গল্পকথায় কৃষ্ণা মালিক
পাপ
১
দুপুর আর তেমন টনকো তেজি নেই। সূর্য পশ্চিমে বেশ খানিকটা। ছায়া পাতলা হয়ে কেমন গা ভাঙলে, আলিস্যিতে গড়িয়ে গেল দেয়ালের পিছনে।
সবে বসন্তের আঁচলার হলদে রঙ দেখা দিয়েছে। পাখিগুলোরই কোনো ক্লান্তি নেই। এডালে ওডালে, খোড়ো চালে, দালানের নির্জন আলসেতে উড়ে বেড়াচ্ছে। কাছেই পুণ্যিপুকুরে বোধহয় কোনো মদ্দাহাঁস হাঁসীকে তাড়া করে ধরে ফেলেছে , তার ডাক শোনা যাচ্ছে; – এবার তার মাথা চঞ্চুতে কামড়ে ধরে পিঠে উঠে পড়বে। তারপর –। একটু পরেই হাঁসাটা হাঁসীকে ছেড়ে দেবে। হাঁসা পেছন নাড়তে নাড়তে ঝুলন্ত তার যন্ত্রপাতি গুটিয়ে চলে যাবে। হয়তো পুকুরের ঢালু পাড় বেয়ে গড়িয়ে নামবে গিয়ে জলে। হাঁসীও অন্যদিকে। তার দীর্ঘায়িত প্যাঁ – ক প্যাঁ – ক ডাক – ওই তো শোনা যাচ্ছে!
হাওয়া মাঝে মাঝে শীত-শীত হাত বুলিয়ে দিচ্ছে গায়ে। গাছের পাতাগুলো ঝিরঝির করে ঘুম-ঘুম চোখে টেনে টেনে ছড়া বলার মতো দুলতে থাকলো।
এই সব দেখতে দেখতে কখন সময় তার গণ্ডী পেরিয়ে অন্য সময়ের দোরে গিয়ে দাঁড়ায় বুঝতে পারি না। মনকেমন করে শুধু। কোনো সময়ই সময় তার এক্তিয়ার মানে না।
অনেকক্ষণ ধরে একটা ডাক বহুদূর থেকে ভেসে আসছে। বোধের সীমানায় ঢুকতে সময় লাগছে তার। তারপর ঠাকুমার গলা বুঝতে পারি। আমাদের প্রতিবেশী চাঁপাদের বাড়ি থেকে ঠাকুমা ফিরলো বোধহয়। ডাকছে, শুনতে পাচ্ছি, বৌমা – বৌমা!
মাকেই যে ডাকছে সেটাও আমার মাথায় ঢুকতে সময় লগলো। প্রথমে মনে করেছিলাম মা বা কাকীমার কোনো একজনকে ডেকে থাকবে। ওরা নিশ্চয় এবার সাড়া দিয়ে কাছে যাবে, আর ঠাকুমার উদগ্রীব ডাকও থেমে যাবে। – ঠাকুমা আবার ডাকছে।
সাড়া দিচ্ছে না কেন কেউ? – ওহো! কাকীমা, মানে সেজ কাকীমা তো বাড়িতে নেই, সতীশমামার বাড়ি গেছে। উনি সেজ কাকীমার দাদা। তিনি থাকেন দুর্গাপুর। কিন্তু মা কোথায়? ঘুমিয়ে পড়লো? বাড়ির আর সবাইই বা কোথায়? দূর! আর সবাই বলতে তো – বাবা অফিস গেছে। জ্যেঠু আর ছোটকাকু তাঁদের নিজের নিজের কর্মস্থলে, জ্যেঠিমা কাকীমা আর ভাইবোনেরা সেখানকার বাসাবাড়িতে। ভাই স্কুলে। সেজকাকু আজ কীসব কাজ থাকায় অফিস যায়নি। আমিও আজ স্কুল ফাঁকি দিয়েছি। রোজ রোজ স্কুল যেতে আমার ভালো লাগে না। বাড়িতে থাকার মধ্যে মা কাকু ঠাকুমা আর আমি। মা সাড়া দিচ্ছে না কেন? সেজকাকুই বা কোথায়?
আমি জানলার ধার ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই দুয়ারে। আমাকে দেখে ঠাকুমা জিগ্যেস করে, “হ্যাঁরে কোনি, তোর মা কি ঘুমিয়ে গেছে? কিন্তু সে তো এমন মরার মতো ঘুমোয় না দিনমানে! গোয়ালে যায়নি তো”?
