T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় দীপঙ্কর দে

আমার ছোটবেলার সাথী ঘুড়ি
শরতের সাদা নীল আকাশে উড়ে যাচ্ছে পেঁজা তুলোর মত মেঘ আর তাকে সুন্দর আলপনা এঁকে দিয়ে যাচ্ছে না রঙ-বেরঙের ঘুড়ি তা ভাবা যায় না। এখন বৃদ্ধ বয়সে শহরের বড় বড় অট্টালিকার ফাঁক দিয়ে যখন ঘুড়ি উড়ছে দেখি কোনো ছাদ থেকে ছোট বড় ছেলের দল মিলে ,তখন মনে পড়ে যায় সেই গ্রাম- আধা শহরে সেই ছোটবেলার ঘুড়ির উড়ানোর আনন্দঘন সোনালী দিনগুলোর কথা। তাই নিয়ে আজ আমার লেখা।
এই ঘুড়ির ইতিহাস কবে কোথায় তা সঠিক উত্তর নেই।তবে কবে আবিষ্কার হয়েছে সেই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও আনুমানিক ২৮০০ বছর পূর্বে চীনে ঘুড়ির ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। সে সময়কার ঘুড়ি ছিল সিল্কের কাপড়ের তৈরি। তবে তারও আগে ইন্দোনেশিয়া-তে পাতার তৈরি ঘুড়ির প্রচলন ছিল বলে ধারনা করা হয়। ইন্দোনেশিয়ার গুহাচিত্রে ঘুড়ির ছবি দেখতে পাওয়া যায়। কাগজের তৈরি ঘুড়ি প্রথম আকাশে উড়ে ৬ষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমে চীনে। তখন চীনারা সামরিক কাজে ব্যবহার করে,তারপর ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নেয়। ১৭শ-১৮শ শতাব্দীতে এই ঘুড়ির ব্যবহার বিজ্ঞানীরা আবহাওয়া সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে wireless- যোগাযোগের জন্য ঘুড়ির সাথে এন্টেনা যুক্ত করে দিতো।যুদ্ধে সংকেত পেরন ও অন্যান্য যুদ্ধের সরঞ্জাম বেঁধে শত্রুকে খতম/পরাজিত করা হতো ঘুড়ির ।সাহায্যে ।এখন বিনোদনই ঘুড়ি উড়ানো মূখ্য কাজ।
ইউরোপের লোকেরা ঘুড়ির গল্প প্রথম শোনা যায় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত অভিযাত্রী Marko Polo-র কাছ থেকে। আর ইউরোপে ঘুড়ি প্রথম নিয়ে আসে জাপানী আর মালয়েশিয় নাবিকেরা ১৬’শ থেকে ১৭’শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। এই ঘুড়ির সাহায্যেই ১৭৫০ সালে Benjamin Franklin তার সেই বিখ্যাত পরীক্ষা চালান যেটির মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে আকাশের বিদ্যুৎ চমক হচ্ছে ইলেক্ট্রিসিটির প্রবাহ।
আজকের পৃথিবীতে প্রায় সব দেশেই ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন রয়েছে। তবে দেশে দেশে ঘুড়ির মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কারণ নানা দেশের মানুষ ঘুড়ির মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছে নিজেদের সংস্কৃতি, মিথ এমনকি ধর্মও। চীন, জাপান ও তাইওয়ানে তো ঘুড়ি উড়ানো রীতিমতো জাতীয় উৎসব। এখনো চিনা ও জাপানীরা ড্রাগনসহ নানা জীবজন্তূর মুখের আদলে রঙ-বেরঙের ঘুড়ি উড়ায়। বাংলাদেশে এখনো হাকরাইন নামে ঘুড়ি উড়ানো উৎসব জনপ্রিয়। এদেশের ঘুড়ির নাম অনেক যেমন:মদনা,আউক্কা,পতেঙ্গা, সাপা ইত্যদি।
