সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৭৩)

সীমানা ছাড়িয়ে

ছেলেরা বউরা কেউ আপত্তি করল না। তারাও মনে মনে এটাই চাইছিল। কিন্তু বলতে পারছিল না। তারা আলোচনা করছিল এই বুড়ি বয়সে ওদের আবার কে দেখবে? আমাদের আমরা অফিস চলে যাই কাজের লোক আমাদের সন্তানসম্ভবা বউদের দেখাশোনা করবে। এগুলো থাকলে আমাদের অসুবিধা হবে।

মা ছেলেদের মনের কথা বুঝতে পারেন। তাই হয়তো দুই মা একত্রে ঠিক করেছেন তারা বৃদ্ধাশ্রমের থাকবেন। ছেলে বৌদের খুব আনন্দ। আর কয়েকদিন পরেই বুড়ি দুটো বৃদ্ধাশ্রমের যাবে। সুজয় বৃদ্ধাশ্রমের সমস্ত কথা বলে, পরে বাড়ি ফিরে এলো।

পাড়ার সকলে খুব আনন্দিত হলো। কারণ পাড়ার লোকজন জানত তো, সুজয় বিজয় তাদের মাদের দেখবেনা। বৃদ্ধাশ্রমে তবু তারা ভালো থাকবে।

সুজয় আর বিজয়ের বউ অন্তঃসত্ত্বা। তাদের বাচ্চা হবে আর দু-তিন মাসের মধ্যে। দুজনে কাজে বেরিয়ে যায়।রুমকি আর বৃষ্টিকে দেখার কেউ নেই তাদের বয়স হয়েছে। কাজের লোক বৌমাদের যত্ন করতে ব্যস্ত। খুব তাড়াতাড়ি মধ্যেই তারা বৃদ্ধাশ্রমের চলে যাবে মনস্থির করল।

তারপর একদিন শুভদিন দেখে দুজনে চলে গেল ছেলেদের সঙ্গে। বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছে দিয়ে ছেলেরা ফিরে এল। খুব আনন্দ করলো তারা বউদের নিয়ে।

সমাজ জানলো না সমকামী চারজন ছেলে মেয়ের জীবন কাহিনী। তাদের সমস্ত কিছু সঞ্চিত ধনও তারা উদারচিত্তে পালিত পুত্রদের দান করে গেল। বৃদ্ধাশ্রমের পাশেই অনাথ আশ্রম।সেখান থেকেই তারা ছেলেদের দত্তক নিয়েছিল। আবার সেই ছেলেরা বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে এলো তাদের জননীদের।

এটাই বাস্তব জীবন। এখানে মায়া দয়ার কোন স্থান নেই। আবেগে যারা ভাসে তারা বোকা। তারা এই পৃথিবীতে অযোগ্য।বোকারা আছে বলেই পৃথিবী এত সুন্দর, বোকারা আছে বলেই এত ফুল ফোটে।

তারপর সুখে দুঃখে শোকে বৃষ্টি আর রুমকির জীবন কাটতে লাগল। তাদের মনে পড়ল ছোটবেলার কথা, মা-বাবাকে কত কষ্ট দিয়ে তারা পালিয়ে এসেছে তা এই একটা কারনেই। তার কারণ হল তারা সমকামি।

বাবা-মা মেয়েরা সমকামী জানলে কষ্ট পাবেন। ছেলে মেয়েরা সমকামী হলে ভারতবর্ষের বাবা মারা কষ্ট পান। তারা মেনে নিতে পারেন না এই সহজ আর পবিত্র সম্পর্ক। সমকামিতা যেকোনো সম্পর্কের মতোই স্বাভাবিক সুন্দর জীবন। কিন্তু এখানকার সমাজ তা মানতে চায় না তারা এটাকে অপরাধ ভেবে দূরে সরিয়ে রাখে।

বৃষ্টি বলে, হে ভারত তুমি সাবালক হও আর কতদিন নাবালক হয়ে থাকবে। সারা পৃথিবীর দেশ যখন ছুটে উন্নত দিকে এগিয়ে চলেছে, তুমি কেন পিছিয়ে পড়বে। তুমি এগিয়ে চলো, উন্নত হও আমার মা আমার দেশ আমার জননী।শিল্প,মানবসম্পদ,ঐতিহ্য পাশাপাশি এগিয়ে চলুক সবুজের গতি নিয়ে। বিকশিত হোক শত শত মূর্খ জীবন।

তুমি কি বলো ভারতের সমাজ। তোমরা মানুষকে বাঁচতে দাও। সংসারে সম্মান বাঁচাতে গিয়ে আমাদের জীবনের সর্বস্ব উজাড় করে যেতে হয় বারেবারে। তবু সমাজের চেতনা ফেরে না। আইন মেনে নিলেও সমাজ মানে না। এই সম্পর্ক গুলো সুস্থ হোক স্বাভাবিক হোক। সমাজ মেনে নিলে, তবেই হবে ধন্য রাজার দেশ।