“মা আমাকে কিছু বলেনি গো, ঠাকুমা!”
“দ্যাখ, গোয়ালবাড়ি গেছে কিনা। গাই দুইতেও যেতে পারে। তোর কাকীমা না থাকায় সকালে দোয়ার কথা কারও মনেই এলো না!”
চটির ফটফট আওয়াজে “আঃ” বলে বিরক্ত হয়ে ঢলে পড়া দুপুর। এই এখান থেকে, এতটা সময় পেরিয়ে সেদিনের দুপুরকে চিনতে পারি, একদম ঢলানি! গোয়ালের দিকে যেতে যেতে পেয়ারা গাছে চোখ পড়ে। কারও কারও ক্ষেত্রে বসন্ত বোধহয় অসুখ সারানোর মলম। নাহলে যে পেয়ারা গাছ এমন মরচে রঙা পাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, সে এমন সবুজ হতে থাকবে কেন? পুরনো সেসব পাতা ধীরে দীরে ঝরে গেলো।
আমলকী গাছে তো শীতকাল থেকেই শুধু শিরা-উপশিরাগুলো প্রকট। গায়ে মেদ-মাংস – সবুজ পাতাগুলোর কথাই বলছি, কিচ্ছুটি নেই। তবে এবার বোধহয় তার শরীর ঘিরে আসবে প্রেমময় বসন্ত। কাঠবেড়ালিটা লেজ তুলে এডাল ওডাল করে পিঁপড়ে, পোকা খুঁটে খাচ্ছে। এতো আদুরে হাবভাব, ওকে দেখলেই মন জুড়ে পার্বন আসে। ও-ও বসন্তে সামিল হলো বোধহয়। বসন্তকে অস্বীকার করবে কে? পায়ে পায়ে মল বাজার মতো ঝমঝম করছে বসন্তের দাহহীন রোদ।
আমি কি অনন্তকাল হেঁটে যাচ্ছি? নাকি আমাদের গোয়ালবাড়িটা যোজন যোজন দূরত্ব পেয়েছে? বাড়ির চৌকাঠ ডিঙোবার আগে ওই তো বাঁ-পাশে বৈঠকখানাটা। দুদিকে বারান্দওয়ালা এই মেটেল ঘরটায় রহস্য যেন ঘাপটি মেরে থাকে। ধবধবে করে নিকোনো খোলামেলা ঘরটা ফাঁকা পড়ে থাকে। এই পরিত্যাগ আমায় কষ্ট দেয়। আসবাবহীন নেড়া ঘরটায় অন্ধকারও তেমন ঠাঁই পায় না দিনের বেলা। উদোম একটা ঘর, উদোম একটা দেহের মতো, তবু যেন কী এক রহস্য আছে ওর ভেতর।
বর্ষায় কুঁড়িদিদির সঙ্গে চুড়ি খেলি বৈঠকখানার পশ্চিমের বারান্দায়। তখন গ্রামের চারদিকে থকথকে পাঁকাল রাস্তা একটা মস্ত কালো অজগরের মতো গ্রামটাকে ঘিরে থাকে, কোথাও যাবার জো-টি নেই। সেইজন্যই মনে মনে উড়ে বেড়ানোর কোনো খামতি ছিলো না। যতো বন্দীদশা ততো নেশায় পাবার মতো কুঁড়িদিদির সঙ্গে পশ্চিমের বারান্দায় বসে পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে চুড়ি খেলা। কুঁড়িদিদিরা আমাদের জ্ঞাতি। একদম পাশের বাড়িটাই ওদের। বর্ষায় ওদের সদর দরজা থেকে আমাদের দরজা পর্যন্ত ইঁট পাতা। তাতে পা দিয়ে দিয়ে দিব্যি আসা যায়।
একটা গোল ঘর টেনে নিতে হয় প্রথমে। দুই খেলি দুদিকে বসে সেই ঘরের ভেতর ছড়িয়ে দেবে চুড়ির টুকরোগুলো। নানা ধরণের, নানা রঙের ভাঙা কাচের চুড়ি। আমার একটা ছোটো কোটোয় প্রচুর সংগ্রহে ছিলো।
