সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে দীপান্বিতা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১১)

ঢেপ্সির প্রেমকাহিনী

একাদশ ভাগ

বাড়িতে থমথমে পরিবেশ। বাবা বারবার একটা কথাই বলে চলেছে “বৌদিদের জীবনে অভিশাপ নেমে এসেছে। কারোর নিস্তার নেই।” আমি বাবাকে বললাম তোমাকে অপমান করায় আমরা বেরিয়ে চলে এসেছি। আজকের পর থেকে ওদের সঙ্গে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক নেই। ওদের কোনো ব্যাপারে যেন আমাদের বাড়িতে আর উচ্চারিত না হয়। যদি এর অন্যথা হয় আমি বাড়িতে কিন্তু দক্ষযজ্ঞ ঘটিয়ে দেব। মা ধমকের সুরে বলল “চুপ কর সব বিষয়ে মাথা ঘামাস না। ওরা ভুল করতেই পারে কিন্তু আমরা চিরকাল ওদের ভালো চেয়েছি আমরা কি করে ওদের থেকে সরে থাকি বল!? অজয়ের এবং অজয়ের পরিবারের যা ব্যবহার দেখলাম ওরা বৌদিদের ফ্যামিলিটা পুরো শেষ করে দেবে। একবারে চুষে খেয়ে নিতে এসেছে। বৌদি আজ স্বামীহারা অসহায় নারী। ওনার পাশে আমরা দাঁড়াবো না বল!? ঢেপ্সীও তো তোর বান্ধবী। সে যতই ঝগড়া করুক আমার কাছে তোরা দুজনেই সমান। আমি তোকে আর ঢেপ্সীকে কোনদিন আলাদা করে দেখিনি। কিন্তু আমি গোঁ ধরে বসে থাকলাম, কোন কথা শুনতে নারাজ। স্পষ্ট বলে দিলাম “আমার সামনে অজয় তোমাদের অপমান করেছে আর ওই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। তাই আমি কোনোভাবেই ওই পরিবারের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবো না। যদি অজয় কোনদিন ওই পরিবার থেকে পৃথক হয় সেই দিনই ওই পরিবারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ তৈরি হবে তার আগে নয়। তোমরা চাইলে যোগাযোগ রাখতে পারো কিন্তু আমি রাখবো না।”
বিকালে অনিরুদ্ধর সঙ্গে দেখা করলাম। আমার মুড অফ ছিল শুনে ডার্ক চকোলেট নিয়ে এসেছিল। বুঝতে পারছিলাম ধীরে ধীরে ছেলেটার সাথে জড়িয়ে যাচ্ছি‌। ওকে জড়িয়ে ধরে হঠাৎ করে কেঁদে উঠলাম কাঁদতে কাঁদতে বললাম “তুমি আমাকে ছেড়ে কখনো চলে যাবে না তো? আমি তোমাকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি থাকবে আমার কাছে?” অনি আমাকে প্রচন্ড শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল “অবশ্যই তোমার কাছে থাকবো কিন্তু আজ তোমার কাছে কতগুলো কথা আমি স্বীকার করছি যেগুলোর না বললে হয়তো বিশেষ ক্ষতি হবেনা কিন্তু আমি অপরাধবোধে ভুগবো‌ কথাগুলো তোমার জানা দরকার।” আমি বুকে মাথা ঘষতে ঘষতে বললাম “বল কি কথা? তোমার সব কথা শুনতে আমি রাজি আছি। কিন্তু আমি এটুকু বিশ্বাস করি যে তুমি আমাকে ভালোবাসো। তুমি আমাকে ছেড়ে কখনো যাবে না। তুমি আমার অন্তত এই বিশ্বাসকে মিথ্যা করে দিও না।” অনি মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল “না আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাবো না। সারা জীবন তোমার পাশেই থাকবো তোমার সাথেই থাকবো। কোনো মুহূর্তে বা কোনো পরিস্থিতিতেই আমি তোমাকে আমার থেকে দূরে যেতে দেবো না। আমি তোমাকে ভালোবাসি খুব ভালোবাসি। আমার প্রতি ভরসা রেখো, বিশ্বাস করো তোমার কখনো ক্ষতি করবো না। নিজের জীবন দিয়ে তোমাকে আগলে রাখবো আমার কাছে।”
