গদ্যানুশীলনে মিঠুন মুখার্জী পর্ব – ২

শ্বশুরবাড়ি ফিরে গিয়ে বর্ষা দুদিন বাড়িতে ছিল। তারপর হসপিটালে জয়েন্ট করে। বিয়ের অনুষ্ঠান বাবদ বর্ষা ও রক্তিম দুই সপ্তাহ ছুটি নিয়েছিল। হসপিটালে রোগীরাও ডাক্তার বর্ষার প্রতি আন্তরিক ছিলেন। তারা বর্ষাকে খুবই সম্মান করতো এবং ভালবাসত। কেউ তাকে ‘ডাক্তার দিদি’ কেউ ‘মা’ বলে সম্মোধন করত। রোগীদের এমন ভাবে বর্ষা মনে ভরসা যোগাতো যে তাকে দেখে ও তার কথা শুনে তাদের অর্ধেক শরীর সুস্থ হয়ে যেত। বর্ষার স্বামী রক্তিমেরও ঐ হাসপাতালে খুব নামডাক ছিল। তারা দুজন মিলে মানুষের সেবায় সর্বদা নিয়োজিত থাকতো। শ্রেণী দিয়ে নয় তারা মানুষ হিসাবেই একজন রোগীকে দেখত।
দেখতে দেখতে দশবছর পার হয়ে যায়। বর্ষা ও রক্তিমের জীবনে অনেক পরিবর্তন ঘটে। দীনবন্ধু ও সরস্বতী দাদু-দিদা হন। বর্ষা ও রক্তিমের মেয়ে হয়। সেই সময় তার বয়স পাঁচ বছর। প্রথম সন্তান ছেলে হয়নি বলে তাদেরও কোনো আফসোস ছিল না। এদিকে বর্ষার ভাই রুদ্রের বিয়ে হয়ে গেছে তিন বছর হয়েছে। রুদ্র এম. এ ও বি.এড করে উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছে। যে স্কুলে রুদ্র চাকরি করে সেই স্কুলের শিক্ষিকা উমা দাশগুপ্তের প্রেমে পড়ে সে। বাবা-মাকে জানিয়ে বিয়ে করে সে। তিনশো নিমন্ত্রিত ব্যক্তি নিয়ে রিসেপশন করা হয়েছিল। দীনবন্ধু চাকরি থেকে রিটায়ার্ড হয়েছেন দু বছর। রিটায়ার্ডের পর বাড়িতে একটি মুদিখানার দোকান করেছেন তিনি। তিনি তার পত্নীকে রিটায়ার্ডের পর বলেছেন— ‘কাজ না করে বসে বসে খেলে, আমার শরীরে রোগ ধরে যাবে। আমি বেশি দিন বাঁচবো না।’ তাই মেয়ে বর্ষা ও জামাই রক্তিমের পরামর্শ নিয়ে এই দোকানটি করেছিলেন তিনি।
এদিকে নানান প্রয়োজনে বাবাকে টাকা দিয়ে বর্ষা সহযোগিতা করত। তিনি নিতে চাইতেন না। কিন্তু বর্ষা জোর জোর করে গুঁজে দিয়ে যেত। উমা বিয়ের এক বছর বেশ ভালই ছিল। কিন্তু তারপর তার আসল রূপ সকলের সামনে আসে। শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে ঘর করতে চাইতো না সে। প্রায়ই রুদ্রকে কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে চলে যাওয়ার কথা বলত।রুদ্র বাবা-মাকে ছেড়ে যেতে রাজি ছিল না। কিন্তু উমার ব্ল্যাকমেইলের কাছে রুদ্র শেষমেশ পেরে ওঠেনি। সে বাবাকে একদিন বলে— “বাবা, আমরা কলকাতায় ফ্লাট নিচ্ছি। এই বাড়িটা অনেক পুরনো হয়ে গেছে। চলো আমরা সবাই মিলে কলকাতার ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকি।” কিন্তু তারা রাজি হন না। দীনবন্ধু বলেন— “এটা আমার বাবার বাড়ি। পিতৃভিটে ছেড়ে কোথাও যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। তোরা যা”। বাবার কথা শুনে রুদ্রের মুখটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। বর্ষাও