ছোটগল্পে অজন্তাপ্রবাহিতা

পড়াশোনা - অসম ও বিশ্বভারতী পেশা -গৃহবধূ শখ -লেখালেখি, গান শোনা ও বই পড়া।

হরিবাত্তি

(মেসেঞ্জার এর ইতি কথা)

প্রথম দিন

লকডাউনে ফোন ছাড়া আর কোনো বন্ধু ছিল না ঋতুপর্ণার কাছে । অলস হাতে ফোনটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে মেসেন্জারে চোখ পড়লো ।
ওপাশে বেশ হ্যান্ডসম একটি প্রোফাইল ছবি । ছবির মালিক বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে । হটাৎ একটি মেসেজ –
-হাই !

-হাই !
-আপনি কি ঋতুপর্ণা দেব ?
– হ্যা ! বিয়ের আগে আমার পদবি দেব ছিল । এখন মুখার্জি ।
-চিনতে পারছো ? ঋতু ?
– না চেনার কি আছে ? তুমি তো নবনীল সেনগুপ্ত । বাবলুদা ।
– যাক , চিনেছো । আমি ভয় পাচ্ছিলাম ।তেত্রিশ বছর পার হয়ে গেছে । তোমার আমাকে মনে আছে কি না ?
-ভয় পাবার কী আছে ?
-না ! মানে, আমি তোমায় অনেক খুঁজেছিলাম, কিন্তু পদবীটা জানতাম না । তাছাড়া সেই তেরো বছর বয়সের তুমি আর এখনকার তুমি । অনেক পাল্টে গেছো ।
– বা রে ! তুমি কী এক আছো ? তুমিও তো পাল্টেছ । কতবড় অফিসার এখন তুমি । নিজের কোচিং ক্লাস আছে ।
-তুমি এসব কি করে জানো ?
– কেন ? না জানতে পারার কি আছে ? তোমার পদবী কি পাল্টেছে ? আমি সময় মতো তোমার ফেসবুক প্রোফাইল ভিসিট করে সব দেখে নিই ।
-ওহ । তারমানে আমায় স্টক করো ?
– স্টক কি খবর রাখা অতশত জানিনা বাপু । চেনা মানুষ গুলোর খবর পাবার জায়গা তো একটাই, ফেসবুক । সেখান থেকেই সব খবর রাখি ।
– তাহলে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাও নি কেন ?
– কেন পাঠাবো ? এই ক্ষেত্রে বয়েজ ফার্স্ট ।
-উফফ । এখনো গার্লস আর বয়েজ নিয়ে ঝগড়া করো ?
– তুমি কি ভেবেছো ? তেত্রিশ বছরে আমার অভ্যেস পাল্টে গেছে ? মশাই, স্বভাব যায় না ম’লে । বুঝলেন ।
আচ্ছা শোনো । আমার রান্না করতে হবে । পরে আসবো । আর মেসেঞ্জারে সবুজ আলো দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে না । আমার বিশেষ ভালো লাগে না এতো টেক্সট করতে ।
– নম্বর দেবে ? কল করবো ?
– খ্যাপা নাকি ? লকডাউনে বর বাচ্চারা সবাই বাড়িতে । কি করে পরপুরুষের সাথে কথা বলবো ? আমার যখন ইচ্ছে হবে আমি টেক্সট করে রাখবো । উত্তর দিও ।
– আচ্ছা । বাই ।
(কিছুদিন পরে। দ্বিতীয় বার আবার যখন দেখা হলো মেসেঞ্জারে )
-হাই
– হাই বাবলুদা ।
– কেমন আছো ?
– লকডাউনে কেমন থাকবো ? রান্না করছি । ঘর মুচছি । বাসন মাজছি ।
– তুমি কি কিছু করো ?
– মানে ? কি করবো ?
– চাকরি ?
– হ্যাঁ করি তো । কিন্তু মাইনে পাই না ।
– বুঝলাম না ।
-উফফ । বাবলুদা । সেই টাল টালই থেকে গেলে । হায়ার সেকেন্ডারিতে স্ট্যান্ড করেছিলে না । কিন্তু এখনো ক্যাবলা ।
সংসার করি ।
– ও ! তোমার মনে আছে , আমার রেজাল্ট ।
– থাকবে না ! তোমার জ্যেঠিমা আমার মায়ের বন্ধু । মা কে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি খাইয়েছিলেন ।
– বাবা ! তোমার এতো কথা মনে আছে ।
– কি করবো ! স্ট্যান্ড করেছিলে তুমি, আর তোমার রেকর্ড ভাঙবার জন্য রাত দিন এক করে পড়তে হয়েছিল আমাকে ।
– কেন ?
– আবার বলে কেন ? আরে আমার ক্যাবলা চন্ডী তোমার জ্যেঠিমা যাতে আমাদের বাড়িতে এসে মিষ্টি খেতে পারে তার জন্য ।
– তোমার আর কী কী মনে আছে ?
– অনেক কথাই মনে পরে মাঝে মাঝে । মজুমদার স্যারের বাড়িতে ম্যাথস টিউশনের দিন গুলো । তুমি টুয়েলভে আর আমি ক্লাস নাইনে ।
– হুমমমম । একবার আমার খাতা শেষ হয়ে গেছিলো, তুমি নতুন খাতা দিয়েছিলে ।
– মনে আছে । খাতা শেষ হবার পরে তুমি কেমন ঘাবড়ে গেছিলে । এমনিতেই মজুমদার স্যার কত্ত রাগী ছিলেন, তার ওপর
টিউশনে আসবার আগে চেক করোনি কত পেজ বেঁচে আছে । আমি যদি তোমায় খাতা ধার না দিতাম তোমার কপালে দুঃখ ছিল ।
– তুমি দশমীর মিষ্টি নিয়ে এসেছিলে, সে কথা মনে আছে ? ঋতু !
– হ্যা মনে আছে । তুমি লালমোহন খেতে ভালোবাসতে । সেকথা ক্লাসে একদিন বলেছিলে । সেবার বাবা দশমীর মিষ্টিতে লালমোহন এনেছিলেন ।বাবামায়ের কাছ থেকে দূরে থাকো । তাই কি মনে করে দুটো মিষ্টি তোমার জন্যে নিয়ে গেছিলাম ।
– আর মিষ্টি খাইয়ে নিজের বন্ধুদের সাথে মিলে আমায় ‘লালমোহনদা’ বলে ডাকতে শুরু করেছিলে ।

