“চৈতালি” কাব্যগ্রন্থে “কাব্য” রচনাটি উৎসুক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। ১৩০৩ সালের ১১ শ্রাবণ তারিখে কবিতাটি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই কবিতায় এক অমর কবির জীবনের যন্ত্রণা ও সংকটের বিষয়গুলির সম্ভাব্যতার প্রতি লক্ষ করেন কবি সুখদুঃখ, আশানৈরাশ্যের দ্বন্দ্ব, রাজসভার ষড়যন্ত্র, অপমানভার, গোপন আঘাত, অনাদর, অবিশ্বাস, অবিচার, তীব্র অভাব ইত্যাদির মধ্য দিয়েই জীবন কাটে। উদ্বেগে দুশ্চিন্তায় অপমানের স্মৃতিচারণে রাত্রে চোখে ঘুম আসা কঠিন হয়ে ওঠে। বুকে সেইসব গোপন ও প্রকাশ্য আঘাতগুলি শেলের মতো গেঁথে থাকে। তবু মহৎ কবি তাঁর কাব্যে বিশ্বসৌন্দর্যকেই ফুটিয়ে তোলেন। সেই সৌন্দর্য সৃজন সকল মালিন্যমুক্ত, নীচতা আর দীনতা থেকে বহু উচ্চে অবস্থিত। কবি লেখেন,
“জীবনমন্থনবিষ নিজে করি পান,
অমৃত যা উঠেছিল করে গেছ দান।”
জোড়াসাঁকোয় বসে ১৩০৪ বঙ্গাব্দের ১৫ বৈশাখ তারিখে “দুঃসময়” কবিতাটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই কবিতাটি “কল্পনা” কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। সঞ্চয়িতায়ও রয়েছে। এই কবিতায় এক মহা আশঙ্কার ছবি আঁকেন তিনি। সমস্ত সংগীত কার ইঙ্গিতে থেমে গিয়েছে। নিজেকে পাখির মতো ভাবেন কবি। যেন প্রলয় ঝড়ের প্রাক্ মুহূর্তে আকাশে সঙ্গীহীন একলা হয়ে যাওয়া এক পাখি। তার সমস্ত অঙ্গ জুড়ে ক্লান্তি নেমে আসছে। দিক্-দিগন্ত কালো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। শব্দ শোনা যায়, তবে সে শব্দ বনের গাছে গাছে হাওয়ায় হাওয়ায় পাতার নড়াচড়ার স্বাভাবিক শব্দ নয়। সাগর গর্ভের ঘুম ভাঙা দৈত্য যেন জেগে উঠে ফুঁসছে, গর্জন করে ফুলে ফুলে উঠছে। প্রবল তরঙ্গ বিক্ষোভ ফেটে ফেটে পড়ছে তার শাদা শাদা ফেনা নিয়ে। চারদিকে রাত্রির কালো। সূর্য উঠতে এখনো অনেক দেরি রয়েছে। বিশ্বজগৎ যেন গভীর উদ্বেগে দমবন্ধ করে আসন্ন বিরাট দুর্যোগের জন্য আতঙ্কিত হয়ে অপেক্ষা করছে। এমন সময় দূর দিগন্তে চাঁদের একটা ফালি দেখা গেল। সে যেন সামান্য একটু আশার সংকেত। কবি নিজেকে বলবেন:
“ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।” কবি লেখেন, ঊর্ধ্ব আকাশের তারাগুলি তাঁর সত্ত্বাকে ইঙ্গিত পাঠাচ্ছে। আর নিচে সমুদ্রের চেহারা নিয়ে মরণ, শত তরঙ্গে উছলে উঠে তাকে ছুঁতে চাইছে। বহুদূরে প্রায় অদৃশ্য তীর থেকে কারা অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে করুণ মিনতি করে কবিকে ডাকছে। কিন্তু কোনো রকম স্নেহ মোহ বন্ধনের কাছে কবি ধরা দেবেন না। ঘরের নিভৃতি তাঁর জন্য নয়। বৃথা বসে ক্রন্দনের সপক্ষেও তিনি নন। কোনো রকম দুর্বলতার কাছে ধরা দেবেন না তিনি। পাখা মেলে মহাকাশে