একদিন ফোন করে রুদ্রকে বলেছিল— ‘দেখ ভাই, বাবার কাছে শুনলাম তুই বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে চলে যাচ্ছিস। যাস না সোনা। তুই চলে গেলে বাবা-মার কী হবে!! তারা খুব একা হয়ে যাবে। তাছাড়া তোদের এখানে কি সমস্যা তোরা আমায় খুলে বল। এই বয়সে বাবা-মাকে ছেড়ে কেউ যায়।” দিদির কোনো কথার উত্তর দেয়নি রুদ্র। কথায় বলে, বউ এসে আপনকে পর করে দেয়। কথাটা দীনবন্ধু বিশ্বাস করত না। কারণ সরস্বতী ও বর্ষা তো এমন করেনি। কিন্তু দীনবন্ধুর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায় ছেলে ও বউ তাদের ফেলে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে গেলে। পর করে দেওয়ার কথাটি সত্য হয়ে যায়। বাবা-মায়ের ভালোবাসার কাছে, তাদের কষ্টের কাছে বউয়ের আনন্দটাই বড় হয়ে গেল। তারা যেদিন বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছিল সেদিন সরস্বতী ছেলে-বৌমার হাত ধরে অনেক বারণ করেছিল। কিন্তু তারা শোনে নি। হাউ হাউ করে কেঁদেছিল সরস্বতী। দীনবন্ধুর চোখেও জল দেখা গিয়েছিল। তবুও মা-বাবাকে ছেড়ে রুদ্র শহরে চলে যায়।
ভাই চলে যাওয়ার দিন বর্ষা রক্তিমকে নিয়ে বাপের বাড়িতে এসেছিল। বাবাকে বলেছিল— “তোমরা কেঁদোনা। দেখবে ও ওর ভুল ঠিক বুঝতে পারবে। আর কয়েক দিনের মধ্যে বাড়িতে চলে আসবে। ও তোমাদের ছেড়ে কোনদিন থেকেছে। তোমাদের মন খারাপ লাগলে চলো সপ্তাহ খানেক আমাদের বাড়িতে থাকবে। বিয়ের পর তো কোনোদিন থাকনি। রক্তিমও তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বর্ষার বাবা-মাকে অনুরোধ করে। বর্ষার মেয়ে দীনবন্ধুকে বলে— ‘দাদুভাই চলনা আমাদের বাড়ি। দেখবে তোমাদের মন খারাপ ঠিক হয়ে যাবে‌। মামা ও মামনি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।’ দুজনের চোখে জল দেখে নাতনি দিদুনের শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেয়। দীনবন্ধু বর্ষাকে বলেন— ‘নারে মা, আজ আমরা যাব না। সময় সুযোগ বুঝে পরে কয়েকদিন তোদের বাড়িতে ঘুরে আসব।’ এরপর কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বর্ষা পুনরায় শ্বশুরবাড়ি ফিরে যায়।
সরস্বতী ছেলের জন্য চোখের জল ফেলে। রুদ্র মাঝে মাঝে মাকে ফোন করলেও উমা একবারের জন্যও খোঁজ নিত না। রুদ্রকে বাড়িতে আসার জন্য সরস্বতী অনেকবার বলেছেন। কিন্তু নানা রকম বাহানা দেখিয়েছে সে। কখনো বলেছে, এখন খুব কাজের চাপ, কখনো স্কুল ছুটি নেই, আবার কখনো বলেছে পূজোর ছুটিতে যাব। ছোট্ট রুদ্র আজ বড় হয়ে এত চালাক হয়েছে দেখে মা-বাবা খুবই অবাক হন। সরস্বতীর মনে পড়ে সে যখন ছোট ছিল তার জন্য তারা কিনা করেছেন— সেই সব দিনের কথা। নিজেদের শখ, সুখ, আনন্দ সবই ত্যাগ করেছিলেন তারা। আর আজ বয়সকালে তাদের যখন