ভারতবর্ষে ঘুড়ির আগমন কখন সেটি সঠিকভাবে কেউ বলতে না পারলেও এই অঞ্চলে ঘুড়ি উড়ানো একটি অবসরমূলক বিনোদন এবং ঘুড়ি উড়ানো নিয়ে এখানে অনেক উৎসব হয়। বাংলাদেশে, পৌষ মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তিতে ঘুড়ি ওড়ানো উৎসব পালন করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বকর্মা পূজার দিন ঘুড়ি ওড়ানোর প্রথা রয়েছে। আমাদের ত্রিপুরায় ঘুড়ি উড়ানো উৎসব এমন হয় না-তবে বিশ্বকর্মা পূজার দিন বেশি ঘুড়ি উড়ে আর মকর সংক্রান্তির পর থেকে চৈত্রের বৈশাখ পর্যন্ত আকাশে ঘুড়ির উড়ানোর চল আছে।এছাড়াও ভারতে প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে।
আমার সেই ছোটবেলার ঘুড়ির কথা আজও মনে পড়ে। তখন সকালে প্রাইমারি স্কুলে যেতাম ক্লাশের জানালা দিয়ে ঘুড়ি উড়ানো দেখতাম-মন আকুল করে তুলতো কখন স্কুল ছুটি হবে বাড়িতে গিয়ে ঘুড়ি উড়াবো। ছুটির পর বাড়িতে স্কুলের ড্রেস ছেড়ে একটু ভাত খেয়েই বসে পড়তাম ঘুড়ি বানানোর কাজে। রঙিন কাগজ এক আনা, কোথায় পাবো পয়সা? যাত্রাগানের বিজ্ঞাপনের পাতলা কাগজ দিয়ে ,দুটি বাঁশের কাঠি (একটা বাঁকানো যাবে,একটা সোজা তৈরী হতো ব্লেড দিয়ে কেটে সাইজ করতে হতো। কতবার আঙ্গুল কেটে রক্ত ঝড়ছে!),আঠা হলো -বেল/সজনের আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো।আবার পাতলা কাগজ ছোট বলে ঘুড়ি ঠিক উড়বে না বলে, ঘুড়ির নিচে খাতার কাগজ দিয়ে আঠা লাগিয়ে লম্বা লেজ লাগানো হতো।আর এক আনা হলে রঙিন কাগজ দোকান থেকে এনে দুটি বড় ঘুড়ি বানানো হতো।ভালো উড়তো না বাজারের(এক বাড়িতে তৈরি করতো,বিক্রি করতো।ঐখানে থেকে কিনতাম)এক আনার ঘুড়ির মতো।আর নাটাই ও সুতো। নাটাই হতো পন্ডসের (pond’s powder) লম্বা কৌটো আর সুতো ২পয়সার এক ঘুঁটি(নরম ছিল), এক আনা হলে রেল সুতা ।এটা হলো টিকসই সুতা।এই নিয়ে ছোটবেলার আমার ঘুড়ির আনন্দের মাঠ। মাঞ্চার কথা বলতে হবে। কাঁচের গুড়া,ভাতের ফেন ও সাগু দিয়ে তৈরি হতো। মাঠে রোদ্রতে বসে ২/৩ জন মিলে কাজ সমাপন হতো।সুতো ধার হতো প্রতিপক্ষের সঙ্গে ঘুড়ির কাটাকাটিতে জয়ী হওয়া/না হলে এক মিনিটেই অন্য পক্ষ আমার ঘুড়িকে কেটে দিবে।