তারপর অনি বলল “বেশ আমার কথাগুলো আগে শোনো।” আমি বললাম “ঠিক আছে বলো।” অনি যা বললো তার অর্থ এই আমার সঙ্গে ওর যোগাযোগ টা সম্পূর্ণটাই ছিল প্রিপ্ল্যান। অজয় ভীষণ নোংরা মাইন্ডের ছেলে। অজয় ঢেপ্সীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে তার একটাই কারণ ঢেপ্সীর বাবার সম্পত্তি এবং ব্যবসা। অজয়ের প্রাইম টার্গেট আমি এবং ও আমাকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফ্যান্টাসি তৈরি করেছে নিজের মধ্যে। যেনতেন প্রকারে ও আমার কাছাকাছি আসতে চায়। একদিন বিকেলে অনিরুদ্ধ আর অজয় একসাথে জিম করছিল সেই সময় হঠাৎ বৃষ্টি আসে ফলত ওরা আটকে যায় এবং ওদের সাথে আরও স সময় যারা জিমে ছিল সকলেই আটকে যায়। ওদের ওদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প হচ্ছিল। একথা সেকথায় অজয় ওর প্ল্যানটার কথা অনিরুদ্ধ ও সোমনাথকে বলে। এবং আমার একটা ছবি ওদেরকে দেখায় যে ছবিটা অজয় কাছে সেভ আছে। অনিরুদ্ধ বারবার করে অজয় কে বারণ করে যে তুই যা করছিস ভুল করছিস তুই কিন্তু এই কাজ করিস না। অজয় শুনতে নারাজ এবং ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অজয় অনিরুদ্ধর মধ্যে একটা ঝামেলা শুরু হয়ে যায়। অনিরুদ্ধ এক পর্যায়ে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করে যে তুই কখনোই ঢেপ্সীর বান্ধবীকে তোর জীবনে আনতে পারবি না। ওর কোনো ক্ষতি করতে পারবি না। আমি বেঁচে থাকতে তুই ঢেপ্সীর বান্ধবীর ত্রিসীমানায় যাওয়ার চেষ্টা করিস না।
কথাগুলো শুনে আমি জাস্ট আকাশ থেকে ভেঙ্গে পড়লাম। অজয় এতটা বাজে ছেলে!? অনিরুদ্ধ আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে বলল “তোমার কোন ভয় নেই। আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। তোমাকে বাঁচাতে এসেছিলাম কিন্তু তোমাকে ভালোবেসে ফেলবো বুঝতে পারেনি। আমি যতদিন তোমার সাথে আছি অজয় তোমার কিছু ক্ষতি করতে পারবেনা। তবে অজয় যে তোমার পরিবারের সঙ্গে কিছু একটা দুর্ব্যবহার করবে তা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। তোমাকে আমি বলার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু বলতে পারিনি শেষ পর্যন্ত। তুমি সাবধানে থেকো ঢেপ্সীর বাড়িত যতটা পারবে কম যাতায়াত করো। অজয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখো না।” আমি ঝাঁঝের সুরেই বললাম “অজয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই। আর ঢেপ্সীর বাড়িতে আমি আর কোনদিন যাব না। বাড়িতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি কিন্তু আমার তো এখন নিজেকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে ও মেয়েটা বড্ড সরল। ওর জীবনে যে কি দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে তা তো বোঝাই যাচ্ছে। অনিরুদ্ধ বলল কেউ যদি নিজের ভালো না বোঝে তাহলে তাকে কি বোঝানো যায়? কেউ যদি জেগে ঘুমায় তাহলে আর কিছু বলার থাকে না। ও তো সবই বুঝতে পারে। ওর সঙ্গে তো কম দুর্ব্যবহার করে না? ওকে অকথ্য ভাষায় অপমান করে তার পরেও যে মেয়েটা কেন ওর কাছে পড়ে আছে ভগবান জানে। এটাই কি ভালোবাসা? আচ্ছা ভালোবাসা কি? যে ভালোবাসা প্রতিনিয়ত মানুষকে অপমান করে প্রতিদিন মানুষকে কাঁদায়, ক্ষত-বিক্ষত করে সেটাই বুঝি ভালোবাসা? এমন ভালোবাসা আমি কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনা।”
