প্রবাসী মেলবন্ধনে দীপশিখা দে (মেলবোর্ন)

মহামারী, সময়কাল – দৃশ্যপট বদল
কেশবপুর প্রাইমারী স্কুলের ভূগোলের মাস্টার গোপীচরণ সমাদ্দারের একমাত্র মা মরা কন্যা কাজল এর বিয়ে দিলেন নিজের প্রাক্তন ছাত্র অখিলের সাথে। মেধাবী ছাত্র অখিল, পল্লীগ্রামে বেড়ে ওঠা প্রাণবন্ত ,বুদ্ধিমান। প্রখর দীপ্তি তার চোখে, সেদিক পানে চেয়ে চোখ ছলছল হাসি মুখে গোপীচরণ বলেছিলেন -‘ তোমরা ভালো থেকো। কাজল আমার বড় অভিমানী। কত দূরদেশে যাবে , আমার আনন্দের সীমা নেই অখিল, তবু দেখো অভিমানী মেয়েটা কে আমার। ওর চোখের দিকে চেয়ে মনের কথা বুঝতে হতো আমায়। এ ভার আমি তোমায় দিলাম ‘
এই দৃশ্যপটের সময়কাল আকাশ উড়ান শুরুর অনেক আগের। তাই অখিল কাজল চামড়ার বড় পেট মোটা দড়ি দিয়ে শক্ত আঁটা বাক্স আর কিছু নকশি কাঁথার পুরোনো কাপড়ের পুঁটলি বেঁধে জাহাজের ভোঁ শুনে নড়েচড়ে উঠলো। কাজলের চোখ দিয়ে গোপীচরণ দেখবে তার বহুদিনের প্রত্যাশিত সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ের সেই সব শহর কে। শত পথ পাড়ি দিয়ে ডাকঘরের নাম বদলে বদলে কাজলের চিঠি আসবে কেশবপুরের ডাকঘরে। শত ভাঁজ চিঠিতে কালি দোয়াতের লেখা বড় বড় হরফে মেয়ের চিঠি।
শ্রী চরণেষু বাবা …… তারপর একঝাঁক লেখার হরফে ছবি। গোপীচরণের চোখের সামনে চলন্ত বায়োস্কোপ। কেশবপুরের মেলায় আসে সেই জাদুকর যার অন্ধকার বাক্সের ঘুল ঘুলিতে এক চোখ বন্ধ করে আরেক চোখ খুললেই কত সাদা কালো নানা দেশের ছবি। ঠিক তেমন ছবিতে কাজলের লেখা, আরো রঙিন সুতোর নকশা কাটে। ছয় মাস ,সে এক দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা ক্লাস রুমের জানলার দিকে চেয়ে থাকা দুটি ব্যস্ত চোখের। ডাকঘর থেকে এই দুপুরে বৈকুন্ঠ ঘোষ চিঠি বিলি করতে আসে।কাজলের চিঠি এলে সে একবার স্কুল বাড়ির জানলার দিকে চেয়ে দেখে আর হাঁক দেয় ‘ ও মাষ্টার মশাই বিদেশের চিঠি ‘ কি সুন্দর খাম তাতে ডাকটিকিটের মাধুর্য্য। নতুন চিঠি আসার আগে প্রতি সন্ধ্যে একই চিঠি বারবার পড়া আর আঙুলের ছোঁয়া হরফে। মনে পড়ে কাজলের নরম হাতের বিলি কাটার কথা ওই হরফ গুলো ছুঁলে।
কাজলের চিঠি আসে অখিলের অফিসের ঠিকানায়। বড় সাহেব খুব স্নেহ করে অখিলকে। তার ঠিকানায় কেশবপুরের চিঠি আসে। সেই চিঠি অখিল যখন নিয়ে আসে তার ওভারকোটের পকেট থেকে বাবার চিঠি বের করতে দেখলেই ছুট্টে আসে কাজল। কাজল এক প্রকার অখিলের ওভারকোটের পকেট থেকে একটানে কেড়ে নেয় সেই চিঠি। কেশব পুরের গন্ধ আছে বুঝি সেই খামে। বাবার লেখাগুলি ছুঁয়ে দেখে সে বারবার।
