সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১৮)

কেল্লা নিজামতের পথে
সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্নের শেষ নেই মুর্শিদাবাদে। আজও মানুষের মনে করে ঠিক তেমন ছিল নবাবদের জীবন? ঠিক কেমন করে প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নীতি অনুসারে দেশ শাসন করত নবাব নাজিমরা। আজ তো আর নবাবী নেই৷ পড়ে আছে কিছু ইট কাঠ পাথরের ভাঙাচোরা ইমারত। তাও তা হাতে গোনা। এরমধ্যেই একেবারে ভরদুপুরে মহিমাপুর থেকে একটা টোটো গাড়ি ঠিক করে পৌঁছে গেলাম একটা ভাঙাচোরা, অসম্পূর্ণ মসজিদের মধ্যে। বর্তমান রেললাইনের পাশে লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে একটা রাস্তায় দাঁড়ালো আমার টোটোটা। আমি নেমে হাঁটা দিলাম পাশের সরু রাস্তা ধরে। উদ্দেশ্য ওই ভাঙা মসজিদটা। অষ্টাদশ শতাব্দীর একটা বিখ্যাত আর্কিটেকচার যে প্রায় ধ্বংসাবশেষ অবস্থায় এই কানাগলির মধ্যে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে তা আমি কল্পনা করিনি। যদিও অসম্পূর্ণ সেই মসজিদটা দেখাই আমার উদ্দেশ্য ছিল তখন। কিন্তু তার বর্তমান অবস্থান ও পরিস্থিতির বিচারে সে যে কতটা অবহেলিত তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। স্থানীয় জনগণের মুখে মসজিদটির নাম ফুটি মসজিদ বা ফৌতি মসজিদ। কিন্তু তাকে খুঁজে বার করা একজন বহিরাগতের পক্ষে বেশ অসুবিধাজনকই। আশপাশে ছোট ছোট অস্থায়ী কুঁড়েঘরের পাশে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল ইমারত যেন। একপাশে আকাশচুম্বী দেয়াল। দু একজন কে জিজ্ঞাসা করেই পৌঁছে গেলাম পিছন দিক দিয়ে ঘুরে তার সদর দরজায়। কিন্তু পৌঁছেও আবার অবাক হওয়ার পালা। এতো পেল্লায় একটা মসজিদ, যার দেয়ালে দেয়ালে সে যুগের নবাবীয়ানার ছাপ। কিন্তু তার ভেতর ঢোকবার জন্য একটা ভালো রাস্তা পর্যন্ত করা নেই৷ জমি থেকে বেশ অনেকটা ওপরে পা দিয়ে রীতিমতো কষ্ট করে উঠতে হয় সেখানে। একেবারে খালি দুধু একটা মসজিদের ভেতর বড় বড় আগাছা এবং রীতিমত লম্ফঝম্প করে তার ভেতরে ঢোকার প্রস্তুতি। এই হল নবাবদের স্থাপত্যগুলোর বর্তমান সংরক্ষণের হাল। অথচ এই মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একসময়ের নবাব সরফরাজ খাঁয়ের বর্ণময় ইতিহাস। প্রথমে দাদু মুর্শিদকুলি খাঁয়ের মৃত্যুর পর উড়িষ্যা থেকে ছুটে আসা সুজাউদ্দিনকে পুত্র হিসেবে নবাবের আসন ছেড়ে দেওয়া, এবং তারপরে বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসে একের পর এক প্রহসনের সম্মুখীন হওয়া, এই ছিল সরফরাজের নবাবী ইতিহাস। এই ফৌতি মসজিদ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সম্পূর্ণ করার ইচ্ছা মনে পোষন করলেও তিনি কি তা করে উঠতে পেরেছিলেন? যদি করে উঠতেন, তাহলে মসজিদের ছাদ এভাবে অসম্পূর্ণ ও খোলা থেকে যেত না। আজও এই বিশাল মসজিদের ভেতরে ঢুকলে স্বাধীন দেয়াল গুলো যেন একা একা গিলে খেতে আসে যে কোন পর্যটককে। অথচ ভেতরে দেয়ালে অসাধারণ কারুকাজ আজও মুগ্ধ করে দেয়। শিল্প সত্ত্বা ও সময়ের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু কজন পর্যটক দেখতে আসেন সরফরাজের এই ফৌতি মসজিদ কে? পরিবার নিয়ে দেখতে এলেও কজন বা ভেতরে ঢুকতে পারেন সেই দুর্গম উঁচু নিচু রাস্তা পেরিয়ে? জানিনা এমন ঐতিহাসিক স্থাপত্যে পর্যটকদের ঢোকবার জন্য পরে কখনো সুবন্দোবস্তের বিষয় চিন্তা হবে কিনা, তবে বর্তমানে তা সত্যিই দুর্গম। যে মসজিদ সম্পূর্ণ তৈরি করার আগেই গিরিয়ার যুদ্ধে আলিবর্দীর হাতে প্রাণ দেন সরফরাজ, তা আজও ঠিক একই জায়গায় এবং ওই অবস্থায় পড়ে আছে মুর্শিদাবাদের বুকে। এটাই হল মুর্শিদাবাদের বৈশিষ্ট্য। এক নবাবের কাজ আর এক নবাব সম্পূর্ণ করেছেন এমন নজির প্রায় হাতে গোনা। