T3 || লক্ষ্মী পুজো || সংখ্যায় অনিন্দিতা সেন

পুরাতনী বাংলায় কোজাগরীর উত্থান

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে নারায়ণ নারদমুনি কে লক্ষীর সৃষ্টির রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে,
সৃষ্টির পূর্বে রাসমন্ডলস্থিত শ্রীকৃষ্ণের বামদিক থেকে লক্ষীদেবীর আবির্ভাব। গ্রীষ্ম কালে শীতল ও শীতে উষ্ণ অঙ্গধারিনী অতিশয় সুন্দরী এই নারী ছিলেন স্থির যৌবনা। কঠিন দুই স্তন, কটিদেশ ক্ষীণ ও গুরু নিতম্বের অধিকারিনী এই নারীর মুখমন্ডলের প্রভা কয়েক কোটি পূর্ণ চন্দ্রের থেকেও বেশি, চোখ দুটি যেন শরতের প্রস্ফুটিত পদ্মের মত।

শিশুকাব্যে রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-

‘লক্ষ্মী আমায় বল দেখি মা
লুকিয়ে ছিলি কোন সাগরে
সহসা আজ কাহার পূণ্যে
উদয় হলি মোদের ঘরে’

আসলে লক্ষীর উদ্ভব বৈদিক যুগে, তখন তার নাম ছিল শ্রী। বেদে তাঁর জন্ম বৃত্তান্ত না থাকলেও তিনি তখন থেকেই ঐশ্বর্য্যের দেবী। পুরান যুগে এসে তিনি পেলেন বাপ-মা ও স্বামী হিসেবে নারায়ণ কে, বাসস্থান স্বর্গের বৈকুন্ঠ লোকে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর উর্বশী কাব্যগন্থে লিখেছেন-

‘আদিম বসন্তপ্রান্তে উঠেছিলে সমুদ্র মন্থনে
ডান হাতে সুধাপাত্র বিষভান্ড লয়ে বাম করে’

বিষ্ণুপুরাণ ও ভাগবতে লক্ষীদেবীর সমুদ্র মন্থনে উঠে আসার উল্লেখ আছে।
একদিন ভ্রমনরত অবস্থায় দুর্বাসা মুনির সাক্ষাৎ হল অপূর্ব পুষ্পহার পরিহীতা এক অপ্সরার সাথে। স্বর্গীয় সেই কন্ঠহার অপ্সরার থেকে হস্তগত করে তিনি ইন্দ্র কে দান করলেন। ইন্দ্র পরিয়ে দিলেন ঐরাবতের গলায়। অবলা জীব সেটি দলে পিষ্ট করলে দূর্বাসা মুনির কোপে পড়লেন ইন্দ্র। মুনির অভিশাপে তিনি লক্ষীকে হারালেন। স্বর্গ লক্ষী ছাড়া হল। লক্ষীর ঐশ্বর্য্য ফিরে পাবার উদ্দেশ্যে শুরু হল দেবাসুরদের মিলিত সমুদ্রমন্থন। উঠে এলেন দেবী, যার জন্য তিনি সমুদোদ্ভবা। বিষ্ণু তাঁর বুকে ঠাঁই দিলেন এই ধনরত্নের দেবী লক্ষীকে।