দৃশ্যপটের এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের ছবি – সারা পৃথিবী জুড়ে মহামারীর প্রকোপ। জানলা দিয়ে কাজল দেখে শবদেহ ঢাকা চলেছে মিছিলের মত। অখিল ইংরেজি পেপার নিয়ে আসে। সন্ধ্যে বেলা নকশা কাটা বিলিতি টেবিলের উপর কাগজ ছড়িয়ে রেখে জোরে জোরে সে পড়ে শোনায় কাজলকে। সার বিশ্বে মড়ক লেগেছে। ভারতবর্ষের ছবি আরো ভয়ানক। আন্ত্রিক , ম্যালেরিয়া তো ছিলই কিন্তু এই মহামারী তে গ্রাম শহর উজাড় হয়ে যাচ্ছে। কাজলের মন উতলা হয়ে ওঠে কেশবপুরের কথা ভেবে। চিঠি আসেনা বহুদিন। এই বিদেশেও মড়কের ভয়ঙ্করতায় ডাক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কাজল তাঁর বাবার জন্য ডুকরে কেঁদে ওঠে। ছেলেটা জন্মেছে এই দুই মাস হলো। খবরটাও জানানো গেলোনা। গোপীচরণ দাদু হয়েছেন। বাবা যে একা , বড় একা। ছয়মাস আগে চিঠিতে জেনেছিলো বাবার জ্বরের কথা। ভালো আছি বললেও সে জানে ভালো নেই। কিন্তু এই মহামারীতে বাবা ! ভাবতে গিয়ে মন টা হুহু করে ওঠে কাজলের। দুধ গরম হয়ে উতলে পড়ে যায়। কেশবপুরে এই সময় প্রতি বছর ঝড় বাদল দিনে বন্যা হয়।এবার ঘরে জল উঠলে বাবা কি পারবে একা হাতে খাটের পায়াতে ইট গুঁজতে। চশমার কাঁচ ভেঙে গেলে কে সারাবে ? বাবার চিঠির কাগজ , কালি দোয়াত শহর থেকে বৈকুন্ঠ কাকা কি এনে দিয়েছে ? ওরা সবাই কেমন আছে ? সব থেকে যে প্রশ্ন কাজলের মনে ভয় ডেকে আনে সে কথা ভাবলে তার হৃৎপিণ্ড এক পাথর সম হয়ে তার কণ্ঠ রোধ করে – বাবা আছে তো ?? সেদিন বিলেত যাত্রার শুরুতেই কি কাজল আর গোপীচরণ একে অপরকে চির বিদায় জানিয়েছিল ? এই মহামারীর অতলান্ত সমুদ্রে তারা হারিয়ে গেলো
দৃশ্যপট ২০২০ — আবার এক মহামারী। শুরুর দিনে জানা ছিলোনা কতদিন , কত ভয়ঙ্কর তার ছবি হতে পারে। আকাশ থমথমে। প্লেন চলেনা। জরুরী কালীন হেলিকপ্টারের আওয়াজ শোনা যায়। রাস্তা শুনশান। হাতে গুনে কারফিউ শহরগুলিতে মাস্ক পড়ে প্রয়োজন নেহাত জরুরি হলে মানুষ বের হয়। স্কুলের কোলাহল নেই , উৎসব আড্ডা মানুষের জমায়েত এক চরম আশঙ্কা। পার্কে উদ্যানে লাল রঙের ফিতে দিয়ে সব বসার জায়গা আটকানো। কোনো জমায়েত নয়।
ভারতবর্ষের চিত্র আরো ভয়ঙ্কর। পোস্তর দানার মত পিলপিল জন সমুদ্র স্তব্ধ। রেলগাড়ি চলেনা। কর্মহীনতা যেন মহামারীর থেকেও বিভৎস্য। রুজি হীন মানুষ , রুজি বদল মানুষ চারিদিকে ত্রস্ত।