ঠাকুমা দিয়েছিলো সেই কৌটো। মহার্ঘ কিছু নয়, সাদা কাচের, ঘটের মতো, তাতে লাল রঙের একটা ঢাকনা। ঢাকনাটা প্লাস্টিকের হলেও দেখতে যেন কাঠ। তার ভেতর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কাচের চুড়ির টুকরোগুলো মাঝে মাঝে দেখতাম। কৌটো ধরে ঝাঁকুনি দিলে রিনিঝিনি আওয়াজ হতো। আওয়াজটা শুনতে খুব মিঠেল। তাদের রঙের ছটা আর প্রত্যেক ভাঙা অংশের গায়ে আলো লেগে হীরের মতো ঝকঝক করতো। কী যে মায়া লেগে থাকতো তাতে! কিন্তু সে মিথ্যে মায়া আর সস্তার জমক। আসলে যা কিছু ঝুটা, তারই দেখনদারি যে বেশি, তা আমি আমার মতো করে বুঝে গিয়েছিলাম।
খেলায় যার যার নিজের চুড়ির ভাগ তালুর ভেতর নিয়ে পালাক্রমে গোলঘরে ছড়িয়ে দিতে হবে। চুড়ি যে ছড়াবে সে আঙুলের ডগায় টেনে টেনে অন্য টুকরোর স্পর্শ বাঁচিয়ে ঘরের বাইরে আনবে। যখনই ঠেকাঠেকি হবে তখন সেই খেলি মোর হয়ে যাবে। এবার অন্য জনের পালা।
আমার পালা এখনও চলছে। আজও রঙিন কাচের চুড়ির টুকরো টেনে চলেছি। পালা কবে যে শেষ হবে, কে জানে! সব চুড়ির কুঁচি একটানে বাইরে এনে না ফেললে নতুন খেলা শুরু হবে না তো! কুঁড়িদিদি কবেই তার দান গুটিয়ে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি চলে গেছে!
আমি গোয়ালের দিকে চলেছি। মাটির চওড়া রাস্তা পেরোলে ডোবা। তার চারদিকে বাঁশঝাড়, পাখিদের ক্যাঁচোড়ম্যাচোর – শিস দিয়ে প্রেম-প্রেম মুড, ঝগড়া -। সব মিলিয়ে ছায়াচ্ছন্ন জায়গাটা সরগরম হয়ে থাকে সাধারণত। গোয়ালবাড়ির কাছেই তালুকদারদের পাঁচিল। পাঁচিলের এপাশে খানিকটা ফাঁকা জায়গার পর আমাদের গোয়ালঘর। সামনে একটা সোনাঝুরি গাছ। তার শুকনো শুঁটিতে বাতাস লাগলে খরখর করে বাজনা বাজে। আপাতভাবে বেতালা শুনতে লাগলেও, একটা ছন্দেই বাজে। প্রকৃতির কোন্ জিনিসটাই বা ছন্দহীন?
তখন আমাদের দুটো গাইগোরু দুধ দিচ্ছিলো। সেই দুধ দোওয়া, জ্বাল দেওয়া – সেসব সেজকাকীমার দায়িত্ব। জলখাবার বেলায় আর বিকেলের দিকে গাই দোওয়া হয়। সকালে আজ সেই কাজটা হলোই না, কাকীমা বাড়ি না থাকায় খেয়াল হলো না কারও। যখন খেয়াল হলো তখন দেরি হয়ে গেছে। তাই অল্প দুধ দুয়ে বাছুরকে তার মায়ের কাছে দেওয়া হলো। তারপর বেঁধে রাখা হয়েছে। শেষ বিকেলে দুধ দুয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। আবার রাতে বেঁধে রাখা। মা হয়তো এখন গাই দুইতেই এসেছে।
একা একা গাই দোওয়ার ঝামেলাও আছে। বাছুর দৌড়োতে চায় মায়ের কাছে, সব দুধটুকু প্রাণভরে খেতে চায়। সেটা হতে দেওয়া যায় না। তাকে বঞ্চিত করেই না গেরস্তর পুষ্টি। তাই দুধ দুইতে শুরু করার আগে গাইএর বাঁটে দুধ আসার জন্য অল্প সময় বাছুরকে খেতে দেওয়া হয়। তারপর সরিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয় কেউ থাকলে সহজ হয়। সে বাছুরকে ধরে গাইএর নাগাল থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। একা হলে বাছুর ছাড়ো – খুঁটোয় বাঁধো – দুধ দোও ; আবার বাছুর ছাড়ো – বাঁধো – দুধ দোও। একদম শেষে ছিটেফোঁটা দুধ বাছুরের। এই রকম দড়ি টানাটানি চলে বাছুরে-মানুষে।
