জগদীশচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ – এক নিবিড় বন্ধুত্বের কাব্যকথা
“যদিদং কিঞ্চ জগৎ, সর্বং প্রাণ এজতি নিঃসৃতম্”, অর্থাৎ “এই যা-কিছু জগৎ, যা-কিছু চলছে, তা প্রাণ থেকে নিঃসৃত হয়ে প্রাণেই কম্পমান”। ছেলেবেলা থেকেই তিনি এই ঋষিবাক্যের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। প্রাণ পদার্থ থাকে জড়ের গুপ্ত কুঠুরিতে গা ঢাকা দিয়ে। কিন্তু সেই স্পন্দন যে প্রাণস্পন্দনের সঙ্গে এক, এ কথা বিজ্ঞানের প্রমাণভাণ্ডারের মধ্যে তখনও জমা হয় নি। সেদিন এই মহান বার্তাকে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রই প্রথম বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে পাকা করে গেঁথে দিয়েছিলেন। সেইসময় বাঙালি বিজ্ঞানী ‘জগদীশচন্দ্র বোস’-এর সম্পর্কে আইনষ্টাইন নিজেই বলেছেন: “জগদীশচন্দ্র যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে কোনটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।” লন্ডনের Daily Express [ডেইলি এক্সপ্রেস] পত্রিকায়, ১৯২৭ সালে ছাপা হয়েছিল এবং তারা স্বীকৃতি দিয়েছিল, “বাঙালিরাও বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে নিউটন -আইনস্টাইনের চেয়ে কম যায়না। জগদীশ চন্দ্র গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী”। না এসব আমার মন-গড়া কথা নয়। উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে উইকিপিডিয়া বলছে।
অথচ নোবেলে, বাঙালি সাহিত্যে আছেন, অর্থনীতিতে আছেন কিন্তু বিজ্ঞানে নেই। কলেজে পা দেওয়া ছেলেমেয়েদের কাছে বিজ্ঞানী সম্বন্ধে জানতে চাইলে তারা গড়গড়িয়ে বলে দেবে দুই ‘বোস’ আর ‘সাহা’র নাম। হালে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে বিজ্ঞানের গবেষণায় একটি নামই মনে করতে পারে বাঙালি। অশোক সেন। কিন্তু পুরস্কারের নিয়মবিধির জন্য তিনিও নোবেল পাননি। পেয়েছেন সমতুল্য একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ২০১২ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ৩০ লক্ষ ডলার অর্থমূল্যের ‘ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স প্রাইজ’।
কিন্তু কেন বিজ্ঞানের নোবেলে বাঙালি নেই? এই উত্তরটা খুঁজতে গিয়ে অনেক প্রতিভাধর কিংবা পোষ্ট ডক্টরেল করতে যাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের ভাষায় শুনতে পাই, “প্রথমত, যে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা বাঙালির ৫০ বছর আগে যা ছিল আজ পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাবে তা উবে গেছে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা করার জন্য যতটা উন্নত মানের গবেষণাগার, যন্ত্রপাতি, পরিকাঠামো দরকার, সেটা ভারতে পাওয়ার অভাব। তৃতীয়ত, কিছু করে দেখানোর জেদটা হারিয়ে ফেলেছে বাঙালি প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে, অথচ অতীত-সর্বস্বতায় ডুবে অন্যকে অবজ্ঞা করা, নিজের সব কিছুকেই অভ্রান্ত, অনতিক্রম্য বলে ধরে নেওয়ার ঔদ্ধত্য, অহমিকা প্রকাশ করা! [সূত্র: আনন্দবাজার]
তা বলে মেধা বা প্রতিভা কিন্তু বাঙালির হারিয়ে যায়নি। এই বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুই প্রথম বলেছিলেন মানুষের মতো উদ্ভিদেরও অনুভূতি আছে। আঘাত করলে ওরা ব্যথ্যা পায়। জগদীশ বসুর আবিষ্কার সারা পৃথিবীতে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল। বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসুর প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বৃক্ষবন্দনা’।
“অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান
প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ,
ঊর্ধ্বশীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনা
ছন্দোহীন পাষাণের বক্ষ-‘পরে; আনিলে বেদনা
নিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে”। …
কবিতার শুরুতে বৃক্ষ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তার অনেকখানি প্রযোজ্য বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর ক্ষেত্রেও। জগদীশচন্দ্র বসুই ছিলেন প্রথম বিজ্ঞানী যিনি এই উপমহাদেশে আধুনিক বিজ্ঞান-গবেষণার জাগরণ ঘটিয়েছিলেন। তিনিই বিশ্ববিজ্ঞানের আসরে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে সুবিধাবঞ্চিত তৎকালীন পরাধীন ভারতের বাঙালিও নিজের অধ্যবসায় ও মেধার জোরে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণায় উদ্ভিদবিজ্ঞান সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যবহারিক ও গবেষণাধর্মী বিজ্ঞানের সূচনা হয়। ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স তাঁকে রেডিও বিজ্ঞানের জনক বলে অভিহিত করে। বেতারযন্ত্র এবং জড়জগতের রহস্য উদ্ঘাটনকে ঘিরে তাঁর রয়েছে শতাধিক চমকপ্রদ আবিষ্কার। খ্যাতিমান এবং সফল বিজ্ঞানী হিসেবেই স্যার জগদীশচন্দ্র বসুকে স্মরণ করছি কিন্তু তিনি কেবল আমাদের কাছেই গৌরবের বিষয় নন, গোটা উপমহাদেশও তাকে নিয়ে গর্বিত। যিনি আমেরিকান প্যাটেন্টের অধিকারী উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তি। বিজ্ঞানে তাঁর জগৎজোড়া গবেষণা তাকে দিয়েছে এক অনন্য সম্মান। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রকে উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, –
“ভারতের কোন্ বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি
হে আচার্য জগদীশ। কী অদৃশ্য তপোভূমি
বিরচিলে এ পাষাণনগরীর শুষ্ক ধূলিতলে”।…
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন হরিহর আত্মা। রবীন্দ্রনাথ তখন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে বাস করেন। ওদিকে বিজ্ঞানী মশাই কবিকে বেশিদিন না দেখে থাকতে পারতেন না। তাই মাঝে মাঝে গবেষণা ছেড়ে তিনি কলকাতা থেকে পাড়ি দিতেন শিলাইদহে। থাকতেন অনেকদিন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাবিবারিক বোটে চেপে সপরিবারে বেরিয়ে পড়তেন পদ্মার কোনো চরের দিকে। সাথে থাকতেন জগদীশ বসুও। জগদীশ বসুর ভাব শুধু রবীন্দ্রনাথের সাথেই ছিল না। তাঁর ছেলেমেয়েদের বন্ধু ছিলেন তিনি। বিশেষ করে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রথীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের বড় ছেলে। জগদীশ বসুর সাথে তিনি এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াতেন। কচ্ছপের ডিম খুঁজে বেড়াতেন চরের বালুতে। বিজ্ঞানী মশাই মাঝে মাঝে পদ্মার তীরে গর্ত কবরের মতো গর্ত খুঁড়তেন। অনেকগুলো গর্ত। সেই গর্তের একটায় তিনি শুতেন। আর অন্যগুলোতে রবীন্দ্রনাথের ছেলেমেয়েরা। মাথায় একটা ভেজা গামছা জড়িয়ে নিতেন। তারপর গর্তের ভেতর শুয়ে শরীরে রোদ লাগাতেন। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর শরীর গরম হয়ে উঠত। আর রোদ সহ্য করতে পারতেন না। তখন রবীন্দ্রনাথের ছেলেমেয়েদের নিয়ে দৌড়ে ঝাঁপ দিতেন পদ্মার বুকে। উত্তপ্ত শরীরের পদ্মার শীতল জলের ছোঁয়ায় ভেসে যেতেন প্রশান্তির সাগরে।
তাঁদের দুজনের অন্তরঙ্গতা সম্পর্কে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
