এক মাসের গপ্পে জাহ্নবী ব্যানার্জী (পর্ব – ৫)

নীলাঞ্জনা

(৫ম পর্ব)

বাইরে বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলেছে। কটা বাজে কে জানে! ট্রেনের দুলুনিতে চোখ লেগে গেছিলো কিংশুকের। উঠে গিয়ে ট্রেনের দরজার কাছে যেতেই বুঝতে পারল বন্ধ দরজার এপার থেকে বৃষ্টির বেগ যতখানি মনে হচ্ছিলো, তার চাইতে অনেক বেশী জোরেই এই ধারাপাত চলছে। এরকম ভাবে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছিল আরও এক দিন। নীলাঞ্জনা দি ফোনে সবকিছু জানানোর ঠিক পর দিন। নাঃ… সেই রাতে কিংশুক ঘুমায়নি। ভোরের দিকে চোখ একটু লেগে এসেছিলো। ঘুম যখন ভেঙ্গেছিল, তখন ঘড়িতে সকাল ৯ টা হলেও জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে হয়েছিলো, সন্ধ্যা হয় হয়। শহরের মাথায় গর্ভবতী মেঘেদের জমায়েত। এরকম ওয়েদারে কিংশুকের মন ভীষণ ভালো হয়ে যায়। কিন্তু সেদিন তা হয়নি। আগের দিনের ফোনের কথাটা মনে পড়ে গিয়েছিলো। মাথার ভিতরটা দপদপ করে উঠেছিলো। নিঃশ্বাসটা ভীষণ গরম হয়ে উঠেছিলো ওর।গলার কাছে কি একটা পাকিয়ে উঠেছিলো। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকার সময়ে কিংশুকের বারবার মনে পড়ছিল নীলাঞ্জনা দি’র একলা লড়াইয়ের দিনগুলোর কথা। আর অদ্ভুত রকমের একটা রাগ ওর শিরা উপশিরায় দাপাতে শুরু করেছিলো। ও জানে না কেন হঠাৎ ভীষণরকম কান্না মনের কোন এক গভীর থেকে ঠেলে বেড়িয়ে এসেছিলো ওর। ওর মনে পড়েছিলো আগের রাতে নীলাঞ্জনা দি ওকে বলেছিল সাইকিয়াট্রিস্ট – এর কাছে যাওয়ার সময় ওকে সাথে যেতে। কিন্তু আজ যা ওয়েদার বেড়নোটা তো সম্ভব নয়। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ও কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন লাগিয়েছিল নীলাঞ্জনা দি’র নম্বরে।
নীলাঞ্জনা দি স্বাভাবিক স্বরে উত্তর দিয়েছিলো “না রে … আজ হচ্ছে না… দেখি নেক্সট কবে ডাকে…”
এরপর টুকটাক কথা বলে ফোন রেখেও দিয়েছিলো। নীলাঞ্জনা দির গ্রামের বাড়ি শান্তিনিকেতনের শালুকফোটা গ্রামে হলেও কলকাতায় গড়িয়ায় ওদের ফ্ল্যাট ছিল। নীলাঞ্জনা দি তখন ওর মা বাবার কাছে ফিরে গেছে। ওই ফ্ল্যাটেই তখন ওরা থাকছে।
