সাপ্তাহিক শিল্পকলায় শিল্পের জন্য শিল্প – লিখেছেন আলবার্ট অশোক (পর্ব – ৩২)

হাইপার রিয়েলিজম ও ফটো রিয়েলিজম

‘DOUBLE KETCHUP 1996-97 RALPH Goings’ oil on canvas 40 x 60 in.

ভারতের সব রাজ্যে শিল্পী ভাস্কর পাওয়া যাবেনা, তবে কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লী, চেন্নাই, বেংগালুরু ইত্যাদি শহরে বেশ শিল্প চর্চা হয়, কারণ কিছু নামী ব্যক্তির বা সেখানকার প্রসিদ্ধ ঐতিহ্যের জন্য। কলকাতা র শিল্পী ছাড়া বাকী রাজ্যগুলির শিল্পীরা পড়াশুনা করেন। সেইভাবে তাদের শিল্পকীর্তি কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতে পারেন। কলকাতার অধিকাংশ শিল্পী অশিক্ষিত, পরাম্পরা ধারার মতো পড়াশুনা না করেই ছবি আঁকে। ফলে তাদের জীবনে হা হুতাশ ৯০ শতাংশ। এ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
কুমোরটুলির প্রতিমা কারিগরদের পড়াশুনা করতে হয়না। পরাম্পরা চলছে। ছাঁচ আছে, কাদামাটি ঢেলে মূর্তী গড়ে চাহিদার যোগান দিলেই হল। যেহেতু পূজাপার্বনের দেশ ও সবাই পৌত্তলিক।একটা পুতুল দরকার পূজার জন্য। যেমন তেমন হলেই হল।
 কলকাতার তথা বাংলাদেশের শিল্পীরা, কোন রবিবারের আঁকার স্কুলে ছোটবেলায় শেখে, আর কোন সিনিয়র/স্বনামধন্য শিল্পীর কাছে কিছুদিন ছবি আঁকার পর নিজেকে শিল্পী মনে করে। তাদের মনে হয়না ছবি আঁকা আসলে  কুমোরটুলির মূর্তী নয়, এ মানুষের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ, ফলে বুদ্ধি বাড়াতে ইতিহাস ও নানা পড়াশুনা করতে হয়।
 যা আমরা চোখে দেখি, তা আসলে দেখিনা। যা আমরা চোখ বন্ধ করে দেখি তাই আসলে দেখি। ফলে পড়াশুনা ছাড়া শিল্পী পাড়ার এলাকায় নাম কেনা যায়। রাজ্যের নয় বা দেশ/বিদেশের নয়। কোন ছবি এঁকে নিজেকে শিল্পী বা বুদ্ধিমান প্রমাণ করা খুব শক্ত।
ইজম নিয়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলার ছাত্র ছাত্রীদের জন্য লিখছি, কিন্তু পাঠক কই? ঠিক এই কারণেই প্রকাশকরা শিল্প সাহিত্যের বই ছাপেনা। যার ফলে বাংলা এমন অশিক্ষিত। ও বাংলাতে শিক্ষার বই পাওয়া যায়না।বাস্তবিক এর জন্য বাংলার সরকার ও অশিক্ষিত রাজনীতি দায়ী।
পড়ুন ও পড়ান।
Realism,surrealism, magicrealism, hyperrealism, photorealism
বেলজিয়ামের আর্ট ডিলার ইসি ব্র্যাচট (Belgian art dealer Isy Brachot) ১৯৭৩ সালে ব্রাসেলসে, তাঁর গ্যালারিতে একটি প্রধান বা বড় প্রদর্শনী্র আয়োজন করেন এবং তার প্রদর্শনীর ছবির তালিকা বা ক্যাটালগের শিরোনাম হিসাবে Hyperréalisme, (হাইপার রিয়ালিজম Hyperrealism) ফ্রেঞ্চ শব্দটি তৈরি করেছিলেন।সেই থেকে শব্দটি চালু, হাইপাররিয়েলিজম।
এই প্রদর্শনীতে আমেরিকার যেসব শিল্পী আলোকচিত্রের মত ছবি ও ভাস্কর্য বানাতেন এবং ইউরোপের  প্রভাবশালী শিল্পীরা যারা ফটো-রিয়েল বা আলোকচিত্রের সাহায্যে কাজ নকল করে কাজ করতেন তাদের রাখা হয়েছিল। আমেরিকান শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন  র‍্যালফ গোয়িংস Ralph Goings, চাক ক্লোজ Chuck Close, ডন এডি Don Eddy, রবার্ট বেচলে Robert Bechtle and  রিচার্ড ম্যাক্লীন Richard McLean; আর ইউরোপের শিল্পীদের মধ্যে  ডমেনিকো নলি Domenico Gnoli, গেরহার্ড রিখটার Gerhard Richter,কন্রাড ক্লাফহেক Konrad Klapheck, and রোলান্ড ডেলকো Roland Delcol [fr] সেই থেকে হাইপরিয়ালিসমে ইউরোপীয় শিল্পী ও ডিলাররা ফোটোরিয়ালবাদীদেরPhotorealists দ্বারা প্রভাবিত চিত্রশিল্পীদের প্রয়োগ করতে ব্যবহার করে আসছিলেন। সমসাময়িক ইউরোপীয় হাইপাররিয়েলিস্ট চিত্রশিল্পীদের মধ্যে আমরা গটফ্রিড হেলেনউইন (অস্ট্রিয়ান)Gottfried Helnwein (Austrian), উইলিম ভ্যান ভেলডহুইজন Willem van Veldhuizen, জাল্ফ স্পারনায়ে (ডাচ) Tjalf Sparnaay (Dutch), রজার উইত্তেভরঙ্গেল (বেলজিয়াম) Roger Wittevrongel (Belgian),  ফ্রান্স থেকে the French পিয়েরে বারায়া Pierre Barraya, জ্যাক বোডিন Jacques Bodin, রোনাল্ড বোভেন Ronald Bowen, ফ্রান্সোইস ব্রিক François Bricq, গার্ডার্ড স্লোজার Gérard Schlosser, জ্যাক মনারি Jacques Monory, বার্নার্ড রানসিল্যাক Bernard Rancillac, গিলস আইলাউড Gilles Aillaud and গার্ডার্ড ফ্রোমঞ্জার Gérard Fromanger প্রমুখ।
হাইপাররিয়ালিটি Hyperreality, সেমিওটিকস semiotics  বা লক্ষণ এবং উত্তর আধুনিকতাবাদে postmodernism,  বাস্তবতার অনুকরণ থেকে বাস্তবতাকে আলাদা করার অক্ষম সচেতনতা, বিশেষত প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত উত্তর আধুনিক সমাজগুলিতে।