“একজন বিজ্ঞানী, অন্যজন কবি – এঁদের মধ্যে যে আকর্ষণ ছিল সে কেবল বন্ধুত্ব বললে সম্পূর্ণ বলা হয় না। পরস্পরের মধ্যে একটি গভীর অন্তরঙ্গ সম্বন্ধ ছিল। কথাবার্তা গল্প করার মধ্যে ভাব-বিনিময়ের চেষ্টা যেন সর্বদাই চলত। নতুন গল্পের প্লট বা যে প্রবন্ধ লিখছেন তার বিষয়বস্তু নিয়ে বাবা আলোচনা করতেন। জগদীশচন্দ্র তাঁর উদ্ভাবিত নতুন যন্ত্রের কথা বলতেন, নতুবা বলতেন জড় ও জীবের মধ্যে কী সব অদ্ভুত মিল তিনি সেই যন্ত্রের সাহায্যে আবিষ্কার করেছেন। দুজনের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে চললেও তাঁরা যেন যথেষ্ট খোরাক পেতেন পরস্পরের আলোচনা থেকে।”
কলকাতায় প্রথম বিনা তারে বার্তা প্রেরণ এবং তা গ্রহণ করার একটি কৌশল দেখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। বড় লাটের হস্তক্ষেপে তাঁর এই আবিষ্কার ইংল্যান্ডে দেখানোর জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সহায়তা করলে তিনি লন্ডনে গিয়ে সেটি প্রদর্শন করেন। ১৮৯৬ সালের ২৪ জুলাই লন্ডনে রাজকীয় বিজ্ঞান সমিতিতে তিনি তাঁর আবিষ্কার সব বিজ্ঞানীর সামনে তুলে ধরেন। এমনকি তিনি তাঁর পরীক্ষার খুঁটিনাটি এত বিশদভাবে তুলে ধরেন যে তা থেকে যে কেউ পরীক্ষাটি পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন। মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলকাতার সেই বিনা তারে বার্তা প্রেরণের ঘটনাটিই প্রথম। পরে লন্ডনেও তিনি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তাঁর উদ্ভাবনের কোনো ‘পেটেন্ট’ বা ‘স্বত্ব’ করেননি।
জগদীশচন্দ্র বসুর ইতিহাস একটু বলে নিলে বুঝতে সুবিধা হবে কেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এতো কাছের বন্ধু হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তিনি। ‘সেই সাধনার সে আরাধনার যজ্ঞশালার’ দ্বার উন্মুক্ত করবার জন্য আবির্ভূত হলেন ভারতের বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি আচার্য জগদীশ। লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর পদার্থবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে কাজ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। এর অন্যতম কারণ হলো, তিনি তখন ‘ধাতব বস্তুর’ প্রাণ আছে কি না তা ভাবতে থাকেন। তবে তাঁর এই ভাবনাটা ক্রমেই উদ্ভিদের দিকেই চলে যায়। ফলে মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে বিনা তারে বার্তা প্রেরণের জগদীশের সাফল্য অনেকে ভুলে যান। অন্যদিকে উদ্ভিদের জীবনের বহিঃপ্রকাশের কারণে তিনি সেই দিকে বেশি কার্যকরী হন।
বর্তমানে, বিশ্বের তাবত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুকেই বিনা তারে বার্তা প্রেরণের জনক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ঐ আমরা যে মোবাইল নিয়ে নেট করছি, বন্ধুত্ব তৈরি করছি তার শুরু জগদীশ বাবুর চিন্তা থেকেই। তবে জগদীশচন্দ্র বসু কাজ করেছেন মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে এবং রেডিও যন্ত্রের উদ্ভাবক মার্কনি কাজ করেছেন বেতারতরঙ্গ নিয়ে। অনেকেরই ধারণা, জগদীশচন্দ্র যদি মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে তাঁর কোহেরারকে আরও এগিয়ে নিতেন, তাহলে ১৯০১ সালের প্রথম নোবেল পুরস্কারটি একজন বাঙালি পেলেও পেতে পারতেন।
হৃত-গৌরব দরিদ্র জাতির পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ পরাধীন ভারত-জননীর অশ্রুসিক্ত আর্শীবাদ পাঠালেন –
বিজ্ঞানলক্ষ্মীর প্রিয় পশ্চিমমন্দিরে
দূর সিন্ধুতীরে,
হে বন্ধু, গিয়েছ তুমি; জয়মাল্যখানি
সেথা হতে আনি …
আজি মাতা পাঠাইছে অশ্রুসিক্ত বাণী
আশীর্বাদখানি
জগত্সভার কাছে অখ্যাত অজ্ঞাত
কবিকণ্ঠে ভ্রাতঃ!