মুক্তি খুঁজবেন। ওই ১৩০৪ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসের সাত তারিখে একটি কবিতার সংক্ষিপ্ত পাঠ লেখেন রবীন্দ্রনাথ। কয়েকটি মাস পরে, ১৩০৫ সালের আষাঢ় মাসের সাত তারিখে পতিসরে কবিতাটি তার পূর্ণায়ত রূপগ্রহণ করবে। কবিতাটির নাম “হতভাগ্যের গান।” এই কবিতাটিও “কল্পনা” কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। এই কবিতায় তিনি বলছেন,
“রিক্ত যারা সর্বহারা সর্বজয়ী বিশ্বে তারা,
গর্বময়ী ভাগ্যদেবীর নয়কো তারা ক্রীতদাস।”
সাধারণ লোকে সুখ ও সাফল্যের সূত্রে শ্রীমণ্ডিত লক্ষ্মীর কল্পনা করেন। লক্ষ্মী শ্রী, সমৃদ্ধি, ঐশ্বর্য ও সুস্থিতির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। কিন্তু “হতভাগ্যের গান” কবিতায় কবির সঙ্গে যে দেবীর সম্পর্ক হয়, কবি জানেন সে দেবী অলক্ষ্মী ও রুক্ষকেশী। এই দেবী অশান্তির, অমঙ্গলের, দুর্ভিক্ষ ও অনাহারের। কবি হতভাগ্যের দলে। কিন্তু সেই নিয়ে তাঁর মনে কোনো ক্ষোভ বা অশান্তি নেই। নৈরাশ্যও নেই। নৈরাজ্য তাঁর মনকে ক্লিন্ন করেনি। বরং স্পষ্ট আত্মসচেতনতার সঙ্গে ঘোষণা করেন,
“আমরা সুখের স্ফীত বুকের ছায়ার তলে নাহি চরি।
আমরা দুখের বক্র মুখের চক্র দেখে ভয় না করি।”
নিজেদের ঢাকটির ভগ্নাবস্থা সত্ত্বেও, সেই ভাঙা ঢাকেই যথাসাধ্য উদ্যমের সঙ্গে জয়বাদ্য বাজাতে তাঁদের কোনো সঙ্কোচ নেই। আর আশা ছিন্ন বিক্ষিপ্ত বিধ্বস্ত হলেও তাকেই নিয়ে তুমুল কলরোলে উৎসাহ প্রকাশ করতেও তাঁদের ক্লান্তি নেই। কবি জানেন এই অলক্ষ্মী দেবী হতভাগ্যের জন্য অচঞ্চলা, এবং এই দেবীই মরণফাঁসি টানেন। আর এও জানেন পৃথিবীর সেরা সেরা মানুষের জীবনে শান্তি আর সুস্থিতির সুযোগ প্রায় নেই। তাঁদের জন্য দুঃখের কঠিন শয্যা পাতা। অমঙ্গলকে ভয় করেন না তিনি। বলেন, “তোমায় দিব ধন্যধ্বনি মাথায় বহি সর্বনাশ।” আরো বলেন, লক্ষ্মীছাড়ার সিংহাসনে তাঁকে যুবরাজ করে দিতে। আর পোড়া কপালে দুর্বিপাকের আগুন লাগাতে বলেন। অদৃষ্টকে নিয়ে পরিহাস করতে করতে তীব্র পুরুষকারে গভীর আস্থা ও বিশ্বাস ব্যক্ত করেন। অগ্রজ কবি নবীনচন্দ্র সেন ( ১০.০২.১৮৪৭ – ২৩.০১.১৯০৯) এর মতোই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যেন বলতে পারতেন, ‘ধন্য আশা কুহকিনী।’ বলতে পারতেন, “নাচায় পুতুল যথা দক্ষ বাজিকরে
নাচাও তেমনি তুমি অর্বাচীন নরে।” কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হতভাগ্যের গান’ কবিতায় মানুষের সঙ্গে আশার সম্পূর্ণ অন্যবিধ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ঠিক অর্বাচীন নয় সে। নিজস্ব অতুলনীয় মেজাজে রবীন্দ্রনাথ বলছেন,
“আশারে কই, ‘ঠাকুরানি, তোমার খেলা অনেক জানি,
যাহার ভাগ্যে সকল ফাঁকি তারেও ফাঁকি দিতে চাস?”
