নেংটিশ্বরী আর ধেড়েশ্বরের কথা তো আগেই বলেছি. এনারা আপাতত গণশার পুজো নিয়ে বেজায় ব্যাস্ত. গভীর রাতে লিখতে বসে এদের যাতায়াতের আভাস, ইঙ্গিত পাই বৈ কি. তা একদিন হয়েছে কি রাত বেশ গভীর হয়েছে. নেংটি ঠাকুমা নেংটিশ্বরীদের নিয়ে স্বর্গ থেকে ফিরছেন. আমি লেখার টেবিলে ঘটনার ঘনঘটার জট ছাড়াতে বসেছি. কিন্তু জট আর খোলে না. দু ঢোক জল খেলাম, পেন চিবুলাম, জট খুলল না.
আমার লেখার টেবিলে দাশুর একটা ছবি আছে. সে ব্যাটা গত সপ্তাহের পর আর দেখা দেয় নি. এই সব সাত পাচ ভাবতে ভাবতেই জানলার কাছে ফ্যাঁস, ফ্যাঁস, গড় গড় আওয়াজ. মার্জার বাহিনী ল্যাজ তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে. এমনি আমার মার্জার ভীতী মারাত্মক. ইয়া মোটা হুলো, জিরো ফিগারের ন্যাকা মেনি কে নেই সেখানে. বুকটা ধড়াস করে উঠল. সর্বনাশ নেংটিশ্বরীদের গন্ধ পেয়েছে ওরা. কি হবে এবার. দাশুর ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলি ‘অ মুখপোড়া দাশু, মা ষষ্ঠীকে খবর দে গে যা. নিজের বাহনদের সামলাক এসে. নেংটিশ্বরীদের গায়ে যেন আঁচটি না লাগে. মা ষষ্ঠীর বাহনদের তিনি এসে সামলান. চুরি করে দুধ, ক্ষীর গেরস্ত বাড়ী থেকে, বাজার থেকে মাছের কানকোটি , মাছের মুড়োটি, ল্যাজার অংশ কিছুই তো বাদ যায় না. এর মধ্যে আবার মা ষষ্ঠীর বাহনেরা এসে ঝামেলা লাগিয়েছে কেন? যা খবর দে গে যা, মা ষষ্ঠীকে ‘. দাশু ব্যাটা এই প্রথম দেখলাম আমার কথা শুনে ছবি থেকে বেড়িয়ে আকাশপানে ছুট লাগাল.
মা ষষ্ঠী ঠাকরুণ আকাশের কোনায় আঁচল বিছিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন. আমার মুখ ঝামটানি আর দাশুর পায়ের শব্দে তাঁর ঘুম গেল চটকে. তারার আলোর পথ বেয়ে দাশু তাঁকে প্রায় পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে আমার খাটের উপর বসিয়ে দিলে. মা ষষ্ঠী বললে ‘কি হলটা কি, দু চোখের পাতা তোরা এক করতে দিবি নে. এই রাত বিরেতে দাশু ব্যাটা গিয়ে টানাটানি করছে আমায়. বলি হয়েছটা কি?’
আমি বললাম ‘দ্যাখো মা ঠাকুরুন এই দাশুকে না পাঠালে তুমি তো সাড়া দিতে না, এবার তোমার বাহনদের সামলাও. আমার কিন্তু দুয়োরাণীর বাঁদরের সাথে হেব্বি দোস্তি. এক্ষুনি দাশুকে বলব তাঁকে খবর দিতে. ক্ষীরের ছেলে খেয়ে ফেলে তাঁকে সোনার চাঁদ ছেলে দিয়েছিলে জানি, এবার আমার পাড়ার নেংটিশ্বরীদের বাঁচাও. ‘ এই দুয়োরাণীর বাঁদরকে মা ষষ্ঠী সমঝে চলেন, সঙ্গে আবার দাশু দোসর. মা রেগে বলেন ‘তা তোমার নেংটিশ্বরীরা কি গেরিলা ওয়ারফেয়ার জানে না. পাইপের আড়ালে, পুকুরপারের গর্তে সিধোতে পারছে না? লুকিয়ে আক্রমণ শানাতে শেখে নি. গনশা ব্যাটাও তো শুধু ভূড়ি সামলিয়েই গেল, বাহনদের কিছু শেখাতে পারে নি.’
