আজকের লেখায় ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

নাচুক তাহাতে শ্যামা

সময়টা ১৮৯৮। স্বামী বিবেকানন্দ কাশ্মীরের ডাল লেকে একটি হাউসবোটের মধ্যে বসবাস করছেন। কাশ্মীর যাত্রার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ায় ভীষণের পূজাই তখন তাঁর মূলমন্ত্র হয়ে উঠল। রোগ-যন্ত্রণা তাঁকে মনে করিয়ে দিত, “যেখানে বেদনা অনুভূত হচ্ছে, সে স্থান তিনি, তিনিই যন্ত্রণা এবং যন্ত্রণাদাতা। কালী! কালী! কালী!” একদিন তিনি বললেন, তাঁর মাথায় কতগুলি চিন্তা প্রবল হয়ে উঠেছে এবং তাকে লেখনীর সাহায্যে প্রকাশ না করা পর্যন্ত তার অব্যাহতি নেই। সেই সন্ধ্যায় সঙ্গীসাথীরা কোন স্থানে ভ্রমণের পরে বজরায় ফিরে এসে দেখলেন, স্বামীজী এসেছিলেন এবং তাঁদের জন্য নিজের হাতে Kali the Mother (মৃত্যুরূপা মাতা’) কবিতাটি লিখে রেখে গেছেন। পরে শোনা গেছে, দিব্যভাবের তীব্র উন্মাদনায় কবিতাটি লেখা শেষ হওয়ার পরেই তিনি মেঝের উপর পডে যান। মূল ইংরেজী কবিতা “Kali The Mother” ও তার বাংলা ভাষায় অনুবাদ “মৃত্যুরূপা মাতা”, করেছেন প্রখ্যাত কবি শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।
“Thou “Time”, the All-Destroyer!
Come, O Mother, come!
Who dares misery love,
And hug the form of Death,
Dance in Destruction’s dance,
To him the Mother comes”.
“কালী, তুই প্রলয়রূপিণী, আয় মাগো, আয় মোর পাশে।
সাহসে যে দুঃখ দৈন্য চায়, মুত্যুরে যে বাধে বাহুপাশে
কাল-নৃত্য করে উপভোগ, মাতৃরূপা তারি কাছে আসে”।
কিন্তু ব্রাহ্মসমাজের সদস্য নরেন্দ্রনাথ একসময় মূর্তিপুজো, বহুদেববাদ ও রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের কালীপুজো সমর্থন করতেন না। এমনকি অদ্বৈত বেদান্ত মতবাদকেও তিনি ঈশ্বরদ্রোহিতা ও পাগলামি বলে উড়িয়ে দিয়ে সেই মতবাদকে উপহাস করতেন। কিন্তু হঠাৎ এমন কি হলো যে স্বামী বিবেকানন্দ হঠাৎ কালীভক্ত হয়ে উঠলেন।
১৮৮৪ সালে নরেন্দ্রনাথ যখন এফ. এ. পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন বিশ্বনাথ দত্তের মৃত্যু হয়। বিশ্বনাথ দত্তের আকস্মিক মৃত্যুতে দত্ত পরিবার দেউলিয়া হয়ে যায়। ঋণদাতারা ঋণ শোধ করবার জন্য তাগাদা লাগাতে শুরু করে এবং আত্মীয়স্বজনেরা তাদের পৈতৃক ভিটে থেকে উৎখাত করার ভয় দেখাতে থাকেন। একদা স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান নরেন্দ্রনাথ কলেজের দরিদ্রতম ছাত্রদের একজনে পরিণত হন। তিনি ছিলেন বিশ্বনাথ দত্তের বড়ো ছেলে। তাই তাকেই পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। তিনি চাকরি জোগাড়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। পরিবারের ভরনপোষণের ব্যবস্থা করতেও তিনি ব্যর্থ হন। যেসব ধনী বন্ধু ও আত্মীয়েরা সহজেই তাদের সাহায্য করতে পারতেন, তারা কেউই তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন না। নরেন্দ্রনাথ জীবনে প্রথম বার চরম দুরবস্থার সম্মুখীন হলেন।
সেই দিনগুলির কথা স্মরণ করে বিবেকানন্দ লিখেছিলেন—
আমি খিদেয় মরে যাচ্ছিলাম। খালি পায়ে অফিসে অফিসে ঘুরতাম। কিন্তু কোথাও কাজ পেলাম না। আমার অভিজ্ঞতায় আমি মানুষের সহানুভূতি দেখেছিলাম। এই প্রথম জীবনের বাস্তব দিকটির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটল। আমি তা আবিষ্কার করলাম… দুর্বল, দরিদ্র, গৃহহারাদের জন্য সেখানে কোনো স্থানই ছিল না…
এই দুরবস্থার মধ্যে নরেন্দ্রনাথের দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত বৃদ্ধি পায়। তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের উপদেশে শান্তি পেতে থাকেন।
রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবী কালীর পূজা করতেন। প্রথম দিকের সাক্ষাতে নরেন্দ্রনাথ কালীকে গ্রহণ করতে বা তার পূজা করতে সম্মত ছিলেন না। রামকৃষ্ণ তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “যদি আমার মা কালীকে নাই মানবি, তাহলে এখানে আসিস কেন?” নরেন্দ্রনাথ উত্তরে বলতেন, “আমি আপনাকে দেখতে আসি। আমি আসি, কারণ, আপনাকে আমি ভালবাসি।”
একদিন নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংসকে কালীর কাছে তাদের পরিবারের প্রয়োজনে আর্থিক সুরাহার জন্য প্রার্থনা করতে বলে, বললেন –
‘আপনার মাকে একবারটি বলুন’।
অবাক হয়ে তাকান ঠাকুর, ‘কি বলব রে?’