আজ যেন জায়গাটা বেশি নির্জন। আমি স্কুল ছুটির দিন এখানে বসে থাকি। কখনও বা সোনাঝুরি গাছের নীচে বসে গল্পের বই পড়ি। কী যে ভালো লাগে, এই গা ছ্যাঁকছ্যাঁকে একলা একার অনুভূতির মধ্যে চুপচাপ বসে থাকতে! আমার এখন ক্লাস সিক্স। দরজা বন্ধ করে জামাকাপড় বদলাই। খালি গায়ে আয়নায় চোখ চলে গেলে লজ্জায় কান গরম হয়ে যায়। ইচ্ছেও হয়, ব্যথা-ব্যথা বুকে একটু হাত দিয়ে দেখতে। চারপাশটা শক্ত শক্ত, অল্প ফুলে ওঠা বুকদুটো আমাকে বেলকুঁড়ির কথা মনে করায়। তারপর কেমন গ্লানির ভেতর চটপট ফ্রক পরে নিই। একা থাকলে এখন অনেক সময়ই আমার সেদিকে মন চলে যায়, একা একাই লজ্জা পাই।
একা থাকা নাকি ভালো নয়। মিলি বলে। কথাটা আমার ঠিক বলেই মনে হয়। বৈঠকখানার এককোণে দাঁড়িয়ে একবার ইচ্ছে হয়েছিলো আমার যৌনাঙ্গে হাত দিয়ে দেখতে। পপির ওখানে নীলু হাত দিয়েছিলো নাকি।
লুকোচুরি খেলা হতো তখন রোজ বিকেলে। আসলে নানা ধরণেরই খেলা হতো। গাছের পাতা আনা, ছোট-খেলা, নুনচিক, “আইস্কোপ-বাইস্কোপ”, বুড়ি বসন্ত – আরও কত কত খেলা। লুকোচুরি খেলতে গিয়ে হীরীর মায়ের বাড়ির বার-বারান্দায় মেলে রাখা কাপড়ের আড়ালে লুকিয়েছিলো ওরা। তখন ওর ওখানে নীলু -। আমরা থ্রীতে পড়ছি তখন। সেকথা বলতে বলতে হিহি করে পপি খুব হেসেছিলো। কোনোরকম লজ্জাই পেলো না। সেই বয়সে খুব তুচ্ছ ব্যাপার একটা, একটা খেলাই যেন। তাই আমারও ওই রহস্যময় বৈঠকখানার কোণে দাঁড়িয়ে এই ইচ্ছা।
একা থাকা সত্যই ভালো নয়।
বলছিলাম মিলির কথা, আমার মাকে খুঁজতে যাবার কথা। অথচ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেমন। এক কথা থেকে অন্য কথা এসে যাচ্ছে। – মিলির কথায় আসি। ও এমন অনেক কথা বলে যার মানে না বুঝলেও একটা রহস্য টের পাই। ও পড়াশুনো করে না, স্কুল বন্ধ করেছে। ক্লাস ফোর পর্যন্ত – ব্যাস! বয়সে বেশ অনেকটা বড়ো আমাদের থেকে। ওর বুকদুটো কেমন নরম আর গড়ানো টাইপের। থেকে থেকেই ও আমাকে জাপটে ধরে, তখন বুঝেছি। খুব অস্বস্তি হয় আমার। ঠিক করি, ওর সঙ্গে আর মিশব না। কিন্তু ও এত দস্যি যে কারও বাধা, অপমান ইত্যাদি থোরাই কেয়ার করে! ও কারও কথায় কখনও রাগ করে না। হা-হা করে হাসে। গাছে চড়তে, সাঁতার কাটতে ওস্তাদ। ওর বাবা নাকি ছোটকাকুর সঙ্গে ওর বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলো। ঠাকুমা এককথায় নাকচ। মা-মাকীমারা একদম পছন্দ করে না ওকে। আমাকেও মিশতে বারণ করে।
তবু ও আসে আমাদের বাড়ি। ছোটকাকু বাড়ি এলে ওর আসাও বেড়ে যায়। কথা বলতে বলতে “মানুদা মানুদা” বলতে বলতে ঘাড়ে পড়ে যাবে যেন! ঠাকুমা ওকে ধমকায়, “এই, তুই ঠিক করে বসতে পারিস না? – “এই, তুই সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখিসনি?” – “এই, তুই এবার বাড়ি যা!” ছোটকাকীমা রাগে গজগজ করে। ওর সঙ্গে কথা বলে না। কাকুটা বড়ো সরল মানুষ। নরম করে বলবে, “মিলু, এবার তুই যা! আমাদের তো স্নান খাওয়া সারতে হবে!“
