হৈচৈ গল্পে অনুরাধা মুখার্জী ব্যানার্জী

অক্ষর জ্ঞান
সদ্য স্কুলে চাকরিটা পেয়েছি ।বেশিদিন হয়নি।অদ্ভুত অভিজ্ঞ্তা।স্কুল টা ছিল প্রত্যন্ত গ্রামে,সাথে ছেলে মেয়েরা প্রথম সারির পড়ুয়া।কেমন জানি ধুলো কাদা মাখা,রুক্ষ শুষ্ক চুলের বিন্যাস,অগোছালো ,পরিপাটি হীন ভাবে বিদ্যালয়ে আসা।অসময়ে বিদ্যালয় থেকে চলে যাওয়া,এই ছিল নিত্য নিয়মিত তাদের আখ্যান।হটাৎ একদিন দিদিমণি খেয়াল করলেন একটি ছেলে সে অন্য সকলের থেকে আলাদা, কারো কথা শোনে না।দূরব্যবহার করে, গালি গালাজ করে। সে এক মনে লিখে চলেছে,কি লিখছে কৌতুহল বশত এগিয়ে গেলাম।গিয়ে দেখি সে বাংলা বর্ন আ লিখছে উল্টোদিকে।তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তার লেখনীর পরিবর্তন করা সম্ভব হলো কিছু দিনেই। ধীরে ধীরে তার অক্ষর জ্ঞান হলো।কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতে এই ছেলের চাল চলন,পারিপাট্য সবে তেই পরিবর্তন দেখা দিল।বদল হচ্ছিল সেই বাচ্ছাটির চেহারা র ।নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলছিলো স্বাভাবিকতার সঙ্গে।সাথে আমার ও মনে মনে সফলতা খুঁজে পেয়ে আনন্দ হচ্ছিল। কয়েক মাস যেতে না যেতেই হটাৎ একদিন দেখি সে অনেক কিছু শিখে ফেলে।তার বুদ্ধির আন্দাজ আমি সেদিন ই করে ফেলেছিলাম যখন তার চপল চোখের একাগ্রতার দিকে দৃষ্টি পাত হয়।সেদিন ছিল শীতের দুপুরের ক্লাস ।সবাই কে জানতে চাইলাম তারা কি হতে চাই বড় হয়ে।সেই ছেলেটি উত্তর দিলো জেসিবি এর ড্রাইভার।কেননা তার ধারণা তারা অনেক টাকা বাড়ি আনে রোজ।যদি সেও ওই কাজ করে তাহলে তাদের বাড়িতে আর কষ্ট থাকবে না,অনেক টাকা আয় হবে।ক্লাসের মেয়েরা কেউ কেউ বললো আপনার মত দিদিমণি হতে চাই,সাথে সাথে ছেলে গুলো প্রতিবাদ করে,না দিদি ওরা ভাত রান্না করবে, মানে বোঝাতে চাইলো যে তারা গৃহবধূ হবে,এটা নিশ্চয় বাড়িতে আলোচনা সাপেক্ষে তাদের মস্তিষ্কে সূক্ষ্ম ভাবনায় গ্গ্রোথিত।।ভাবনা ভেবে অবাক হলাম।ওই ছয় বছরের শিশুর এত অদ্ভুত অদ্ভুত ভাবনা।তার পরেই হটাৎ বলে ওঠে আচ্ছা দিদি একটা প্রশ্ন আছে। বলে ফেলো বলার সাথে সাথেই বলে দিদি আপনি হিন্দু না মুসলিম?আমি বলেছিলাম আগে বল আমি যদি হিন্দু হয় তাহলেই বা কি আর মুসলিম হলে তাতেই বা কি?সে ছেলে মুখ নিচু করে বলেছিল দিদি আপনি হেন্দু?তার মন শুনতে চাইছিল আমি যেনো মুসলিম হয়।ছোট্ট ছয় বছরের বাচ্চা অবাক চোখে তাকিয়ে তার মনে যেনো আরো প্রশ্ন,আমি বলার অপেক্ষায়,গোটা ক্লাস রুম এক দৃষ্টে চেয়ে আমার দিকে।আমি একটু চুপ করে বললাম হ্যাঁ আমি হিন্দু।তাতে কি?ওরা বললো দিদি হিন্দুরা যে খুব বদমাশ হয়।আমি জানতে চাইলাম কে বলেছে তোদের?বললো আমরা জানি ,সবাই কে জিজ্ঞাসা করেন।আমি বললাম আমিও তাহলে বদমাশ তাইতো??সঙ্গে সঙ্গে এক ঝাঁক ক্ষুদে কণ্ঠস্বরে প্রতিবাদ জানিয়ে উঠে বললো কই আমাদের দিদিমণি তো তুমি ,তুমি তো কই বদমাশ নও। ওদের বললাম তাহলে হিন্দুরা কেন বদমাশ হবে??ধর্মে কি আসে যায়,একেক জনের ধর্ম একেক টা,তাই বলে কি খারাপ ভালো বলা যায় বল?ওরা যেনো ওদের দিদিমণি কে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে তাই বিশ্বাস করে নিলো।ফিস ফিস করে বললো দিদিমণি ঠিক বলেছে,তাহলে ওরা যে বললো?ওরা এক তাল মাটির মত যেমন আকার তুমি দেবে ,সেও তেমন আকার পাবে।ওদের মধ্যে একটা শিশু আমাকে প্রশ্ন করে উঠলো আচ্ছা দিদি তাহলে হনুমান দের ও হিন্দু মুসলমান হয়?আমি হো হো করে হেসে উঠলাম।জানতে চাইলাম সেটা আবার কি করে?বললো “আমাদের দ্যাশে যখন হনুমান মরে তখন আমরা কবর দিই,আর তুমদের দ্যাশে গাঁয়ে হনুমান মরলে তুমরা কেত্তন করে খোল বাজিয়ে পুড়াতে লিয়ে যাও?”আমার এই প্রশ্নের উত্তর অজানা ছিল।সে আমাকে বুঝিয়ে দিলে আমাদের সমাজ তার মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছে,যে হনুমান টা র কবর হয়,সে যদি মুসলিম হয়,তবু,যে হনুমান কে পুড়িয়ে সৎকার্য করা হয়,সে তবে হিন্দু।আমার সেদিন অজানা প্রশ্নের উত্তরের কৌতূহলে অক্ষর জ্ঞান হলো।তাদের ক্ষুদে মনের প্রশ্নের চাহিদা আমি মেটাতে পারিনি।সমাজের আয়নায় সম্প্রদিয়াকতার প্রতিফলনের বীজ বপন হতে দেখে বুক টা কেপে উঠেছিল,মনে হয়েছিল আমাদের অক্ষর জ্ঞান হওয়া আগে প্রয়োজন,তবে না আমরা বাচ্চাদের অক্ষর জ্ঞান শেখাবো।
তোমাদের গ্রামে মিটে যাক যত, ধর্মান্ধতার অন্ধ শোক,
আমার শহরের বেদ ও কোরান মিলে মিশে একাকার হোক।
কাদা মাটির টুকরো গুলো, যত্নে গড়ায় দাও ধ্যান,
সমাজের বুকে ওদের চোখে আমাদের ,আর আমাদের হাতে ওদের হোক অক্ষরজ্ঞান।