এদিকে মর্ত্যে লক্ষীর প্রথম অবতার হলেন রাজা কুশধ্বজের কন্যা বেদবতী। একবার মা লক্ষীর আরাধনা বন্ধ করায় অর্থ, বৈভব, ধনসম্পদ সমস্ত হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন রাজা রথধ্বজ। তখন তাঁর দুই পুত্র কুশধ্বজ ও ধর্মধ্বজ লক্ষীর আরাধনায় বসে তপস্যায় লক্ষীকে সন্তুষ্ট করলে কুশধ্বজের স্ত্রী মালবতীর গর্ভে লক্ষীস্বরূপা কন্যা বেদবতীকে লাভ করেন।
ফিরে এল পুরনো ঐশ্বর্য্য। বেদবতী যৌবনবতী হলে দেব-নর-অসুর সবাই ছিলেন তাঁর পাণিপ্রার্থী। কিন্তু তিনি লক্ষীর অবতার, কাজেই নারায়ণ কে স্বামী হিসেবে পেতে শুরু করেন কঠিন তপস্যা। সেই অবস্থায় সদ্য যুবক রাবন পুষ্পক রথে চড়ে ভ্রমণকালে তাঁকে দেখে ফেলেন এবং প্রলোভিত করার চেষ্টা করেন। বেদবতীর সাড়া না পেয়ে তিনি তাঁকে হরণ করতে যেতেই বেদবতী তাঁকে ভয়ংকর এক অভিশাপ দিয়ে বসেন এবং নশ্বর দেহ ত্যাগ করেন। ফিরে আসেন আবার জনক রাজার দুহিতা সীতার রূপ ধরে। এই সীতাকে কেন্দ্র করে রাবন বধের ইতিহাস আমাদের প্রায় সকলেরই জানা।
যেহেতু মা-লক্ষীর অবতার ছিলেন বেদবতী, তাই কথিত আছে যে দেবীর অভিশাপেই রাবনরাজের অদৃষ্ট রচিত হয়েছিল রাম-রাবণের যুদ্ধের মাধ্যমে।
আবার পুরাণের আব্যন্ত খন্ডে আছে যে, লক্ষী ঋষি ভৃগু ও তাঁর পত্নী খ্যাতির কন্যা। এই লক্ষীই আবার নারায়ণের প্রেমে পড়লেন। তাঁকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য সাগরসীমায় গিয়ে শুরু হল তাঁর কঠিন তপস্যা। দেবতারা এই সুযোগে নারায়নের ছদ্মবেশে লক্ষীর সামনে উপস্থিত হয়ে বর চাইতে শুরু করলেন। লক্ষীও তেমনি চালাকি করে বিশ্বরূপ দেখতে চাইলে দেবতারা সঙ্গে সঙ্গে পিছু হটলেন। তখন নারায়ণ স্বয়ং এসে বিশ্বরূপ দেখিয়ে লক্ষীকে লাভ করেন। সেই থেকে নারায়ণ হলেন ‘মূল শ্রীপতি’ ও ব্রহ্মচর্য্য স্বরূপা লক্ষীদেবী হলেন ‘ব্রাহ্মী মুলশ্রী’।
দেবী ভাগবত পুরাণে লক্ষী সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, তিনি পতিব্রতাদের প্রধান, সকল জীবের জীবন, স্বর্গে স্বর্গলক্ষী, রাজগৃহে রাজলক্ষী, বণিকদের বানিজ্য লক্ষী ও সাধারণ মর্ত্যবাসীর ঘরে গৃহলক্ষী। আবার পাপীদের কলহ উৎপাদিনী। আমাদের বাংলার লক্ষীর ব্রতকথাগুলি পুরাণ কথাকে আশ্রয় না করলেও, সেই সব উপকথার সারবস্তুর সংগে এই সব পৌরানিক বর্ননার কি আশ্চর্য মিল!

তবে লক্ষী শুধু পৌরাণিক দেবী নন, অনার্যদের আদিদেবী। আর্য্য সংস্কৃতিতে লক্ষী হলেন সম্পদ- সৌন্দর্য্যের দেবী, আর অনার্যদের কাছে খিদের অন্নই হল লক্ষী। তাই তিনি কৃষিলক্ষী। মেয়েলি ব্রতের দেবী, ঘরের লক্ষী, ধান্যলক্ষী। ধান যার আছে সেই ধনবান। বহুব্রীহি মানেই ধনী। রাঢ় বাংলায় ফসল কাটার সময় এলেই লক্ষীর আরাধনা। চৈতি পৌষালি আর ভাদুরে ফসল উঠলেই চৈত্র, ভাদ্র ও পৌষ সংক্রান্তিতে লক্ষীর আরাধনা ঘরে ঘরে।
কালীপূজোর রাতে অনেক বাড়িতে লক্ষী প্রতিষ্ঠার আগে অলক্ষীর পুজো হয়। সবুজ, হলুদ, লাল রঙের তিনটি পুতুল প্রাগার্য্য লক্ষী পুজোর নিদর্শন হিসেবে পুজো করতে হয়। কিন্তু তার আগে একটি কিম্ভুত গোবরের পুতুলকে মেয়েদের মাথার ফেলা চুল, নুড়ি-পাথর ইত্যাদি দিয়ে মোমবাতির আলোয় বাঁহাতে পুজো করাটাই বিধেয়। কুলো বাজিয়ে তাকে বাড়ির বাইরে বিদেয় করে হাত-পা ধুয়ে লক্ষীপুজোয় বসাটাই রীতি।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে এটি হল অনার্য দের আদি শষ্যলক্ষী পুজো। এর প্রচলন পাই বাংলার ব্রতগ্রন্থে। সবুজ, হলুদ, লাল রঙের তিনটি পুতুল প্রাগার্য্য লক্ষী পুজোর নিদর্শন। সবুজ হল পাক ধরার প্রাক মুহূর্ত, হলুদ পাকা শষ্য এবং লাল ঝুনো শষ্যের প্রতীক। এই আদিম লক্ষীপূজা বাংলার বাইরেও প্রচলিত ছিল।