মিলু এখন ঘোরতর সংসারী। স্বামী-সোহাগী হয়েছে তো, এরপর বহুদিন সে ছোটকাকুকে “ছোড়দা” বলে ডেকেছে।
আমি গোয়ালের কাছে সোনাঝুরি গাছের নীচে এসে পৌঁছে গিয়েছিলাম। হাওয়ায় হাওয়ায় সরসর – ফিসফিস করে গাছ কিছু বললো। খানিক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি পাতা দোলার দিকে। যেন গুচ্ছ গুচ্ছ চুল দুলিয়ে ঘাড় নেড়ে নেড়ে কোনো বাচাল মেয়ে কথা বলছে।
একটা বাছুর তার মায়ের পেটে ঢুঁসো মেরে ফতুর বাঁট থেকে চকচক করে দুধ টেনে নেবার চেষ্টা করছে বৃথাই। সেই আওয়াজে সেদিকে তাকিয়েছিলাম। সোনাঝুরির অদূরে একটা গোঁজে গাইটা বাঁধা। দেখি আমার মায়ের একহাতে দুধের ছোট বালতি। বোধহয় দুধ দোওয়া হয়ে গেছে। অন্য হাতে সেজকাকুর ডানহাতের বাহু ধরে আছে। মায়ের চোখে সম্ভবত কিছু পড়েছে, বালি বা কোনোকিছুর কণা হবে। কাকু সেটা বের করার চেষ্টা করছে।
এই দৃশ্যে তো কোনো পাপ নেই, বলুন? তাহলে আমি যখন ডেকে উঠলাম “মা” বলে, তখন মা ছিটকে সরে যাবে কেন? কেন মুখটা তার ফ্যাকাসে হবে? আর কাকুরই বা কেন হবে কাঁচুমাচু? বিশ্বাস করুন, আমার তখন এসব কিছুই মনে হয়নি। আমি বললাম, “ওমা! তোমার গাই দোওয়া হলো? ঠাকুমা তোমাকে ডাকছে।“
মা যেন কোনোমতে বললো, “হ্যাঁ, চল!”
কাকু তখন গরুর ডাবার জাবনা ঠিক করছে।
২
নানাভাবে শুনেছি মায়ের গল্প। মায়ের খুব অল্প বয়সে বিয়ে হলো। মা শুনলো যার সঙ্গে বিয়ে সে তার থেকে চোদ্দ -পনের বছরের বড়ো। ছোটকাকু আর সেজকাকুর সঙ্গে মায়ের ঘনিষ্ঠতা তাই বেশি । ছোটকাকুর সঙ্গে আমার ছোটমামার কতো মিল ধরা পড়বে। ছোটকাকু হলো ভাই। আর সেজকাকু, বন্ধু। পেয়ারা, কুল, কাঁচাআম, কদবেল জোগাড় করে এনে চুপিচুপি ডাকবে, “বৌদি – ”! তারপর তিনজনে মিলে নির্জন দুপুরে লুকিয়ে লুকিয়ে সেসব উদ্ধার করা হবে।
এসবে কেউ খারাপ দেখলো না। বাবার সঙ্গে মায়ের গম্ভীর সম্পর্ক দেখে এসেছি বরাবর। বাবা চুপচাপ, তার প্রতি মায়ের সমীহই বেশি। সবাই তো তা-ই জানতো! এসব গল্প আগেই শুনেছিলাম। পরে বেশি বেশি করে উঠে এলো একদিন। যেমন হয়ে থাকে আর কী, ঘটনা ঘটার পর পরিপার্শ্ব নিয়ে কাটাছেঁড়া – বিচার-বিশ্লেষণ -।
আমি ঠিকই ছিলাম। মায়ের প্রতি আমার ব্যবহারে কোনো তফাত ছিলো না। তফাত করার কোনো কারণই ছিলো না আমার কাছে। কিন্তু মায়ের ব্যবহার কেমন যেন পাল্টে গেলো। সেটা আমার সঙ্গে যে হলো তাতে নিচ্চিত, অন্যদের সঙ্গে হলো কিনা বলতে পারবো না।
আমার চোখের দিকে মা ভালো করে তাকাতো না। মায়ের চোখমুখ শুকনো লাগতো। অপরাধীর ছায়া ছিলো কি তাতে? দেখতে পাচ্ছি, প্রতিদিন মা’র মুখ বিষণ্ণ থেকে বিষণ্ণতর।
