সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১৫)

কেল্লা নিজামতের পথে
মুর্শিদাবাদে ঘুরতে ঘুরতে আজ একটা কামানের গল্প বলব। ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্রাজ্য কায়েম করার প্রধান একটি হাতিয়ার ছিল কামান। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে যেমন ছোট ছোট কামান ও ম্যাচলক বন্দুক এনে বাজি জিতে ছিলেন সম্রাট বাবর, তার পর থেকেই ভারতে যেকোনো যুদ্ধে রীতিমত নিয়ামকের ভুমিকা নেয় কামান। আমরা যারা বিষ্ণুপুর বেড়াতে যাই, তারা একটি বিখ্যাত কামান অবশ্যই দর্শন করি। দলমাদল কামান। বিষ্ণুপুরে মল্ল রাজাদের সময়ে নির্মিত এই কামান বর্গী আক্রমণে বিশেষ ভূমিকা নেয় বলে শোনা যায়। ঠিক তেমন ভাবেই তৎকালীন ঢাকা শহরে ছিল একটি কামান যার নাম জাহানকোষা। এই জাহানকোষা কামান এক সময় মুঘল আমলে বহু ইতিহাসের সাক্ষী। বাংলার রাজধানী ঢাকা তখন জাহাঙ্গীরনগর। এখান থেকেই শাসন হয় তামাম বাংলা বিহার উড়িষ্যা। মাথার উপর সুবেদার ইসলাম খাঁ ও সর্বোপরি দিল্লিতে মুঘল সম্রাট শাহজাহান। সেই সময় ১৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে ঢাকায় শিল্পী জনার্দন কর্মকার প্রস্তুত করেন জাহানকোষা। এই সবকিছুই জানা যায় কামানের গায়ে পিতলের ফলকে লেখা থেকে। ইতিমধ্যে বাংলায় আসেন করতলব খাঁ। মুর্শিদকুলি উপাধি নিয়ে তিনি বসেন দেওয়ানের আসনে। এরপর যখন সুবেদার আজিমুশ্বানের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে রাজধানী স্থানান্তর করে নিয়ে আসেন মুর্শিদাবাদে, তখন সঙ্গে নিয়ে আসেন জাহানকোষা কামানটি। সেই থেকে মুর্শিদকুলের সাথে কামানটিও মুর্শিদাবাদবাসী। আজও কাটরা মসজিদের তোপখানায় রাখা আছে জাহানকোষা। একসাথে ১৭ কেজি বারুদের গোলা দরকার হত একটি তোপবর্ষণের জন্য। প্রায় ১৭ ফুট লম্বা এই কামান সেযুগে বাংলার ধাতুশিল্পের একটি অনন্য নিদর্শন। আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে এই কামানটিকে একটি গাছে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। অযত্নে ও অবহেলায় কামানটির তখন জীর্ণ দশা। যদিও অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি বলে আজ পর্যন্ত বিন্দুমাত্র মরচে ধরেনি কামানটির গায়ে। একেবারে প্রায় অক্ষত অবস্থায় আজও বাঙালির শিল্প সত্ত্বাকে আধুনিক মানুষের সামনে তুলে ধরে এই কামান।
সকালে মধ্যাহ্নভোজ সারবার জন্য হোটেল রেস্টুরেন্টের অভাব নেই মুর্শিদাবাদ। মুঘল মুসলিম খানা থেকে আদ্যোপান্ত হিন্দু খাবার, সবই মিলে যায় এই শহরে। ইতিহাস ঐতিহ্য আর ঘটনাপ্রবাহে ভর করে শহরটির বেড়ে ওঠা। ভাঙা গড়া তো থাকবেই৷ আছেও। মুর্শিদাবাদের দেয়ালে দেয়ালে উঁকি মারলে শোনা যায় কত চাপানউতোর৷ সে ঘসেটি বেগম ও আমিনা বেগম ঘনিষ্ঠ হোসেন কুলি খাঁয়ের খোলা রাস্তায় নির্মম হত্যা হোক অথবা মুর্শিদকুলির