ক্যাফে ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৭)

১২। ফ‍্যারাডে ও ম‍্যাক্সওয়েল

পদার্থবিজ্ঞানসাধক জেমস ক্লার্ক ম‍্যাক্সওয়েল ( ১৩ জুন ১৮৩১ – ৫ নভেম্বর ১৮৭৯) গণিতের সূত্র ধরে গতিবান তড়িৎ চৌম্বকক্ষেত্রের ধর্ম লক্ষ্য করেছিলেন।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তাঁর অবদানকে বিপুল স্বীকৃতি দিয়েছেন। বলেছেন, তাঁর আপেক্ষিকতাবাদের গবেষণার ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে আছে ম‍্যাক্সওয়েল এর অবদান। ছোটো থেকেই চারপাশের জিনিস নিয়ে কৌতূহল ছিল তাঁর। আর ছিল অঙ্কে গভীর আগ্রহ। অঙ্কের ব‍্যাপারে এই ব‍্যুৎপত্তিই তাঁকে অসাধারণ করে দিয়েছিল।
পদার্থবিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বকে বুঝতে ও বোঝাতে , যুক্তিসঙ্গত ব‍্যাখ‍্যা যোগাতে গাণিতিক প্রমাণের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। এইভাবে ম‍্যাক্সওয়েল পূর্বজ পদার্থবিজ্ঞানীদের আবিষ্কারকে বিশ্লেষণ করে সমন্বয় সাধন করে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটান।
এডিনবরা অ্যাকাডেমিতে পড়াশুনা করতে করতেই চৌদ্দ বছরের কিশোর ম‍্যাক্সওয়েল পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখে ফেলেন। সেটি এডিনবরা রয়াল সোসাইটির অধিবেশনে পঠিত হয়। তখনই অভিজ্ঞ শিক্ষক ও অধ‍্যাপকবৃন্দ টের পেয়েছিলেন, কিশোর ম‍্যাক্সওয়েল এর মধ‍্যে একটা গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সক্ষমতা বর্তমান। বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক হয়ে তিনি পড়াশুনা করতে গেলেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপরের পড়াশুনা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে যখন তাঁর পঁচিশ বছর বয়স, তখন আবারদীনের মারিসচাল কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে অধ‍্যাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৬০ সালে লণ্ডনের কিংস কলেজে ন‍্যাচারাল ফিলজফি ডিপার্টমেন্টে অধ‍্যাপনার দায়িত্ব নিলেন। এখানে তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা করতে করতে প্রমাণ করলেন, ইলেকট্রো ম‍্যাগনেটিক ফিল্ডের গতি আলোর বেগের সঙ্গে তুলনীয়। বললেন, আলো বাস্তবে একটি তড়িৎ চুম্বকীয় শক্তি। ১৮৬৪ সালে প্রকাশ পেল তাঁর গবেষণা গ্রন্থ “এ ডাইনামিক‍্যাল থিওরি অফ দি ইলেকট্রোম‍্যাগনেটিক ফিল্ড”। ১৮৬৫তে কিংস কলেজ ছেড়ে চলে যান। তারপরে মাঝে মধ্যে কেমব্রিজে ফিজিক্স পড়িয়ে যেতেন। ১৮৭৩ সালে ম‍্যাক্সওয়েল এর বই বেরোলো “এ ট্রিটিজ অন ইলেকট্রিসিটি অ্যাণ্ড ম‍্যাগনেটিজম”। ওতে তিনি কুড়িটি ইকুয়েশনের আকারে সেই সময় পর্যন্ত তড়িৎ চৌম্বক শক্তি বিষয়ে যা কিছু জ্ঞান আহরিত হয়েছিল, তা প্রকাশ করেন। পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার এই গাণিতিক সূত্র পরবর্তীকালে এই শাখার ভাবনা বিকাশে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিল। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী অলিভার হেভিসাইড (১৮৫০ – ১৯২৫) ম‍্যাক্সওয়েল সাহেবের দেওয়া এই কুড়িটি সূত্রকে ঝাড়াই বাছাই করে সর্বমোট চারটি সূত্রে গোটা বিষয়কে সংহত করলেন। বললেন, আলো তাপ চৌম্বকত্ব ইত্যাদি শক্তিগুলির গভীরে একই অভিন্ন শক্তি কাজ করে, এবং তা হল তড়িচ্চৌম্বক শক্তি। এই পথেই বিকশিত হল পরবর্তীকালের টেলিভিশন, রাডার ও রেডিও। এমনকি বিকশিত হল আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা চলে পরবর্তী সময়ের পদার্থবিজ্ঞানচর্চার ধারার মৌলিক বাঁকবদল ঘটিয়ে দিলেন তিনি।
১৮৩১ সালে বিদ‍্যুৎ ও চুম্বকের পারস্পরিক ক্রিয়ায় গতিবান যন্ত্র বানালেন মাইকেল ফ‍্যারাডে। সেই প্রথম বিদ‍্যুৎকে কাজে লাগিয়ে শ্রমসাধ্য কাজ করিয়ে নেওয়ার যন্ত্র। তার আগে যেন বিদ্যুৎ আর চুম্বকের চর্চা ছিল ভাসা ভাসা। তাকে যে বাস্তব জীবনের দরকারি কাজে লাগানো চলে, ফ‍্যারাডের হাতে তার সিংহদুয়ার খুলল। সূচনায় যেন ছিলেন হান্স ক্রিশ্চিয়ান ওরস্টেড। ১৮২০ সালে, আজ থেকে দুশো বছর আগে ওরস্টেড দেখিয়েছিলেন তার দিয়ে বিদ্যুৎ চললে কাছে রাখা সূচিমুখ চুম্বককে তা প্রভাবিত করে। আর ওরস্টেডের সেই কাজ দেখে আন্দ্রে মারি অ্যামপিয়ার তাঁর গণিত প্রতিভা দিয়ে তাকে আরো বিকশিত করে একটা তাত্ত্বিক ভিত্তি দিলেন। ওরস্টেড আর অ্যামপিয়ারের কাজের ভিত্তিতে তড়িৎ চুম্বক থেকে গতিশক্তি বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন অনেকে। সেই কাজটা করে দেখালেন মাইকেল ফ‍্যারাডে।