মা, তোমার মুখে কি আত্মগ্লানির ছায়া? – তবে একটা কথা, মায়ের মুখে সেই সময়ে আমি সত্যিই এইরকম দেখেছিলাম, নাকি পরবর্তী কালে আমার বিচারমনস্ক মন ময়নাতদন্ত করে ছবিটা এঁকেছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারি না।
পরে একদিন বিকেলে আমাদের আবার লুকোচুরি খেলা। লুকোনোর জায়গাগুলো সবার জানা হয়ে গেছে। একই খেলা খেলে খেলে খেলার অন্ধিসন্ধি জানতে কারই বা বাকি থাকে! কোথায় লুকোনো যায় তাই ভাবছি। শর্ত আছে, কারও বাড়ির ভেতর লুকোনো চলবে না। তাহলে তো সহজেই ফাঁকি দেওয়া যেতো। নতুন জায়গা চাই, যেখান থেকে খুঁজে নিতে বেশ বেগ পেতে হবে খেলি পুলিশকে। ধাপ্পা খাওয়া চলবে না। তাহলে আমাকে হতে হবে পুলিশ, আর লুকিয়ে থাকা সবাইকে খুঁজে বার করে ধাপ্পা দিতে হবে। সে খুব শক্ত। চোর দিব্যি পালিয়ে যাবে, কঠিন জায়গায় লুকিয়ে থাকবে। আমার দ্বারা এসব হবে না। চোর হওয়া চিরকালই সহজ।
যে লুকিয়ে থাকে তাকে খুঁজে পাওয়া চিরকাল কত কঠিন! অথচ সেই কঠিন কাজটাই করে যেতে হচ্ছে। তোলপাড় করে ফেলছি সব লুকোনোকে খুঁজে বের করতে।
খুব ভাবছি তখন, কোথায় লুকোবো – কোথায় লুকোবো –! সময় হয়ে গেছে, এক্ষুণি কুড়ি গোনা শেষ হয়ে যাবে। আমার সঙ্গে আছে পাপিয়া।
বাকিরা সবাই দুদ্দাড় করে যে যেদিকে পারে দৌড়েছে। পাপিয়ার হাত ধরে টান দিয়ে বলি – চল! দিলাম দৌড়। আমাদের গোয়ালবাড়ির দিকে ছুটছি। ওদিকে সচরাচর লুকোই না কেউ। ছুটে গিয়ে গোয়ালের ভেতর ঢুকে পড়ি। গরু তখনও চাতালে বাঁধা। বাঁদি কিরষেণ গণাকাকা গরু গোয়ালে ঢোকায়নি। গোয়ালের ভেতর দুটো ঘর। বড়োটায় গরু বাঁধা থাকে, ছোটোটায় গরুর জাবনা, কিছু খড়, চাষের দু-একটা সরঞ্জাম ইত্যাদি থাকে। আমি গরুর ঘরে ঢুকেই একটা কোণে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়তে চাইছি। কিন্তু কীসের সঙ্গে যেন জোর ধাক্কা লাগলো। গোয়ালের মাটির মেঝে খুব মসৃণ নয়, কোথাও কোথাও অল্পস্বল্প গর্ত মতো। তাই ধাক্কা খেয়ে সামান্য উঁচুনিচুতে পা হড়কে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। মুখ তুলে তাকালাম।
কে যেন ঝুলছে –! কে? ছোট একটা জানলার মতো ফোকর দিয়ে একেবারে শেষ সূর্যের মরা আলো গোয়ালে – ওই তো তেরছাভাবে পড়েছে। ভেতরটা একেবারে অন্ধকার নয়। খেলার উত্তেজনা – বাইরের বেশি আলো থেকে কম আলোয় – অন্ধকারই লাগছিলো ঢুকে। ভালো ঠাহর হয়নি প্রথমটায়। মুখ তুলে তাকাতে মানুষ বলে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। শাড়ী পরা। এবার ভয়ে আতঙ্কে আমার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। বুকের ধুকপুক যেন বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে মরার কথা কখনও কখনও কানে এসেছে। আমার কষ্ট হয় বলে শুনি না। কেউ এমন কথা শুরু করলেই উঠে চলে যাই। – আমার গলায় হাত চলে গেল, এই তো ঘাম লেগে! কিন্তু ও কে?
