গল্পবাজে ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

রবীন্দ্রনাথের বসন্তের গানের গল্পকথা

পরিক্রমণরত ছটি ঋতুর দৃশ্যপট কবিমনকে বিশেষ আন্দোলিত করলেও বর্ষা ও বসন্ত এই দুই ঋতু কবির মনে এক বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। তার মধ্যে বসন্ত ঋতু কবির কাছে আনন্দঘন মূর্তিতে ধরা দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের বসন্ত-ঋতুর গানের সংখ্যা ১০৪টি।
রবীন্দ্রনাথ লিখছেন: এক বিরহিণী আমাদের জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইয়াছেন– বিরহের পক্ষে বসন্ত গুরুতর কি বর্ষা গুরুতর? … মহাকবি কালিদাস দেশান্তরিত যক্ষকে বর্ষাকালেই বিরহে ফেলিয়াছেন। মেঘকে দূত করিবেন বলিয়াই যে এমন কাজ করিয়াছেন, তাহা বোধ হয় না। বসন্তকালেও দূতের অভাব নাই। বাতাসকেও দূত করিতে পারিতেন। একটা বিশেষ কারণ থাকাই সম্ভব।
বসন্ত উদাসীন, গৃহত্যাগী। বর্ষা সংসারী, গৃহী। বসন্ত আমাদের মনকে চারিদিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়, বর্ষা তাহাকে এক স্থানে ঘনীভূত করিয়া রাখে। বসন্তে আমাদের মন অন্তঃপুর হইতে বাহির হইয়া যায়, বাতাসের উপর ভাসিতে থাকে, ফুলের গন্ধে মাতাল হইয়া জ্যোৎস্ন্‌l মধ্যে ঘুমাইয়া পড়ে; আমাদের মন বাতাসের মত, ফুলের গন্ধের মত, জ্যোৎস্নার মত, লঘু হইয়া চারি দিকে ছড়াইয়া পড়ে। বসন্তে বহির্জগৎ গৃহদ্বার উদ্‌ঘাটন করিয়া আমাদের মনকে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যায়। বর্ষায় আমাদের মনের চারি দিকে বৃষ্টিজলের যবনিকা টানিয়া দেয়, মাথার উপরে মেঘের চাঁদোয়া খাটাইয়া দেয়। মন চারি দিক হইতে ফিরিয়া আসিয়া এই যবনিকার মধ্যে এই চাঁদোয়ার তলে একত্র হয়। পাখীর গানে আমাদের মন উড়াইয়া লইয়া যায়, কিন্তু বর্ষার বজ্রসঙ্গীতে আমাদের মনকে মনের মধ্যে স্তম্ভিত করিয়া রাখে। পাখীর গানের মত এ গান লঘু, তরঙ্গময়, বৈচিত্র্যময় নহে; ইহাতে স্তব্ধ করিয়া দেয়, উচ্ছ্বসিত করিয়া তুলে না। অতএব দেখা যাইতেছে, বর্ষাকালে আমাদের “আমি” গাঢ়তর হয়, আর বসন্তকালে সে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে। … বসন্তের উপসংহারে তিনি বলেন–
মলয়পবনবিদ্ধঃ কোকিলেনাভিরম্যো
সুরভিমধুনিষেকাল্লগন্ধপ্রবন্ধঃ।
বিবিধমধূপযূথৈর্বেষ্ট্যমানঃ সমন্তাদ্‌
ভবতু তব বসন্তঃশ্রেষ্ঠকালঃ সুখায়॥
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্ত উৎসব পালিত হয়ে উঠছে, যাতে অংশ নেয় বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে আসা হাজারো মানুষ। ১৯০৭ সালে বিশ্বকবির ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই উৎসব। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘ঋতুরঙ্গ উৎসব’। তবে সেই ঋতুরঙ্গ উৎসব হারিয়ে যায়নি, বরং কালের বিবর্তনে আরো জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বসন্ত উৎসব নামে।
