মেহেফিল -এ- কিসসা আবু আফজাল সালেহ (প্রবন্ধ)

আধুনিক চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরাট বটগাছ। বাংলা সাহিত্য ও শিল্প জগতে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি তিনি। সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণ করেছেন। বহুমুখী ধারায় পুষ্ট করেছেন বাংলা ভাষাকে। তিনি কবি হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত ও আলোচিত হয়ে থাকলেও গান-ছোটগল্প-নাটক শাখায়ও সফল। কবিতা-গান নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। ছোটগল্প নিয়েও আলোচনা হয়। তার প্রবন্ধ-উপন্যাস বা নাটক-ভ্রমণকাহিনি নিয়ে আলোচনা হয়। আর একটা দিক হচ্ছে, চিত্রকলা গুণ। এ ক্ষেত্রেও সফল তিনি। কিন্তু ‘চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ’ কম আলোচিত বিষয়। এটা আড়ালেই থেকে যায়। আলোচনা খুব কম হয়। ভারতবর্ষের চিত্রকলার নান্দনিকতায় ও বহুমুখীরেখায় নতুনত্ব এনে আধুনিকতায় নতুনমাত্রা যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ইউরোপেও তার চিত্রকলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

জীবনের শেষপ্রান্তে এসে কবিতার কাটাকুটি করতে গিয়ে আঁকা শুরু করলেন চিত্রকলা। ১৯২৪ থেকে ১৯৪১ সালে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার ছবি এঁকে তিনি বিস্ময়কর শিল্প প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পুরোদস্তুর ছবি আঁকা শুরু করেন ১৯২৮ সাল থেকে। নিজের আঁকা ছবি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ঐগুলি কেবল রেখাই নয়, ঐগুলি তার থেকেও কিছু বেশি। আমার চিত্রাঙ্কিত স্বপ্ন এক কাব্যিক কল্পনার দর্শন।’ জীবনের শেষলগ্নে (১৯২৪ থেকে ১৯৪১) বেশির ভাগ ছবিই এঁকেছেন। ছোটবেলার আঁকাআঁকি শেখা পরে শান্তিনিকেতনে চিত্রশিল্প শিক্ষা প্রচলন ছিল। এ ছাড়া পারিবারিকভাবে অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, পুত্র রথীন্দ্রনাথ, পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী এরাও চিত্রচর্চা করতেন। ভ্রাতু®পুত্র গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের মতো আধুনিক ভারতীয় চিত্রশিল্পের পথিকৃৎ জনদের সার্বক্ষণিক সান্নিধ্য, আলাপ-আলোচনা এবং শিল্প পরিবেশ ইত্যাদির মধ্যে তার ছিল বসবাস। জোড়াসাঁকোয় ঠাকুর পরিবারে প্রিন্স দ্বারকানাথের ছেলে গিরীন্দ্রনাথ এবং তার ছেলে এবং রবীন্দ্রনাথের জ্ঞাতিভাই। গুণেন্দ্রনাথ মূলত ছবিই আঁকতেন। আর গুণেন্দ্রনাথের তিন ছেলে গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ ভারতের চিত্রকলাজগতের দিকপাল। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তাদের দুই বোন বিনয়িনী ও সুনয়ানী দেবীকেও বাদ রাখা যাবে না।

শিল্পকলা রবীন্দ্রনাথকে খুব টানত। কাটাকুটি থেকেই চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠেন। চিত্রকর হয়ে ওঠার গল্পটাও অন্যরকম। রবীন্দ্রনাথ নিজেই ছবি আঁকার শখকে উল্লেখ করেছেন ‘শেষ বয়সের প্রিয়া’ বলে। চিত্রসমালোচক প্রতিভা ঠাকুর ‘গুরুদেবের চিত্রকর্ম’ গ্রন্থে বলেন, ‘১৯২৭ সালের দিকে গুরুদেব তুলি ও কলমে আকার কাজ শুরু করেন। পরে পান্ডুলিপি সংশোধনের উছিলায় তিনি তাতে ডিজাইন বা নকশা আঁকা শুরু করেন, যেটা আজ সুধীমহলে সুপরিচিত।’ আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী, সাহিত্য সমালোচক ও লাতিন আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের নেত্রী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বাড়িতেই ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ লিখেছিলেন বলে জানা যায়। ওকাম্পো আবিষ্কার করেন ‘চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ’কে। ছোট্ট কবিতার খাতায় কবিতার কাটাকুটি ও তা থেকে ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। ওকাম্পো লিখলেন, ‘ওঁর একটি ছোট খাতা টেবিলে পড়ে থাকত, ওরই মধ্যে কবিতা লিখতেন বাংলায়। …লেখার নানা কাটাকুটিকে একত্রে জুড়ে দিয়ে তার ওপর কলমের আঁচড় কাটতে যেন মজা পেতেন কবি।…সমস্ত ভুল, সমস্ত বাতিল করা লাইন, কবিতা থেকে বহিষ্কৃত সব শব্দ এমনি করে পুনর্জীবিত হতো এক ভিন্ন রূপের জগতে, আমাদের দিকে তাকিয়ে যেন স্নিগ্ধ কৌতুকে হাসত তারা। এই ছোট খাতাটাই হলো শিল্পী রবীন্দ্রনাথের সূচনাপর্ব।’ জীবনের শেষ সতেরোটি বছর তিনি এঁকে গেছেন দুহাতে। প্রায় দিনেই তিনি চার-পাঁচটি ছবি এঁকে শেষ করতেন। হাতের কাছে যা পেতেন তাই ব্যবহার করতেন। ভ্রাতু®পুত্র চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ একে ‘আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত’ বলতেন। রেখা ও রঙের সমবায়ে নির্মাণ করে অভিনবত্ব এনেছেন তিনি।