বেতার-যন্ত্রের আবিস্কারকের সম্মান, প্রকৃতপক্ষে জগদীশচন্দ্রেরই প্রাপ্য। জগদীশবাবু তাই এক স্থানে লিখেছেন – “যাঁহারা আমার বিরুদ্ধ পক্ষ ছিলেন, তাঁহাদেরই একজন আমার আবিষ্কার পরে নিজের বলিয়া প্রকাশ করেন।”
যে কলেজ তাঁকে নিয়োগ দিতে চায়নি, সে কলেজই তাঁকে অবসরের পরও অতিরিক্ত দুই বছর জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক হিসেবে বেতন দিয়েছে। ১৯১৫ সালে অবসরের পর তাঁকে প্রফেসর ইমেরিটাস মর্যাদা দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার ১৯০৩ সালে তাঁকে কমান্ডার অব ইন্ডিয়ান এম্পায়ার উপাধি দেয়। ১৯২৮ সালে তিনি রাজকীয় বিজ্ঞান সমিতির ফেলো নির্বাচিত হন।
১৯২৭ সালে তিনি কলকাতায় একটি বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এটিকে তিনি একটি ‘মন্দির’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বর্তমানে এটি বসু বিজ্ঞান মন্দির নামেই বেশি পরিচিত। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বন্ধু। রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্র বসুর তিন বছরের ছোট হলেও তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল আমৃত্যু। একজনের হাতে বিকশিত হয়েছে বাংলায় সাহিত্য আর একজন করেছেন বাংলায় বিজ্ঞান রেনেসাঁর সূচনা।
রবীন্দ্রনাথ বন্ধুত্ব সম্পর্কে এক সময় লিখেছিলেন – “বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় অনেক তফাৎ আছে, কিন্তু ঝট করিয়া সে তফাৎ ধরা যায় না। বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোশাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ে দুই-এক জায়গায় ছেড়া থাকিলেও চলে, ঈষৎ ময়লা হইলেও হাশি নাই, হাঁটুর নীচে না পৌঁছিলেও পরিতে বারণ নাই। গায়ে দিয়া আরাম পাইলেই হইল। কিন্তু ভালোবাসার পোশাক একটু ছেড়া থাকিবে না, ময়লা হইবে না, পরিপটি হইবে। বন্ধুত্ব নাড়াচাড়া টানাৰ্ছেড়া তোলাপাড়া সয়, কিন্তু ভালোবাসা তাহা সয় না। … প্ৰেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান । মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায়। তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্ৰতিষ্ঠা করা যায়”।
রবীন্দ্রনাথের প্রভাব এতটাই জগদীশচন্দ্রের মধ্যে ছিল যে তাঁর রচিত ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থে রয়েছে তাঁর অমলিন স্বদেশপ্রেম, গভীর দর্শন-চিন্তা ও অকৃত্রিম সাহিত্যানুরাগের সুস্পষ্ট পরিচয়। হতমান ভারতবর্ষের সন্তান হিসেবে তিনি যে পরাধীনতার গ্লানি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন তাতে তিনি রবীন্দ্রনাথের সাথে সমব্যাথী হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর ‘অব্যক্ত’ হাতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
বন্ধু
তোমার “অব্যক্ত”র অনেক লেখাই আমার পূর্বপরিচিত— এবং এগুলি পড়িয়া অনেক বারই ভাবিয়াছি যে যদিও বিজ্ঞানবাণীকেই তুমি তোমার সুয়োরাণী করিয়াছ তবু সাহিত্যসরস্বতী সে পদের দাবী করিতে পারিত— কেবল তোমার অনবধানেই সে অনাদৃত হইয়া আছে”।
ইতি ৮ই অগ্রহায়ণ ১৩২৮
তোমার রবি
“যদিও বিজ্ঞান-বাণীকেই তুমি সুয়োরানী করিয়াছ, তবু সাহিত্য-সরস্বতী সে পদের দাবি করিতে পারিত, কেবল তোমার অনবধানেই সে অনার্দত হইয়া আছে।” ‘বিজ্ঞানে সাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেছেন,