বসন্ত আজ এসেছে ফুলবনে, পাতায় পাতায় পল্লবে, পল্লবে। সেই আনন্দে সবাই গেয়ে উঠছে ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে কিন্তু ক’জন লক্ষ্য করেছি যে “এরিমা সব বন অমুয়া মোলে” গান থেকে কবি রচনা করেছেন ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে…
ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে—গানটির প্রথম প্রকাশ ১৩২১ (১৯১৫)
এই গানের মূল গান হল –
এরিমা সব বন অমুয়া মোলে,
ঢুঁড় ফেরত ব্রজ দ্বার শ্যামকো,
ঢুঁড়ত কুঞ্জকে গলিয়াঁ,
ঢুঁড়ত নন্দ ভবনমেঁ।…
ইন্দিরাদেবী লিখছেন: “গান ভাঙা দুরকমে হতে পারে– এক, পরের সুরে নিজের কথা বসানো। এ ক্ষেত্রে পরের সুরে নিজের কথা বসাবার দৃষ্টান্তই বেশি পাওয়া যায়। পরের কথায় সুর দেবার দৃষ্টান্ত অতি বিরল; যদিও একেবারে নেই, তা নয়। এই প্রথম শ্রেণীকে আমি সুবিধার্থে দুই ভাগে বিভক্ত করেছি: এক, অ-বাংলা ভাষার গান ভাঙা; দুই, বাংলা ভাষার গান ভাঙা”।
শৈলজারঞ্জন মজুমদার লিখছেন: তখনকার দিনে ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে’– গানটি কণ্ঠে কণ্ঠে পথে পথে শোনা যেত, গানটি খুব প্রচলিত ছিল। এর উঁচু সুরটি শেষ পর্যন্ত একমাত্র টিঁকে ছিল, নীচু সুরটি হারিয়ে গিয়েছিল। … পাশের ঘরে গুরুদেবকে গিয়ে বললাম — গানটা গা’ন তো? … গুরুদেব ঠিক স্বরলিপির মতই গানটিতে প্রথম পংক্তি প্রথম নীচু সুর, তার পরের বারে চড়া সুরে গাইলেন। তখন আমায় পায় কে? … ঠিক তার পরেই পাঠভবনের কোন এক সাহিত্যসভায় একক কণ্ঠে এই গানটি আমি ঠিক ঐ সুরেই গাইলাম। ….; সুধীরচন্দ্র কর, যিনি গুরুদেবের দপ্তরে কাজ করতেন, তিনি আমার সঙ্গ ধরলেন এবং এই গানটি সম্বন্ধে আমার কানে বাক্যবাণ ছুঁড়তে লাগলেন। .. পরের দিন [সুধীরবাবুর সমক্ষে] গুরুদেবকে বললাম– ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে’ গানটি আর একবার করুন না।
উনি গানটি আবার সেই-দুই সুরেই গাইলেন। সুধীরবাবু তখন পালাতে পারলে বাঁচেন। শোনা গেল চাপা কণ্ঠে উনি বলছেন — দুর্জন কোথাকার!
আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে: – গানটি রচিত হয়েছিল ৫ এপ্রিল ১৯১৪ তারিখে।
রবীন্দ্রনাথের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ অনুচর চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় লিখছেন: “… কোনো এক নাটক অভিনয় উপলক্ষে আমরা বহু লোক বোলপুরে গিয়েছিলাম। খুব সম্ভব ‘রাজা’ নাটক অভিনয় উপলক্ষে। বসন্তকাল, জ্যোৎস্না রাত্রি। যত স্ত্রীলোক ও পুরুষ এসেছিলেন তাঁদের সকলেই প্রায় পারুলডাঙা নামক এক রম্য বনে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কেবল আমি যাই নি রাত জাগবার ভয়ে।… গভীর রাত্রি। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল, মনে হল যেন ‘শান্তিনিকেতনের’ নীচের তলার সামনের মাঠ থেকে কার মৃদু মধুর গানের স্বর ভেসে আসছে। আমি উঠে ছাদে আলসের ধারে গিয়ে দেখলাম, কবিগুরু জ্যোৎস্নাপ্লাবিত খোলা জায়গায় পায়চারি করছেন আর গুন্‌গুন্‌ করে গান গাইছেন। আমি খালি পায়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেলাম, কিন্তু তিনি আমাকে লক্ষ করলেন না, আপন মনে যেমন গান গেয়ে গেয়ে পায়চারি করছিলেন তেমনি পায়চারি করতে করতে গান গাইতে লাগলেন। গান গাইছিলেন মৃদুস্বরে। তিনি গাইছিলেন ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে …’। —
