সাপ্তাহিক ধারাবাহিক ঐতিহ্যে “কলকাতার চার্চ (কোম্পানীর যুগ)” (পর্ব – ১০) – লিখেছেন অরুণিতা চন্দ্র

বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপিকা পদে নিযুক্ত আছেন। ইতিহাসের অধ্যাপনা ও গবেষণা ছাড়াও পুরাণ ও ভারতীয় সংস্কৃতিচর্চায় তিনি প্রবল আগ্রহী। বাঙালির জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনা তাঁর স্বপ্ন। এছাড়া ভালোবাসেন ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করতে এবং লেখালিখির চেষ্টা করতে।
আগের পর্বগুলিতে বিবিধ মিশনারী সংগঠন দ্বারা কোম্পানী শাসিত কলকাতার চার্চগুলির আলোচনায় দেখা গিয়েছিল চার্চের কার্যকলাপের সাথে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং পশ্চিমী শিক্ষাবিস্তারের কাজটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। এ প্রসঙ্গেই এসময়ের আরো কয়েকটি প্রোটেস্টেন্ট চার্চের কথা না বললে আলোচনা অসমাপ্ত থাকে।
এপ্রসঙ্গেই আসে St. Thomas Church ও তার সাথে জড়িত মহানগরীর বর্তমান প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান St. Thomas School এর কথা। ১৭২৯ খ্রিষ্টাব্দে রেভারেন্ড Joshua Thomlinson এবং তাঁর স্ত্রী Elizabeth কোম্পানির ইউরোপীয় সৈন্য দের অনাথ সন্তানদের জন্য Charity School শুরু করেছিলেন। পরে ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় Free School . ফ্রি স্কুল সংলগ্ন রাস্তাটি পরিচিত হয় Free School Street নামে যা বর্তমানের মীর্জা গালিব স্ট্রীট নামে পরিচিত। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রি স্কুল ওল্ড চ্যারিটি স্কুলের সাথে মিশে যায় এবং আজকের সেন্ট টমাস স্কুল নামে পরিচিতি পায়। খিদিরপুর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলের দেওয়ালে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ কে ভিত্তিবর্ষ দেখে মনে করা হয় এটিই পুরাতন চারিটি স্কুল ছিল যা ওই বছর খিদিরপুরে স্থান পরিবর্তন করেছিল। যদিও ১৮৩১-৩২ খ্রিষ্টাব্দের সমাচার দর্পনের প্রতিবেদনেও ফ্রি স্কুলের নামোল্লেখ দেখে মনে হয় খিদিরপুরের ওল্ড চারিটি স্কুলের সাথে মিশে গেলেও ফ্রি স্কুল কম্পাউনডের পৃথক অস্তিত্ব ছিল।এই ফ্রি স্কুল কম্পাউন্ডে ই চার্চ টি তৈরি হয়। পরে চার্চের পূর্বদিকে ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপিত হয় বর্তমান St.Thomas Day School.
বিশপ টার্নার প্রথম ফ্রি স্কুল কম্পাউন্ডে একটি চার্চ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রস্তাব গৃহীত হয়। স্কুলের ফান্ড থেকে ৫০,০০০ টাকা এর জন্য সংগৃহীত হয়। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিংকের স্ত্রী চার্চটির শিল্যান্যাস করেন। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে চার্চটি প্রার্থনার জন্য খুলে দেওয়া হয়। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে বিশপ ড্যানিয়েল উইলসন আনুষ্ঠানিকভাবে চার্চটির পবিত্রতা ঘোষণার উৎসব পালন করেন। চার্চটি ক্লাসিকাল স্থাপত্যে নির্মিত এর চূড়াটি গথিক ধারায় স্থাপিত। মঞ্চের পশ্চাতে দুটি বড় রঙিন কাঁচের জানলে যিশুর জীবনের বিবিধ কাহিনী বিবৃত হয়েছে। চার্চের দেওয়ালে যোসেফ, মেরী আর খ্রীষ্টের রঙিন ছবি এবং ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ছবি সজ্জিত। প্রথমদিকে চার্চের সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা বিকাল চারটার মধ্যে অর্থাৎ অন্ধকার নামার পূর্বেই সমাপ্ত হত। পরে ১৮৬০ থেকে সে অবস্থার পরিবর্তন আসে। চার্চের দেওয়ালে এক স্মৃতিফলক থেকে Miss Mary Bird নামে এক মহিলার কথা জানা যায় যিনি হিন্দিভাষী খ্রিষ্টান মহিলাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সেন্ট থমাস স্কুলের সাথে জড়িত অপর একটি চার্চ ছিল St. Stephen’s Church. খিদিরপুর এলাকায় গঙ্গার তীরে এবং স্কুলের পরিসরের মধ্যেই চার্চটি অবস্থিত ছিল। এর সুউচ্চ শিখরটি নদীবক্ষে দৃশ্যমান এবং মাস্তুলের ন্যায় প্রতিটি হত। এই চার্চটি মূলত খিদিরপুর বন্দরে আসা জাহাজের নাবিক ও খালাসীদের জন্যই নির্মিত ছিল। এই চার্চের মিনিস্টারের পদ প্রথম সৃষ্টি হয় ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বলে জানা যায়। চার্চের স্মৃতিফলকগুলি থেকে স্পষ্ট সেসময় জলপথে দুর্ঘটনায় জাহাজীদের মৃত্যু নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় ছিল। এই স্মৃতিফলক থেকে দেখা যায় চট্টগ্রামের প্রাক্তন জজ Mr. Frederich Stairforth চার্চ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে গার্ডেনরিচে তাঁর মৃত্যু হয়। পার্লামেন্টারি শাসনকালেও চার্চটি ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতে বলে জানা যায়।

চলবে

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!