ছেলের প্রয়োজন, তখন তার চোখ ফুটে গেছে। নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই চেনে না। হায়রে আজকের ছেলে!! সেই মুহূর্তে সরস্বতীর আরো মনে হয়— ‘রুদ্রের থেকে আমার বর্ষা অনেক ভালো। অন্তত বাবা- মায়ের প্রতিনিয়ত খোঁজ নেয়। আপদ-বিপদে সাহায্যের হাত তো মেলে দেয়। তাছাড়া প্রথম ছেলেসন্তান আশা করে মেয়ে হয়েছিল বলে একটু খারাপ লেগেছিল। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি ভগবান যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন। মেয়ে-সন্তান আমার ছেলে-সন্তানের থেকে বেশি ভালো। পিতা-মাতার দুঃখ তারা বোঝে।’
বেশ কিছুদিন কেটে যায়। হঠাৎ একদিন দীনবন্ধুর কাছে উমার ফোন আসে। ফোন করে উমা বলে— “বাবা আপনার ছেলে আজ সকালে বাইক এক্সিডেন্ট করেছে। বেলভিউ নার্সিংহোমে ভর্তি আছে। ওর খুবই খারাপ অবস্থা।আপনারা একটু তাড়াতাড়ি আসেন।” দীনবন্ধু বলেন—“হ্যাঁ, অবশ্যই যাবো আমরা। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে আমর আসছি। তুমি একদম টেনশন করো না।” এই বলে দীনবন্ধু ফোনটা রেখে দেন। বাবা-মা এমনই হয়। সন্তান দুঃখে আছে শুনলে তারা স্থির থাকতে পারেন না। কিন্তু সব ছেলেরা এমন হয় না কেন!! ফোন রেখে দীনবন্ধু সরস্বতীকে সব বলেন। তারপর রক্তিম ও বর্ষাকে ফোন করে। সকলে মিলে ঘন্টা খানিকের মধ্যে গাড়িতে করে বেলভিউ নার্সিংহোমের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। এদিকে যাওয়ার আগে রক্তিম বেলভিউতে থাকা তার এক বন্ধু ডাক্তারকে ফোন করে সব জানায়। তার ফলে রুদ্রকে বিশেষ কেয়ার দিয়ে ডাক্তাররা দেখেন। ঘন্টাখানেক পর তারা বেলভিউতে পৌঁছান। রুদ্রের শরীর থেকে অনেকটা রক্ত বেরিয়ে যায়। ‘ও নেগেটিভ’ রক্ত যেটুকু পাওয়া গিয়েছিল সেটুকু দেওয়া হয়েছে। এখন আরও প্রয়োজন বলে ডাক্তার জানান। বর্ষারও ‘ও নেগেটিভ’ রক্ত হওয়ায় তাড়াতাড়ি ভাইকে রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করে ডাক্তাররা। রুদ্রকে দেখে বর্ষার মার দু- চোখ দিয়ে জল ঝরে। কয়েক ঘন্টা পরে রুদ্রকে সাধারণ বেডে দেয় ডাক্তার। ওর জ্ঞান ফেরে। এই বিপদের সময় সবাইকে কাছে পেয়ে রুদ্রের মুখে আলতো হাসি ফোটে। কিন্তু তখনও কথা বলা ডাক্তারের বারণ ছিল। তাই ও কথা বলেনি।
তিনদিন পর বেলভিউ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সরস্বতী ও দীনবন্ধু রুদ্রকে নিয়ে কলকাতার ফ্ল্যাটে যান। সেখানে মায়ের সেবায় সপ্তাহখানেকের মধ্যে সে সুস্থ হয়ে ওঠে। রুদ্র আবারো বাবাকে এখানে থেকে যাওয়ার কথা বলে। কিন্তু দীনবন্ধু থাকেন না। তারা বাড়ি ফিরে আসেন। উমা কিন্তু একবারও থাকার জন্য বলেনি। দীনবন্ধুর মনে প্রশ্ন জাগে— ‘বউ এলে ছেলেরা তাদের পুরুষত্ব বিসর্জন দিয়ে কি ভেড়ায় পরিণত হয়?’