নরেন ক্লিষ্টকণ্ঠে বলে ওঠে, ‘মা-ভাই-বোনের কষ্ট আর দেখতে পারি না। মায়ের কাছে বলুন – যদি একটা চাকরি বাকরি হয় আমার…’
রামকৃষ্ণ শান্তভাবে চান নরেনের চোখে, ‘আমার মা, তোর কে?’
কালী মানে না নরেন। তার কাছে মা প্রস্তরপুত্তলিকা! মাথা হেঁট করে থাকে নরেন, ‘আমার কে তাতে কি আসে যায়? আপনার তো সব। বলুন না যাতে একটু টাকাকড়ির মুখ দেখি।’
‘ওরে ও সব বিষয়ের কথা আমি কইতে পারব না। ও আমার কাছে বিষ। তুই বল। একবার মা বলে ডাক’।
নরেন বলে, ‘আমার ডাক আসে না’।
‘তাই তো তোর এত কষ্ট। ওরে একবার তাঁর কাছে গিয়ে বল। মা তো মা জগজ্জননী। তিনি সর্বোচ্চ জ্ঞান, ব্রহ্মের অখণ্ড শক্তি এবং তাঁর ইচ্ছামাত্রেই তিনি জগৎ সৃষ্টি করেছেন। সব কিছু দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। তিনি কি মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেন? আজ মঙ্গলবার। রাত্তিরে কালীঘরে গিয়ে প্রণাম করে মার কাছে যা চাইবি তিনি তাই দেবেন’।
‘সত্যি?’
‘দ্যাখ না, সত্যি কি না!’
নরেন কালীঘরে প্রবেশ করল। রাত্রি একপ্রহর কেটে গেছে। মন্দিরে কেউ নেই। শুধু নরেন আর মা ভবতারিণী। মা আনন্দময়ীর ত্রিলোকমোহিনী মূর্তি। এখানে কোথাও কোন দুঃখ নেই, শোক নেই, অভাব-অভিযোগ নেই। কেবল এক অপার শান্তি বিরাজমান। এই মায়ের সামনে কি চাইবে নরেন? সে প্রণাম করে বলে উঠল, ‘মা, জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, বিবেক দাও, বৈরাগ্য দাও’।
ফিরে এল নরেন ঠাকুরের কাছে। ‘কি রে কি চাইলি? টাকাকড়ি চাইলি?’
‘নাঃ, সব ভুল হয়ে গেল, চাইতে পারলাম না।’
ঠাকুর বললেন, ‘যা যা আবার যা। প্রার্থনা করে বল মা আমায় চাকরি দাও, টাকাকড়ি দাও…’
নরেন আবার এসে দাঁড়াল মায়ের সম্মুখে। কিন্তু আবার এ কি হল তার? কি চাইলে সে মায়ের কাছে? তুচ্ছ টাকাকড়ি? না না, তা সে কেমন করে চায়? ‘মা আমাকে জ্ঞান, ভক্তি, বিবেক, বৈরাগ্য দাও’।
ফিরে এল নরেন ঠাকুরের কাছে।
‘কি রে চাইলি?’