এবার স্পষ্ট দেখতে পাই মুখটা। চিৎকার করে উঠলাম প্রাণপণ – “মা –! মাগো – !” কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না। শুধু গোঙানি বের হয়ে থাকবে। পাপিয়া সামনের ঘরে ছুটেছিলো। আমি আরও একটু দূরে,খুঁজে পেতে আরও একটু সময় লাগবে ভেবে পিছনের ঘরে ঢুকেছিলাম। – তুমিও কি তাই এই ঘরটাই বেছে নিলে মাগো? যাতে যথেষ্ট সময় নিয়ে মরা যায়! কেউ তোমায় বিরক্ত না করে?
আমার গোঙানি আর আছাড় খেয়ে পড়ার শব্দে পাপিয়া এখানে চলে এসেছে। এক-দু মুহূর্ত। তারপরই চিৎকার করে ছুটে বেরিয়ে গেছে। আমাদের খেলায় এর পরেরটাই ছিলো সেদিনের শেষ পালার লুকোনো। তারপর যার যার বাড়ি ফেরার কথা। আমার ছিলো জীবনের শেষ খেলা।
খেলা শেষ হলে বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে চেঁচাতাম, “মা, খিদে পেয়েছে, খেতে দাও – “! মা আর কোনোদিন বললো না, জল ভরে রেখেছি, কলতলায় গিয়ে ভালো করে হাত-পা ধুয়ে আয় – । তারপর খাওয়া।
তুমি আমার সব খেলা শেষ করে দিলে, মা! কেন করলে এমনটা?… খুব রাগ হয়েছিলো মায়ের উপর। আমি ছাড়া কেউ তো জানতে পারেনি তোমার মন। তুমি চলে যাবার পরেও নয়। তাহলে কেন চলে গেলে? তোমাকে আর সেজকাকুকে আমি না দেখলে তুমি কি চলে যেতে? এই প্রশ্নের উত্তর আমায় কে দেবে? এর উত্তর আমার যে না জানলে চলবে না! নিজেকে কোন জায়গায় রাখব, আমি যে বুঝতে পারি না!
তোমার চলে যাবার কারণ খুঁজতে গিয়ে সবাই খুব হাতড়েছিলো। নাহ্! সামান্য ভুল ভেবেছিলাম। তখন তো ছোটো ছিলাম, তুমিই আমায় রাতারাতি বড়ো করে দিলে অবশ্য! বড়ো হয়ে বুঝেছিলাম, শুধু আমি না, আরও দুজন মানুষ জানতো তোমার চলে যাবার কারণ। অন্তত একজন জানতোই। আর একজন যে গাম্ভীর্যের ভেতর থেকে কোনোদিন বেরোলোই না। একটা দুর্ভেদ্য বর্ম পরে থাকলো সারাজীবন। কিন্তু আমি তোমায় কিছু বলিনি, মা! কাউকে বলিনি। কোনোদিন বলতামও না। তাতে তো আমারই পাপের কথা সবাই জেনে যেতো! পাপই তো! যা দেখা উচিত নয়, সেটাই পাপ। খারাপ চোখে দেখাটাই পাপ। তাই মা চলে গেলো। বাবাও অল্প কয়েক বছর পর, কোথায় কে জানে! কখনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বাড়ি এখন ভাইএর।চারজনের পক্ষে বড্ড বড়ো বাড়িটা। বাকিরা সবাই ছেড়ে গেছে কোনো না কোনোভাবে। তবে তাদের ছায়া আছে বাড়ি ঘিরে। যখন তখন তাদের ডাক শুনতে পাই।
শরীর নাকি মন্দির! ভুল কথা। এই শরীর হলো পাপ। তাতে খুব ঘেন্না আমার। একা হলে পাপের ইচ্ছা জাগে, সেকথা ভুলিনি। দুজনে মিলেও যে একা হওয়া যায়, ছোটবেলায় দেখেছিলাম, বড়ো হয়ে বুঝেছি।