সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্তী (ইতিহাস কথা পর্ব ৮)

শ্রীরামপুরের কথা

এদিকে ১৮০৮ সালে গ্রেট ব্রিটেনের সাথে আবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ডেনমার্ক। আর তখনই কলকাতা থেকে ইংরেজ কোম্পানি দ্বিতীয়বার শ্রীরামপুর দখল করবার চিন্তাভাবনা শুরু করে। দেরি না করে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে একদল সৈন্যও তড়িঘড়ি পৌঁছে যায় শ্রীরামপুর। ইংরেজ লেফটেন্যান্ট কর্নেলের নেতৃত্বাধীন বাহিনী এক শীতের ভোরে শ্রীরামপুরের ড্যানিশ কলোনির অধিকার কায়েম করে বসে। তখন শ্রীরামপুরের শাসক জেকব ক্রিফটিং। বিখ্যাত মিশনারীরাও চুটিয়ে ধর্মপ্রচারের কাজ করছেন স্থানীয় আশপাশের গ্রামগুলোয়। ইউরোপে যুদ্ধের দামামায় হঠাৎ নেমে আসা এমন বিপর্যয়ে মাথায় হাত পড়ে ড্যানিশ কোম্পানির। নিজেদের হাতে তিলে তিলে গড়ে তোলা তাদের একান্ত আপন একটি সাজানো-গোছানো ভারতীয় শহর শ্রীরামপুর। দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছরের উপনিবেশের উপর মায়াও যে জড়িয়ে যায় নি তা নয়। জমে উঠেছে বাণিজ্যও। এমনকি ড্যানিশ কোম্পানির সাথে ব্যবসা করে বহু প্রতিপত্তি হয়েছে স্থানীয় বাঙালীদেরও। গোস্বামী বাড়ির রঘুরাম গোস্বামীর নামও তখন চতুর্দিকে। ড্যানিশ বাণিজ্যের অধ্যক্ষের কাছে তাঁদের কদরও প্রচুর।
কিন্তু কলকাতায় বসে সারা বাংলার দিক থেকে এতটুকু নজর ঘোরাচ্ছেন না তখন ইংরেজ সরকার বাহাদুর। সাম্রাজ্যের নেশায় বুঁদ ব্রিটিশরা ছেড়ে কথা বলছেন না শ্রীরামপুর থেকে ফরাসী চন্দননগর, কোনোদিকেই। কিন্তু শান্তিপ্রিয় ড্যানিশরা বাণিজ্যের ওপরে কখনো গুরুত্ব দেয়নি সামরিক সাজসজ্জাকে। ব্যবসার পতাকা নিয়ে যাঁরা ভারতের উপকূলে পা ফেলেছিল সুদূর ডেনমার্ক থেকে, আর যাই হোক, ব্রিটিং কোম্পানির মতো তাদের আগ্রাসনের আগুনে জ্বলেপুড়ে মরে নি সাধারণ ছাপোষা বাঙালী। তাদের গণ্ডি ছিল ভাগীরথীর তীরে ওই ছোট্ট শহর শ্রীরামপুরেই। শহরটিকে সাজিয়ে-গুছিয়ে তারা তৈরি করেছিল মনের মতো করে। কিন্তু ব্রিটিশদের প্রতিটি পদক্ষেপ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দিয়েছে তাদের বাণিজ্য ভবিষ্যতটুকুও। বারবার ব্রিটিশ বাহিনী সুযোগ পেলেই শ্রীরামপুরে উপনিবেশের থাবা বসানোয় মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে ড্যানিশ কোম্পানির নির্বিবাদী বাণিজ্যনীতি। ভেঙে ফেলা হয়েছে তাদের কুঠি। বন্দী করাও হয়েছে সিভিল ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ আধিকারিকদের। এবারেও তার অন্যথা হল না। শ্রীরামপুর নিজেদের দখলে নিয়ে সেখানেই বন্দী করা হল সব ড্যানিশ কর্মচারীদের। এককথায় সম্পূর্ণ থেমে গেল এককালে পতপত করে ওড়া ড্যানিশ বাণিজ্য জাহাজের রাজপতাকা। ব্যারাকপুর থেকে জর্জ ইলিয়ট সাহেব নৌকায় শ্রীরামপুর পৌঁছে ওইদিনই দখল করলেন তিন তিনটি জাহাজ। কোম্পানির ডাক্তার ডঃ ন্যাথান উল্ফও বন্দী হলেন ব্রিটিশদের