সে ছিল এক শীতের বিকেল তারিখটা ছিলো চব্বিশ ডিসেম্বর. দিনটা স্মৃতিপটে ধ্রুবতারার মতন উজ্জ্বল, কেন তাহলে বলি, আমি তখন মাস্টার্সে পড়ি, প্রতি বছর পুজোর ছুটিতে একটু দূর, আর শীতের ছুটিতে মোটামুটি কাছে বেড়াতে যাওয়া হয় সেবার ঠিক হল সুন্দরবন যাব বহুবার যাওয়া সত্ত্বেও শীতকালে সুন্দরবন যাওয়ার আনন্দ আমাদের কাছে আলাদা রকম ছিল, কারণ বাবা বনবিভাগে চাকরি সূত্রে পশ্চিমবাংলার সুন্দরবনের বিভিন্ন রেঞ্জে কাটিয়েছেন শীতকালে বন বিভাগ আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী বার্ষিক সম্মেলন হত বিয়েবাড়ির কায়দায় সাত দিনব্যাপী ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ ডিনার এবং বিভিন্ন রকম সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন হতো, এবং বনবিভাগ পরিবারের সবাই একত্রিত হতো, উপরি পাওনা ছিল সুন্দরবন ভ্রমণ.
সুন্দরবনের বনবিভাগ নির্মিত প্রতিটি রেঞ্জ অফিসে একটি বা দুটি কংক্রিটের তৈরি ঘর যেখানে অফিস ও অফিসারদের বাসগৃহ স্থাপিত আর বাকি অংশে বেশকিছু নানান আকৃতির অপূর্ব সব কাঠের বাংলো ছড়ানো ছিটানো আছে, সোলার এনার্জি ব্যবহার করে সারারাত আলো জ্বালানো হয় সেখানে. নদীবেষ্টিত এই অফিস বরাবর নদীর পাড় ধরে জনবসতি গড়ে উঠেছে আর ঠিক তার অপর পাড়ে আছে ঘন নিবিড় অরণ্য, সন্ধ্যা হলে নদীতে দীপাবলী আলোর মতো আলো আসে সারি সারি নৌকা থেকে, সন্ধ্যার পর আলো-আঁধারি মিলিয়ে এক অদ্ভুত গা- ছমছমে পরিবেশ তৈরি হয়I
এই মায়াবী পরিবেশে ভূতের ভয় নয়, বাঘের ভয়টাই বেশি হয়. সন্ধ্যার পর যদিও খুব বেশি লোকালয়ে আসেনা রয়েল বেঙ্গল টাইগার তবুও সন্ধ্যার পর এত নিস্তব্ধতা বিরাজ করে, যে ভয় আসতে বাধ্য. একবার, তখন বাবা সজনেখালি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে ছিলেন চারপাশে জঙ্গলবেষ্টিত টুরিস্ট বাংলোতে থেকে ছিলাম সারা রাত, ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছি কিন্তু সকালে উঠে দেখেছি সাদা রাজহাঁসরা বাংলোর তলা দিয়ে ডাকতে ডাকতে যাচ্ছে আর, বিকালে অসংখ্য হরিণ ছোলা খেতে আসতো. না, তবে জঙ্গলের মধ্যে আমি কোনদিন বাঘ দেখিনি.
অবশ্য তার জন্য আমার কোন দুঃখ নেই কারন বরাবরের ভীতু আমি- কুমির জঙ্গল পাখি ডলফিন দেখেই দারুণ খুশি তাই জঙ্গলের প্রতি একটা আলাদা টান ছোট থেকেই ছিল, তবে সেবার, অর্থাৎ শুরুতে যে কথা বলছিলাম সে ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতার দিন, বাবা তখন বাগনা অফিসে ছিলেন দুপুর বারোটার দিকে আমরা খাওয়া-দাওয়া করে ঝিঙেখালি অভিমুখে রওনা দিলাম সেখানে পৌঁছনোর পথে প্রচন্ড ঢেউ পেলাম, ওখানে দেখলাম জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশের জন্য বেশ কিছুটা দূর পর্যন্ত রাস্তা করেছে পর্যটকদের জন্য তবে নন্দনকানন এর মধ্যে যেমন সিংহরা রাস্তার পাশে শুয়ে থাকে বাঘমামা কিন্তু তেমনটি ননl সুন্দরবনের মানুষ দক্ষিণরায় বলে তাকে সম্বোধন করে ও পূজা করে কারণ জঙ্গলের উপরেই তো তাদের জীবিকা নির্ভরশীল তাই যাতে দক্ষিণরায়ের দেখা না পেতে হয় তাই তারা বনবিবি ও দক্ষিণরায়কে একত্রে পূজা করে সেখান থেকে ফেরার পথে একটা কোর এরিয়ার মধ্যে একটা ঢুকে যেতে দেখে বাবা বোনকে ওইদিকে ঘোরাতে বলল কারণ কোর এরিয়ায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ.