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে কয়েকটি ক্ষেত্র যে দেখা যায় না তা নয়। যেমন মুর্শিদকুলির চেহেল সেতুনকে এক কথায় বিশাল রূপ দেন তাঁর জামাই সুজাউদ্দিন। মুর্শিদাবাদে আসার পর নিজের বাসভবন হিসেবে যে চেহেল সেতুন নির্মাণ করেছিলেন মুর্শিদকুলি, তার দরবার গৃহ, দালান থেকে শুরু করে প্রায় সমস্তটার এক কথায় বিশাল ব্যপ্তি ঘটান নবাব সুজাউদ্দিন। কিন্তু তেমনটা সব ক্ষেত্রে হয়নি। তাই মুর্শিদাবাদের নবাব অনুযায়ী প্রত্যেকের ছিল আলাদা আলাদা বাসগৃহ এবং মসজিদ। কিছু আজও অক্ষত, আর কিছু সময়ের চাকায় মিলিয়ে গেছে ভাগীরথীর জলে। ঠিক সেভাবেই সরফরাজেরও ইচ্ছে হয়েছিল নিজস্ব মসজিদ নির্মাণের। কিন্তু সিংহাসনে বসা থেকেই নিজের মন্ত্রীবর্গ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যেই এত অস্থিরতা যে কোন কিছুই ঠিকমতো ভেবে ওঠার বা সাজিয়ে ওঠার সুযোগ হয়নি তার রাজত্বে। তারমধ্যে যেমন রয়েছে প্রজাদরদী নবাব এবং সুশাসক বাবা সুজাউদ্দিনের রক্ত, ঠিক তেমনভাবেই রয়েছে অত্যন্ত বিলাসী জীবনের এক বিরাট আকাঙ্ক্ষা। মুর্শিদাবাদের নবাবদের মধ্যে একমাত্র সরফরাজ ছিল প্রায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। নগরে বেরোলে সহস্র দেহরক্ষী ঘিরে সাধারণ মানুষের থেকে নিজেকে দূরে রেখে একটা পাঁচিল নির্মাণ করে থাকতেন তিনি। সেক্ষেত্রে সহজে নাগাল পাওয়া যায় না নবাব কে। অথচ নবাব থাকেন বিলাস-ব্যসন এবং হারেমে সুন্দরী নারীদের মধ্যে। বিচারব্যবস্থাতেও খুব একটা নজর নেই নবাবের। এক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর মধ্যেই বিশৃঙ্খলা এবং নগরে জনমানুষেও এক তীব্র বিরক্তি ঘিরে ধরেছিল মুর্শিদাবাদে। কিন্তু সরফরাজের কান নেই কোনোদিকেই। সে থাকে তার নিজের খেয়ালে। এমনকি রাজত্বকালে জগত শেঠ, আলীবর্দী খাঁ, তার দাদা হাজি আহমেদ কারো সঙ্গেই দুর্ব্যবহার করতে ছাড়েননি সরফরাজ। অথচ এই হাজী আহমেদ এবং আলীবর্দী খানের উপরে ভরসা করে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিতেন তার বাবা সুজাউদ্দিন। কিন্তু ধর্মপরায়ণ আলীবর্দী কেমন করে তার প্রভু সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজকে যুদ্ধক্ষেত্রে হত্যা করে নিজের সিংহাসনে বসলেন, তা বাংলার ইতিহাসে সত্যিই এক গভীর প্রশ্ন। অর্থাৎ ঠিক যে ঘটনা ঘটেছিল পরবর্তীকালে সিরাজ এবং মীরজাফরের ক্ষেত্রে, তারই ছবি যেন অনেক আগেই নির্মিত হয়েছিল মুর্শিদাবাদের আকাশে নবাব সরফরাজ এবং তার কর্মচারী আলীবর্দী খাঁয়ের হাত ধরে। কিন্তু এই বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্নটি আজ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, বরং অনেক বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে মীরজাফরের বেঈমানি। কেন এমন পক্ষপাতিত্ব? প্রশ্নটা না হয় রাখা থাক। আলোচনা হবে পরের পর্যায়ে।