আলো প্রতিসরিত হয়ে যায় বলে অমন আভার মতো দেখায়।
টেলিস্কোপ হাতে মিল্কিওয়ে দেখেছিলেন গ্যালিলিও। সেটা ১৬১০ সাল। তিনি বলেছিলেন ওগুলো তারা। অনেক দূরে আছে বলে আবছা লাগে। ১৭৫৫ সালে জার্মান দার্শনিক ইম্যানুয়েল কান্ট ( ২২ এপ্রিল ১৭২৪ – ১২ ফেব্রুয়ারি ১৮০৪) বললেন ছায়াপথ নীহারিকা হল বিপুল সংখ্যক তারার একটি ঘূর্ণায়মান বস্তু। ওই ১৭৫৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর গবেষণাপত্র বেরিয়েছিল। তার নাম প্রিনসিপিওরাম প্রাইমোরাম কগনিটিওনিস মেটাফিজিকে নোভা ডিলুসিডেটিও। ১৭৭০ সালের আগস্টে কান্টের আরেকটি গবেষণাপত্র বেরিয়েছিল। তার নাম ছিল দে মুন্ডি সেনসিবিলিস আটকে ইনটেলিজিবিলিস ফরমা এট প্রিনসিপিইস। তবে তাঁর সেরা বইটি ছিল ক্রিটিক অফ পিওর রীজন। ১৭৮১/ ১৭৮৭। ১৭৮৫ সালে উইলিয়াম হার্শেল মিল্কিওয়ের চেহারাটা বোঝার চেষ্টা করলেন। আর তাতে কত সংখ্যক তারা থাকতে পারে, তাও গণনা করতে চেষ্টা করলেন।
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকে উন্নততর টেলিস্কোপ নিয়ে বুঝতে আন্তরিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন অ্যাংলো আইরিশ জ্যোতির্বিদ লর্ড রস ( ১৭ জুন ১৮০০ – ৩১ অক্টোবর ১৮৬৭)। তিনি রয়াল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বেশ অনেকগুলি উৎকৃষ্ট ধরনের দৈত্যাকৃতি প্রতিফলক টেলিস্কোপ গড়ে তিনি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সর্পিল চেহারা সম্বন্ধে বিজ্ঞানী সমাজকে অবগত করেন। ১৮৪৫ সালে বাহাত্তর ইঞ্চি ব্যাসের ধাতব আয়না ওয়ালা তিনটন ওজনের একটি টেলিস্কোপ তৈরি করান। তখনো কাচের গায়ে রূপার প্রলেপ লাগিয়ে বড় আয়না তৈরির প্রযুক্তি কৌশল গড়ে ওঠেনি। স্পেকুলাম নামে তামা ও টিনের এক মিশ্রধাতুকে খুব ভালো করে পালিশ করে সে সময় উৎকৃষ্ট আয়না বানানো হত। বিপুলায়তন ওজনের এই প্রতিফলক টেলিস্কোপটির নাম ছিল পারসনটাউনের লেভিয়াথান।
আগে ধারণা ছিল ইথারের মধ্যে সকল গ্রহ নক্ষত্র ভাসছে। ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন – মর্লি পরীক্ষার দ্বারা ইথারের অস্তিত্ব চিরতরে নাকচ হয়ে গেল। অ্যালবার্ট আব্রাহাম মাইকেলসন ( ১৯ ডিসেম্বর ১৮৫২ – ০৯ মে ১৯৩১ ) ছিলেন একজন আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী। ১৮৬৯ সাল থেকেই তিনি আলোর চলা নিয়ে গবেষণা করে চলেছিলেন। ১৮৮৭ সালে তিনি আরেকজন বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইলিয়ামস মর্লি ( ২৯ জানুয়ারি ১৮৩৮ – ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২৩) এর সঙ্গে একযোগে কাজ করা শুরু করেন। ওই বৎসরের নভেম্বরে ওঁরা ইথারের অস্তিত্ব নাকচ করে দিতে সমর্থ হন। মাইকেলসন তাঁর গবেষণা র জন্য ১৯০৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। মাইকলসন মর্লি পরীক্ষা পদার্থবিজ্ঞানের বিকাশে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এমনকি যুগন্ধর বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন ইথারের অস্তিত্ব নাকচ করে দেওয়া এই পরীক্ষা তাঁকে সরাসরিভাবে উদ্দীপিত করেছিল।
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি যে একটি ঘূর্ণায়মান মহাজাগতিক অস্তিত্ব, এ নিয়ে বিশদ আলোকপাত করেন ডাচ জ্যোতির্বিদ জ্যাকোবাস করনেলিয়াস ক্যাপটেইন ( ১৯ জানুয়ারি ১৮৫১ – ১৮ জুন ১৯২২)। তিনি ডার্ক ম্যাটার নিয়ে গবেষণা করেন।