হাইপাররেইলিটিটিকে এমন এক শর্ত হিসাবে দেখা হয় যেখানে সত্যটি এবং কল্পকাহিনীটি নিশ্চিহ্নিতভাবে একসাথে মেশানো হয় যাতে কোনটি কখন কোথায়  শেষ হয় এবং অন্যটির শুরু হয় তার মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখা যায়না। এটি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) virtual reality (VR)/কার্যত বাস্তব এবং প্রাকৃত বাস্তব physical reality র সাথে মেশানো হয়, আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)artificial intelligence (AI) র সাথে মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে মিলিয়ে দেয়।
হাইপাররিয়েলিজমে  কোনও শিল্পীর প্রতিভার আসল স্তর দেখাযায়। শিল্পীদের চোখ  কতটা অবিশ্বাস্যভাবে বস্তুকে দেখতে পায়  ও বিশদভাবে বর্ণনা করতে পারে, তারা কীভাবে নিখুঁতভাবে বস্তু, মানুষ এবং পরিবেশ, রঙ, টেক্সচার, আলো এবং ছায়া পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং কাগজ, ক্যানভাসে বা কোনও ভাস্কর্য হিসাবে তারা এটিকে কত নিখুঁতভাবে প্রতিবিম্বিত করতে পারে তা প্রদর্শন করে ।
যে পদ্ধতিতে হাইপাররিয়ালিজম পেইন্টিং বা ভাস্কর্য তৈরি করা হয় তা বিবেচনা করা হয়, ফটোরিয়ালিজমের উন্নত এক ধাপ হিসাবে ।