কন্যা ও সরফরাজের মা আজিমুন্নিসা বেগমের জীবন্ত কবর হোক। ঘটনার প্রবাহে রঙিন মুর্শিদাবাদ। অলিতে গলিতে ছড়ানো ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতা। ভাগীরথীর পূর্বপাড়ে মহিমাপুরে জগত শেঠের বাড়ি যাওয়ার পথে বাম হাতে পড়ে পুরনো একটা ভগ্নস্তূপের মত কবর। আশপাশে বাগান দিয়ে সাজানো। কিন্তু কে শুয়ে আছেন এই কবরে? সামনে আর্কিওলজিক্যাল বোর্ড বলছে এটিই মুর্শিদকুলি কন্যা আজিমুন্নিসা বেগমের কবর। কে এই আজিমুন্নিসা বেগম? মুর্শিদকুলি খাঁয়ের বড় মেয়ে এবং উড়িষ্যার শাসনকর্তা ও পরবর্তী নবাব সুজাউদ্দিন খাঁয়ের বেগম আজিমুন্নিসাই মুর্শিদাবাদে পরিচিত কলিজা খাওয়া বেগম হিসাবে। একসময় দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত আজিমুন্নিসা বেগমকে চিকিৎসক নিদান দেন প্রত্যেকদিন একটি করে হনুমানের কলিজা খাবার। কিন্তু বিষয়টি হনুমান অবধি থেমেছিল না। স্থানীয়দের কথায় জানা যায় প্রত্যেকদিন একটি করে শিশুর কলিজা খাওয়া নাকি বেগম আজিমুন্নিসার নেশায় পরিণত হয়। এবং এহেন পিশাচিনী বেগমের পরিণতি হয় জীবন্ত সমাধি। মুর্শিদকুলি খবর পাওয়ার পর মেয়েকে জীবন্ত সমাধি দিতে নাকি দু’বার ভাবেননি। কিন্তু এই সবই তো লোকগাথা। ইতিহাস কোথায়? ইতিহাসের কোনো প্রামাণ্য গ্রন্থেই কেন এই ঘটনার বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই? নবাবী আমলের সব থেকে প্রামাণ্য গ্রন্থ গোলাম হোসেনের সিয়ার উল মুতাক্ষরীণও কেন এই তথ্যকে সিলমোহর দেয় না? আসলে আজিমুন্নিসা বেগম ছিলেন যথেষ্ট প্রভাবশালী এক নারী। শিশুর কলিজা খাওয়া তাঁর পক্ষে যেমন সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি তাঁকে ধরে বেঁধে জীবন্ত কবর দিয়ে দেওয়াও মুর্শিদপুরের পক্ষেও সম্ভব নয়। বিশেষ করে আজিমুন্নিসা বেগম ছিলেন সরফরাজ খাঁয়ের মা। তাই এরূপ একটি ঘটনা সরফরাজ মুখ বুজে দেখবেন এই মত কেউ ইতিহাস সমর্থন দেয় না। তাই যথারীতিই কলিজা খাওয়া বেগমের গল্প কখনো লোকগাথা থেকে ইতিহাসের উন্নিত হতে পারে নি। তাছাড়া মুর্শিদাবাদে রেখেছি মুর্শিদ কলির বংশের সমস্ত কবরই সিঁড়ির তলায় প্রতিষ্ঠিত। যেমন কাটরা মসজিদের সিঁড়ির তলায় মুর্শিদ কুলের কবর, ঠিক তেমনই আজিমুন্নিসা বেগমের কবরও সিড়ির তলায় অবস্থিত। তাই পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিচার করলে এই মতামতে এসে পৌঁছতে খুব একটা দেরি হয় না যে আজিমুন্নিসা বেগম নিজেই তার কবরের জায়গা পছন্দ করেছিলেন এবং মৃত্যুর পর তাকে সেখানে শায়িত করা হয়েছে। তবে কেন এই গালগল্প? আসলে যুগে যুগে চলে আসা এসবই গাইডদের পেশাগত বাধ্যবাধকতা। মুর্শিদাবাদের ইতিহাস নিয়ে এমন বহু গাল গল্প ছড়িয়ে আছে অলিতে গলিতে। কতটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য আর কতটা নয় তা ইতিহাস দিয়ে শোধন করে নিতে হয়।