ছোটগল্পে অজন্তাপ্রবাহিতা

পাহাড়ী মেঘবালিকা

হিমালয়ের কোলে একটি ছোট গ্রাম,নাম কালাপোখরি। গৈরিবাস থেকে সান্দাকফু যাবার পথে এই ছোট্ট গ্রাম খানি পড়ে।
হিমালয়ের রুক্ষ আবহাওয়ার জন্য গ্রামের জনবসতি খুব যে ঘন, তা নয়, আবার এক্কেবারে শূন্য বসতি তাও নয়। এই গ্রামেই অরুন গুরুং , মুন্নি গুরুং ও তাদের একমাত্র কন্যা মনীষার বাড়ি।
বছর সাত কি আট মতো বয়স মনীষার । ভরাট গাল। কাঁধ অব্দি ছোট করে কাটা চুল । আর মুখে হাজার বাতির আলোর মতো মন কেড়ে নেওয়া হাসি । আর পাঁচটা পাহাড়ি মেয়ের মতোই দেখতে লাগে। শুধু ওর চোখ দুটো বড্ডো মায়ায় ভরা। অনেক স্বপ্ন দিয়ে সাজানো চোখ দুটো ওর। একবার সেই দিকে চাইলে দৃষ্টি সরে না।
গ্রাম থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে একটি সরকারি স্কুলে ক্লাস থ্রীতে পড়ে। বাবার হাত ধরে স্কুলে যায় আবার বাবার হাত ধরে বাড়ি ফিরে আসে। রোজকার এই যাওয়া আসার সময় বাবার কাছে নানারকম গল্প শোনে। একদিন বুবাকে (নেপালি ভাষায়,বাবা ) জিজ্ঞেস করে, ‘আমাদের গ্রামের নাম কালাপোখরি কেন ?’
‘পোখরি মানে পুকুর, আর ওখানকার জলের রং কালো বলে নাম হয়েছে কালাপোখরি’—বুবা উত্তর দেন।
পাহাড়ি এবড়োখেবড়ো, আঁকাবাঁকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই মনীষার ছোট্ট পা ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
বুবা তখন ওকে পর্বত কন্যা , জুনকো তাবেই,অরুনিমা সিনহা,ছন্দা গায়েন সবার পর্বত বিজয়ের গল্প শোনান।
বলেন, ‘দেখ মা। ওঁরা সমতলের মেয়ে হয়েও নিজের নিরলস চেষ্টায় কেমন এভারেস্ট জয় করেছেন। আর তুই তো পাহাড়ি মেয়ে, এইটুকু পথ হেঁটে পার করতে পারবি না ?’
ছোট্ট মনীষা বিভোর হয়ে পর্বত কন্যাদের গল্প শুনতে শুনতে হাঁটতে থাকে, আর মনে মনে ভাবে, একদিন ওকেও ওই পর্বতের শিখরে পৌঁছতেই হবে। কত নাম ডাক হবে তখন। সবাই বলবে, পাহাড়ী কন্যা মনীষা কেমন পর্বতকে জয় করেছে। তাই যেমন করেই হোক, হেঁটে বাড়ি পৌঁছাতেই হবে। ক্লান্ত হয়ে পড়লে চলবে না। বুবার সাথে তাল মিলিয়ে পা চালায়।
একদিন পাহাড়ের গায়ে বিশাল মেঘের সমুদ্র দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে,’ওতো মেঘ ওখানে জমা হয়ে কিকরছে,বুবা?’