কুহকিনীর খেলা যেন তিনি ধরে ফেলেছেন, এবং তার সঙ্গে সমানে পাল্লা দেবার সাহস রাখেন। কোনো ক্ষতিকেই ক্ষতি বলে মানেন না। অদৃষ্টকে পরিহাস করবার স্পর্ধায় হতভাগ্যের গান উচ্ছ্বসিত। এই কবিতায় সর্বহারা, সর্বনাশ, প্রতারণা, দগ্ধভাল, লজ্জাহারা, ছিন্নবাস এই শব্দগুলির ব্যবহার আমাদের সচকিত করে। বস্তুতঃ, লক্ষ্মীছাড়ার ধারণাটা তাঁর বড় প্রিয়। এর আগে “চৈতালি” কাব্যগ্রন্থে “বঙ্গমাতা” কবিতায় বঙ্গসন্তানকে দেশদেশান্তরে নিজের স্থান খুঁজে নিতে দেবার স্বাধীনতা সক্ষমতার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, দাও সবে
গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক’রে।
“বলাকা” কাব্যগ্রন্থের ‘সবুজের অভিযান’ কবিতায় বলেন,
“ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আন্ রে বাছা-বাছা।”
‘সুপ্রভাত’ কবিতায় বলেছেন, “হৃদয়পিণ্ড ছিন্ন করিয়া ভাণ্ড ভরিয়া দেহো রে।..
মরণনৃত্যে ছন্দ মিলায়ে হৃদয় ডমরু বাজাব;
ভীষণ দুঃখে ডালি ভরে লয়ে
তোমার অর্ঘ্য সাজাব।..
মহাসম্পদ তোমারে লভিব
সব সম্পদ খোয়ায়ে–”
“মহুয়া” কাব্যগ্রন্থের ‘নির্ভয়’ কবিতায় বলেছেন,
“ভাগ্যের পায়ে দুর্বলপ্রাণে ভিক্ষা না যেন যাচি।”
বলেছেন,
“রুক্ষ দিনের দুঃখ পাই তো পাব,
চাই না শান্তি, সান্ত্বনা নাহি চাব।”
ওই ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থেরই ‘পরিচয়’ কবিতায় বলেছেন,
” ঝংকারি উঠিল মোর অঙ্গ আচম্বিতে
কাঁটার সংগীতে।
চমকিনু কী তীব্র হরষে
পরুষপরশে।”
‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের জন্মান্তর কবিতায় বলেছেন,
“নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে সুসভ্যতার আলোক।।”
ওই ‘ক্ষণিকা’রই “বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ” কবিতাটি ‘তাসের দেশ’ এ গান হয়ে ওঠে
” যাবই আমি যাবই ওগো, বাণিজ্যেতে যাবই।
লক্ষ্মীরে হারাই যদি অলক্ষ্মী রে পাবই।”
এই কবিতাগুলি স্মরণে রাখলে ‘হতভাগ্যের গান’ কবিতার “হে অলক্ষ্মী, রুক্ষকেশী, তুমি দেবী অচঞ্চলা” এই অংশটি মর্মভেদী হয়ে ওঠে।
মৃত্যুর ভূমিকাকে কী অপূর্ব সুন্দর করে দেখে এই ‘হতভাগ্যের গান’ কবিতায় লেখেন,
মৃত্যু যেদিন বলবে ‘জাগো, প্রভাত হল তোমার রাতি’
নিবিয়ে যাব আমার ঘরের চন্দ্র সূর্য দুটো বাতি।
আমরা দোঁহে ঘেঁষাঘেঁষি চিরদিনের প্রতিবেশী,
বন্ধুভাবে কণ্ঠে সে মোর জড়িয়ে দেবে বাহুপাশ–
বিদায়কালে অদৃষ্টেরে করে যাব পরিহাস।।”
“উৎসর্গ” কাব্যগ্রন্থে “মরণমিলন” কবিতায় লিখেছিলেন
“যদি কাজে থাকি আমি গৃহমাঝ
ওগো মরণ, হে মোর মরণ,
তুমি ভেঙে দিয়ো মোর সব কাজ–
কোরো সব লাজ অপহরণ।
যদি স্বপনে মিটায়ে সব সাধ
আমি শুয়ে থাকি সুখশয়নে,
যদি হৃদয়ে জড়ায়ে অবসাদ
থাকি আধো-জাগরূক নয়নে,
তবে শঙ্খে তোমার তুলো নাদ
করি প্রলয়শ্বাস ভরণ–“
