সাপ্তাহিক ভ্রমণ কাহিনী তে অমিতাভ দাস (পর্ব – ২)

কাশী-বিশ্বনাথ
পরদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে স্নান করে তৈরী হয়ে নিলাম। যাবো কাশী-বিশ্বনাথ মন্দির ও অন্নপূর্ণা মন্দিরে পুজো দিতে। শুনেছিলাম সাংঘাতিক ভিড় হয়। চার-পাঁচ ঘন্টা লাইনে দাঁড়াতে হবে।
টোটো ধরে আমরা পৌঁছে গেলাম বিশ্বনাথ মন্দিরের কাছে। যদিও পথে দুবার টোটো বদলাতে হয়েছে। ভিড়ের কারণে রাস্তায় নো এন্ট্রি । দ্বিতীয় টোটো চালক ছেলেটি অনেক ঘুরিয়ে আমাদের কাশী-বিশ্বনাথ মন্দিরের ৪ নং গেটের কাছে পৌঁছে দিল।
এখানে একটি দোকানে মোবাইল ব্যাগ ও অন্যান্য সামগ্রী জমা রাখতে হল। শুধু কিছু টাকা সঙ্গে রাখলাম। সেই দোকান থেকেই পুজোর জন্য ডালা কেনা হল। অজস্র মানুষ। লোকে লোকারণ্য । সারা ভারতবর্ষের পুণ্যার্থী মানুষ মিলিত হচ্ছেন রোজ রোজ বিশ্বনাথ শিব দর্শনে। স্থানীয় ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা পুণ্যার্থীদের কপালে তিলক এঁকে দিচ্ছে। পাঁচ-দশটাকা নেবে না, চাইছে পঞ্চাশ টাকা।
বেশ কঠোর বিধি-নিষেধ এখানে। নিরাপত্তার বেষ্টনী পেরিয়ে যখন লাইনে দাঁড়ালাম, সাতটার একটু বেশি বেজে গেছে। কয়েক হাজার মানুষের লাইনের পেছনে আমরা। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। এত লম্বা লাইন পূর্বে কোথাও দেখিনি। দু-চোখ ভরে দেখলাম পুণ্যার্থীদের ভাব-তন্ময়তা, আগ্রহ।
লাইনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কাশী-বিশ্বনাথ মন্দিরের কথাই। কত পুরোনো মন্দির। কতো তার ইতিহাস।মহাদেব শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের একটি এই কাশীতে। স্কন্দ পুরাণে কাশীখন্ডে এই কাশী-বিশ্বনাথ মন্দিরের কথা আছে। একাদশ শতাব্দীতে হরিচন্দ্র এই মন্দিরটি পুনর্নির্মান করেছিলেন। ১১৯৪ সালে মহম্মদ ঘোরি বারাণসীর অন্যান্য মন্দিরের সঙ্গে এই মন্দিরটিও ধ্বংস করে দেন। ইলতুৎমিসের রাজত্ব কালে এক গুজরাতি বণিক মূল স্থান থেকে একটু দূরে অভিমুক্তেশ্বরা মন্দিরের কাছে এই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। এই মন্দির আবার ধ্বংস হল ফিরোজ শাহ্ তুঘলকের শাসন কালে। ১৫৮৫ সালে আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করান। তারপর আবার ঔরঙ্গজেব ১৬৬৯ সালে মন্দিরটি ধ্বংস করে জ্ঞানবাপী মসজিদ তৈরী করান। মসজিদটি আজো বর্তমান মন্দিরের পাশে অবস্থান করছে। বর্তমান মন্দিরটি ১৭৮০ সালে মালহাও রাও হোলকারের পুত্রবধূ মহারাণী অহল্যা বাঈ হোলকার তৈরী করে দিয়েছিলেন। ১৮৩৫ সালের পাঞ্জাবে শিখ সম্রাট রঞ্জিৎ সিংহ মন্দিরের চূড়াটি এক হাজার কিলো গ্রাম সোনা দিয়ে মুড়ে দেন।
হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। মেসোকে বলছিলাম, কত মহাপুরুষ এসেছিলেন এই মন্দির দর্শনে।
মেসো বললেন, কারা এসেছিলেন?