– ওটা মেঘেদের রাজ্য। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘেদের রাজা থাকেন, নাম তার মেঘরাজ্। প্রতিদিন মেঘেরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা খবর নিয়ে মেঘরাজের সভায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে। সভায় আসা মেঘেদেরকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কথা জিজ্ঞেস করেন ।
খবর নেন, সময়মতো সব জায়গায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে কি না। কোথাও যদি কম বৃষ্টি হয়, তাহলে চাষীদের ফসল ফলাতে খুব কষ্ট হবে। তাই মেঘেদের বলা হয়, যত পরিশ্রমীই হোক না কেন তারা যেন দূর দূরান্তে উড়ে গিয়ে সময়মতো বৃষ্টি হয়ে মাটির বুকে ঝরে। সব দিকেই ওঁনার কড়া নজর থাকে। ওঁনার রাজ্যে কোনো শোক নেই, সবাই খুব সুখে শান্তিতে বাস করে।
– মেঘের রাজা কেমন দেখতে,বুবা।
-‘মেঘরাজ খুব সুন্দর দেখতে, লম্বা সুঠাম চেহারা ,ফর্সা টকটক করছে গায়ের রং। ওঁনার পোশাক লাল আলখাল্লার ওপরে সাদা পশমের লম্বা কোট। মাথায় সোনার রাজ মুকুট আর হাতে মানদণ্ড। উনি সবার ন্যায় বিচার করেন। সকাল বেলা ভোরের প্রথম সূর্য্য কিরণ যখন ওনার রাজমুকুটে পরে, সেই মুকুট থেকে সোনালী রং ছিটকে পরে বাকি পাহাড় চূড়ার ওপর।
বাবার মুখে মেঘরাজের বর্ণনা শুনে মনীষার কৌতূহল বেড়েই চলে, প্রশ্নের ঝুলি আর শেষ হয় না।
এদিকে বাড়ি পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই অরুণ লেগে পড়েন মুন্নির কাজে সাহায্য করতে।
একটা অল্প উঁচু পাহাড়ের একটি চাইয়ের ওপর অরুণের ছোট্ট কাঠের বাড়ি। সেখানেই মুন্নি ও মনীষার সাথে উনি দিন কাটান।
সেই বাড়ির সাথে লাগোয়া খোলা বারান্দায় কাঠ দিয়ে ঘিরে কয়েকটি বেঞ্চ ও টেবিলে সাজানো ছোট্ট চা জলখাবারের দোকান।
মেনু বলতে, সকালে চা বিস্কুট, ডিমের ওমলেট ও পাউরুটি। আর দুপুরে রুটি, ডালতরকা এবং চিকেন।
সারা বছর ট্যুরিস্টের ওপর নির্ভর করেই রোজগার। অতএব, ট্যুরিস্ট মানেই ওদের কাছে ভগবান।
সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী মুন্নি খাবার বানিয়ে চলে। অরুণ একটা রংচটা নীল রঙের জিন্‌স প্যান্ট ও বেশ পুরোনো সোয়েটার ও কাঁধের এক পাশে একটি ছোট তোয়ালে ঝুলিয়ে এই টেবিল থেকে ওই টেবিল অর্ডার নিতে ও সার্ভ করার জন্য ছুটে বেড়ায়। মনীষাও স্কুল থেকে ফিরে ছোট্ট ছোট্ট হাতে যতটা সম্ভব মা ও বাবার কাজে সাহায্য করে।
প্রায় সারা বছর ট্রেকিং ও বেড়ানোর জন্য দেশ বিদেশ থেকে ট্যুরিস্ট আসে যায়। পিক সিজন ছাড়াও সারা বছরই কম বেশি পরিমানে ভীড় লেগেই থাকে।
ওদের হোটেলে খাবার খেতে এসে তারাও নানা রকম গল্প বলে। দেশ বিদেশের নানারকম গল্প। মনীষা চুপটি করে দাঁড়িয়ে শোনে, কখনো বোঝে, কখনোবা সম্পুর্ণটা বুঝতে পারে না। শোনা কথা গুলো ওর শিশু মনে নানা রকম ছবি আঁকে। নিজের মতো একটা জগৎ তৈরী হয় ।
দুপুর শেষে দিনের আলো যখন নিস্তেজ হয়ে আসে, পাহাড় থেকে হালকা হালকা মেঘেরা তখন নেবে আসে হাতের ছোঁয়ার নাগালে। তাদের মধ্যে কিছু মেঘ ওদের ঘরের ভেতর নিজের রাস্তা বানিয়ে নিয়ে আসাযাওয়া করে ।
ওদের দেখে মনীষা খুব খুশি হয়ে ওদের সাথে লুকোচুরি খেলা করে। একটা মেঘকে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু হাত দিয়ে ছুঁতে গেলেই হুশশ করে উড়ে যাচ্ছে।
আনন্দে আত্মহারা হয়ে মনীষা বাবাকে ডেকে বলে,’ বুবা, দেখো কত মেঘ ঘরে উড়ে বেড়াচ্ছে।’
কাজে ব্যস্ত অরুণ মেয়েকে উত্তর দেন, ‘দেখো কেমন মেঘরাজের মেঘেরা তোমার সাথে খেলা করবার জন্য এসেছে। তোমায় বলেছিলাম না,মেঘরাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবার খবর নেন।’
-সত্যি বলছো বুবা, এদের মেঘরাজ পাঠিয়েছেন ?