কোজাগরী লক্ষী পূজা হল ‘কে জাগে’ অর্থাৎ ধনহীন ধনের আশায় আর ধনবান না হারানোর আশায় জাগে!

‘নিশীথে বরদা লক্ষীঃ জাগরত্তি ভাষিনী
তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ’
কোজাগরীর দিনে যে জাগে, দ্যূতক্রীড়া অর্থাৎ পাশা-জুয়া ইত্যাদি খেলে রাত জাগে, দেবী তাকে বরদান করেন। বোঝো ঠ্যালা, যে দেবীকে নিয়ে এত লক্ষী-অলক্ষীর বিচার, সেখানেই জুয়া খেলা!
এ প্রসঙ্গে জগৎ শেঠের গল্পের উল্লেখ না করে পারছি না। ভদ্রলোকের ধনী হবার গপ্পো। বিদ্যাবুদ্ধির খাতিরে ডাক পড়ল তার দিল্লির দরবারে। সম্রাট তাঁর বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করে বললেন ‘কি চাই আপনার?’
শেঠ মহাশয় জানালেন, কোজাগরীর রাতে যেন কোন বাড়িতে আলো না জ্বলে। কাজে কাজেই সম্রাটের আদেশে রাজধানীর সব আলো নিভে গেলেও চুপিসাড়ে জ্বলে রইল জগৎ শেঠের বাড়ির আলো। দেবী লক্ষী জগৎ ভ্রমণে বেরিয়ে আলো দেখে ভিতরে প্রবেশ করতেই, শেঠজীর মা দেবীকে ভিতরে বসিয়ে নদীতে স্নানের উদ্দেশ্যে গিয়ে প্রাণত্যাগ করলেন। যাবার আগে কথা আদায় করে নিয়েছিলেন যে যতক্ষন না পর্য্যন্ত উনি নদীর থেকে ফিরে আসছেন, দেবী যেন ওখানেই অধিষ্ঠান করেন। মাতাও আর ফিরে এলেন না এদিকে লক্ষী দেবীও কথার খেলাপি হতে না পেরে রয়ে গেলেন জগৎ শেঠের সংসারে।
লক্ষী দেবির বাহন হল পেঁচা যা কিনা কুৎসিত ও দিবান্ধ। ধনের দেবী নিজের সঙ্গে পেঁচাকে বাহন হিসেবে রেখে সকলকে জানিয়ে দেন, ‘যারা ভক্তিধন অন্বেষণ করবে তারা আমাকে পাবে আর যারা পার্থিব ধন অন্বেষণ করবে তারা আমাকে নয়, আমার পেঁচাকে লাভ করবে’।
দেবী লক্ষী হলেন কমলাসনা, কেউ বা বলেন দেবীর আবাস বিল্বপত্রে। কারও মতে দেবী অধিষ্ঠান করেন হাতির কপালে অথবা গো-পৃষ্ঠে।
দেবীর প্রধান আবাস হাতের আঙুলের অগ্রভাগে। কারন মানুষের প্রধান কর্মেন্দ্রিয় তার আঙুল, এই অঙ্গই তার অন্ন সংস্থান করে। ফলে লক্ষীর আবাস হিসেবে হাতের আঙুলের অগ্রভাগকে কল্পনা করাটা অস্বাভাবিক নয় মোটেই।
বাঙালির লক্ষীপুজোয় উদ্দীপনা ও ঐশ্বর্য্য থাকবে অপরিসীম। সেই আশায় অতুলপ্রসাদের গান মনে পড়ে যায়:

‘উঠ গো ভারতলক্ষী, উঠ আদি জগত-জন-পূজ্যা
দুঃখ- দৈন্য সব নাশি, করো দূরিত ভারত-লজ্জা
ছাড়ো গো ছাড়ো শোক-শয্যা, কর সজ্জা
পুনঃ কনক-কমল-ধন-ধান্যে!’

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।