মিল্কিওয়ের ঘূর্ণন বিষয়ে আরো আলোকপাত করেন সুইডিশ জ্যোতির্বিদ বারতিল লিন্ডব্লাড ( ২৬ নভেম্বর ১৮৯৫ – ২৫ জুন ১৯৬৫)। তিনি মিল্কিওয়ের ঘূর্ণন নিয়ে যা বলেছিলেন, তা যে যথাযথ, সে ব্যাপারে অবগত করেন ডাচ জ্যোতির্বিদ জান হেনড্রিক উর্ট ( ২৮ এপ্রিল ১৯০০ – ০৫ নভেম্বর ১৯৯২)। উর্ট রেডিও জ্যোতির্বিদ্যার অন্যতম পথিকৃৎও ছিলেন। ১৯৩২ সালে তিনি ডার্ক ম্যাটার নিয়ে আলোকপাত করেন। কিন্তু এডুইন হাবল দেখিয়ে দিলেন মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মধ্যেই তাবৎ বিশ্বজগৎ ধরা নেই। তার বাইরে প্রতিবেশী হিসেবে রয়েছে অ্যান্ড্রোমীডা গ্যালাক্সি। আরো অনেক অনেক গ্যালাক্সি থাকা সম্ভব।
আজ আমরা জানি ল্যানিয়াকিয়া সুপার ক্লাসটারের মধ্যে রয়েছে ভার্গো সুপার ক্লাসটার। মিল্কিওয়ে রয়েছে এর মধ্যে। মিল্কিওয়ে একটি সর্পিল গ্যালাক্সি। এর মধ্যস্থল থেকে অনেকগুলি প্রলম্বিত অংশ বা হাত বা আর্ম রয়েছে। তাদের নাম নিয়ার থ্রি কেপিসি আর্ম, পারসিয়ুস আর্ম, নরমা আর্ম, আউটার আর্ম, স্কুটাম- সেন্টরাস আর্ম, কারিনা স্যাগিটোরিয়াস আর্ম। গোটা দুয়েক তুলনায় ছোট ছোট বাহুর একটি ওরিয়ন সিগনাস আর্ম।
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির গোউল্ড বেল্টের লোকাল বাবল অংশে লোকাল ফ্লাফের মধ্যে ওরিয়ন আর্মের প্রান্তসীমায় সূর্যের অবস্থান। সূর্য মিল্কিওয়ের কেন্দ্রীয় মণ্ডল থেকে প্রায় পঁচিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে। আর মিল্কিওয়ের নিজের ব্যাস একলক্ষ আলোকবর্ষ। এই গ্যালাক্সির বয়স সাড়ে তের বিলিয়ন বছরের কিছু বেশি। আর এতে তারার সংখ্যা ১০০ – ৪০০ বিলিয়ন। অ্যান্ড্রোমীডা গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের থেকে কিছুটা বড়। তা আছে পৃথিবী থেকে আড়াই মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরত্বে। অ্যান্ড্রোমীডার ব্যাস মিল্কিওয়ের থেকে বেশি। অন্ততঃ একলক্ষ দশহাজার আলোকবর্ষ। আর তার ভরও বেশ খানিকটা বেশি। তার অভ্যন্তরে তারার সংখ্যা এক ট্রিলিয়ন।
সূর্য মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকে প্রদক্ষিণ করছে। মিল্কিওয়ের চার পাশে সূর্য ঘন্টায় চুরাশি হাজার কিলোমটার গতিবেগে দৌড়ে চলেছে। এই বিপুল বেগে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকে একবার পাক খেতে সূর্যের সময় লাগে দুশো চল্লিশ মিলিয়ন বছর। সূর্য সৃষ্টির পর থেকে এখনো পর্যন্ত সূর্য এই গ্যালাক্সি কে আঠারো থেকে কুড়িবারের বেশি পাক খেতে পারে নি। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিও স্থির নয়। সে প্রতি সেকেণ্ডে ছয়শো ত্রিশ কিলোমিটার গতিবেগে দৌড়ে চলেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় পাই :
সন্ধ্যাতারা-জ্বালা অন্ধকারে
অনন্তের বিরাট পরশ যথা অন্তর মাঝারে,
তেমনি সুদূর স্বচ্ছ সুর
গভীর মধুর
অমর্ত্য লোকের কোন্ বাক্যের অতীত সত্যবাণী
অন্যমনা ধরণীর কানে দেয় আনি।
…..
কতবার মনে ভাবি কী যে সে কে জানে!
মনে হয়, বিশ্বের যে মূল উৎস হতে
সৃষ্টির নির্ঝর ঝরে শূন্যে শূন্যে কোটি কোটি স্রোতে..