১৩১৪ বঙ্গাব্দের বৈশাখের আট তারিখে শান্তিনিকেতনে বসে ‘সুপ্রভাত’ নামে কবিতাটি লিখেছিলেন তিনি। এই কবিতাতেও একটা অমঙ্গলের পরিবেশের মধ্যে এক মরণনৃত্যের ছবি এঁকেছেন তিনি। একজন সুখী মানুষ, তন্দ্রার মধ্যে স্বপ্ন দেখতে থাকা মানুষ হঠাৎ জেগে উঠল। শ্মশানবাসী প্রমথনাথ নাগভূষণ শিব রূদ্ররূপে বিষাণ বাজিয়েছেন। সেই আওয়াজে আকাশ বাতাস কাঁপছে। তাঁর কপালে ভয়ঙ্কর নাগিনী ফুঁসছে। বাজছে রূদ্রবীণা। এমন একটা ভয়ঙ্কর সকালের চিত্র এঁকেছেন সুপ্রভাত কবিতায়। শিবের প্রমথ সহচরগণ চারপাশে নৃত্য করছে। এরই মধ্যে জেগে ওঠার গান
“নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”
এই উপলব্ধি থেকে মৃত্যুকে অমৃত করে নেওয়ার কথা বলেন “সুপ্রভাত” কবিতায়।
“পূরবী” কাব্যগ্রন্থে ১৩৩০ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে লেখা ‘লীলাসঙ্গিনী’ কবিতায় এক রহস্যময়ীর অঙ্গুলিসংকেতে অযাত্রাপথে যাত্রী হবার কথা ভাবেন রবীন্দ্রনাথ। ঘরছাড়া যত দিশাহারাদের মতো খোলা আকাশের নিচে নিরাশ্রয় হয়ে দাঁড়াবার কথা বলেন। বলেন নিষ্ফল আয়োজনে মেতে ওঠার কথা। এই রহস্যময়ী তাঁর কঙ্কণের কিঙ্কিণীতে কবিকে ডাক দেন। সেই ডাক যেন চেনা সুরের ডাক। দুয়ারের বাহিরে সেই রহস্যময়ী দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে যেন কবি চেনেন। কবির মনে হয় এই রহস্যময়ীই বুঝি তাঁর চিরকালের প্রিয়তমা। এটা কবির মনে হয়। পরিষ্কার সাংসারিক চেনার মতো ঘরোয়াভাবে চেনা তিনি নন। নির্জনক্ষণে কবি যখন আনমনা হয়ে আছেন, তখন তিনি একটু ছোঁয়া দিয়ে যান। কখনো হাসিতে, কখনো বাঁশিতে খেলায় ডাক দেন। এই লীলাসঙ্গিনী কবিতায় এক গোধূলি আলোর কথা বলেন রবীন্দ্রনাথ। “গোধূলি” শব্দের আগে “বিস্মরণ” শব্দটি বসিয়ে তাকে রহস্যময় আধো আলো আধো অন্ধকারের রূপ দিয়েছেন তিনি। অপরূপ গোধূলির আলো মেখে সে মেয়েকে বড়ো সুন্দর লাগে। কবির মনে পড়ে কতবার এই রহস্যময়ী তাঁকে ভুলিয়েছেন, বকুল গন্ধে উতলা করে দিয়েছেন, কেয়াফুলের রেণু মেখে দেখা দিয়ে উদাসী করে দিয়েছেন। সে মেয়ের স্বর নদীর কলধ্বনির মধ্যে শুনেছেন কবি। বাতাসে ভেসে আসত তাঁর ইশারা। সে মেয়ে নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে কবিকে ডাক দিত, কেয়াফুলের রেণু হয়ে ডাক দিত, বর্ষা শেষের আকাশের সোনামাখা মেঘ হয়ে কবিকে ডাক দিত। এই ‘লীলাসঙ্গিনী’ কবিতাতেও খেলার কথা আনেন কবি। কিন্তু “খেলা” শব্দের আগে “অবেলা” কথার নিগূঢ় অব্যর্থ প্রয়োগে খেলাকে অন্যমাত্রায় পৌঁছে দেন তিনি।
সকালে মালতীলতার কুঞ্জবনে যাঁকে দেখা গিয়েছিল, নিশীথ অন্ধকারে অমাবস্যার পারে তাঁর সঙ্গে লুকোচুরি খেলা হবে। দিনের বেলা যা দুরাশা ছিল, তা অন্ধকারে স্বপ্নের ভাষা হয়ে উঠবে। এই গোপনরঙ্গিনীকে ভয় করার কথা; কিন্তু কবি তাঁকে ভয় করবেন না। রহস্যময়ীর আঁচলের একটু আধটু ছোঁয়া সবটুকু কথা বলে চলে যাবে।