“বিজ্ঞানী ও কবি একই অরূপের সন্ধান করেন, তবে প্রভেদ এই – কবি পথের কথা ভাবেন না, বৈজ্ঞানিক পথটা উপেক্ষা করেন না।”
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিরসুহৃদ জগদীশচন্দ্র বসুর উদ্দেশে লিখেছিলেন,
“পেয়েছ সম্বল তব আপনার গভীর অন্তরে।
তোমার খ্যাতির শঙ্খ আজি বাজে দিকে দিগন্তরে
সমুদ্রের এ কূলে ও কূলে; আপন দীপ্তিতে আজি
বন্ধু, তূমি দীপ্যমান; উচ্ছ্বসি উঠিছে বাজি
বিপুল কীর্তির মন্ত্র তোমার আপন কর্মমাঝে”।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা জগদীশ্চন্দ্র বসু রবীন্দ্রনাথের কেবল ব্যক্তিগত বন্ধু-ই ছিলেন না, রবি-প্রতিভায় মুগ্ধ জগদীশ রবীন্দ্রনাথের লেখা ভালোভাবে ও উঁচুমানের ইংরেজিতে অনুবাদের জন্যে যথেষ্ট কাজ করেছেন, যাতে সারা পৃথিবী এই অমূল্য রত্নের সন্ধান পান। জগদীশের দাবী ছিল প্রতি সপ্তাহে রবি একটি করে ছোট গল্প লিখে দেবেন যেটা অনুবাদ করিয়ে ছাপাবার ভার জগদীশের ওপর। প্রথম দিকে ইংরেজ যে নারীকে দিয়ে জগদীশ অনুবাদ করাতেন, রবীন্দ্রনাথের অতি সূক্ষ্ম অনুভূতির অনুবাদে মাঝে মাঝে তিনি হিমসিম খেয়ে যেতেন। রবীন্দ্রনাথ-ও খুব খুশি ছিলেন না তাঁর অনুবাদে। অবশেষে ভগ্নী নিবেদিতা অনুবাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর অনুবাদের মান নিঃসন্দেহে অনেক উঁচুতে মেনে নেন জগদীশ ও রবীন্দ্রনাথ। ভগিনী নিবেদিতা ১৯১২ সালের জানুয়ারি সংখ্যার মডার্ন রিভিউতে রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করেন।
আর এখানেই রবীন্দ্রনাথের সাথে বিজ্ঞানের নিবিড় সম্বন্ধের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ে জগদীশচন্দ্র বসুর সাথে তাঁর এই বন্ধুত্ব। রবি ঠাকুরের লেখা পত্রাবলীতে একটু নজর দিলেই আমরা দেখতে পাবো তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন :
“বিজ্ঞান ও রসসাহিত্যের প্রকোষ্ঠ সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন মহলে, কিন্তু তাদের মধ্যে যাওয়া আসার দেনা পাওনার পথ আছে। জগদীশ ছিলেন সেই পথের পথিক। সেই জন্য বিজ্ঞানী ও কবির মিলনের উপকরণ দুই মহল থেকেই জুটত। আমার অনুশীলনের মধ্যে বিজ্ঞানের অংশ বেশী ছিল না, কিন্তু ছিল তা আমার প্রবৃত্তির মধ্যে। সাহিত্য সম্বন্ধে তাঁর ছিল অনুরূপ অবস্থা। সেই জন্য আমাদের বন্ধুত্বের কক্ষে হাওয়া চলত দুই দিকের দুই খোলা জানালা দিয়ে।”
অর্থের অভাবে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা যখন প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগার হয়েছিল, তখন বন্ধুর গবেষণা যেন কোনভাবে বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে মুল উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি ১৯০০ সালের ২০ নভেম্বর একটি চিঠিতে জগদীশচন্দ্রকে বলেছিলেন :
“আচ্ছা, তুমি এদেশে থেকেই যদি কাজ করতে চাও, তোমাকে কি আমরা সকলে মিলে স্বাধীন করে দিতে পারিনে? কাজ করে তুমি সামান্য যে টাকাটা পাও, সেটা যদি আমরা পুরিয়ে দিতে না পারি, তা হলে আমাদের ধিক্। কিন্তু তুমি কি সাহস করে এ প্রস্তাব গ্রহণ করবে? পায়ে বন্ধণ জরিয়ে পদে পদে লাঞ্ছনা সহ্য করে তুমি কাজ করতে পারবে কেন? আমরা তোমাকে মুক্তি দিতে ইচ্ছা করি – সেটা সাধন করা আমাদের পক্ষে যে দুরূহ হবে তা আমি মনে করিনে। তুমি কি বল?”