বাড়ি ফিরে এলাম কিন্তু মনের মধ্যে খটকা লাগতে শুরু করলো আমার। অনিরুদ্ধ আমাকে হঠাৎ করে বাঁচানোর জন্য এত উঠে-পড়ে লাগল কেন? ও তো আমাকে আগে থেকে চিনতো না। সেইদিনই প্রথম আমার ছবি দেখেছিল। আমাকে সম্পুর্ন ভালোভাবে জানেওনা চেনেও না তারপরেও সম্পূর্ণ একজন অপরিচিতকে বাঁচানোর জন্য কেউ এভাবে ঝাঁপাতে পারে? প্রশ্ন গুলো আমাকে বড্ড ভাবিয়ে তুলছিলো মনে মনে। ঠিক করলাম অনিরুদ্ধর ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে হবে। অঙ্কিতা, রূপক ও দেবিকাকে কনফারেন্স কল করলাম। ওদের পুরো বিষয়টা খুলে বললাম। অঙ্কিতা ও রূপক আশ্বস্ত খোঁজখবর নিয়ে আমাকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ঠিক জানাবে। চারদিন পর অঙ্কিতা জানালো “ছেলেটার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানলাম ছেলেটা যথেষ্ট ভালো ছেলে, জেনুইন। জীবনে পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখে কোনো নেশা ভাং করে না। মাঝে মাঝে একটু আধটু সিগারেট চলে। ইদানিং একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছে আর সেই মেয়েটা তুই। ছেলেটার পাস্ট হিস্টরি এমন কিছু খারাপ নয় যেটা শুনলে বা জানলে তোর সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যেতে সমস্যা হবে। তুই এগিয়ে যেতেই পারিস বাকিটুকু তোর ইচ্ছা।” আমি বললাম ” হুম।সবই তো বুঝলাম কিন্তু তুই এই সমস্ত খবর কিভাবে জানলি সেটুকু আমাকে তো বল?” অঙ্কিতা বলল “অনিরুদ্ধর বাড়ির কাছাকাছি আমার বয়ফ্রেন্ডের মাসির বাড়ি। ওর মাসির ছেলের থেকে খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছি। যদি রিলেশনশিপ শুরু করিস তাহলে একদিন আমাদের ট্রিট দিয়ে দিস।” ঠিক আছে পরে দেখা যাবে বলে আমি ফোন রেখে দিলাম।
চার পাঁচ দিন পর একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমি আর মা গল্প করছি হঠাৎ দরজায় টোকা পড়লো। দরজা খুলে অবাক। কাকিমা ও ঢেপ্পী এসেছে‌। মা ওদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলে আমি দোতলায় আমার ঘরে চলে এলাম। মোবাইলে গান শুনছিলাম বিভোর হয়ে । হঠাৎ ঘরের লাইটটা জ্বলে উঠলো। আমি ভয়ে চমকে গেছি, তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম। দেখি ঢেপ্সী ঘরে দাঁড়িয়ে। আমার পাশে বসে হাতদুটো চেপে ধরে কেঁদে উঠলো। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। আমি এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। আমার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে বুঝতে পারছি। ওকে চুপ করালাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম “বল কী হয়েছে কাঁদছিস কেন?” ঢেপ্সী বললো ” আমি ভুল করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দে। কিন্তু প্লীজ তুই আমাকে ছেড়ে যাস না। তোর থেকে ভালো বন্ধু আর কোথাও পাবো না।” আমি হাসতে হাসতে বললাম” যাক শেষ পর্যন্ত ভুল বুঝতে পেরেছিস এটাই অনেক। তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়তো শেষ হবে না কিন্তু একটা কথা জানিস তো ভাঙা কাঁচ জোরা লাগলেও দাগটা থেকে যায়।” বেশ তোর আমার বন্ধুত্ব র‌ইবে কিন্তু একটা শর্তে। ঢেপ্সী মাথা নিচু করে বললো ” তোর সমস্ত শর্ত মানতে রাজি। তুই শুধু সাথে থাকে।” আমি বললাম “আচ্ছা ঠিক আছে থাকবো কিন্তু তোর আমার যোগাযোগ আছে এটা অজয় যেন কোনোভাবেই না জানতে পারে।” ঢেপ্সী আশ্বস্ত করলো অজয় জানবে না।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।