অনেকক্ষণ পরে গান থামলে তিনি অতি মৃদুস্বরে কথা বললেন – চারু এসেছ? আমি তাঁকে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নিলাম। তিনি তেমনি মৃদুস্বরে বললেন, “যাও, তুমি শোও গিয়ে’। বুঝলাম, তিনি একলা থাকতে চান। আমি চলে এলাম।
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিরশ্মি।
‘আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি: – গানটি রচিত হয়েছিল ৩ এপ্রিল ১৯১৬ তারিখে।
অসিতকুমার হালদার [সম্পর্কে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের দৌহিত্র] লিখছেন: “বিচিত্রাতে পাশে ঘরে একটা পিয়ানো ছিল। একদিন রবিদা সৌম্যকে [সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর] আর আমাকে নিয়ে গেলেন লালবাড়ির সেই ঘরে। পিয়ানো বাজিয়ে দুটি তাঁর পুরনো গান আরো খানিকটা রচনা করে বাড়িয়ে গাইলেন। একটি গানের গোড়া ‘পথভোলা এক পথিক’ আর একটি ‘অলকে কুসুম না দিও’। গান দুটি সৌম্য আর আমি শিখে নিলুম বটে কিন্তু রবিদার মনঃপূত হল না। বললেন, ‘ওরে, আমার সুরসুন্দরীকে তোরা সহজে বশে রাখতে পারবিনে– একা দিনুই তা পারে’। ”
একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে: গানটির প্রথম প্রকাশ বসন্ত ১৮৯৩।
সরলা দেবী লিখছেন: মহীশূরে যখন গেলুম সেখান থেকে এক অভিনব ফুলের সাজি ভরে আনলুম। রবিমামার পায়ের তলায় সে গানের সাজিখানি খালি না করা পর্যন্ত, মনে বিরাম নেই। সাজি থেকে এক একখানি সুর তুলে নিলেন তিনি, সেগুলিকে মুগ্ধচিত্তে নিজের কথা দিয়ে নিজের করে নিলেন—তবে আমার পূর্ণ চরিতার্থতা হল। “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে”, “এস হে গৃহদেবতা”, “এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ”, “চিরবন্ধু, চিরনির্ভর” প্রভৃতি আমার আনা সুরে বসান গান।
বসন্তে ফুল গাঁথল আমার জয়ের মালা: – গানটি রচিত হয়েছিল ১০ মার্চ ১৯১৫ তারিখে।
“বসন্তে ফুল গাঁথলো” গানটি হল মূলত ফাল্গুনী নাটকের বাউলের গান। ১৯৩৩ সালে, শাপমোচনে গানটি ব্যবহার করা হয়েছিল, বসন্তোৎসবে রাজার উদ্দামনৃত্যের প্রয়োজনে। অর্জুনকে দিয়ে এই গানটির সঙ্গে ঐরূপ উদ্দাম নৃত্য করাবার ইচ্ছায়, প্রতিমা দেবী গানটিকে তাঁর পরিকল্পনার চতুর্থ দৃশ্যে রেখেছিলেন। প্রতিমা দেবীর ইচ্ছার প্রতি লক্ষ্য রেখে গুরুদেব তাঁর রচিত চিত্রাঙ্গদায় একই ছন্দ ও সুর বজায় রেখে ‘অশান্তি আজ হানল’ রূপে তাকে পরিবর্তন করে দিলেন। [শান্তিদেব ঘোষ, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক ভারতীয় নৃত্য]