-হাহা ! হাহা ! সে তো ওই সময় একটু মজা করেছিলাম আর কি । লালমোহন বললেই কি তুমি সত্যি সত্যি লালমোহন হয়ে যাবে নাকি ।

– আচ্ছা জানো ! সেই সেদিন, তোমার মায়ের কাছে বকুনি খাবার পরে আর কখনো তোমার সাথে দেখাই হয় নি ।
– বকুনিটা খেয়েছিলে তোমার জ্যাঠতুতো দাদার নালিশের জন্যে । তুমি যেদিন আমায় তোমার নোটস গুলো দেবার জন্য পোস্টঅফিসের সামনে দেখা করতে বলেছিলে, সেদিন তোমার সুবিমলদা তোমার সাথে আমায় দেখে নালিশ করেছিল মায়ের কাছে।
– কিন্তু আমি তো তোমাকে নোটস দেব বলে দেখা করতে বলেছিলাম । এতে দোষের কি হলো । এদিকে দাদা এসে বলেছিলো তুমি নাকি ঘুমের ঘোরে আমার নাম বিড়বিড় করো । তাই তোমার মা আমায় অত্তো বকুনি দিয়েছিলেন ।
– তুমিও বলিহারি । সাহস ছিল না বলবার যে তুমি দোষী নও ।
– ঋতু ! একটা সদ্য হায়ার সেকেন্ডারি পাস করা ছেলের কত সাহস থাকতে পারে বলো । আর আমাদের সময় মোবাইলও ছিল না । ঠিক তারপর দিন আমি বোম্বে চলে যাই ।
– সেখানে তো তুমি একটি মারাঠি মেয়ের সাথে প্রেম করতে ।
– একথা তুমি কি করে জানলে ?
– বৈদেহী আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল । আমার সাথেই পড়তো ।ব্যাস ওই টুকু ।
– এখন সাফাই দিয়ে কি হবে ? বাবলুদা ।
– তোমায় আমি অনেক খুঁজেছিলাম জানো, ঋতু ।
– কোথায় খুঁজেছিলেন আপনি শুনি ? আকাশের ঠিকানায় ? কেন আমাদের শহরে কি আর কোনো প্রাণী ছিল না আমার খবর দেবার মতো ?
– দেখো । দুর্গাপুর আসি আমি জ্যেঠুর কাছে থেকে পড়াশুনা করবো বলে । বাবা তখন বিহারে পোস্টেড্ ছিলেন । সেখানে ভালো স্কুল ছিল না । আমি কাউকে চিনিও না । এক দুবার সুবিমলদাকে তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম । বললো, জানে না ।
– কি বলি তোমায় ? বুদ্ধিহীন ?
-যা খুশি বলো । কিন্তু তখন তোমার খোঁজ পাই নি । পরে জ্যাঠিমার কাছে শুনেছিলাম তোমার ভালো বিয়ে হয়েছে ।
– তাহলে এখন খুঁজলে কেন ? বাবলুদা ।
– খুঁজেছি অনেক দিন ধরে । একটা কথা বলবো বলে । মেসেন্জারে এসে তোমার নামের পাশে সবুজ আলো জ্বলতে দেখে মাঝে মাঝে ভাবতাম একবার ‘হাই ‘ বলি । সাহসে কুলাতো না । কাকিমার কথা কানে ভাসতো, “ঋতুর থেকে দূরে থাকবি ।”
– বুঝলাম বীর অর্জুন । পরীক্ষার খাতায় যতই প্রশ্ন স্বরূপ বাঘের সাথে মোকাবিলা করো না কেন, রায়বাঘিনি স্বরূপ আমার মাতাশ্রীর হালুমটা এখনো মনে আছে ।
– উফফ ! এখনো ইয়ার্কি । তুমি কবে সিরিয়াস হবে ঋতু ?