বললাম, আচার্য আদি শঙ্কর মানে শঙ্করাচার্য, তৈলঙ্গ স্বামী, তুলসীদাস গোস্বামী, গুরু নানক, আনন্দময়ী মা, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ আরো কতজন…
মেসো বললেন, তৈলঙ্গ স্বামী ছিলেন সাক্ষাত জীবন্ত শিব। তিনি গঙ্গায় ভেসে থাকতেন।
–একদম- ই তাই। কথা বলতেন না। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। হিন্দুদের বিশ্বাস গঙ্গায় ডুব দিয়ে এই মন্দির দর্শন করলে মোক্ষ লাভ হয়।
কয়েক ঘন্টার দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে বাবা বিশ্বনাথকে দর্শন করলাম। দর্শন করলাম বলা যায় না, সামনে দাঁড়ালাম মাত্র। প্রণাম করার সুযোগটুকুও নেই, ঠেলে সরিয়ে দিলো নিরাপত্তা রক্ষীরা। কিছুদিন আগেও নাকি বিশ্বনাথ শিবের মাথায় জল ঢালা যেত, স্পর্শ করাও যেত। এখন সে সুযোগ নেই। বড়ো ফানেলের মতো করা, সেখানে জল ফেলে দাও, গড়াতে গড়াতে শিবের মাথায় পড়বে। জল ফেলার আগেই পুরোহিত হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে। খুচরো টাকা দক্ষিণা দেওয়ায় সে কী রাগ– নিলো না। বললে, এত কম দক্ষিণা বাবা বিশ্বনাথকে? আরে ভাই, বিশ্বনাথ কোথায়? নিচ্ছ তো তুমি হাত পেতে। দোষ দিচ্ছ বাবা বিশ্বনাথের। একজন ভক্ত কী দেবে, কত দেবে সেইটে তাঁর নিজস্ব ব্যাপার। সব তীর্থস্থানেই এই রকম কান্ড চলে।
বাবা বিশ্বনাথের দর্শন সেরে আমরা গেলাম পাশেই মা অন্নপূর্ণার দর্শনে। মা অন্নপূর্ণা কাশীর নিত্যদেবী। এখানে ভিড়টা তুলনামূলক কম।এখানে মাকে প্রাণভরে দেখলাম, প্রণাম করলাম। মন ভরে গেল। দক্ষিণাও দিলাম । তারপর প্রসাদী চাল একমুঠো নিজের কাছে যত্নে রেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম ভোগের লাইনে। কাশীতে এসে মা অন্নপূর্ণার প্রসাদ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । সে সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। শুনেছি কাশীতে মা অন্নপূর্ণার কৃপায় কেউ কখনও অভুক্ত থাকে না।
এখানে এসে মনে পড়ে গেল রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের বহুখ্যাত সেই পংক্তি, যা অন্নদামঙ্গলে আছে। আমরা ছেলেবেলা ‘অন্নপূর্ণা ও ঈশ্বরী পাটনী’ নামাঙ্কিত কবিতায় পড়েছিলাম–” আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে”। মা অন্নপূর্ণার মূল নাম ভবাণী। কবি ভারতচন্দ্রের আরাধ্যা দেবী এখানে অন্নপূর্ণা রূপে পূজিত হচ্ছেন। ভারতচন্দ্র লিখেছেন:
” অন্নপূর্ণা অন্নদাত্রী অবতীর্ণা হও।
কাশীতে প্রকাশ হয়ে বিশ্বপূজা লও।।
আনন্দকানন কাশী করিয়াছি স্থান ।
তব অধিষ্ঠান বিনা কেবল শ্মশান।।”
ভোগের লাইনে দাঁড়িয়ে এইসব ভাবছিলাম। কত পুরোনো মন্দির । এই মন্দিরেও আঘাত এসেছিল । মধ্যযুগে অন্নপূর্ণা মন্দির ধ্বংস হলেও বর্তমান মন্দিরটি ১৭২৫ খ্রীষ্টাব্দে মারাঠারাজ পেশোয়া প্রথম বাজিরাও তৈরী করে দিয়েছিলেন। এখানে মায়ের রৌপ্য মূর্তি। রৌপ্য খচিত সিংহাসনে আসীন।
হাঁটতে হাঁটতে মানুষের ধাক্কা খেতে খেতে আমরা পৌঁছে গেলাম প্রসাদ গ্রহণের স্থানে। দীর্ঘ হলঘর। শয়ে শয়ে মানুষ প্রসাদ নিচ্ছে। কী সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে ভোগ বিতরণের কাজ। আমরা গিয়ে বসলাম নির্দিষ্ট স্থানে। মা অন্নপূর্ণার ভোগ-প্রসাদ খেলাম। তালিকায় ছিল লাড্ডু ভাত ডাল দুই রকম তরকারি আচার পাঁপড় চাটনি , আর শেষ পাতে দই। আহা, যেন অমৃতের স্বাদ।
ভোগ খেয়ে বেরলাম খুব সরু এক গলির ভেতর দিয়ে। অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল।হাজার বছরের পুরোনো সময়, পুরোনো ইতিহাস—যেন ইতিহাসের ভিতর দিয়ে হেঁটে আসলাম। একটা ঘোর, একটা বিস্ময় সঙ্গে নিয়ে লজে ফিরতে ফিরতে দুপুর একটা বেজে গেল।
ক্রমশ