ফোন রাখার পর থেকেই কিংশুকের অস্থিরতা অদ্ভুতভাবে বেড়ে গিয়েছিলো। কিছুতেই ঘরে থাকতে পারছিলো না। অস্থিরতাকে প্রশ্রয় দিয়ে একটা ক্যাব বুক করে ও বেড়িয়ে পড়েছিলো বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। নীলাঞ্জনা দি’র বাড়ির উদ্যেশ্যে। সটান হাজির হয়েছিলো ওর বাড়ি। কলিংবেলে চাপ দিতেই দরজা খুলেছিল হিরন্ময় জেঠু। কিংশুককে দেখেই হাসি মুখে ঘরে ঢুকতে বলেই নীলাঞ্জনা দিকে ডাক দিয়ে বলল, “মিনি… দেখ রে… কে এসেছে!” জেঠিমা স্বভাবসিদ্ধ ভাবে বেড়িয়ে এসে বলেছিল খেয়ে যেতেই হবে সেদিন। তা করতেই নীলাঞ্জনা দি বেড়িয়ে এসেছিলো। এলোমেলো ভাবে চুলটা মাথার উপর তুলে বাঁধা। চোখমুখ দেখে বোঝাই যায় ঘুমের চেষ্টা করছিলো। কিংশুককে দেখে নিরুত্তাপ ভাবে বলল “এত বৃষ্টিতে কি হল আবার তোর? আয় ঘরে আয়…”
নীলাঞ্জনা দি ঘরে স্কার্ট ব্লাউজ পরে ছিল। একদম বাচ্চা মেয়েদের মত লাগছিলো। কিংশুক ওর পিছন পিছন গিয়ে ওর ঘরে বসল। কিংশুককে কোন কথা বলতে না দেখে নীলাঞ্জনা দি ওকে গম্ভির মুখে বলেছিল “কালকের ফোনের এফেক্ট? তা বলে বৃষ্টি মাথায় করে ছুটে আসতে হবে?” কিংশুক আর পারেনি চেপে রাখতে। সকাল থেকে মনের মাঝে জমতে থাকা মেঘ চোখে এসে ধাক্কা মেরেছিল।
নীলাঞ্জনা দিকে ঝপ করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল “আর নয় নীলাঞ্জনা দি… অনেক কষ্ট পেয়েছ তুমি। আর নয়। তোমায় আমার থেকে বেশী কেউ শান্তিতে রাখবে না। তুমি আমার সাথে থাকবে চলো… আমি জানিনা আমি কি বলছি… কিন্তু তোমায় আমি কষ্ট পেতে দেব না। হয়তো তোমার আবার বিয়ে দেবে জেঠু জেঠিমা… অনেক ভালো পাত্র দেখে… কিন্তু আমি সেই ঝুঁকিও নিতে পারব না। সে যে তোমায় ভালো রাখবে তার কি মানে! তোমায় ভালো রাখার ব্যাপারে আমি নিজের ছাড়া আর কারুর গ্যারান্টি নিতে পারব না।” এক নাগাড়ে বলে ফেলে কিংশুক খেয়াল করেছিলো নীলাঞ্জনা একইরকম দিদিসুলভ ভঙ্গিতে ওকে বলেছিল, “পাগল হলি?”
নীলাঞ্জনা দি’র অতি স্বাভাবিক আচরণে কিংশুক অস্বস্তিতে পরে গিয়েছিলো খানিক। জেঠিমার শত জোরাজুরিতেও না খেয়েই বেড়িয়ে এসেছিলো ও। বাড়ি ফিরে দুদিন নীলাঞ্জনা দিকে ফোন করেনি কিংশুক। অপরাধবোধে। দুদিন আগে থেকে শুরু হওয়া নিম্নচাপ কাটলে হঠাৎ একদিন নীলাঞ্জনা দিই ওকে ফোন করেছিলো।
“সামনের সোমবার ডেট পেয়েছি রে। যাচ্ছিস তো?”