[মৈত্রেয়ী দেবী লিখছেন: একটি জাপানী ছেলে ছিল তার নাম কি ভুলে গেছি, তাঁর নাচ খুব প্রাণবন্ত, তাঁকে শেখাচ্ছিলেন এই গানটির সঙ্গে নাচ – “বসন্তে ফুল গাঁথলো আমার জয়ের মালা” – ‘গাঁথল’-র উপর ঝোঁক দিয়ে তাঁর পা ফেলা শতবার করে করেছে, কবির পছন্দই হয়না। কিংবা “ বিঁধল হৃদয় নিদয় বাণে” সে একপাক ঘুরে গেল, কবি বসে বসেই তাঁকে গানের সঙ্গে নাচ শেখাচ্ছেন – বার বার গান গেয়ে গেয়ে।…
ফাগুনের নবীন আনন্দে: – গানটি রচিত হয়েছিল ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ তারিখে।
সুশোভন সরকারের সঙ্গে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের ভগ্নী, বিশ্বভারতীর ছাত্রী রেবার বিবাহের খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রশান্তচন্দ্রকে বললেন, বাবলির [রেবা মহলানবিশ] বিয়েটা তাহলে আমিই দিয়ে দিই; তোমাদের অনুষ্ঠানের পদ্ধতিটা ঠিক জানা নেই, আমাকে একটু শিখিয়ে দেবে। …বিবাহের দিন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে দুটি গান এসে হাজির, তাঁর প্রিয় বাবলির উদ্দেশে আশীর্বাদ। গান দুটি হল, “দোলে প্রেমের দোলনচাঁপা” এবং ” ফাগুনের নবীন আনন্দে “। সেদিনের চয়নিকার একেবারে শেষে গানদুটি ছাপা হল, কিন্তু কী কারণে জানিনা রচনার উপলক্ষ দেওয়া হয় নি।… সুশোভন সরকার লিখেছেন: “ফাগুনের নবীন আনন্দে” গানটির একটু বদলানো ভার্সান কবি আমাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত কারণে যেটা আমাদের কাছে অশেষ মূল্যবাণ:
‘ফাগুনের নবীন আনন্দে
বাণী মোর গাঁথিলাম ছন্দে।
পথ হতে নিক তুলি
পাখির কাকলিগুলি
ভরা হোক বকুলের গন্ধে।
চলে যাক মিলনের পান্থ
দখিনের বাতাস অশান্ত।
তারি হাতে হোক লেখা
পলাশের রাঙ্গা রেখা
সুভাগিনী তোমার সীমান্তে’।
ও মঞ্জরী, ও মঞ্জরী আমের মঞ্জরী – গানটি রচিত হয়েছিল ১২ মার্চ ১৯২২ তারিখ, শান্তিনিকেতন।
শান্তিদেব ঘোষ উদ্ধৃত করছেন জনৈক প্রাক্তন ছাত্রের স্মৃতিচারণ: … ‘মনে পড়ে বসন্তোৎসবের কথা [১৩২৮]। দিনুবাবুর বাড়িতে সকালবেলা মহড়া চলেছে। এমন সময় এলেন মঞ্জুশ্রী দেবী [স্বর্গত সুরেন্দ্রনাথের কন্যা]। কবি তাঁকে দেখেই বলে উঠলেন, “দিনু, এই যে আমের মঞ্জুরী এসেছে; তাহলে আমের বোলের গানটা মঞ্জুই গাইবে, কি বলিস্‌?” উত্তরে দিনুবাবু বললেন, “তা আমাদের পালায় ত আমের মঞ্জুরী নেই”। সহসা কবির ভুল ভাঙলো, বললেন, “তা কি আর হয়েছে, নাতনীর সঙ্গে নয় একটু পরিহাস করলুম। “কিন্তু এই নেহাৎ ব্যক্তিগত পরিহাসকে কেন্দ্র করেই কবি বিকেলবেলা লিখে নিয়ে এলেন– ‘ও মঞ্জরী ও মঞ্জরী’।
শৈলজারঞ্জন মজুমদার, লিখছেন: ‘ও’ এই সম্বোধন একাক্ষর। এর উদাহরণ দেওয়া যায় ‘ও মঞ্জরী ও মঞ্জরী’ গানে। ‘ও’-তে সুরের বিন্যাসের রূপটি লক্ষ্যণীয়। গানে প্রথম ‘ও’ একটি তীক্ষ্ণ হাঁকের মতো– র্রা র্মা র্রা অতি উচ্চ পর্দায়, তারপর মঞ্জরী কথাটা আসছে। যেন অনেক দূর থেকে কেউ ডাকছে। কবি আহ্বান করছেন বসন্তের দূত আম্রমঞ্জরীকে। দ্বিতীয়বার ‘ও’ ধ্বনিটি এক প্রলম্বিত সুরের খেলায় নৃত্যচ্ছন্দে ধেয়ে চলে। গানটি বসন্তের লীলাচঞ্চল রূপের ভাবকে প্রকাশ করেছে। যেখানে সম্বোধনবাচক কোনো একাক্ষর বা দুই অক্ষরের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে এই ধরণের বিশেষত্ব আছে।
আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে: – গানটির প্রথম প্রকাশ, অগ্রহায়ণ, ১২৯৫ (১৮৮৮), দার্জিলিং।
‘মায়ার খেলা’ নৃত্যনাট্যের সপ্তম দৃশ্যে শান্তা ও অমরের মিলনোৎসবে পুরনারীগণ যখন সমাগত হয়ে আনন্দগান গাইছে। অমর যখন ফুলের মালা নিয়ে শান্তার গলায় পরাতে যাচ্ছে এমন সময় ম্লান ছায়ার মত প্রমদা কাননে প্রবেশ করল। সহসা অনপেক্ষিত্ভাবে উৎসবের মধ্যে বিষাদপ্রতিমা প্রমদার নিতান্ত করুণ দীন ভাব অবলোকন করে নিমেষের মতো আত্মবিস্মৃত অমরের হাত থেকে ফুলের মালা খসে পড়ে গেল। উভয়ের এই অবস্থা দেখে শান্তা ও আর-সকলের মনে বিশ্বাস হল যে, অমর ও প্রমদার হৃদয় গোপনে প্রেমের বন্ধনে বাঁধা আছে।
সেই সময় সখীরা গেয়ে উঠল: আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে… এই গানের মূল গান হল:
Go where glory waits thee,
But while fame elates thee,
Oh! still remember me. – [Thomas Moore, Irish Melodies I, 1808]
ওগো দখিন হাওয়া, ও পথিক হাওয়া: গানটি রচিত হয়েছিল ১২ ফাল্গুন ১৩২১ (২৪ ফেব্রুয়ারি,১৯১৫): সুরুল
সীতা দেবী লিখছেন: ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দের গোড়ার দিকে ‘ফাল্গুনী’ নাটক রচিত হয়। কিছুদিন পরেই, ইস্টারের ছুটিতে উহা শান্তিনিকেতনে অভিনীত হইল।… ‘ফাল্গুনী’ অভিনয় জমিয়াছিল খুব। রঙ্গমঞ্চ তো ফুলে পাতায় একেবারে ঢাকিয়া গিয়াছিল, দুই ধারে ছিল দুইটি দোলনা। ‘ওগো দখিন-হাওয়া, ও পথিক হাওয়া’ গানটি যখন হইল তখন দুইটি ছোট ছেলে এই দুইটি দোলনায় বসিয়া মহানন্দে দোল খাইতে খাইতে গান আরম্ভ করিল। সঙ্গী তাহাদের অনেকগুলিই ছিল, তাহারা স্টেজে দাঁড়াইয়াই গান করিতেছিল। … পাখির কাকলিতে যেমন বনস্থল প্রতিধ্বনিত হয়, বালকদের গানেও তেমনি নাট্যঘরখানি প্রতিধ্বনিত হইতেছিল। রবীন্দ্রনাথ অন্ধ বাউল সাজিয়াছিলেন, ‘ঘরছাড়ার দলে’ ছিলেন দিনেন্দ্রনাথ, সন্তোষবাবু [মজুমদার], অজিতকুমার চক্রবর্তী, অসিতকুমার হালদার প্রভৃতি। ….
আজি বহিছে বসন্তপবন সুমন্দ তোমারি সুগন্ধ হে: গানটির প্রথম প্রকাশ, ১২৯২ (১৮৮৬)
এই গানের মূল গান হল:
আজু বহত সুগন্ধ পবন সুমন্দ মধুর বসন্তমেঁ,
হর মকুর পর যূথ মধুপ মদহর নিরত কর রব কুঞ্জমেঁ।
সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন: ‘আজি বহিছে বসন্ত পবন সুমন্দ’ গানটি – হিন্দী গান ভাঙা। গানটি মূলত বাহার রাগে হলেও রবীন্দ্রনাথ গানটির জায়গায় জায়গায় এমন দু একটি স্বরযোজনা করেছেন যেগুলি রাগের দিক থেকে বিচার করলে শুদ্ধ বাহারে লাগে না। এখন যদি কোনো ওস্তাদ ‘আজি বহিছে’ গানটিতে শুদ্ধ বাহারের রূপ ফোটাবার জন্য মরিয়া হয়ে লেগে পড়েন তো তাঁকে বোঝাতে না পারলেও সাধারণ মানুষকে এটা সহজেই বোঝানো যাবে যে গানের সুরকে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন গানে কথার ভাবটিকে ফুটিয়ে তোলবার জন্য।