কবিগুরু কতটুকু সাহায্য করতে পারবেন, এ নিয়ে বোধ হয় জগদীশ চন্দ্রের মনে খানিকটা হলেও সন্দেহ ছিল। এ যে বিশাল টাকার ব্যাপার। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের আশ্বাসবানী যে স্রেফ কথার কথা ছিল না, এটি বোঝাতে পরবর্তী চিঠিতেই (১২ ডিসেম্বর, ১৯০০) আবারো লিখলেন রবীন্দ্রনাথ, যখন তাহার নিজের অর্থসম্বল এ সময়ে ক্ষীণ কিন্তু, – “জগদীশবাবুর কার্ধ্যে আমি মান অপমান অভিমান কিছুই মনে স্থান দিতে পারি না— লোকে আমাকে যাহাই বলুক এবং যতই বাধা পাই না কেন তাহাকে বন্ধনমুক্ত ভারমুক্ত করিতে পারিলে আমি কৃতাৰ্থ হইব। ইহা কেবল বন্ধুত্বের কার্য্য নহে, স্বদেশের কার্য্য”…
এই কথা মনে করে “অভিমানকে সম্পূর্ণ বিসর্জন” দিয়ে তিনি জগদীশচন্দ্রের জন্য অর্থসংগ্রহে ব্ৰতী হইলেন ; জগদীশচন্দ্রকে লিখলেন,
“তুমি তোমার কৰ্ম্মের ক্ষতি করিও না, যাহাতে তোমার অর্থের ক্ষতি না হয় সে ভার আমি লইব”।
তার বন্ধুকে সাহায্য করার আবেদন রবীন্দ্রনাথ অন্যদেরও জানিয়েছিলেন। কিংবা নভেম্বর মাসে (চিঠিটিতে কোন তারিখ ছিল না) তিনি জগদীশচন্দ্রকে লেখেন :
“আমি তোমার কাজেই ত্রিপুরায় আসিয়াছি। এইখানে মহারাজের অতিথি হইয়া কয়েক দিন আছি। তিনি শীঘ্র বোধ হয় দুই এক মেলের মধ্যেই তোমাকে দশ হাজার টাকা পাঠাইয়া দিবেন। সে টাকা আমার নামেই তোমাকে পাঠাইব। এই এক বৎসরের মধ্যেই তিনি আরো দশ হাজার পাঠাইতে প্রতিশ্রুত হইয়াছেন। ইহাতে বোধ করি তুমি বর্তমান সংকট হইতে উত্তীর্ণ হইতে পারিবে।”
জগদীশের জন্য অর্থ সাহায্য করেই কেবল রবিঠাকুর ক্ষান্ত হননি, জগদীশের কাজ যাতে সাধারণেরা জানতে পারে, ১৯০১ সালে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত (শ্রাবণ সংখ্যা) একটি লেখায় জগদীশ চন্দ্রের কাজের উপর ভিত্তি করে রবি ঠাকুর রচনা করলেন একটি প্রবন্ধ – ‘জড় কি সজীব?’ তারও আগে আষাঢ় সংখ্যায় লিখেছিলেন ‘আচার্য জগদীশের জয়বার্তা’ নামের আরেকটি প্রবন্ধ। রবীন্দ্রনাথের হয়ত সংশয় ছিল প্রবন্ধগুলোর মান ও গুণ নিয়ে, তাই জগদীশচন্দ্র বসুকে একটি চিঠিতে বলেছিলেন –
“আমি সাহসে ভর করিয়া ইলেক্ট্রিশ্যান প্রভৃতি হইতে সংগ্রহ করিয়া শ্রাবণের বঙ্গদর্শনের জন্য তোমার নব আবিস্কার সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ লিখিয়াছি। প্রথমে জগদানন্দকে লিখিতে দিয়াছিলাম – পছন্দ না হওয়াতে নিজেই লিখিলাম। ভুলচুক থাকিবার সম্ভাবনা আছে – দেখিয়া তুমি মনে মনে হাসিবে।”
না, জগদীশচন্দ্র বসু হাসেন নি। বরং উল্টে বলেছিলেন :
“তুমি যে গত মাসে আমার কার্যের আভাস বঙ্গদর্শনে লিখিয়াছিলে তাহা অতি সুন্দর হইয়াছে। তুমি যে এত সহজে বৈজ্ঞানিক সত্য স্থির রাখিয়া লিখিতে পার, ইহাতে আমি আশ্চর্য হইয়াছি।”