এইবার দাশু হাল ধরে. ‘দেখো মা তোমরা দেবতারা বাহনদের কি শেখাবে বা না শেখাবে তোমরা বুঝে নাও, আপাতত তোমার বাহনদের সামলাও, না হলে আমার মিহিদানার হাড়ী ভর্তি পটকা রাখাই আছে. এবার আমি আগুন দেব’, আমিও সুযোগ বুঝে মা ষষ্ঠীর পায়ে ডাইভ মারলুম. বললেম ‘তুমি কিছু করবে কিনা বল, তুমি কিছু যদি না কর আমিও তোমার পা ধরে বসলুম, মোটেই ছাড়ছি না. কেমন চলে যাও দেখি’.
‘আ মোলো যা, ছাড়, ছাড় একে পায়ে বাতের ব্যাথা, তায় তুই পা ধরে টানাটানি শুরু করলি, দাশু আবার পটকার ভয় দেখাচ্ছে, দেখি কি করতে পারি’. এই না বলে মা ষষ্ঠী আমায় ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালে.
আহা সে কি রূপ তাঁর, জ্যোৎস্নার রঙের মত শাড়ী পরনে,তাতে সিঁদূর রঙা চওরা পাড়. গায়ের রঙ যেন দুধে আলতা মেশানো. কপালে এক টাকা কয়েনের সাইজের টিপ, সিঁথিতে সিঁদূর. নাকের উপর গুড়ো গুড়ো সিঁদূর লেগে রয়েছে.
আহা সে যে জগজ্জননী, মা ষষ্ঠী আঁচল গুছিয়ে উঠে দাঁড়াতেই তাঁর আঁচলে চাবির গোছা ঝনঝন করে উঠল. আর সেই ঝনঝনানিতে ন্যাকা মেনি, হুমদো হুলো ল্যাজ তুলে পালালে. পালানোর সময় দেখি আমার ছাত্রী আগমনীর তিনটে বেড়াল সেখানে রয়েছে, তাদের নাম সখী, রাধা, শ্রীমতি. আমি মনে মনে বললাম. ‘আগমনী তিনবেলা তাঁর বাগানে ভালোমন্দ খাওয়াচ্ছে তাও এখানে নেংটিদের ধাওয়া করে আসা কেন বাপু, নোলা মন্দ নয়’.
মা ষষ্ঠী চাবির গোছায় আবার আওয়াজ করলেন. ব্যাস আর তাদের দেখতে পাই নি. মা ষষ্ঠী আমাদের পাড়া আলো করে দাঁড়িয়ে রইলেন. নেংটিশ্বরীরা তাঁর ডেরায় ফিরে গেল,মা ষষ্ঠীকে পেন্নাম ঠুকে.
আমি কিন্তু মা ষষ্ঠীর আঁচল ছাড়ি নি. বললাম ‘তুমি এ যাত্রায় বাঁচালে মা, এখন ঘরে বসে একটু জল খেয়ে যাও. মা ষষ্ঠী ঘরে এলেন. ফ্রীজে আম ফিরনি ছিল. মাকে নিবেদন করলাম. সঙ্গে বরফ দেওয়া, কর্পূর দেওয়া ঠান্ডা জল. লাল কূঁচি দেওয়া তালপাতার পাখাটা টেনে নামিয়ে মা কে বাতাস করি. মা ষষ্ঠীর চোখ দুটি কেমন টলটল করে ওঠে মায়ায়. মা আম ফিরনির বাটি আর জলের গেলাস খালি করে উঠে দাঁড়ালেন বললেন ‘এবার যাই,লম্ফ,ঝম্প করে রাত কাবার হল’, আমি বললাম ‘দাঁড়াও দাশু পৌছে দিয়ে আসুক.’ দাশু বললে ‘নাও মা কাঁধে ওঠ’.
বলতে বলতেই ঠক করে আওয়াজ….
ও মা কোথায় ষষ্ঠী ঠাকরুণ, কোথায় দাশু, লিখতে বসে, টেবিলে আমার মাথাটি ঠুকে গেছে. সকাল হয়ে গিয়েছে. খবরের কাগজওয়ালা এই পৃথিবীর গুষ্টির খবর নিয়ে আমার দরজায় ঘন্টি বাজাচ্ছে.
তবে আমি বিলক্ষণ জানি যে দাশু যাবার সময় আমার মাথটি ঠুকে দিয়ে গেছে, অনেকদিন জ্বালায় নি যে আমাকে. মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে উঠে পড়ি, ছিষ্টির কাজ পড়ে রয়েছে.