– হ্যা রে।
– তুই ওঁর সবচেয়ে প্রিয় মেঘবালিকা কি না, তাই তোর মনের ইচ্ছের কথা উনি জানতে পারেন । আর সেই ইচ্ছে পূরণ করার জন্য মেঘরাজ তোর কাছে মেঘেদের পাঠিয়েছেন।
নিজের বিশ্বাসকে দৃঢ় করার জন্য মনীষা আবার জিজ্ঞেস করে ,’আমার সব ইচ্ছে মেঘরাজ জানতে পারেন?’
-হ্যা রে মা।
বাবার উত্তরে খুশি হয়ে মনীষা আবার মেঘেদের সাথে খেলায় জুটে যায়।
এমনি করেই বেশ ছন্দে ছন্দে মিলেমিশে দিন কাটছিলো। হেঁটে হেঁটে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া আসা। হোটেলে বাবা মায়ের সাথে কাস্টোমার সামলানো। সময়মতো স্কুলের কাজ। মাঝে মাঝে জানলা দিয়ে তাকিয়ে থেকে মনেমনে দূরে এভারেস্টের মাথায় বাস করা মেঘরাজের সাথে মনের কথা বলা।
নতুন বছর ঢুকতেই চেনা ছন্দের পতন হলো। এক অদৃশ্য দানবের নাম শুনলো,মনীষা।
কবিড ১৯। এই দানবকে চোখে দেখা যায় না। এর অক্টোপাসের মতো অনেক গুলো পা আছে। এ প্রথমে মানুষের গলায় বাসা বাঁধে, তারপর ফুসফুসকে আক্রমণ করে। এর হাত থেকে বাঁচা খুব মুশকিল। সব শুনে খুব অবাক হয়ে যায়। মনে মনে শঙ্কাও হয়, এবার কি হবে ?
দেখতে দেখতে মনীষার স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। লকডাউনের জন্য কোনো ট্যুরিস্ট বেড়াতে আসেনা। ট্রেকিংও বন্ধ।
মা -বাবাকে আর রান্নাঘর ও খদ্দেরের টেবিলে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা যায় না। আস্তে আস্তে বাবা মায়ের জমানো টাকা শেষ হয়ে আসছে। রোজই চাপা গলায় মা বাবাকে বলেন, ‘আমরাতো জল খেয়ে থেকে যাবো। কিন্তু মেয়েটাকে না খাইয়ে রাখি কি করে ‘?
মনীষা বুঝতে পারে রোজগার বিহীন বাবা মায়ের কষ্ট হচ্ছে। কি করলে সব ঠিক হয়ে যাবে ও বুঝতে পারে না।
তখন বুবার কথা মনে পরে, আর দেরি না করে সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে একটা চিঠি লেখে।
আমার প্রিয় মেঘরাজ
তুমি আমার খুব ভালো বন্ধু। আমার সব ইচ্ছা পূরণ করো। তোমার পাঠানো মেঘ বন্ধুদের সাথে আমি রোজ খেলা করি।
কোবিদ নামের ভাইরাসের ভয়ে আমাদের দোকানে কোনো খদ্দের আসে না। আমাদের রোজগারও হয় না। বাবামায়ের খুব চিন্তা, আমায় কি খাওয়াবে ?তুমি বাবা মায়ের সব চিন্তা ও কষ্ট দূর করে দাও। এই দুস্টু ভাইরাসকে মেরে ফেলো।
আমি বড় হয়ে অন্যান্য পর্বত কন্যাদের মতো তোমার সাথে দেখা করতে যাবো ।
আমি তোমায় এত্ত ভালোবাসি।
ইতি, তোমার প্রিয় মেঘবালিকা, মনীষা।
সব্বাইকে লুকিয়ে দৌড়ে রাস্তার ওপাশে থাকা ডাক বাক্সে চিঠি খানা ফেলে আসে। বুবার কাছে শুনেছিলো মেঘরাজ উত্তর পাঠান মেঘপিয়নের হাতে। রোজ বিকেল হলেই জানলার ধারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে মেঘপিয়নের। মনে বিশ্বাস, আজ না হোক কাল মেঘরাজের উত্তর আসবেই আসবে ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।