১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর জগদীশ্চন্দ্রের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথ এর মধ্যে দিয়ে সমস্ত দেশের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন দেখতে পেয়েছিলেন। তাই তিনি জগদীশচন্দ্রকে বলেছেন,
“এ তো তোমার একার সঙ্কল্প নয়, এ আমাদের সমস্ত দেশের সঙ্কল্প, তোমার জীবনের মধ্যে দিয়ে এর বিকাশ হতে চলল।”
বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠার সময় কবিগুরু ছিলেন আমেরিকায়। তারপরেও শত ব্যস্ততার মাঝে উদ্বোধনী সঙ্গীত লিখে পাঠিয়েছিলেন। সেই বিখ্যাত সঙ্গীতটিই হল –
মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন কর’ মহোজ্জ্বল আজ হে
বর -পুত্রসঙ্ঘ বিরাজ’ হে।
শুভ শঙ্খ বাজহ বাজ’ হে।
রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। পুরস্কার ঘোষিত হয় ১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর। রবীন্দ্রনাথ খবর পান ১৬ নভেম্বর। এর ঠিক তিন দিন পরে জগদীশচন্দ্র তাঁকে অভিনন্দন জানালেন এভাবে :
“বন্ধু, পৃথিবীতে তোমাকে এতদিন জয়মাল্য ভূষিত না দেখিয়া বেদনা অনুভব করিয়াছি। আজ সেই দুঃখ দূর হইল।…”
রবীন্দ্রনাথের জীবনে এভাবে কথা বলার অধিকার যদি কেউ রেখে থাকেন, তবে নিঃসন্দেহে তা জগদীশচন্দ্র বসু। জগদীশচন্দ্র কিন্তু বলেন নি যে কবির পুরস্কার পাবার ঘটনায় তিনি ‘আনন্দিত’। তিনি বলেছেন – তাঁর ‘দুঃখ দূর হল’। এ যেন যথার্থ বন্ধুর চাপা আনন্দের এক নির্মোহ স্বর!
ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড তাদের ৫০ পাউন্ডের নোটে নতুন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির মুখ যুক্ত করার জন্য নমিনেশন দিয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটের হিসাবে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত প্রায় ১,৭৫,০০০ নমিনেশন গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে তারা ১,১৪,০০০ নমিনেশন প্রকাশ করে যেখানে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুকে সেরা তালিকায় রাখা হয়েছে। মূলত তারবিহীন প্রযুক্তিতে তিনি যে অবদান রেখেছেন সেটার কল্যাণেই আজকে আমরা ওয়াইফাই, ব্লুটুথ বা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ খুব সহজে ব্যবহার করতে পারছি। যদিও আমরা আধুনিক রেডিও-র জনক হিসেবে জি. মার্কনিকে বিবেচনা করে থাকি ১৯০১ সালে তার আবিষ্কারের জন্য, কিন্তু তার কয়েক বছর আগেই স্যার জগদীশচন্দ্র বসু তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তাই, যদি নির্বাচিত হয় তাহলে ২০২০ সালে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের ৫০ পাউন্ডের নোটে দেখা যাবে এ মহান বিজ্ঞানীর নাম।
[তথ্যসূত্র: অন দ্য এজেজস অব টাইম, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবিজীবনী – প্রশান্তকুমার পাল, উইকিপিডিয়া]