খানিক স্বাভাবিক হয়েছিলো কিংশুক এই ফোনটা পেয়ে। বলেছিল “হ্যাঁ যাবো…সময়টা জানিও।”
নির্দিষ্ট দিনে সময় মত নীলাঞ্জনা দির সাথে দেখা করে ও গিয়েছিলো ডঃ সেনের চেম্বারে।
প্রথম দুটো সিটিং-এ কিংশুককে বাইরে বসতে বললেও থার্ড সিটিং এর দিন ওকে একা ভীতরে ডেকে বলেছিলেন সামনের সোমবার নীলকে না নিয়ে ওকে একাই আসতে। সেদিন কিংশুক অনেক কিছুর উত্তর পেয়েছিলো।
ডঃ এর সাথে কথায় ও জানতে পেরেছিল, নীলাঞ্জনা এক ভয়াবহ মানসিক রোগে ভুগছে। এই রোগের লক্ষণই হল “অতি-স্বাভাবিকতা।” নীলাঞ্জনা দি মেনে নিতে পারেনি যে ও এত গভীর ভাবে বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হয়েছে, ও মানতে পারেনি যে অরিন্দম ওকে ঠকিয়ে দিনের পর দিন ওরই গোপন থেকে গোপনতম মুহূর্তদের খোলা বাজারে বিকিয়ে দিয়েছে। নীলাঞ্জনা দি ভাবতে পারেনি যে ওকে একদল বিকৃতকাম মানুষের মাঝে অরিন্দম একটা হাতবদলের জিনিসের মত ছেড়ে রাখার বন্দবস্ত করেছে ওর জন্মদিনের উপহার হিসেবে। নাঃ নীলাঞ্জনা দি’র নাকি এতে আঘাত লাগেনি, বরং ওর আত্মসম্মানে লেগেছিল অনেক গভীরভাবে। তাই ও এই যাবতীয় ঝড় বুকের ভিতরের একলা বারান্দায় পড়ে থাকা একটা খাঁচায় আটকে রেখেছে। এরপর ডঃ সেন কিংশুকের হাতে একটা মেমরিকার্ড তুলে দিয়েছিলো। সেটা ওর ফোনে লাগিয়ে কিংশুক যা দেখেছিল, তাতে ওর চোখের সামনে বিশ্বব্রম্ভান্ড এক পাক খেয়ে গিয়েছিলো। কিংশুক জানতে পেরেছিল, নীলাঞ্জনা দি সেই জন্মদিনের রাতে পরিকল্পনামাফিক অরিন্দমসহ অন্য বন্ধুদের কেকের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়েছিলো শুধু অরিন্দমকে। সেখানে অরিন্দমকে বিবস্ত্র করে শান্ত মাথায় অরিন্দমের হাত বেঁধেছিল, পা বেঁধেছিল, মুখে কাপড় বেঁধেছিল। তারপর শুরু করেছিলো থাবড়ানো। অরিন্দমের জ্ঞান ফিরে এলে অরিন্দম সবটা বুঝে ওঠার আগেই রক্তপাত শুরু হয়েছিলো ওর ঠোঁটের পাশ থেকে, কান থেকে। গুনে গুনে ফেরত দিয়ে এসেছিলো প্রতিটা অপমান। অরিন্দমের চোখে যতবার আকুতি দেখেছিলো নীলাঞ্জনা দি, ততবার ঠাণ্ডা মাথায় থাপ্পর মারছিল সমস্ত গায়ের জোর এক করে। দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো, ঘরের কোথাও ক্যামেরা ফিট করেছে নীলাঞ্জনা দি। ভিডিওর শেষে ক্যামেরা বন্ধ করার সময় নীলাঞ্জনা দি সোজাসুজি ক্যামেরার দিকে তাকায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য। কিংশুকের বুকের রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিলো সেই বরফের মত ঠাণ্ডা চাউনিতে। ভিডিও দেখার পর বেশ খানিক্ষন কিংশুক বসেছিল থম মেরে। বুঝে উঠতে পারছিলো না অনেক কিছুই। ডঃ সেন জানিয়েছিলেন ওভাবেই অরিন্দমকে ও রেখে এসেছিলো ফ্ল্যাটে। আসার আগে বলে এসেছিলো কোনরকম গণ্ডগোল পাকানর চেষ্টা করলে, এতদিন ধরে জোগাড় করা প্রমান আর তার সাথে সেদিনের সেই পরিকল্পনামাফিক করা ভিডিও ছড়িয়ে দেবে ওর অফিসে, চেনা অচেনা সব জায়গায়। হ্যাঁ… অরিন্দম কেঁচো হয়ে গিয়েছিলো। চুপচাপ ডিভোর্স দিতে রাজি হয়ে নিজে বেঁচে গিয়েছিলো।