এরপর স্বাভাবিক ছন্দে সকলের দিন অতিবাহিত হয়। ছেলে প্রতিদিন বাবা-মার খবর না নিলেও মেয়ে বর্ষা প্রতিদিন তাদের খবর নিত। ব্যস্ততার মধ্যেও কোনদিন ভুলে যেত না। একদিন রাত্রে ঘুমের ঘোরে দীনবন্ধুর হার্ট অ্যাটাক হয়। সরস্বতী কি করবে বুঝতে পারছিলেন না। একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। বর্ষাকে ফোন করেন সরস্বতী। কয়েকবার ফোন বেজে যাওয়ার পর বর্ষা ফোন ধরে। ওকে সব কথা বলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে রক্তিমকে ডেকে অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করে কাছের হাসপাতালে নিয়ে যায়। বর্ষা ও রক্তিম সময় মতো নিয়ে আসার জন্য সেই যাত্রা বেঁচে যান দীনবন্ধু। বর্ষার চোখে জল, সরস্বতীও কাঁদছেন। সে এক অন্য দৃশ্য। সরস্বতী সেই রাত্রে ছেলে রুদ্রকেও কিন্তু অনেকবার ফোন করেছিলেন। ফোন কেউ তোলেনি। একবার উমা ‘এত রাতে কে ফোন করছে’ বলে ফোনটা কেটে দিয়েছিল।
পরদিন সকালে বর্ষা ভাইকে ফোন করে বাবার শরীর খারাপের বিষয়টা জানায়। রুদ্র বলে— “দিদি আজ থেকে তিন দিন আমি খুব ব্যস্ত আছি। তারপর একদিন গিয়ে দেখে আসব।” তার এই কথায় বর্ষা অবাক হয়ে যায়। সে মনে মনে ভাবে— “ভাই কত পাল্টে গেছে। বাবার থেকে কাজটাই বড় হয়ে গেল। ওর বিপদে বাবা-মা ছুটে গেল, কিন্তু বাবার বিপদে ও….!!” এরপর কোনো কথা না বলে ফোনটা কেটে দেয় বর্ষা। ভগবানের উদ্দেশ্যে বলে— “হে ঠাকুর, তোমার অসীম কৃপা যে তুমি আমায় একটা মেয়ে দিয়েছিলে। পরবর্তীতে আরেকটি মেয়ে দিলে আমি বেশি খুশি হবো।”
তিনদিন পর বর্ষা বাবাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসে। বাবা দীনবন্ধু সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার কয়েকদিন পর রুদ্র তার বউ উমাকে নিয়ে বাবাকে দেখতে আসে। রুদ্রকে দেখে অভিমান করে দীনবন্ধু মুখ ফিরিয়ে চুপচাপ বসে থাকেন। মার কাছে এতদিন না আসতে পারার কারণ বানিয়ে বানিয়ে বলে রুদ্র।দীনবন্ধু আর ধৈর্য রাখতে পারেন না। তিনি বলেন— “আমার থেকে তোর কাছে কাজ বড় হয়ে গেল! এই তুই আমাদের ভালোবাসিস!! বৌমা কিংবা বৌমার বাবা-মার কিছু হলে তুই না গিয়ে থাকতে পারতিস? তোর কাছে তো আমরা কিছুই চাইনি। শুধু প্রয়োজনের সময় একটু উপকার পাওয়ার মতো কর্ম কি আমরা করিনি? তোর দিদি এত ব্যস্ত, তবুও সে কিন্তু পুরোমাত্রায় তার কর্ম করে যাচ্ছে। একবারও তোর মতো কাজের দোহাই দেয়নি। এখন আমার মনে হচ্ছে, ভগবান যদি আমায় ছেলের বদলে আরেকটি মেয়ে…..।” বাবার কথা শুনে রুদ্রর মাথা নত হয়ে যায়। উমার মুখটা ছোট হয়ে যায়। কিছুক্ষণ সকলে চুপ করে থাকে। উমা হঠাৎ শ্বশুরকে বলে— “বাবা, বলছিলাম আমরা আমাদের ফ্লাটেই আরো দুটি ঘর নিচ্ছি। অনেক টাকার প্রয়োজন। আমরা তো এখানে তেমন আসি না। অদূর ভবিষ্যতে আর আসাও হয়তো হবেনা। তাই আপনার ছেলের ভাগের সম্পত্তিটা দিয়ে দিলে আমাদের ভালো হয়। আমরা সব বেঁচে একেবারে কলকাতায় চলে যাব।”
উমার কথাটা শুনে দীনবন্ধু ও সরস্বতী অবাক হয়ে যান। দীনবন্ধুর চোখের কোণে জল দেখা যায়। তিনি রুদ্রকে বলেন— “এটা কি তোরও সিদ্ধান্ত? তোর বউকে দিয়ে না বলিয়ে তুই নিজেই বলতে পারতিস। আমাদের আর কত অপমান করবি তুই? তবে আজ শুনে রাখ, সম্পত্তি ভাগ আমি ও তোর মা বেঁচে থাকতে করবো না। আমরা মরে গেলে তোরা সম্পত্তির ভাগ নিতে আসিস। তুই ও বর্ষা সমান ভাগ পাবি। তাছাড়া তোরা দুজনই তো স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকা। খুব কম হলেও এক লক্ষ টাকার উপরে মাসে আয় করিস তোরা। তোদের আমার সম্পত্তি না নিলে হচ্ছে না? তাছাড়া তোরা যদি বাবা-মার সাথে এরকম আচরণ করিস তবে শিক্ষার্থীরা তোদের কাছ থেকে কি শিখবে, আমি তা বুঝতে পারছি। ঠিক আছে এসেছিস থাক, খাওয়া- দাওয়া কর। তুই আমাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করলেও আমরা বাবা-মা হয়ে এমন নিষ্ঠুর হতে পারি না। তাই তোদের তাড়িয়ে দিলাম না।”