দখিন হাওয়া জাগো জাগো: গানটি রচিত হয়েছিল ৫ ফাল্গুন ১৩২৯ (১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৩): শান্তিনিকেতন
শঙ্খ ঘোষ, লিখেছেন: যদি ভাবি বসন্তের কোনো গান: ‘আজি দখিনদুয়ার খোলা ‘। ওইরকমই তো উল্লাস আছে ‘ওগো দখিন হাওয়া, ও পথিক হাওয়া’য়? ওইরকমই তো আবেগ জাগায় ‘দখিন হাওয়া জাগো জাগো’? কিন্তু লক্ষ্য করতে ভালো লাগে যে এর প্রথমটিতে আছে কেবল বহির্বসন্তের মদিরতা, দ্বিতীয়টিতে আছে ‘আমি’র সঙ্গে ‘তার’ যোগের ব্যাকুলতা, আর তৃতীয়টিতে যেন এসে যায় এ-যোগের ‘তাত্ত্বিকতা’ও অনেকখানি, যখন শুনি ‘নৃত্য তোমার চিত্তে আমার মুক্তিদোলা করে যে দান’। লক্ষ্য করতে ভালো লাগে যে গানগুলির কালের দিক থেকে আছে যোগ্য এক পরম্পরা।
বসন্তে-বসন্তে তোমার কবিরে দাও ডাক: গানটির প্রথম প্রকাশ, ১৩৩৭ (১৯৩১)
“বসন্তে বসন্তে তোমার কবিরে” গানটির বিশেষত্ব যে সুরান্তরের সঙ্গে ঘটে কালান্তর, যা রবীন্দ্রগীতরচনার ক্ষেত্রে বিরল। গানটিতে কবি প্রথমে লাগালেন ইমন-চালের সুর, ছন্দে জোগালেন গতি, মেজাজে উচ্ছলতা। তারপর কবি যখন তার রূপান্তর ঘটাতে চাইলেন, তখন তিনি গানটিকে পূর্বের শুদ্ধসুর সমন্বয়ে নির্মিত নৈশ রাগ-বাতাবরণ থেকে সরিয়ে আনলেন ঊষালোকে; তখন সে আসে ভোরের রামকেলি রাগকে গলায় নিয়ে, ঢিমালয়ে পা ফেলে, সূর্যোদয়োন্মুখ বাসন্তী প্রত্যূষের প্রশান্তিকে ব্যাপ্ত করে।
প্রথম সুরটি যেন উচ্চগ্রামে সোচ্চার সমস্বর ঘোষণা; আর দ্বিতীয়া একাকিনী, মীড়ের টানে টানে যে সব হারানোর উদার স্বীকৃতি।
নব বসন্তের দানের ডালি এনেছি তোদেরই দ্বারে: গানটির প্রথম প্রকাশ, ১৩৪৪ (১৯৩৮)
এই গান সম্বন্ধে শান্তিদেব ঘোষ লিখছেন: “দ্বিতীয়বার ‘নৃত্যনাট্য চণ্ডালিকা’ অভিনয়কালে, গানের একটু অদল-বদল করা হয়েছিল। পুস্তকের প্রথম গানটি সেইবারের রচনা। গানটি সকালে তাঁর কাছে শিখে এসে বাড়িতে পা দেওয়া মাত্রই তাঁর ভৃত্য চিঠি নিয়ে এসে হাজির। লিখেছেন– “এই নতুন গানে, মমতার ফুল বিক্রির ভঙ্গীর সঙ্গে সঙ্গে অনিতা আর হাসি এসে যেন ওর কাছ থেকে ফুল নিয়ে কানে পরচে খোঁপায় পরচে ভঙ্গি করে তবে ভালো হয়। তখনি ওরা চলে যাবে।”
এই চিঠি পাবার আগে পর্যন্ত নিশ্চিন্ত ছিলাম এই ভেবে যে, গানটি প্রথমে সকলকে শিখিয়ে তার পরে নাচের কথা ভাবা যাবে। কিন্তু এর পরে আর নিশ্চিন্ত থাকা সম্ভব হল না। গানগুলি গাইবার দোষে নাচের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রাখতে পারলে গুরুদেব অস্থির হয়ে উঠতেন। ।
এক ফাগুনের গান সে আমার আর ফাগুনের কূলে কূলে: গানটি রচিত হয়েছিল ১৪ চৈত্র ১৩২৮ (২৮ মার্চ,১৯২২):