ডঃ সেন আরও বলেছিলেন, নীলাঞ্জনা দি নিজের মানসিক বিকার সম্পর্কে অবহিত। অতিরিক্ত প্রতিশোধস্পৃহা থেকে নীলাঞ্জনা দি এমন করেছে তা ডঃ সেন না বললেও কিংশুক বুঝতে পেরেছিল এবং মনে মনে খানিক সমর্থনও জানাচ্ছিল। কিন্তু ডঃ সেন তারপর যা বলেছিলেন তা অত্যন্তই আশঙ্কার। বলা ভালো, উনি যা দেখিয়েছিলেন। তা হল একটি ডায়রি। ডায়রির শুরুতে বেশ কিছু আঁকিবুঁকি এবং এরপর একটি নির্দিষ্ট পাতা থেকে কিংশুক দেখেছিলো, বিভিন্ন রকম ভাবে কাউকে খুনের বর্ণনা লেখা। কোথাও লেখা খাওয়ারের সাথে বিষাক্ত পোকা মিশিয়ে মেরে ফেলার ফন্দি, তো কোথাও হাইভোল্টেজ তারে পেঁচিয়ে মেরে ফেলার ফন্দি। সবিস্তারে বেশ নিখুঁত পরিকল্কনা। কিংশুক বেশিক্ষন পড়তে পারেনি। শিউরে উঠেছিলো। নীলাঞ্জনা দির চোখ দুটো মনে পড়ছিল কি ভীষণ! যেন ডায়রির পাতা থেকে কিংশুকের দিকে তাকিয়ে আছে। ডায়রি বন্ধ করে ডঃ সেনকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। ডঃ সেন বলেছিলেন, এই খুনের পরিকল্পনা প্রতিদিন নিখুঁত থেকে নিখুঁততর হচ্ছে।
কিংশুকের ভয় করছিলো। হারিয়ে ফেলার ভয়। একটা প্রানশক্তিতে ভরপুর মানুষকে অতলস্পর্শী খাদে খুঁজে না পাওয়ার ভয়। প্রতি মুহূর্তে বুঝতে পারছিলো ও সব কিছু বাজি ধরতে রাজি এই অন্ধকুপ থেকে নীলাঞ্জনা দি’কে বের করে আনতে। ও অস্থির হয়ে উঠেছিলো দেখে ডঃ সেন বলেছিলেন, “কিংশুক… এখনই ভয় পেলে চলবে? নীলাঞ্জনার খুনের তালিকায় সবচেয়ে উপরে কার নাম জানো?”
কিংশুক অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, “কার?”
ডঃ সেন জবাব দিয়েছিলো “তোমার।”
কিংশুকের হতবাক হওয়া তখন শুরু। ডঃ সেন বলেছিল, “এই অন্ধকুপ থেকে ওকে বের কে করে আনতে পারবে জানো?”
কিংশুক মনে মনে চাইলেও মানতে পারছিলো না যে এই প্রশ্নের উত্তরেও ডঃ সেন ওরই নাম নেবে! কিন্তু ডঃ সেন যথারীতি জলদগম্ভীর স্বরে বলেছিলেন “তুমিই।”
আরও যোগ করেছিলেন উনি। এই অন্ধকার জায়গা থেকে নীলাঞ্জনাকে বের করা একটু কঠিন। কারন অন্য মানসিক রোগের ক্ষেত্রে সাধারনতঃ রুগি বুঝে উঠতে পারেনা যে সে রোগাক্রান্ত। কিন্তু নীলাঞ্জনার মস্তিষ্কের অবচেতন ও চেতন একে অপরের চাইতে বেশ সতন্ত্র ও সমান শক্তিশালীভাবে কাজ করছে। তাই সচেতন অবস্থায় বুঝতে পারে যে ও অপ্রতিরধ্য গতিতে কোন এক পরিনতির দিকে এগোচ্ছে। আবার সেই নীলাঞ্জনাই ওর অবচেতনে একের পর এক খুনের পরিকল্পনা করছে। এই ডায়েরি ও নিজেই তুলে দিয়েছে ডঃ সেনের হাতে। কিন্তু এসব কিছুর পরেও আশার আলো বলতে ওর নিজে থেকে সুস্থ হতে চাওয়া। আশেপাশের মানুষের সাহায্য ওকে বের করে আনতে পারে। কিংশুক যেন এতক্ষন ধরে এটুকুই শুনতে চেয়েছিল। ও অধীরভাবে জানতে চাইছিল কোন মন্ত্রবলে নীলাঞ্জনা দি’কে ফিরে পাবে ও? এও জানতে চাইছিল তার কোন অপরাধে সে ওর ঘৃণার শিকার হল! তবে কি সেদিন নীলাঞ্জনা দি’কে আগুপিছু না ভেবে কথাগুলো বলে ফেলাই এই ঘৃণার কারন? কিন্তু ও কি করে জানবে এত কিছু! আর নীলাঞ্জনা দি তো তারপর ভীষণ স্বাভাবিক ছিল ওর সাথে!