ফোটোরিয়ালিজম Photorealism একটি আমেরিকান শিল্প আন্দোলন। যেখানে চিত্রকর্মীরা আলোকচিত্রের মধ্যে থাকা বস্তু বা প্রতিমূর্তী আঁকার জন্য বিভিন্ন শৈল্পিক মাধ্যম যেমন অঙ্কন, প্যাস্টেল, রং, কাঠকয়লা ইত্যাদি ব্যবহার করে চেষ্টা করে। এটি করার জন্য শিল্পী আলোকচিত্রটি photo  বিকাশ করে develop, একটি কাগজে বা ক্যানভাসে স্থানান্তর করে, ভাস্কর্যও রচনা করা যায়। এবং একটি ভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে এটিকে সম্পূর্ণ  জীবন্ত করে।
শিল্পীরা বা আগ্রহী ব্যক্তিরা বিভিন্ন কারণে, অধিক বাস্তব জগতের সাথে আরও ঐক্যবদ্ধ বা জড়িত  হতে পারেন এবং প্রাকৃত  বাস্তবের সাথে কম জড়াতে পারেন।
এই বিষয়ে বিশিষ্ট তাত্ত্বিকদের মধ্যে আছেন, জিন বাউডিলার্ড Jean Baudrillard, আলবার্ট বর্গম্যান Albert Borgmann, ড্যানিয়েল জে বুর্স্টিন Daniel J. Boorstin, নীল পোস্টম্যান Neil Postman এবং উম্বের্তো ইকো Umberto Eco।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে হাইপাররিয়ালিজম ফোটোরিয়ালিজমের নান্দনিক নীতিগুলির aesthetic principles of Photorealism. ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমেরিকান চিত্রশিল্পী ডেনিস পিটারসন Denis Peterson, যার অগ্রণী কাজগুলি সর্বজনীনভাবে ফটোরিয়ালিজমের প্রশাখা হিসাবে দেখা হয়,নতুন আন্দোলনে প্রয়োগ করতে প্রথম “হাইপাররিয়ালিজম” ব্যবহার করা হয়েছেএবং কিছু বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠির কাজ।
গ্রাহাম থম্পসন Graham Thompson লিখেছেন,১৯৬০ সালের শেষের দিকে ও ১৯৭০ সালের গোড়ার দিকে আলোকচিত্রের বেড়ে উঠা শিল্পের সাথে মিশে গেছিল দেখে মনে হয় ফটো রিয়েলিস্টদের সাফল্য। এটাই ছিল সুপার রিয়েলিজম বা super-realism or হাইপাররিয়েলিজম hyper-realism। এবং সেইসময়ের শিল্পীরা আলোকচিত্রের প্রিন্ট থেকে তাদের পেইন্টিং বানাতেন, বানাতেন এমনভাবে যাতে পেইন্টিঙ্গটা আলোকচিত্র মনে হয়। এই শিল্পীদের মধ্যে  Richard Estes, Denis Peterson, Audrey Flack, and Chuck Close  এনারা উল্লেখযোগ্য।

ফোটোরিয়ালিজমের উদাহরণঃ
“হাইপাররিয়ালিজমের এই উদাহরণটি একটি পারফরম্যান্স আর্ট। পিটারসন দেখিয়ে দিয়েছেন দর্শকদের ইচ্ছাকৃতভাবে, সময় এবং শ্রমসাধ্য প্রচেষ্টা কতটা তা দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে। দারফুর শরণার্থীর চরিত্রটি আঁকার সময় দর্শক দেখেছেন।  শিল্পী আমাদেরকে তার ছবিতে উৎসর্গ করা কাজ দেখতে বাধ্য করেছেন বিস্ময়কর বাস্তবতা হ’ল  প্রতিটি চামড়া কুঁচকানো   এবং চুল পাকান রঙ লাগানো হয়েছে, এবং ছায়াযুক্ত হয়েছে দৃশ্যের  অন্যান্য বস্তুর প্রতিচ্ছবিযুক্ত আলোর নিরিখে।
যেখানে ক্যামেরা আলোকবিজ্ঞানকে নির্বোধভাবে  কাজ করে, সেখানে এই শিল্পী মানুষের চোখ হিসাবে  যতটুকু সম্ভব  দেখতে পায়, বা নির্বোধভাবে যা করেনা, তা ছবিতে তুলে ধরার জন্য পরিশ্রম সহ্য করেছেন। আমরা খবরের কাগজে ফটোতে পৃষ্ঠা উল্টাতে পারি, ক্যামেরার একটি ক্লিক দিলেই হয়ে যায়,  তাতে এমন যত্নবান শ্রমের ফসল পাওয়া যাবেনা।
এরি সিলিটজ – প্রতিটি মানবিক দুর্ভোগের জন্য একটি ব্রাশ স্ট্রোক (Ari Siletz – A Brush Stroke for Every Human Suffering)

DENIS PETERSON, Don’t Shed No Tears সিরিজ (আসল ছবিটা বিক্রীর জন্য নয়।)Polyvinyl Paint, Airbrush/Glazed Layers, 30″x40″ Stretched Canvas

to be continued…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।