চিত্রশিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক। ভারতের আধুনিক চিত্রকলায় তার অবস্থান আলোচনা করা যেতে পারে। অবনীন্দ্রনাথের অবস্থানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। পথিকৃৎ হিসেবে সোমেন্দ্রনাথ সাহিত্যকেন্দ্রিক চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে আধুনিক সচেতনতার আবির্ভাব কিন্তু রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। এরপর নন্দনাল বসু, রামকিংকর প্রমুখের হাত ধরে আধুনিক চিত্রকলা পুষ্টিলাভ করেছে। ইউরোপীয় স্টাইল কিছুটা এলেও ভারতীয় মূলচেতনা রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে তিনি অনন্য। বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী চিত্রকলায় ক্রমবর্ধমান বৈচিত্র্য ও খোলসবদল করেছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে প্রথার সঙ্গে আটকে থাকেননি। ইউরোপীয় ও ভারতীয় শিল্পের সম্মিলন করে তৈরি করেছেন নতুন বোধ। তিনি হাতের কাছে যা পেতেন তাই দিয়ে ছবি এঁকেছেন। ভাঙা কলম-পেনসিল, বাদ-দেওয়া কাগজ নিয়েই তৈরি করেছেন নতুন ছবি। তিনি ব্যবহার করতেন পেলিক্যান কালি। ভারতীয় মিথভিত্তিক এবং মুঘল চিত্রকলার সুদীর্ঘ অচলায়তন ভেঙে রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব ঢঙে ছবি আঁকতে শুরু করেন। ভারতবর্ষের চিত্রকলার হাজার বছরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যবোধ থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে উপমহাদেশের চিত্রজগতে নতুন এক ধারার সৃষ্টি করেন তিনি। তার আঁকার ভঙ্গি প্রসঙ্গে প্রতিমা ঠাকুর বলেন, ‘তার আঁকার ভঙ্গিটি স¤পূর্ণ নিজস্ব ছিল, তিনি স্বদেশি বা বিদেশি কোনো অঙ্কন পদ্ধতি অনুসরণ করতেন না। রবীন্দ্রনাথের ছবি দৃশ্যমান জগতের বাস্তবানুগ অনুকরণ অথবা চেনা শৈল্পিক ফর্মের অনুসরণ নয়। নিসর্গ, নারী-পুরুষ বা পশুপাখি যাই হোক, তা কোনোভাবেই বাস্তবের দাসত্ব করেনি। শুধু পশ্চিমী নয়, প্রাচ্যের চীন-জাপানের শিল্প, পেরু ও উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার ‘প্রিমিটিভ আর্ট’-এ মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। শিলাইদহ বা শাহজাদপুরে কবির আঁকা চিত্রকর্ম দেখা যাবে। কলকাতার জোড়াসাঁকো বা শান্তিনিকেতনে এ শিল্পকর্ম লক্ষ করা যাবে। প্রতিকৃতি, নারীদৃশ্য, বৃক্ষরাজি, বিমূর্ত ইত্যাদি ছবি শাহজাদপুরের কাছারি বাড়িতে শোভা পাচ্ছে! শান্তিনিকেতনে কবির শিল্পকর্মের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। রবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ভারত সরকার কবির চিত্রকর্ম নিয়ে বই প্রকাশ করেছে।

রবীন্দ্রনাথের ছবিকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন : ১. নর-নারীর মুখের ছবি। ২. জীবজন্তুর প্রতিকৃতি। ৩. প্রকৃতির পটভূমিকায় মানুষের রূপকচিত্র। ৪. অলঙ্কারিক চিত্র। ৫. প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। নারীর চরিত্র সৃষ্টিতে তিনি বেশি সফল হয়েছেন বলে মনে করা হয়। তার আঁকা নর-নারীর মুখের ছবিতে যেমন বিশিষ্ট মনের আকৃতি, তেমনি প্রতিকৃতিতে পাওয়া যায়। নিজেরসহ বহু প্রোট্রেট এঁকেছেন। রবীন্দ্রচিত্রকলায় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, রেখাচিত্র ও বিভিন্ন রঙের ব্যবহার। খয়েরি রঙের ব্যবহার বেশি করা হয়েছে। তবে সবুজ ও নীল রঙের ব্যবহার নেই বললেই চলে। কালি ও কলমে আঁকা বেশ কিছু ছবি লিনিয়ার রেখায় ফুটে উঠেছে। তার চিত্রকলায় অপরূপকে সন্ধানের কোনো আকুলতা নেই। আছে শুধু রূপকে অপরূপ করার সাধনা। সৃজনশীলতা প্রকাশের যতগুলো মাধ্যম রয়েছে, তার মধ্যে চিত্রকর্ম একটি অন্যতম মাধ্যম। বৈষয়িক জীবনে রবিঠাকুরের মনে যে ভাবাবেগ, আবেগ, উদ্দীপনা, হৃদয়-বেদনা, শক্তির উপলব্ধি ও সৌন্দর্যবোধের উদয় হতো, তা তার চিত্রে প্রতিফলিত হতো। চিত্রকলায় কবির প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও তিনি চিত্র অঙ্কনে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। আঁকা ছবির সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি। ‘পূরবী’ ছবিটি তার আঁকা অন্যতম ছবি।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!