ডঃ সেন ওর মনের কথা পড়তে পেরে উত্তর দিয়েছিলো, “নীলাঞ্জনার একটা মানুষ দরকার যাকে ও বিশ্বাস করতে পারে। শি নিডস আ হিউম্যান বিং ইন এনি ফর্ম হুম শি ক্যান ট্রাস্ট এগেইন। আর সেই তালিকায় তোমার নাম সবার উপরে। তোমায় ওকে এই শহর ছেড়ে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে হবে। এবং ওকে বুঝতে দেওয়া যাবে না এই সমস্তটাই একটি নিখুঁত পরিকল্পনা। কারন এখন ওর নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে সন্দেহ। ও সব্বাইকে বিরোধীপক্ষ ভাবে। ওর মনের পটে একটা নতুন ছবি আঁকতে হবে। ওকে কাগজে কলমে বিশ্বাস করাতে হবে যে তুমি ওকে এই আবর্ত থেকে বের করে নিয়ে গেছো। এতে ওর মন শান্ত হবে। আর এরপর শুরু হবে ওর কাউন্সেলিং। এখন ও কাউন্সেলিং করার মত মানসিক স্থিতিতেই নেই। ও যতখানি স্বাভাবিক আচরণ করছে, ভীতরে ও ততটাই অশান্ত, উগ্র, উন্মত্ত, রাগী ও প্রতিশোধস্পৃহায় মগ্ন। তাই তোমার থেকে কোন রকম বিশ্বাসভঙ্গ ওকে সাংঘাতিক করে তুলতে পারে। ও কিছুতেই মেনে নেবে না ওকে আবার কেউ বোকা বানাবে, ওর সারল্যের সুযোগ নেবে। নীলাঞ্জনা দিনদিন শিকারি নেকড়ের মত ক্রূর হয়ে উঠছে। তোমায় ওর বিশ্বাস অর্জন করতে হবে এবং ইউ হ্যাভ টু মেইনতেইন দ্যাট! নয়তো ও এই আবর্তে বন্দী হয়ে পড়বে আবার। জটিলতা বাড়তে বাড়তে কোনদিকে যে মোড় নেবে… মনে রেখ, কিংশুক, তোমার একটু ভুলে ও কিন্তু ……”
কিংশুক ফিরে এসেছিলো বাড়িতে। ডঃ সেনের কথা জেঠুকে জানিয়েছিল সবিস্তারে। ওনার কথা মত জেঠু হায়দ্রাবাদে সমস্ত ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কিংশুক বুঝে উঠতে পারছিলো না ও স্বপ্ন দেখছে কিনা! হাজার প্রশ্ন ওর মনে! ও প্রথম কিছুদিন নিয়েছিলো ওর হতভম্ব হয়ে যাওয়া কাটিয়ে উঠতে। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী ও এক পা এক পা করে নিজেকে সঁপে দিচ্ছিলো নীলাঞ্জনার কাছে। খুব সহজেই নীলাঞ্জনা থেকে নীল হয়ে উঠেছিলো ওর নীলাঞ্জনা দি। কিন্তু কিংশুক অবাক হয়ে দেখত আর ভাবতো মানুষের মন এত বিচিত্র হয়! এক এক দিন নীল ওর বাড়ি চলে আসত। এখানে ও একাই থাকে বরাবর ওর দিদার সাথে। তাই বিশেষ অসুবিধা হত না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর বাড়ির ছাদে বসে আড্ডা মারত নীল-এর সাথে। এক এক সময়ে ওর ডঃ সেনকে সন্দেহ হত! ঠিক বলেছে তো লোকটা! যে মেয়ের মনের পরতে পরতে এত জটিলতার নাগপাশ, সে এত প্রাণখোলা হাসি হাসে? সে কি করে পিছন থেকে এসে কিংশুকের চোখ টিপে ধরে আগের মত? কি ভাবে একরকম ভাবে বকাঝকা করে ওকে ওর একটুও ভুলে? কিংশুক ভুলে যেত যে ওর প্রতিটা আচরণ আরেকটা মানুষের ওষধির কাজ করছে। এরকমই একদিন কলেজস্ট্রিট কফিহাউস থেকে বেড়িয়ে এদিক ওদিক হাঁটতে হাঁটতে ও নীলাঞ্জনার হাতটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে বলেছিল “চলো… আমরা চলে যাই এখান থেকে। একসাথে থাকব। যাবে?”
