গারো পাহাড়ের গদ্যে মনিরুজ্জামান প্রমউখ

পল্লবী’র জীবন উপাখ্যান
শহর’- এর যে প্রান্তে, তখনো- নাগরিক আঁচ গৌণ গৌণ । মুখ্য-তা’র খির বেলা-সূত্র অ-বন্টিত সব স্তরে- ঘর-বাড়ি, গাছ-গাছালী, নালা-নর্দমায় । পাখি-দের রব বিদ্যমান ছিলো- সাময়িক গ্রামে’র কাকলি’র মতো । এমন আবহে গড়ে উঠেছিলো- চাঁটগাইয়ে-দের ভীড়ে সন্দীপ-ওয়ালা’র ভাড়া-বাসা এগারো কোয়ার্টার । এগারো পরিবার থাকা’র পৃথকীকরণে’র সাথে, এক বাউণ্ডারি’র ভিতর বাস । এক-তলা বিশিষ্ট দুই ভাগে, বিভক্ত- থাকা’র বন্দোবস্ত । উন্নয়ন’- এর সিড়ি বেয়ে, এক-দিন এগারো কোয়ার্টার তার- গায়ে’র সংখ্যা গণনা’র ভিত ছেড়ে দেয় । দোতলা হতে, তিন-তলায় শরীর বাড়িয়ে নেয়- সময়ে’র ঋদ্ধি ভাবে’র সাথে সাথে । নাম তার- বদলায়-না । বসে যায়- চিরো-স্থায়ী’র ডাকায় ।
দোতলায় সারি-বদ্ধ ভাবে- চার পরিবার থাকা’র আয়োজন । নিচ-তলা হতে, সিড়ি বেয়ে উঠতে’ই যে- বাসা । সে- বাসায় পল্লবী-দের বসবাস । ও-দের না ছিলো- বাবা, না ছিলো- মা । তবুও বাইরে থেকে, দেখলে- অভিভাবক শূন্য মনে হতো-না । এমন পরিপাটি ধ্যান-সমৃদ্ধ গোছানো ছিলো- সংসার ও-দের । অভাব ছিলো-না, সংসার’ এর গায়- স্বভাবে’র শুদ্ধ-তায় ।
পল্লবী-রা তিন-বোন, এক-ভাই মিলে- চার-জনে’র বাধা পরিবার । ক্রমে’র ধারায় সে- তৃতীয় । চারে’র আসনে এক-মাত্র ও সবার ছোটো- নান্নু ভাই-টা । বয়স তার কতো ছিলো- তখন ! হবে, হয়-তো তিন-চার বছরে’র আশ-পাশ । তাকে খাওয়ানো, পরানো থেকে শুরু করে- সারা-দিনে’র সঙ্গ-সহ যাবতীয়- দেখভালে’র আপামর দায়িত্ব ছিলো- নির্ফাকে পল্লবী’র ওপর । কারণ- বড়ো বোন দু-জনে’ই চাকরি করতো- জীবন, সংসার’- এর পাদ-ভেদ্য সামলাতে, সংরক্ষণে, সমন্বয়ে ও-দের জুড়ি ছিলো-না, ভবে-তে । এক-জনে’র আয়ে- বাসা-ভাড়া সামলাতো । আরেক-জনে’র আয়ে- জীবিকা নির্বাহ হতো । বিবাহ আয়োজন’- এর সময়- পূর্ব দিগন্ত হয়ে, পশ্চিম দিগন্ত হেলনে- মেঘ-তরবারী বাড়ালেও প্রকৃতি । ও-দের যেনো- রায় নেই, সে- কার্য সম্পাদনে । পরস্পরে’র পরম্পরা হতে’ই যেনো- তাদের অভিলাষ । পিতা-মাতা-হীন সংসারে, ও-রা যেনো- প্রত্যেকে’ই প্রত্যেকে’র পিতা-মাতা । একেক-জন যেনো- একেক-জনে’র জীবন চলা’র পথে’র মহড়া । পরস্পর পরস্পর-কে আগলানো’ই যেনো- ও-দের জীবনে’র প্রবর্তীত সাধনা ।
এক-দিন আবশ্যক কারণে- পল্লবী-দের ঘরে রেখে, পিতা-মাতা গিয়েছিলেন, ঘরে’র বাইরে । তাদের ফিরতে দেয়-নি, এক অমানিশা-কাল ! সড়ক দুর্ঘটনা- তাদের পৌঁছে দেয়, চিরো-স্থায়ী’র আবাসনে । রেখে যান- অ-নাথ করে, চার অন্তরে’র জীবনী-দের সংগ্রামে’র ময়দানে । পিতা-মাতা এক-টি চরম ভূল করেছিলেন, তাদের জীবদ্দশায় । পল্লবী-কে পোলিও টিকা’র দু-বুন্দ খাওয়ান-নি, তারা । জেরে- পল্লবী তার শরীরে ধারণ করলো- আ-মরণ লালিত্যে’র পঙ্গুত্ব । তার কোমর’- এর নিচে’র অংশ শুকিয়ে, শক্তি-হীন বে-বোধ অচল । দু-হাত’ই তার- সর্বময়ী সম্বল । পল্লবী তার দু-হাতে, হাঁটে । দু-হাতে’ই সামলায়- ঘরে’র যাবতীয় কাজ-কর্ম । রান্না-ঘর হতে, শোবার ঘরে’র সার্বিক সমন্বয়- তার হাতে’র ছোঁয়ায়- জীবনে’র সার হয়ে, উঠে । অর্থাৎ- যে কর্ম মায়ে’র । সে কর্ম’ই পল্লবী’র । মায়ে’র অ-বর্তমানে, পল্লবী’ই মা ও-দের সংসারে । মায়ে’র ভূমিকা যে- অ-তুলনীয় জগতে, ব্যতিক্রম-হীনে এ কথা সবার’ই জানা । পাঁচ বছর বয়সে- পঙ্গুত্ব বরণীয়, পল্লবী ছিলো- মায়ে’রও মা ।
১৯৯৩ সালে, পল্লবী ছিলো- পূর্ণ যৌবণা-প্রাপ্ত । চেহারা’র মাধুর্যে কবি’র কবিতা’র হিমেশ-অক্ষর বোনা থাকতো যেনো । হাসলে, ঝরে পরতো- অমানিশা-আঁধার কাটা পূর্ণিমা’র সরল-ভেদ্য ঝংকার । চাহনী-তে ছিলো- তার কী যে- সহজ জীবনানুবাদ । ভাষা’র প্রয়োগ তার- নির্ঘাত হার । ভদ্রতা’র যে- অবিসংবাদিত নিদর্শন । তা- পল্লবী’র অনুভবে, ছিলো- সমাদৃত ।
পল্লবী-রা এগারো কোয়ার্টার ছেড়ে, পাড়ি জমায়- জীবনে’র অন্য কোনো- পাঠ্যে পঠিত হতে, প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ পূর্বে । এখন- তাদের জীবনে, বর্তমান- কোন সুরে, কোন গানে’র সঙ্গিত রচনা করছে । সে শুধু- জানে, তারা আর- জানে তাদের সৃষ্টিকর্তা । জানে-না, এগারো কোয়ার্টার’- এর বাসিন্দা-রা । পৃথিবী’র সারা প্রমত্তায় পল্লবী-রা কোন স্রোতে’র লহমায় পাড়ি দিচ্ছে- জীবন-সমুদ্র, তা জানে-না, গল্পে’র লেখকও ।