হাতে। প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্রিটিশরা শ্রীরামপুরকে একরকম কারাগারে পরিণত করে ফেললো। ক্রমে নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্য হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়লো ড্যানিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। প্রথম থেকে এমনই ছিল এদেশের মাটিতে ব্রিটিশ আগ্রাসন। নিজেদের প্রতিহিংসার আগুনে শ্রীরামপুর, চন্দননগরের মতো বাংলার অন্যান্য ইউরোপীয় বদান্যতায় গড়ে ওঠা শহরগুলোকেও একদিনের জন্যও ছাড়েনি তারা। হুগলী নদীতে বারবার ভেসেছে ইংরেজ রণতরী। শব্দ করেছে ব্রিটিশ কামান। তার গন্তব্য কখনো শ্রীরামপুর, আবার কখনো ফরাসী চন্দননগর। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজকে সিঁনফ্রে সাহেবের সরাসরি সহায়তার পর থেকে বারবার ব্রিটিশদের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল চন্দননগরে ফরাসীদেরও। তাই একাধিকবার নিজেদের খেয়ালখুশিমতো এইসব শহরের দখল নিয়েছে ইংরেজ আবার মর্জিমাফিক ছেড়েও দিয়েছে রাশ। ঠিক সেই খেয়ালের বশেই শ্রীরামপুরের দখল নেবার কিছুদিন পরেই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান ডঃ ন্যাথান উল্ফ সাহেব ও আরো কিছু ড্যানিশ অফিসার। যদিও শুধুমাত্র ধর্মপ্রচারের ছাড়পত্রটুকু মিশনারীদের হাত থেকে কেড়ে নেয় নি ইংরেজ কোম্পানি।
এর মধ্যেই ঘটে যায় আরও এক বিপর্যয়। যদিও সেটি প্রাকৃতিক। ১৮১২ সালের ১১ই মার্চ ভয়ানক ভূমিকস্পের কবলে পড়ে শ্রীরামপুর এবং সেইদিন বিকেলেই আগুনে ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের অফিস। এখনো অবশ্য বলাই হয় নি মিশন প্রেসের কথা। সে এক আশ্চর্য নবজাগরণের উত্থান। যখন বাংলা হরফে ছাপা বইয়ের কথা কস্মিনকালেও কেউ কানে শোনে নি, তখন একটি আস্ত মুদ্রণযন্ত্র আনিয়ে এবং গাছের ছাল থেকে বাংলা হরফ প্রস্তুত করে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস নামক একটি ছাপাখানা তৈরি করে ফেললেন রেভারেন্ড উইলিয়াম কেরী। সম্পূর্ণ ছাপাখানা ও যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পড়ল আর এক মিশনারী উইলিয়াম ওয়ার্ড সাহেবের ওপর। বাংলা হরফ নির্মাণে যে মানুষটির কথা না বললেই নয় তিনি বৈদ্যবাটি নিবাসী শ্রী পঞ্চানন কর্মকার। হরফ নির্মাণে দক্ষ শিল্পী ক্যাপ্টেন উইলকিনের নামডাক তখন চারদিকে। তাঁর কাছ থেকেই হরফ নির্মাণের তালিম আগেই নিয়েছিলেন বৈদ্যবাটির বাঙালী শিল্পী পঞ্চানন। পরে শ্রীরামপুরে ছাপাখানায় ডাক পেলে তিনি বাংলা হরফ নির্মাণে সরাসরি নেতৃত্ব দেন। তাই বাংলা সাহিত্য ও বইপ্রেমীরা আজও পঞ্চানন কর্মকারের কাছে চিরঋণী। তাঁর বানানো হরফেই তখন একের পর এক ছাপা হয় বাংলা গদ্যের বই। সেইসব বই শ্রীরামপুর থেকে আসে কলকাতায়। পড়ানো হতে থাকে লর্ড ওয়েলেসলী প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে। সেখানেই প্রথমে বাংলা পড়াতেন কেরী সাহেব। তাঁর বাংলা ক্লাস