‘নাঃ এবারেও পারলুম না। মাকে দেখামাত্র কেমন আবেশ হয়, কিছুই মনে করতে পারি না’।
‘দূর বোকা, আর একবার যা। মনকে বশে রেখে মায়ের কাছে যা চাইবার চেয়ে নে’।
নরেনকে মন্দিরের ভেতরে ঠেলে পাঠালেন ঠাকুর।
নরেন দেখলে শুদ্ধা চৈতন্যময়ী মা রয়েছেন চরাচর ব্যাপ্ত করে। সেখানে নিরানন্দের কোনও স্থান নেই। সবেতেই আনন্দের প্রকাশ। হীনবুদ্ধির মতো সে চৈতন্যময়ীর কাছে টাকাপয়সা চাইব? ‘মাগো, আর কিছু চাই না, কেবল জ্ঞান, ভক্তি, বিবেক, বৈরাগ্য দাও’। বারে বারে প্রণাম করতে লাগল নরেন।
‘কি রে কি চাইলি’? জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।
‘চাইতে লজ্জা করল।’
ঠাকুর হাসলেন। আনন্দে হাত বুলিয়ে দিলেন নরেনের মাথায়। ‘মা বলে দিয়েছেন মোটা ভাত কাপড়ের অভাব তোদের কোনওদিন হবে না’।
নরেন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়, “আমাকে শেষ পর্যন্ত তাঁকে (কালী) মানতে হয়েছিল!” ছয় বছর কালীকে ঘৃণা করার পর সেই ছিল ঘৃণার শেষ। এই ঘটনার পরে বিবেকানন্দ এও বলেছিলেন যে, “কালী ও মা নামে পরিচিত নারীরূপা কোনো এক মহাশক্তির অস্তিত্ব আছে, তা বিশ্বাস না করার উপায় রইল না।”
নরেন ঠাকুরের কাছে কালীর গান শিখতে বসল,
আমার মা ত্বং হি তারা
তুমি ত্রিগুণধরা পরাৎপরা
মা ত্বং হি তারা।
আমি জানি মা ও দীনদয়াময়ী
তুমি দুর্গমেতে দুঃখহরা,
মা ত্বং হি তারা।
সারারাত গাইলে ওই গান। ঘুমুতে গেল না। পরদিন দুপুরবেলা পর্যন্ত ঘুমোচ্ছে নরেন। পাশে বসে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। কি আনন্দ ঠাকুরের, ‘ওরে নরেন কালী মেনেছে, মা মেনেছে – কী বলো, বেশ হয়েছে। কেমন? তাই না?’
পরবর্তী জীবনে দেবী কালীর একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হওয়া বিবেকানন্দ বলেছিলেন, কালী হলেন “ব্রহ্মাণ্ডের দিব্য জননী”, যিনি “নিজের মধ্যে সৃষ্টি ও ধ্বংস, প্রেম ও ভীতি, জীবন ও মৃত্যুকে আত্মীভূত করেছেন।”
পরবর্তীকালে বিবেকানন্দ যখন পাশ্চাত্যে বেদান্ত প্রচারে গিয়েছিলেন, তখন তিনি ভগিনী নিবেদিতাকে একটি চিঠিতে লেখেন যে, মা তাকে রক্ষা করছেন এবং হৃদয়ের সমর্থন জোগাচ্ছেন। তিনি এও বলেছিলেন যে, “কালীপূজা আমার বিশেষ ধারা” এবং তিনি এও বলেন যে তিনি কাউকে কালীপূজা করতে উপদেশ দেন না। কারণ কালীপূজা তার কাছে গোপনীয়।
এমনকি বাংলার রক্তক্ষরা বিপ্লব ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হয়ে উঠলেন মহাকালী। বাংলার কালীসাধনার নতুন মহিমা প্রকাশ পেল। আদ্যাশক্তি মহামায়া বীর সন্তানের কাছেও ধরা দিলেন। বাংলার এই বীরভাবের সাধনার রূপটি বিবেকানন্দের কথায় ফুটে উঠেছে— “যাঁরা প্রকৃত মায়ের ভক্ত, তাঁরা পাথরের মত শক্ত, সিংহের মত নির্ভীক। মাকে তোমার কথা শুনতে বাধ্য কর। তাঁর কাছে খোসামোদ কি? জবরদস্তি। তিনি সব করতে পারেন।”
বীরসাধনার পরিচয় ফুটে উঠল বিবেকানন্দের কবিতায়, –
“রে উন্মাদ, আপনা ভুলাও, ফিরে নাহি
চাও, পাছে দেখ ভয়ঙ্করা।
দুখ চাও, সুখ হবে বলে, ভক্তিপূজাছলে
স্বার্থ-সিদ্ধি মনে ভরা।
ছাগকণ্ঠ রুধিরের ধার, ভয়ের সঞ্চার
দেখে তোর হিয়া কাঁপে
কাপুরুষ! দয়ার আধার! ধন্য ব্যবহার
মর্মকথা বলি কাকে”?
ভারতীয় ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি “যৌনতার আকর্ষণ” ও “প্রেমের মাদকতা” থেকে মুক্তির কথা বলা হয়েছে এই কবিতায়। স্বামী বিবেকানন্দ ইংরেজিতে অনুবাদ করার সময় এই কবিতাটির ইংরেজি নাম রেখেছিলেন And Let Shyama Dance There (অ্যান্ড লেট শ্যামা ড্যান্স দেয়ার)।
এই কবিতাটি “সুভাষচন্দ্র বসুর মনে অজানার প্রতি আকর্ষণ জাগিয়ে তোলে এবং তিনি মাঝে মাঝেই এমনভাবে এই কবিতাটি পাঠ করতেন যে শুনে মনে হত যে তিনি নিজের আদর্শটি এই কবিতার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন। সুভাষের বন্ধু দিলীপ কুমার রায় স্মৃতিচারণ করছেন “আমরণ ছিল সে শক্তিসাধক – কৈশোরেও গঙ্গাজলে নেমে আবৃত্তি করত স্বামী বিবেকানন্দের Kali the Mother থেকে :-
Who dares misery, loves
And hugs the form of Death,
Dances in Destruction’s dance,
To him the Mother comes.
ঋণ: বিবেকানন্দের বানী ও রচনা। ইন্টারনেট।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।