এই মূর্খ চুতিয়া সমাজের জন্য বৃষ্টি রুমকি অনিমেষ আর আবিরের মত সমকামীদের লুকিয়ে থাকতে হয় তাদের জীবন যাপনের স্বাভাবিক ছন্দ থাকেনা। আনন্দ থাকে না। উৎসব থাকে না। তারা মনে মনে মানসিক রোগে ভুগতে থাকে।

সমাজে তারা লেসবিয়ান, গে, বলে পরিচিত হয়। তর্জনী তুলে সমাজের কিছু লোক বলে, ওই দেখ ওই চুতিয়া সমকামী ছেলে হয়ে ছেলেকে বিয়ে করে আর শালি মেয়ে হয়ে মেয়েকে বিয়ে করে।

সমকামিতা অপরাধ নয় একদিন নিশ্চয়ই লেসবিয়ান যারা, তারা মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বৃষ্টি বলেছে আশার কথা। বৃষ্টি বলছে আর কয়েক বছরের মধ্যেই এই পবিত্র সম্পর্ককে সমাজ মেনে নেবে আশা করি।

রুমকি বলে, মৃত্যুর আগে আমি এই কামনা করি, লেসবিয়ান যারা, তারা মাথা উঁচু করে স্বাভাবিক সম্পর্কের মতই এই সম্পর্কেও খুশি হোক। সব লজ্জা কেটে গিয়ে ঘৃণার কালো মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে দেখা দিক আশার লাল সূর্য।

 

 