করবার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকতো ছাত্ররা। সেখানে তিনি যেসব গদ্যবই পড়াতেন, তা সবই ছাপা হতো শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে। কিন্তু ধর্মভীরু গোঁড়া বাঙালী সাহেবদের হাতে ছাপা বইকে ভালোভাবে নিলো না। বিশেষ করে হিন্দুধর্ম বিষয়ক বইগুলো। তাদের চোখে এইসমস্ত বই হয়ে রইল অচ্যুত। এমনকি কোনও ছাপা বই কেউ ছুঁয়ে ফেললে গঙ্গাস্নানের বিধানও দেয়া হত গোঁড়া ব্রাহ্মণদের সালিশি সভায়। এমনই ছিল প্রথমে বাঙালীর কাছে বাংলা বইয়ের স্থান।
ইতিমধ্যেই শ্রীরামপুরে মিশনারী উদ্যোগে ছাপাখানা তৈরি হয়েছে শুনে কলকাতায় সোরগোল পড়ে গেল। রামরাম বসু নামক একজন বাঙালী খ্রীশ্চান বাগ্মী ও পন্ডিত ব্যক্তি স্বচক্ষে এসব দেখতে কলকাতা থেকে ছুটে গেলেন শ্রীরামপুরে। রেভারেন্ড কেরী সাহেবের সাথে আলাপ জমলো তাঁর। আর সাহেবও তাঁর গুণমুগ্ধ হয়ে তাঁর মুন্সী করবার প্রস্তাব পেড়ে বসলেন। রামরাম বসু রাজি হলে শ্রীরামপুরেই তাঁর পাকাপাকি বাসস্থানের একটা ব্যবস্থা করা হল এবং তিনিও শ্রীরামপুরবাসী হয়ে গেলেন। এরপর শ্রীরামপুর প্রেস থেকে শুরু হল তাঁর সাহিত্য কর্মকাণ্ড। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যখন বাংলা গদ্য বইয়ের অভাব প্রকট হয়ে পড়ে, তখনই রামরাম বসুকে একটা বাংলার ইতিহাসভিত্তিক গদ্যবই লিখতে অনুরোধ করেন স্বয়ং কেরীসাহেব। আর প্রথমে একটু অপ্রস্তুতে পড়লেও পরে কোমর বেঁধে লেগে পড়েন রামরাম। বাংলার বারো ভুঁইয়ার শ্রেষ্ঠ ভুঁইয়া বঙ্গেশ্বর প্রতাপাদিত্যের জীবনী অবলম্বনে লিখে ফেলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম গদ্যবই ‘প্রতাপাদিত্য চরিত্র’। এছাড়াও শ্রীরামপুর প্রেস থেকে পরপর ছাপা হয় কেরীর কথোপকথন, বাইবেলের নূতন সন্দর্ভ, পন্ডিত মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কারের হিতোপদেশ, রাজাবলী, প্রবোধ চন্দ্রিকা ইত্যাদি বাংলা বই। সবকটি বই পাঠ্যপুস্তক হিসাবে পড়ানো শুরু হয় কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে। এভাবেই গোড়াপত্তন হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা ও বাঙালীর বিখ্যাত রেনেসাঁসের। যার ঢেউ পরবর্তীতে আছড়ে পড়ে নব্যবাঙালীর প্রতিটি ঘরে ঘরে। হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ডিরোজিওর ভাবাদর্শে যে সাহসে পরে মাথা তুলেছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদার, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়রা, তারই সূত্রপাত ঘটেছিল শ্রীরামপুর মিশনারীদের হাত ধরেই। শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে তৈরি হওয়া ঢেউ যখন আছড়ে পড়ে গোলদিঘির পাশে হিন্দু কলেজের দরজায়, তখন আর পিছন ফিরে তাকায় নি বাঙালী। শ্রীরামপুরের পথে তৈরি হয় এক নতুন গন্তব্য। এ যেন এক নতুন শ্রীরামপুর। এ যেন বাঙালীর এক নতুন ভাবধারার শহর।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।