এছাড়াও তিনি দেখেছিলেন, একটা লোহার রিংয়ে দুটো তার জড়িয়ে তার একটাতে বিদ‍্যুৎ চালালে, অন‍্য তারটাতেও একটা প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। আরো দেখেছিলেন, প‍্যাঁচানো তারের মধ‍্য দিয়ে চুম্বক দণ্ড নাড়াচাড়া করলে ওই তারের মধ‍্যে বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি হয়। ১৮৪৫ সালে আলোর সঙ্গে চুম্বকের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ দেখালেন ফ‍্যারাডে। সীসা সমৃদ্ধ কাচের ভিতর দিয়ে আলো পাঠাবার সময়ে দেখা গেল চৌম্বক পরিবেশে আলো প্রভাবিত হয়। ১৮৬২ সালে তিনি বললেন, চৌম্বক পরিবেশে আলোর বর্ণালীর বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়। কিন্তু মাইকেল ফ‍্যারাডের কাজের প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করলেন ম‍্যাক্সওয়েল। ফ‍্যারাডের কাজের খুঁটিনাটি আর বিদ্যুৎ আর চৌম্বকত্ব সম্পর্কে গবেষণা তখনো অবধি যে চেহারা নিয়েছিল, তার সবটুকু ভাল ভাবে দেখে শুনে অনুধাবন করে নিজের উচ্চমানের গণিত প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে তত্ত্বগত আঙ্গিকে সূত্রাকারে বিদ্বৎসমাজের কাছে পেশ করলেন। গাণিতিক বোধের সাহায্যে ম‍্যাক্সওয়েল ধরে ফেললেন যে, বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব আর আলো, এগুলি সবই একই অভিন্ন ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ। আমরা এখন এগুলিকে তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ বলি। বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব আর আলো যে একই ঘটনার বহিঃপ্রকাশ, গণিতের সূত্রের আকারে সেটা বোঝাতে পারার সামর্থ্য ম‍্যাক্সওয়েল সাহেবকে তত্ত্বগত পদার্থবিদ‍্যায় যুগনায়কের আসন দিয়েছে।তাঁর সূত্রগুলিকে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে দ্বিতীয় মহান একীকরণ বলে চেনানো হয়। প্রথম একীকরণটি সংঘটিত করেছিলেন মহাবিজ্ঞানী আইজ‍্যাক নিউটন।

ফ‍্যারাডের কাজের উপর অনেক দিন ধরে ম‍্যাক্সওয়েল পড়াশুনা করছিলেন। ১৮৫৫ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলজফিক‍্যাল সোসাইটিতে অন ফ‍্যারাডেজ লাইনস অফ ফোর্স নাম দিয়ে একটা গবেষণা পত্র পাঠ করেন। ফ‍্যারাডে বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে যা যা কাজকর্ম করে ছিলেন, তা এই গবেষণা পত্রে সুসমঞ্জস ও সুসংহতভাবে পেশ করেছিলেন। আরো বছর ছয়েক পরে ১৮৬১ সালের মার্চ মাসে তিনি ওই বিষয়গুলিকে অন ফিজিক‍্যাল লাইনস অফ ফোর্স নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করলেন।

১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয় ম‍্যাক্সওয়েল সাহেবের গবেষণা সন্দর্ভ এ ডাইনামিক থিওরি অফ দ‍্য ইলেকট্রো ম‍্যাগনেটিক ফিল্ড। তাতে তিনি দেখালেন যে শূন‍্য মাধ‍্যমে বিদ্যুৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্র তরঙ্গ আকারে আলোর সমান গতিবেগে ছোটে। দেখালেন বিদ্যুৎ আর চৌম্বক তরঙ্গ যে কারণে সৃষ্টি হয়, আলোকতরঙ্গও সেই একই মাধ‍্যমের আন্দোলিত হবার ফল। এই বিদ্যুৎ আর চৌম্বকত্ব আর আলো নিয়ে ম‍্যাক্সওয়েল কুড়িখানা গাণিতিক সূত্র খাড়া করে ১৮৭৩ সালে লিখলেন এ ট্রিটিজ অন ইলেকট্রিসিটি অ্যাণ্ড ম‍্যাগনেটিজম।
ম‍্যাক্সওয়েল বলেছিলেন, শুধুমাত্র বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলেই চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয় না, বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের পরিবর্তনের ফলেও চুম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। ম‍্যাক্সওয়েলের এই বক্তব্যের সূত্রে বিদ‍্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের তত্ত্বগত অস্তিত্ব প্রমাণিত হল। পরে তার বাস্তব অস্তিত্ব হাতে কলমে করে দেখিয়েছেন হাইনরিশ রুডলফ হার্ৎজ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।