নীলাঞ্জনা হাতটা মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিল প্রেসিডেন্সির মাথার উপর হেলে পড়া নরম সূর্যটার দিকে। খুব ধীরেধীরে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলো, “তারপর?” কিংশুকের বুকের অনেক গভীরে কথাগুলো প্রতিধ্বনি তুলেছিল। শুকিয়ে আসা হলুদ পাতা গাছের ডালের এক কোনায় লেগে থেকে যে অনিশ্চয়তায় তিরতির করে কাঁপে, নীলাঞ্জনার গলার স্বরে সেই অনিশ্চয়তা উঁকি মারছিল। বিধধবংসি কালবৈশাখীর পরদিন ভোরে যে উদ্বেগ নিয়ে চাষি নিজের ক্ষেতি জমির সামনে এসে দাঁড়ায়, সেই উদ্বেগ ওর গলায় বাসা বেঁধেছিল এক নিমেষে। কিংশুক দুটো হাতের মাঝে ওর পদ্মপাতার মত মুখটা ধরে বলেছিল “তারপরে আবার কি? ওটা আমাদের মৌচাক হবে। তুই তোর মত করে বাঁচবি রানি মৌমাছি হয়ে আর আমি তোর আজীবনের কর্মী মৌমাছি!” খিলখিল করে হেসে ফেলেছিল নীল। গোটা সন্ধ্যেটা হাত ধরে ঘুরে বেরিয়েছিল ওরা। তারপর ওরা শুরু করেছিলো পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা। ডঃ সেনের কথামতো নীলকে কিছু জানানো হয়নি এ বিষয়ে। ততদিনে নীল ওর মা বাবার সাথে ফিরে গেছে শালুকফোটা গ্রামে। গত দুদিন নীল এসেছিলো কলকাতায় ওর তুতোবোনের বিয়েতে ওর মা বাবার সাথে। গতকালই ফিরেছে। নীল জানে ওর মা বাবার চোখে ফাঁকি দিয়ে কিংশুক ওকে নিয়ে যাচ্ছে। কিংশুকও বেশ নিশ্চিন্ত হয়েছিলো। এমারজেন্সি কারন দেখিয়ে ওর ট্রান্সফার পেতেও অসুবিধে হয়নি।
একি! ৩ টে ৩০ তো এখনই বাজে! হিসেব মত আরও ৪৫ মিনিট লাগবে নীলের বাড়ির সামনে পৌঁছোতে! মানে ৪ টে ১৫ তো এমনিই বাজবে! ট্রেনটা এত সিগনাল খাচ্ছে! অধৈর্য হয়ে উঠলো নীল। আলো ফুটে যাওয়ার কথা! কিন্তু আলোর দেখা মাত্র নেই! আকাশে যা মেঘ! আজই এমন নিম্নচাপ হতে হল! এরকম দুর্যোগ মাথায় নিয়ে অতখানি যাওয়া! ট্রেন যদিও সেই বিকেলে। যা আবহাওয়া! ক্যান্সেল না করে দেয় ট্রেন। যত ভিতরের দিকে আসছে, নেটওয়ার্কের আশা তত কমছে। বিরক্ত হয়ে সিটে গিয়ে বসলো কিংশুক।
খানিক বাদে ট্রেন থামল বোলপুর স্টেশনে। কিংশুক তড়িঘড়ি স্টেশনে নেমে দেখল কোন টোটো রিকশা কিচ্ছু নেই। এত অসহায় কিংশুকের কোনোদিন লাগেনি। অসহায়তা পরিনত হতে লাগলো আশঙ্কায়। ঘনঘন ঘড়ি দেখছে কিংশুক। ৪ টে বেজে ৩৫ মিনিট। কোনভাবেই কি নীলকে একবার ফোন করা যায়না? এদিক ওদিক দেখল নীল। গুটিশুটি মেরে দু তিনটে কেঁদো কুকুর ছাড়া আর কাউকে চোখে পড়লো না।