পরদিন সকালবেলা রুদ্র ও উমা কাউকে কিছু না বলে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সরস্বতী চোখের জল ফেলেন আর ভাবেন— ‘পরের মেয়ের কি দোষ দেবো। আমার ছেলেই ঠিক নয়। ও ঠিক থাকলে উমার শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে এমন কথা বলার সাহসও হতো না।’ সন্ধ্যাবেলা বর্ষারা দীনবন্ধুকে দেখতে আসে। ভাই ও উমার সমস্ত ঘটনাটা বর্ষার মা বর্ষাকে বলেন। বর্ষা শুনে অবাক হয়ে যায়। মাকে বলে— “জান মা, ভাইয়ের এমন রূপ আমি কখনো দেখিনি। আমার কথা না হয় বাদ দাও; তোমাদের ওর জীবনে অবদানের কথা ও এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেল কি করে!!” পাশে বসে বর্ষার বাবা সব শুনছিলেন। ছেলের এই রকম আচরণ তিনি মেনে নিতে পারেননি। মনের মধ্যে শুধু টেনশন কাজ করছিল। তিনি উত্তেজিত হয়ে রুদ্র সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আবারও হার্ট অ্যাটাক হয়। বর্ষা ও রক্তিম তাদের নিজের গাড়ি করে নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে যেতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বর্ষা ও সরস্বতী তাদের প্রিয় মানুষকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে। বর্ষার মেয়েও মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। ডাক্তার রক্তিমের চোখেও জল দেখা যায়। বাবার মৃতদেহ বাড়িতে নিয়ে আসে বর্ষারা। মাকে খুব কাঁদতে দেখে বর্ষা সান্তনা দেবার চেষ্টা করে। বর্ষার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা খবর পেয়ে বর্ষাদের বাড়িতে আসেন। বর্ষা ভাইকে ফোন করে বাবার মারা যাওয়ার খবরটা দেয়। রুদ্র বর্ষাকে জানায়— ‘বাবা আমাদের যেভাবে অপমান করেছে তাতে ও বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা আমাদের নেই। আমার সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আমি কোর্টে লড়বো। তুই যা পারিস কর।’ এই বলে রুদ্র ফোনটা কেটে দেয়। তারপর বর্ষা পুনরায় ফোনটা করলে উমা তোলে। বর্ষা বাবার মুখে আগুন দেওয়ার কথা বললে উমা বলে— “তুমি থাকতে রুদ্রের কি প্রয়োজন। তুমি ওটা করে দাও। রুদ্র যাবে না।”— এই বলে উমাও ফোনটা রেখে দেয়। বর্ষা প্রচন্ড কাঁদে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। মা ও রক্তিমকে ভাই ও উমার ব্যবহারের কথা জানায়। সব শুনে সরস্বতী বলেন—- “রুদ্রের প্রয়োজন নেই। তুই বাবার মুখাগ্নি করবি। আজ আর ওসব নিয়ম কেউ মানে না।’ মার কথামতো বর্ষা বাবার মুখাগ্নি করে। শ্বশুরবাড়িতে চার দিনের কাজ করে সে। দীনবন্ধুর শ্রাদ্ধ-শান্তি বর্ষা ও রক্তিমের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়। বর্ষা মাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। সরস্বতী তার সমস্ত সম্পত্তি বর্ষাকে দানপত্র করে দেন। তিনি বলেন— “আজ থেকে জানবো আমার কোনো ছেলে নেই। আমার একটাই মেয়ে। আমি কন্যা সুখে সুখী।”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।