তবু আধুনিক প্রযুক্তির ছোয়াঁ এই মহামারীতে অনেক কাজল কে বাঁচিয়ে দিয়েছে। wtsapp যুগে আঙুলের ছোঁয়ায় সে ফোনের স্ক্রিনে একা থাকা সেই মা অথবা বাবা কে দেখেছে। মা আম ফানের বিধ্বস্ত রূপ দেখিয়েছে। নিচের ঘরে কত টা জল উঠেছিল কাজল দেখেছে। মা কে জরুরি কালীন সাবধানতার পরামর্শ দিতে পেরেছে। বিদ্যুৎ চমকালে মা ভয় পায় , তাই সেই সময় মায়ের সাথে কথা বলে সময় পাড় করেছে। মায়ের একা ঘরে পড়ে গিয়ে মাথায় সেলাই পড়েছিল। কাজল দেখেছে সেই ক্ষত কতটা ভরেছে। এখন সেখানে অনেকটা মাথার চুল ভরেছে। সে স্ক্রিনে মায়ের হাতের ফোস্কা দেখে মলমের কথা মনে করিয়েছে। ফোন হাতে কথা বলতে গিয়ে মা যদি সিঁড়ি তে ওঠে অমনি ধমকে ফোন কেটেছে। মায়ের গায়ের পোশাক রং ওঠা দেখে রেগে বলেছে -‘এবার গিয়ে সব কটা পুরোনো পোশাক ফেলে দেব ‘
কাজল বাড়ির দেয়ালের খোসা উড়ে গেলে , কাঠের দরজা ফুলে ফেঁপে বন্ধ না হলে , ঘড়ির কাঁটা বন্ধ হলে , তালা ভেঙে গেলে মিস্ত্রির খবর থেকে শুরু করে ঘরের খুঁটিনাটির তদারক ওই স্ক্রিনে দেখে দেখেই সমাধান দিয়ে কাটিয়েছে দীর্ঘ দুই বছর। মায়ের মাস্কের রং সেটিও তার জানা। সময় ছিল ভয়াবহ তবু আধুনিক সময়ের দৃশ্যপটে কাজলদের করুন পরিস্থিতি তেমন শোচনীয় ছিলোনা। বাড়ির খুঁটিনাটি থেকে মায়ের সব কিছু তার দেখা ,শোনা জানা। একটা ফোনে আঙুলের এক মুহূর্তের ছোঁয়ায়। তবে ওই স্পর্শ সেটার অভাব তো থাকবেই।
তবু এক প্রজন্মের মহামারীর থেকে আরেক প্রজন্মের মহামারীর দীর্ঘ পথে কাজল গোপীচরণ অখিল জীবনের নাট্যমঞ্চে এসেছে অনেক। তবে আজকের দৃশ্যপট তেমন শোচনীয় নয়।
কাজল আজ তার মায়ের সাথে wtsapp ভিডিও তে বাড়ি আসার নানান পরিকল্পনা করে। মা দেখে মেয়ের বিদেশের ঘর আর মেয়ে দেখে তার বেড়ে ওঠা চেনা সেই শোয়ার ঘরে চেনা বিছানার চেনা চাদর পেতে মা বসে কথা বলছে। একে অপরকে কেশ কালারের রং চুলে কেমন ধরেছে সেটা দেখাতে পারে। মা স্ক্রিনে দেখে বলে – ‘আবার বুড়ো আঙুলের নখ চিবিয়েছিস ? দেখি পিছন ঘোর চুল কতটা লম্বা হলো ? অথবা নাতনির স্কুল থেকে সাইকেল চালিয়ে ফেরা সেটাও দেখে। ঘরে গুছানো বাক্স মা কে দেখিয়ে বলে – ‘এই যে সব গোছানো হলো , রবিবার রাতের ডিনার বানিয়ে রেখো মা’।অথবা মা ব্লাড সুগারের কথা বললে মেয়ে ফোন স্ক্রিনে দেখিয়ে বলে -‘ ঠিক আছে তাহলে আর এই চকলেট গুলো আনবো না তোমার জন্যে ‘. মা হেসে বলে- ‘ আরে নানা নিয়ে আয় , সুগার একদমই নেই আর আমি তো অল্প অল্প ভেঙে খাবো।
দৃশ্যপট কত টা অন্যরকম তাই না ? ছোটবেলায় একটা রচনা ছিল বিজ্ঞান দান নাকি অভিশাপ ? আসলে বিজ্ঞান প্রযুক্তি আর মানুষের জীবন সব কিছু মুদ্রার দুই পিঠ। বিদেশে পাড়ি জমানো সেই সব কাজলের জীবনে এই মহামারীর সময় প্রযুক্তি সত্যি আশীর্বাদ ছিল।