ওই কোর এরিয়া গুলো খুব সরু খাঁড়ি অঞ্চল হয় নদী খুব সরু হয় বলে দুই পাশে জঙ্গল খুব কাছাকাছি হয় বাঘের উপদ্রব বেশি হওয়ার কারণে এবং অ্যাক্সিডেন্টপ্রবণ অঞ্চল হওয়ার কারণেই কোর এরিয়া ঘোষণা করা হয় আমাদের বোটম্যান খাঁড়ির মধ্যে প্রবেশ করলো. খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় জোসেফ কনরাড এর জঙ্গল বর্ণনার কথা মনে পড়ছিল দুর্ভেদ্য হেতাল ও গরান আরো নাম না জানা গাছের জঙ্গল যেন আকাশের নিচে ছাতা হয়ে বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করছে. নিস্তব্ধ নিঝুম ঘেরা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আমরা ততোধিক নির্জন পাঁচজন মানুষ শুধু জঙ্গল দেখছিলাম নদী এতটাই সংকীর্ণ যে নদীর দিকে ঝুলে পড়া গাছের ডাল বোটের ছাউনিতে ধাক্কা মারছিলই
কিছু গাছের মাথা থেকে অজস্র লাল ফুল, কিছু গাছের মাথা থেকে অদ্ভুত ফ্যাকাশে সবুজ ছত্রাক নেমে এসেছে অনেকদূর অগ্রসর হচ্ছিলেন তৎপর ছিল চোখে একটা রক্তাক্ত জামা টাঙানো দেখে বুকের মধ্যে এমন মোচড় দিয়ে উঠলো যে জঙ্গলের কাছাকাছি থাকা মানুষদের আরাধ্য দেবী বনবিবির স্মরণ নিলাম কারণ অঞ্চলটিতে বাঘের আনাগোনা বেশী বোঝানোর জন্য জামাটি টাঙ্গানো ছিল রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিশ্বের অন্যতম হিংস্র জন্তু জঙ্গলের রাজা তার নিয়ম অনুযায়ী সে যাকে শিকার হিসেবে টার্গেট করে তাকে আক্রমণ করে, শিকার ফসকে গেলে অন্য শিকার যদি পাশে থাকে তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না, একেবারে নিঃশব্দে হেঁটে যায় আওয়াজ হলে নিজের পায়ে নিজেই কামড় দেয় জঙ্গলে শিকার করতে যাওয়া মানুষদের কাছে শোনা যায় শিকারের খোঁজে জঙ্গলে প্রবেশ করা অনেক দক্ষ শিকারি দিকভ্রষ্ট হয়ে বাড়ি ফিরতে পারে না বাঘেদের নাকি চক্রব্যূহ আছে যার মধ্যে একবার প্রবেশ করলে আর বের হওয়া যায় না
পড়ন্ত বিকেলের রোদ তির্যক হতে শুরু করেছিল পরিবেশটা কেমন দম বন্ধ করা মনে হচ্ছিল এমন সময় বোট ম্যানেজারের চিৎকার : “বাবু ওই দেখুন ডলফিন মরে পড়ে আছে” বাবা বললো “চলো দুজনে মিলে ওটা তুলে আনি” আমরা জঙ্গলের কাছে যেতে বারণ করা সত্ত্বেও বাবা তুলে আনল আমি উঠতে দেখে বাবা বলল তুই এত ভয় পাস? আমাদের টিম কুড়ি ফিট উঁচু নারকেল গাছ থেকে বাঘিনী করে নামিয়েছে বললাম ঠিক আছে বাবা এবার ফিরে চলো আমার ভালো লাগছে না বললাম আর বোটটা হঠাৎ থেমে গেল কিছুতেই চলছে না সেই অবস্থায় নোঙ্গর ফেলা হল ঐ গহীন অরণ্যের পাড়ে, ফরেস্ট রেঞ্জ টির নাম চামটা সেদিন যে কিভাবে জ্ঞান হারাইনি আজও বুঝি না তখন সন্ধ্যে নেমে এসেছে হঠাৎ কুয়াশায় চতুর্দিক ঢেকে গেছে এমন সময় আবার বোট চালু করা গেল আবার নতুন সংকটের মুখোমুখি হলাম শীতকালে সন্ধ্যেবেলা জঙ্গলের রাস্তা চেনা যায়না ওইখানে থেকে বেরিয়ে কোনদিকে যাবে রাস্তা খুঁজে পাচ্ছেনা বাবা হরি কে বলল বোট তীর বরাবর এগিয়ে নিয়ে যেতে আর আমাদের বলল ভয় পাস না এই প্রচণ্ড গর্জনে এখানকার বাঘরা কানা হয়, মানুষের চোখে দেখে আক্রমণ করে এখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে তাই চোখে দেখতে তাদের অসুবিধা হবে একদিকে উত্তাল ঢেউ অপরদিকে জঙ্গলে পথ হারানো সেই দিনই শেষ দিন ভেবে বসে আছি, এমন সময় দূরে একটি আলোর শিখা ঢেউয়ের মাথায় মাথায় দেখলাম উঠতে-নামতে এগিয়ে চলেছে, সেই আলো অনুসরণ করে এগোতে দেখা গেল বনবিভাগের একটি বোট ঢেউয়ের তালে এগিয়ে চলেছে আর একটু এগুতে এক কাকুর সাথে দেখা আমরা উঠলাম আর বাবা চলে গেল সজনেখালি তাকে সঙ্গে নিয়ে ডলফিনটা রাখবে বলেই পরদিন সকালে সজনেখালিতে গেলাম ও সবাইকে আমাদের অভিজ্ঞতার কথা বললাম