প্রশান্ত কুমার পাল লিখছেন: তিনি পর-পর চারদিনে চারটি গান লেখেন, সব্গুলোই পুরোনো শিলাইদহের স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্যের বেদনায় বিধুর: আসা যাওয়ার পথের ধারে (১১ই চৈত্র); কার যেন এই মনের বেদন (১২ই চৈত্র); নিদ্রাহারা রাতের এ গান (১৩ই চৈত্র); এক ফাগুনের গান সে আমার (১৪ই চৈত্র)। শিলাইদহ থেকে যাওয়ার আগের দিন ২২শে চৈত্র রবীন্দ্রনাথ রাণু অধিকারীকে লিখেছিলেন: “আগে পদ্মা কাছে ছিল– এখন নদী বহু দূরে সরে গেছে– আমার তেতলা ঘরের জান্‌লা দিয়ে তার একটুখানি আভাস যেন আন্দাজ করে বুঝতে পারি। অথচ একদিন এই নদীর সঙ্গে আমার কত ভাব ছিল– শিলাইদহে যখনই আসতুম তখন দিনরাত্তির ঐ নদীর সঙ্গেই আমার আলাপ চলত। … এই ত মানুষের জীবন, ক্রমশই কাছের জিনিষ দূরে চলে যায়, জানা জিনিষ ঝাপ্‌সা হয়ে আসে, আর যে স্রোত বন্যার মত প্রাণমনকে প্লাবিত করেচে, সেই স্রোত একদিন অশ্রুবাষ্পের একটি রেখার মত জীবনের একান্তে অবশিষ্ট থাকে।”
চলে যায় মরি হায় বসন্তের দিন: গানটি রচিত হয়েছিল শ্রাবণ ১৩৩৬ (১৯২৯)
রমা চক্রবর্তী লিখছেন: অনভিজ্ঞ আমাকে দিয়ে বৌঠান [প্রতিমা দেবী] ‘নবীন’-এ নাচিয়েছিলেন। গানটি ছিল “মরি হায় চলে যায় বসন্তের দিন”। আমি তো গানের দলেই ছিলাম। হঠাৎ একদিন বৌঠান আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন তোমাকে নাচতে হবে। আমি তো অবাক। সবে নাচ শিখছি, আমি কী করে একলা নাচব। … বৌঠানের আশ্চর্য অধ্যবসায় মানতেই হবে, সাবলীল নৃত্যে আমাকে উৎরে দেবেন যেন পণ করেছিলেন। একদিন বললেন, এই তো বেশ হয়েছে– আজ বাবামশায়কে দেখাতে হবে। আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম আবার ভাবলাম গুরুদেব নিশ্চয় নাকচ করে দেবেন। গুরুদেব নাকচ তো করলেনই না বরং খুব উৎসাহ দিলেন, নিজে উঠে এসে গান করে করে দেখিয়ে দিলেন আমার হাত ধরে, কোন লাইনের সঙ্গে কীভাবে নাচতে হবে। আমি সসংকোচে নাচছি, বেশি দূরে এগিয়ে যাচ্ছি না– এসব দেখে তিনি বৌঠানকে বললেন, “বৌমা একটা চক নিয়ে এসো তো। ” বৌঠান পুপের ডেস্ক থেকে একটা চক এনে দিলেন, গুরুদেব বললেন, “এইবারে এখানে একটা সেমিসার্কল করে দাও– রমা ঐখান পর্যন্ত এগিয়ে যাবে। ” তারপর নিজে উঠে এসে আমার হাত ধরে দেখিয়ে দিলেন কী করে এগিয়ে গিয়ে “চলে যায় বসন্তের দিন” করব আর কীভাবে পিছিয়ে এসে “মরি হায়” করব। “পুলকিত আম্রবীথি” কী সুন্দর দ্রুত স্টেপ দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন– পুলকিত শুধু হাতের মুদ্রায় নয়। “পরানে বাজায় বীণা কে গো উদাসীন”– সে যে কী অপূর্ব ব্য্ঞ্জনাময় তাঁর নৃত্যভঙ্গি– বলে বোঝান যায় না। অনেকখানি সময় নষ্ট হল গুরুদেবের, আমি কুণ্ঠিত বোধ করছিলাম, কিন্তু গুরুদেবের সেদিকে ভ্রূক্ষেপও ছিল না বারেবারে প্রত্যেকটি লাইনের সঙ্গে নাচিয়ে, নিজেও উঠে উঠে দেখিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে তবেই ছাড়লেন।
ঋণঃ রবিজীবনী – প্রশান্ত কুমার পাল। গীতবিতান – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রসঙ্গীত – গবেষণা – গ্রন্থমালা/প্রফুল্লকুমার দাস।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।