তারপর দুপুরের স্কুল হলে, বিকেলে নাটাই ঘুড়ি নিয়ে মাঠে যাওয়া। ঘুড়ি উড়ানো একা হয় না, তাই দূর থেকে একজন ঘুড়িকে উপরে দিকে থাক্কা দিয়ে ছাড়তে হতো। আর ঘুড়ি কারোর কাটা(সইল/বোকাট্টা- গ্রাম্য/শহরে চলতি ভাষা) যাবে অপেক্ষা থাকতাম। এরপর ছূট, ঘুড়ি ধরার জন্য- খাল বিল পার হয়ে গাছে চড়ে ধরা এটা কঠিন ও বিপজ্জনক কাজ ছিল কিন্তু সেই বয়সে বুজতাম না। কৈশোরের সেই সকাল সন্ধ্যা এভাবেই ঘুড়ির পেছনে কাটাতাম। সন্ধ্যার আগেই বাড়িতে ফিরে হাড়িকেনের নিচে চট পেতে ৩ ভাইবোন পড়তে বসা। ঘুড়ির জন্য কত বকা খেয়েছি মায়ের কাছে।
ঘুড়ি হলো বিনোদনের খেলা , উপভোগ করে শুধু ধনীরা,তা মানতে পারছি না।কারন আমার গ্রামে দেখতাম গরীব ঘরের ছেলেরা বা স্কুলে ঠিক যায় না/স্কুলছুট ওরা ৮/১০ রেল সুতা দামী মাঞ্জা দেওয়া নাটাইয়ে থাকতো আর সঙ্গে ২/৩টি ঘুড়ি হাতে রাখতো[ওরা অনেকটা শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তের চরিত্রের মত,] আর অনেক দূর পর্যন্ত সুতা ছাড়তো নাটাই থেকে(অনেক সময় খালি চোখে দেখা যেতো না)আর একের পর এক ঘুড়ি কেটে দিতো।ওদের সঙ্গে সন্ধ্যা পর্যন্ত থেকে ঘুড়ি উড়ানো দেখতাম। ঘুড়ি উড়ানো শুধু বিনোদন নয় নেশা ও বটে।
ঘুড়ি কিভাবে উড়ে তার বৈজ্ঞানিক কি ব্যাখা আছে আলোচনা করবো।
যখন ঘুড়ি উড়ে তার নাটাইয়ের সাথে যে সুতাটি ঘুড়ির দুটি কাঠিতে বাধা হয় এমনভাবে যাতে ঘুড়ি ভূমির দিকে ৪৫°কোনে নত থাকে।
যখন বাতাস বইবে ঘুড়ির দিকে তখন ঘুড়ির পাখা দুটিতে নীচদিক থেকে ধাক্কা দিবে।
ঘুড়ি কিভাবে উড়ে তার বৈজ্ঞানিক কি ব্যাখা আছে আলোচনা করবো।
যখন ঘুড়ি উড়ে তার নাটাইয়ের সাথে যে সুতাটি ঘুড়ির দুটি কাঠিতে বাধা হয় এমনভাবে যাতে ঘুড়ি ভূমির দিকে ৪৫°কোনে নত থাকে।
যখন বাতাস বইবে ঘুড়ির দিকে তখন ঘুড়ির পাখা দুটিতে নীচদিক থেকে ধাক্কা দিবে। তারজন্য ঘুড়ি ৪৫° কোনে উপরের দিকে উত্তলন ঘটবে।তাতে ঘুড়ির ওজনের অভিকর্ষজ আকর্ষন ও বাতাসের বিপরীত মুখী ঘর্ষন কেটে যাবে আর সমতা রক্ষা করবে নাটাইয়ের সুতার টান। আর ঘুড়িকে ডানে/ বামে/নিচের দিকে নিবে / চক্কর কাটাবে নিচ থেকে সুতার টানের খেলায়।
ঘুড়ি দিয়ে অন্য ঘুড়িকে কেটে দেওয়া এখানেও বিজ্ঞান আছে। ছোটবেলায় বুজতাম না কেন এমন করে ?যখন দুটি ঘুড়ি যুদ্ধ লাগে।এখন বিজ্ঞান ধারনায় বুজতে পেড়েছি কারন।
দেখা যআয় তখন এক ঘুড়ি অন্যকে কাটতে যায় হয় খুব বেশি করে সুতা ছাড়ে নতুবা নিজের দিকে দ্রুত টানতে থাকে। তাতে অন্যপক্ষের ঘর্ষন সুতার উপর এক জায়গায় খুব বেশি পড়ে,তাতে সুতা ও পক্ষের ছিঁড়ে/কেটে যায়। এরোপ্লেন উড়ার ও প্রাথমিক ফর্মূলা এর উপর ভিত্তি করেই হয়েছে।এখানে গতিবিদ্যা ও অভিকর্ষজ আকর্ষন দ্বারাই ঘুড়ি উড়ে।
ঘুড়ি তুমি নতুন রঙ্গিন সাজে স্বপ্নএর ফানুস উড়িয়ে বারবার পৃথিবীর নতুন প্রজন্মকে নির্মল আনন্দ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবে চিরকাল।