গাছ লাগানোর নেশা আমাদের ভূতের মত পেয়ে বসে ছিল। আমরা গাছ লাগাতাম বিডিও অফিসে প্রচুর গাছ পেতাম। এনে লাগাতাম একদম রাস্তার ধারে ধারে। সেনপাড়া তালাড়ি গ্রামে। এখন গাছগুলো বড় বড় হয়ে গিয়ে তারা আমাদের সেই ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়িয়ে দেয় । আমরা সেই ক্রিকেটদল ছোটবেলা থেকেই নাটক, তারপর যে কোন অনুষ্ঠান, 25 শে বৈশাখ পালন করতাম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন আমরা একটা ছোট্ট স্টেজ বানিয়ে সুন্দরভাবে পালন করতাম। প্রথমে গান গাইতো আমাদের পাড়ার মৌসুমী। তারপরে আবৃত্তি করত নয়ন। আরো অনেক ছেলে ছিল। তাছাড়া আমাদের ক্রিকেট দলের সবাই আমরা দেখাশোনা করতাম সকলকে। আমরা এইসব কাজ করতাম। তারপর রবীন্দ্র জয়ন্তী পালনের শেষে আমরা সবাইকে একটা করে কেক খেতে দিতাম। আমরা নিজেরাই চাঁদা তুলে কেক কিনে নিয়ে আসতাম।আমাদের দলে আমি মিলু বিশ্বরূপ এই তিনজন একসাথে সব সময় থাকতাম। আমরা তিনজন মোটামুটি দলটাকে পরিচালনা করতাম। তাই আমরা কোন অসুবিধা হলে কারো কাছে চাঁদা চাইলেই সহজেই পেয়ে যেতাম। একবার বন্যায় সব মাটির ঘর বাড়ি ভেঙে গেছিলো। আমাদের হাজরা পাড়ায়। তখন আমরা চাঁদা তুলে সেই পাড়ায় সকলের দেখাশোনা করেছিলাম। বন্যায় দু-চারজন ভেসে যাচ্ছিল। আমরা নৌকা করে তাদের হাত ধরে ছিলাম। এই সব স্মৃতি এখনো মনে পড়ে। মনে পড়লে খুব আনন্দ হয়। গর্ব হয় আমাদের কিশোরদলের সকলের।
আমার সঙ্গে কলেজের বান্ধবীর বিয়ে হয় নি। আমি রজত দাস। আমি দাস, বলে সে আমাকে বিয়ে করে নি। আমার বিয়ে হয়েছে সোমার সঙ্গে। এবার বয়স হয়েছে। তীর্থ ভ্রমণে যেতে মন হল। এখন সোমার সূত্র ধরে নতুন বন্ধু হয়েছে। ভ্রমণবিলাসী চারজন বেরিয়ে পরলাম ভ্রমণে। আমিও গেলাম।প্রথমে ওরা গেল মুকুটমণিপুর। সপ্তাহান্তে পিকনিক বা একদিনে ছুটিতে কাছাকাছি বেড়ানো অন্যতম জায়গা হল মুকুটমণিপুর।আমি রজত দাস আর সোমা দুজন স্বামী স্ত্রী। আর দুজন বন্ধু মিহির আর রমা।বাঁকুড়া পৌঁছে রমা বললো, চলো আমরা এখন কিছু খেয়ে নি তারপর আমরা মুকুটমণিপুরে উদ্দেশ্যে যাত্রা করব।রিমা জিজ্ঞাসা করল বাঁকুড়া থেকে মুকুটমণিপুর কত দূরে দাদা।মিহির বলল, প্রায় 55 কিলোমিটার হবে।তারপর খেয়ে দেয়ে ওরা রওনা হল বাঁকুড়া থেকে বাসে করে মুকুটমণিপুরে উদ্দেশ্যে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে তারা পৌঁছে গেল মুকুটমণিপুর। কংসাবতী নদীর তীরে অবস্থিত মুকুটমণিপুরে প্রাকৃতিক শোভা অনবদ্য। ঝাড়খন্ডের সীমানা ঘেঁষে মুকুটমণিপুরে রয়েছে দেশের বৃহত্তম নদী বাঁধ কংসাবতী। নদীর উপর বাঁধ দেখতে মানুষেরা ভিড় জমায়।তারা গিয়ে দেখল অনেক লোক আসে সাধারণভাবে নদীর তীরে পিকনিকের মজা নিতে। তারাও আনন্দ করতে মুকুটমণিপুর এসেছে।কংসাবতীর শীতল জলে স্নান করে ওদের পরিশ্রমের ক্লান্তি দূর হলো। তারা সেই দিনটা খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন ভোর বেলায় হতে, সূর্য ওঠা দেখতে গেল।
কংসাবতীর বাঁধ থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার দৃশ্য অপূর্ব। আবার পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আলোয় কংসাবতী তীরের সৌন্দর্য দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যাবে। রজত বলল আজ রাত্রিবাস করলেই বোঝা যাবে চাঁদের আলোয় কংসাবতীর তীরে সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য দেখতেই সবাই বেড়াতে আসে এখানে। আমরা সেখানে রাত্রি বাস করব।তারপর তারা চলে গেল লজে।রাত্রিবেলায় রজত সবাইকে নিয়ে বাইরে এল আর চাঁদের আলোয় সেই বাঁধের উপর হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। তাদের খুব ভালো লাগলো।রজত বলল-ওই নদীবাঁধ ছাড়াও মুকুটমণিপুরে আছে জৈনদের অন্যতম তীর্থস্থান কুড়িটি মন্দির সন্নিবিষ্ট পরেশনাথ পাহাড়, ডিয়ার পার্ক ঝিলিমিলি।মুকুটমণিপুরে একটি রাত্রি বাস করলে পরদিন ভোরে উঠে গাড়ি ভাড়া করে এই সমস্ত স্থান ঘুরে আসা যায়।
নদীয়া জেলায় পঞ্চাশটির মত হরিণ শাবক সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মিলবে। এখানে ব্যবস্থা আছে মুকুটমণিপুর থেকে 15 কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান। এখানে উপজাতি সম্প্রদায় হাতের তৈরি ঘর সাজানোর সামগ্রী বিখ্যাত।মিহিরকে বাঁকুড়ার একটি লোক বলল মুকুটমনিপুরে রাত্রি বাস করার জন্য কয়েকটি হোটেল রয়েছে। মুকুটমণিপুর খুব একটা দুর নয়। তবে হাওড়া থেকে মুকুটমণিপুর যাওয়ার ট্রেন বাঁকুড়া ষ্টেশনে নেমে বাসে বা গাড়িতে যেতে হয়। আর সড়ক পথে যেতে হলে কলকাতা থেকে 19 নম্বর জাতীয় সড়ক দিয়ে মুকুটমণিপুর যেতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা।ওখানে রাত্রি বাস করার পর সকাল বেলা উঠে ওরা ঠিক করল মায়াপুর যাবে। নবদ্বীপে মায়াপুরের দেখার জায়গা চৈতন্যদেবের জন্ম ভূমি। নবদ্বীপ তার প্রথম জীবনের লীলাক্ষেত্রও বটে। রিমা বললো আমার বহুদিনের শখ আমি ওখানে গিয়ে পুজো দেবো। মায়াপুরে গিয়ে আমি পুজো দিতে পারলে আমার মনস্কামনা পূর্ণ হবে।। তাই বস্তুত হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম তীর্থক্ষেত্রে পরিগণিত হয় নবদ্বীপ ধাম।
শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থান আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হল মায়াপুর।
কথা বলতে বলতে চলে এলো মায়াপুর। নবদ্বীপ থেকে বেরিয়ে গেল। নদীর তীরে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেখানে মন্দির।
তারা আশ্রয় নিল নবদ্বীপের একটি লজে। পাশাপাশি রয়েছে এবং চৈতন্য সম্প্রদায়ের মিলনভূমি নবদ্বীপ।রমা বললো চলো আমরা নৌকায় যাব। নবদ্বীপ থেকে। তারপর চারজন মিলে জলঙ্গি নদী পেরোলেই মায়াপুর। জলঙ্গি নদীতে নৌকা আছে অনেক। সেখানে মাঝিদের বলে তারা নৌকাবিহার করল এবং সেখানেই রয়েছে বিখ্যাত চন্দ্রোদয় মন্দির। মায়াপুর যাওয়ার জন্য কথা বললে অবশ্য কিছুটা ভুল বলা হবে।।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।