কিংশুক জানে নীলের বাড়ির রাস্তা। একবার ভাবল, হাঁটা লাগাবে? কিন্তু অনেকটা দূর তো! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হাঁটা লাগাল কিংশুক। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর একটা রিকশা পেল। বৃষ্টি একটু ধরে এলেও বেশ জোরেই পড়ছে তখনও। ৫ টা বেজে ০৫ মিনিট। কিংশুকের দুশ্চিন্তার পারা চড়ছে। কানে বাজছে ডঃ সেনের কথা। একচুল অবিশ্বাসের মাশুল কিংশুককে দিতে হতে পারে প্রাণের বিনিময়ে। কিন্তু তার চাইতেও বড় হল, নীলের চিকিৎসা আবার শুন্য থেকে শুরু করতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে যখন নীলের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছল, হাতঘড়ি সময় দেখাচ্ছে ৫ টা ১৫ মিনিট। রিক্সার ভাড়া মিটাতে মিটাতে ও বুঝল, ওর ফোনে নেটওয়ার্ক ধরেছে। আর ঝড়ের গতিতে মেসেজ ঢুকছে। এখন ওর সময় নেই আর ওসব দেখার। শুধু পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল। ১৪টা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ আর বাকি সব মিসডকল অ্যালারট। পকেটে ফোন ঢুকিয়ে রেখে ও জোরে হাঁটা লাগাল। একটু এগিয়ে বাঁ দিকে ঢুকেই ৩ নম্বর বাড়িটা নীলের। আকাশে বড্ড মেঘ। ঠাহর করা যাচ্ছে না কিছু।
কিন্তু ওই তো… ওদের ব্যাল্কনি। ওটা কে বসে আছে?জেঠু? ওই তো পাশে জেঠিমা! ব্যাল্কনির সামনে ঝাক্রা তেঁতুল গাছটা খানিক আড়াল করে দিয়েছে বলে আরও দেখা যাচ্ছে না। নীল কি তবে বেড়িয়ে হাঁটা লাগিয়েছে? কিন্তু তেমন হলে তো ওর সাথে দেখা হওয়ার কথা রাস্তায়! নীল যদি স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগিয়েই থাকে, তাহলে আর ঢুকবে না ও বাড়িতে! এখান থেকেই জেঠুকে একবার ফোন করে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ফোন বের করতেই নোটিফিকেশনে চোখ পড়ে কিংশুক স্থবির হয়ে গেলো।
“এলি না? তবে আমি এলাম…”
মনে অশনিসঙ্কেত আসতেই কিংশুক দৌড়ে যেতে চাইলো বটে কিন্তু পারল না। তবু সমস্ত শক্তি এক করে পা টেনে টেনে ও ওদের বারান্দা লক্ষ্য করে এগতে লাগলো। জেঠিমা উপরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে কেন? সেকি! ওটা কি! জেঠিমার মাথার কাছে…! দুলছে যেন মৃদু মৃদু! কি ভীষণ ছন্দময় দোলা, অথচ কিংশুকের বুকের ভিতরটা এমন হাপরের মত করছে কেন!
কিংশুকের হাত লেগে কখন যে নীলের শেষ পাঠানো গানটা চলতে শুরু হয়ে গেছে… কিংশুক খেয়ালও করেনি!
“খোলা বারান্দায়
এ নির্জনতায়
সিলিং-এর বন্ধনে
মাটির ব্যাবধানে
দুলছে স্খলিত বসনা
নীলাঞ্জনা……”

সমাপ্ত

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!