-কে বলেছে আমি সিরিয়াস নোই । ভীষণ সিরিয়াস আমি । তুমি তো এতো সিরিয়াস । কি করেছো জীবনে ? টাটা আম্বানি হয়ে গেছো ?
– নাহ ! হতে পারি নি ।একটা ভালো চাকরি করি জামশেদপুর স্টিল প্ল্যান্টে, ব্যাস ।ঐটুকুই ।
-ছেলে কি করছে ?
– খড়্গপুর আইআইটি তে পড়ছে ।
– তোমার ছেলে মেয়ে ?
– আমার ছেলে এবার ক্লাস টুয়েলভে আর মেয়ে ক্লাস টেনে ।
-বেশ চাপ । তুমি কোথায় আছো ?
– দিল্লিতে আছি । আচ্ছা ! রাত অনেক হলো । আজ রাখছি ।
– একটু দাঁড়াও, ঋতু । কিছু বলতে চাই ।
– কি ? ভালোবাসো আমাকে ? তাই তো ।
– হ্যা । এটাই বলতে চেয়েছিলাম ।
– এই ছোট্ট কথাটা জানাতে তেত্রিশ বছর পার করে দিলে,বাবলুদা । আমারও তোমাকে ‘থ্যাংক ইউ’ জানবার আছে । তোমার দেয়া নোটস গুলো খুব কাজে এসেছিলো । আমিও বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছিলাম । তোমার থেকে মাত্র একনম্বর বেশি পেয়েছিলাম । আমার মা তোমার জেঠিমাকে বাড়িতে ডেকে মিষ্টি খাইয়েছিলেন ।
– তুমি কি কখনো আমাকে ভালোবেসেছিলে, ঋতু ?
– জানিনা । তবে খুব রাগ হতো । পুরুষ মানুষ হয়েও তোমার এতটুকু সাহস ছিল না সত্যিটা স্বীকার করবার ! আমি কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গেলাম, তখনও তো একবার দেখা করতে পারতে ?

– সেই সময় আমি হাইয়ার স্টাডিজের জন্য বিদেশে চলে গেছিলাম । তোমার ঠিকানা পাই নি । তাই দেখা করতে পারি নি ।

– আর এখন যখন পুরো পৃথিবী মৃত্যু ভয়ে আচ্ছন্ন, তখন তুমি আমায় খুঁজে বের করে এতো বছরের না বলা কথা গুলো বলছো ।

– ঋতু । তোমার নামের পাশে এই সবুজ আলো দেখে আমি বিশ্বাস করে নি, তুমি ভালো আছো । তাই ফেসবুক করছো । যদি ভালো না থাকতে তাহলে অনলাইন আসতে না ।
– আমার মেয়ে মিঠি এই সবুজ আলোকে ‘হরিবাত্তি’ বলে । এই হরিবাত্তির অনেক মহিমা আজকাল । এটা জ্বলছে মানে আমি বা আমরা বেঁচে আছি । যদি অনেক দিন না জ্বলে তাহলে ধরে নিও, ওই আকাশে মিলিয়ে গেছি । এখনো তোমার কাছে আমার খবর দেবার মতো কেউ নেই । যেখানেই থেকো, ভালো থেকো । আর কোনো কথা নেই ।
– বেশ ঋতু । আমি আর তোমায় বিরক্ত করবো না । শুধু রোজ এই হরিবাত্তি জ্বালিয়ে রেখো যাতে আমি বুঝতে পারি তুমি ভালো আছো । বাই ।
— বাই বাবলুদা । তুমিও তোমার নামের পাশে এই ছোট্ট বাতি জ্বালিয়ে রেখো । জানো হার্ট চক্রের রঙ ও সবুজ ।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!