(সানাই, ১৯ পৌষ, ১৩৪৬; ০৪ জানুয়ারি, ১৯৪০)
আরেকটি কবিতায় লিখেছেন:
দক্ষিণমেরুর ঊর্ধ্বে যে অজ্ঞাত তারা
মহাজনশূন্যতায় দীর্ঘ রাত্রি করিতেছে সারা,
সে আমার অর্ধরাত্রে অনিমেষ চোখে
অনিদ্রা করেছে স্পর্শ অপূর্ব আলোকে।
সুদূরের মহাপ্লাবী প্রচণ্ড নির্ঝর
মনের গহনে মোর পাঠায়েছে স্বর।”
( ঐকতান, ০৫ মাঘ, ১৩৪৭; ১৮ জানুয়ারি ১৯৪১)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৯ খ্রীস্টাব্দে, ১৩১৬ বঙ্গাব্দের ২০ অগ্রহায়ণ তারিখে বোলপুরে বসে একটি গানে লিখেছিলেন:
“আলোয় আলোকময় করে হে এলে আলোর আলো।
আমার নয়ন হতে আঁধার মিলালো মিলালো ॥
সকল আকাশ সকল ধরা আনন্দে হাসিতে ভরা,
যে দিক-পানে নয়ন মেলি ভালো সবই ভালো ॥
তোমার আলো গাছের পাতায় নাচিয়ে তোলে প্রাণ।
তোমার আলো পাখির বাসায় জাগিয়ে তোলে গান।
তোমার আলো ভালোবেসে পড়েছে মোর গায়ে এসে,
হৃদয়ে মোর নির্মল হাত বুলালো বুলালো ॥”
সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পঁচিশ ছাব্বিশ বছর পরে লিখলেন:
স্নিগ্ধ তুমি, হিংস্র তুমি, পুরাতনী তুমি নিত্যনবীনা,
অনাদিসৃষ্টির যজ্ঞহুতাগ্নি থেকে বেরিয়ে এসেছিলে
সংখ্যাগণনার অতীত প্রত্যুষে;
তোমার চক্রতীর্থের পথে পথে ছড়িয়ে এসেছ
শত শত ভাঙা ইতিহাসের অর্থলুপ্ত অবশেষ;
… তোমার অযুত নিযুত বৎসর সূর্যপ্রদক্ষিণের পথে…
…সে চিহ্ন যাবে মিলিয়ে
যে রাত্রে সকল চিহ্ন পরম অচিনের মধ্যে যায় মিশে।।
আশ্বিন ১৩৪২ বঙ্গাব্দ ১৯৩৫ খ্রীস্টাব্দ।
( পৃথিবী।। পত্রপুট)
তিনি ১৯১০ খ্রীস্টাব্দ, বঙ্গাব্দ ২৮ আষাঢ়, ১৩১৭ তারিখে লিখেছিলেন:
“তাই তোমার আনন্দ আমার ‘পর
তুমি তাই এসেছ নীচে।
আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর,
তোমার প্রেম হত যে মিছে।
আমায় নিয়ে মেলেছ এই মেলা,
আমার হিয়ায় চলছে রসের খেলা,
মোর জীবনে বিচিত্ররূপ ধরে
তোমার ইচ্ছা তরঙ্গিছে॥
তাই তো তুমি রাজার রাজা হয়ে
তব আমার হৃদয় লাগি
ফিরছ কত মনোহরণ-বেশে
প্রভু, নিত্য আছ জাগি।
তাই তো, প্রভু, হেথায় এল নেমে,
তোমারি প্রেম ভক্তপ্রাণের প্রেমে,
মূর্তি তোমার যুগল-সম্মিলনে সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে॥”
আবার সেই তিনিই ছাব্বিশ বছর পরে লিখলেন:
“শুনেছি একদিন চাঁদের দেহ ঘিরে
ছিল হাওয়ার আবর্ত।
তখন ছিল তার রঙের শিল্প,
ছিল সুরের মন্ত্র,
ছিল সে নিত্যনবীন।
দিনে দিনে উদাসী কেন ঘুচিয়ে দিল
আপনলীলার প্রবাহ।
আজ শুধু তার মধ্যে আছে
আলোছায়ার মৈত্রীবিহীন দ্বন্দ্ব –….
সেই বাণীহারা চাঁদ তুমি আজ আমার কাছে।
দুঃখ এই যে, এতে দুঃখ নেই তোমার মনে।
… ভুলে গেছ – যতই দিতে এসেছিলে আপনাকে
ততই পেয়েছিলে আপনাকে বিচিত্র ক’রে।
আজ আমাকে বঞ্চিত করে বঞ্চিত হয়েছ আপন সার্থকতায়
তোমার মাধুর্যযুগের ভগ্নশেষ রইল আমার মনের স্তরে স্তরে —
… আমি বাস করি
তোমার ভাঙা ঐশ্বর্যের ছড়ানো টুকরোর মধ্যে।
আমি খুঁজে বেড়াই মাটির তলার অন্ধকার…”
৩ ফাল্গুন ১৩৪২, ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬
(উদাসীন।। পত্রপুট)
১৯৪১ সালে জীবনের শেষ কবিতায় লিখেছেন:
“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে…
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে….”
ওই অন্তিম পর্বেরই আরেকটি কবিতায় বললেন:
সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম–
সে কখনো করে না বঞ্চনা।
নিজেকে বাহিরে কুটিল, অন্তরে ঋজু জেনে সত্যকে পাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন শেষতম কবিতাটিতে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৯৩ বঙ্গাব্দ, ১৮৮৭ খ্রীস্টাব্দে লিখেছিলেন:
“সত্য মঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে।
তুমি সদা যার হৃদে বিরাজ দুখজ্বালা সেই পাশরে–
সব দুখজ্বালা সেই পাশরে ॥
তোমার জ্ঞানে তোমার ধ্যানে তব নামে কত মাধুরী
যেই ভকত সেই জানে,
তুমি জানাও যারে সেই জানে।
ওহে, তুমি জানাও যারে সেই জানে ॥”
নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থে “অজ্ঞাতে” শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন:
তখন করি নি, নাথ, কোনো আয়োজন।
বিশ্বের সবার সাথে, হে বিশ্বরাজন্,
অজ্ঞাতে আসিতে হাসি আমার অন্তরে
কত শুভদিনে; কত মুহূর্তের ‘পরে
অসীমের চিহ্ন লিখে গেছ! লই তুলি
তোমার-স্বাক্ষর-আঁকা সেই ক্ষণগুলি–
‘দেহলীলা’ কবিতায় লিখেছেন:
“ক্ষুদ্র এ আমার মাঝে অনন্ত আসন
অসীম, বিচিত্র, কান্ত। ওগো বিশ্বভূপ,
দেহে মনে প্রাণে আমি একি অপরূপ।”
নৈবেদ্যের কবিতাগুলি ১৩০৮ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে জনসমক্ষে এসেছিল। তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চল্লিশ বছর বয়স।
আর সেই তিনি ১৩ মে ১৯৪১, বৈশাখ ১৩৪৮ এ শান্তিনিকেতনে লিখেছেন:
“আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন–
সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে,
মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ করে দিতে।”
জোড়াসাঁকোর বাড়িতে শেষশয্যায় ২৯ জুলাই ১৯৪১, ১৩ শ্রাবণ ১৩৪৮ এ অন্য মাপের চৈতন্যময় অবস্থান থেকে মুখে মুখে বলে যাচ্ছেন:
“যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস
ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়।
এই হারজিত খেলা, জীবনের মিথ্যা এ কুহক,
শিশুকাল হতে বিজড়িত পদে পদে এই বিভীষিকা–
দুঃখের পরিহাসে ভরা।
ভয়ের বিচিত্র চলচ্ছবি –“
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৈনন্দিন জীবনের খবর যাঁরা জানেন, তাঁদের জানা আছে, ‘আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা’ বলতে কবি যা বোঝাচ্ছেন, তা সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী অভাব অনাহার বঞ্চনাজাত দুঃখ নয়। ভয়ের মুখোশ ও বিভীষিকা, যা বাস্তবে পথশিশুদের, অনাথ আতুরদের, উদ্বাস্তুদের ভোগ করতে হয়, দৈনন্দিন গার্হস্থ্য জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তা ভোগ করতে হয়নি। প্রশ্ন উঠবে, যিনি প্রথম যৌবনে পৃথিবী ও বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে অতো মধুর অভিজ্ঞতার কথা লিখলেন, তিনি কেন, কোন্ যুক্তিতে শেষ কবিতায় লিখবেন ‘লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত’… কেন এত প্রবঞ্চনার কথা এসে যায়, কেন তাঁকে অনায়াসে ছলনা সহন করতে শিখে নিতে হয়?
এই সূত্রে আমরা লক্ষ করব, আরেকজন মানুষ বলছেন, Nothing in life is to be feared, it is only to be understood. Now is the time to understand more, so that we fear less.
বক্তা হলেন মাদাম মেরি কুরি ( ০৭ নভেম্বর ১৮৬৭ – ০৪ জুলাই ১৯৩৪) । মেরি কুরি দুইবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। একবার ১৯০৩ সালে, তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে গবেষণা করে, রেডিও অ্যাকটিভিটি আবিষ্কার করার সূত্রে, আর একবার, ১৯১১ সালে, রেডিয়ম আবিষ্কার করার স্বীকৃতি হিসাবে। প্রথমবার পদার্থবিজ্ঞানে, দ্বিতীয়বার রসায়নে নোবেল বিজয়িনী হয়েছেন।