সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে রঞ্জন চক্রবর্তী (পর্ব – ৪)

0
57
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ

জীবনের অর্ন্তনিহিত বিশিষ্ট রূপটির প্রকাশই হল উপন্যাসের ভাব এবং তা প্রকাশের মাধ্যম হল ভাষা।ঔপন্যাসিকের প্রয়োগ পদ্ধতির উপর তাঁর সৃষ্টির সার্থকতা নির্ভর করে, এবং ভাষাই হল প্রয়োগ পদ্ধতির সেই মাধ্যম যার দ্বারা পাঠকের মনে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্লট, চরিত্র বা ঘটনার নির্মিতি সবই ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ পায় বলে বিষয়র সঙ্গে ভাষার সঙ্গতি থাকতে হয়। ভাষার প্রয়োগ যদি সুসমঞ্জস হয় তবেই ভাবের প্রকাশ সার্থকতা পায়।আর ভাব ও ভাষার শৈল্পিক প্রকাশেই একটি উপন্যাস সার্থক সৃষ্টিকর্ম হয়ে ওঠে।উপন্যাস রচয়িতা নিজস্ব বাকশৈলী বা স্টাইল তৈরী করে ভাষা-ব্যবহারে নতুন ব্যঞ্জনা আনতে চান বলেই আঙ্গিকের বিচারে উপন্যাসের ভাষা এত বেশী গুরুত্ব পায়।একইসঙ্গে শব্দের অর্থবহন ক্ষমতার উপর রচনার বাস্তবতা অনেকটাই নির্ভর করে বলে সঠিক শব্দচয়নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।সমাজ ও চরিত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপন্যাসের বিষয়বস্তুও পাল্টায় এবং ভাষাকেও তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হয়। বিষয়বস্তু পরিবেশনের আধারই হল শিল্পশৈলী এবং শিল্পশৈলীর বিচারে এই আধার হল প্লট।
জীবন সম্পর্কে লেখকের যে ধারণা তা মানবচরিত্রকে কেন্দ্রে করেই আবর্তিত হয়। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র লেখকের জীবন সম্পর্কে ধারণাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে জীবন সম্পর্কে লেখকের প্রতীতি(conception) উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। উপন্যাস যেহেতু জীবনের প্রতিফলন, সেহেতু জগৎ ও জীবনের কথাই ঔপন্যাসিকের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। এটা করতে হলে তাঁকে চরিত্রের সাথে একাত্ম হতে হয়। তাই মানুষের চরিত্রচিত্রণ, চরিত্রবিশ্লেষণও অন্তর্জগতের স্বরূপ প্রকাশ করা উপন্যাসের ক্ষেত্রে সবথেকে বেশী তাৎপর্যপূর্ণ। কোন কোন সমালোচক মানুষের মনের নানারকম জটিলতা, চিন্তা-ভাবনা, পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মানবমনের এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে বলেছেন মনস্তাত্বিক বাস্তবতা বা psychological realism।
উপন্যাসের কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ হল –
১. উপন্যাস বর্ণনাত্মক গদ্যে লেখা একটি বিশেষ theme-এর ভাষায় রূপায়ন যার মুখ্য উদ্দ্যেশ্য নব নব তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্রসৃষ্টি।
২. উপন্যাসের ঘটনা পরম্পরা ও বিভিন্ন চরিত্রগুলি কার্যকারণ সূত্রে অবিচ্ছিন্নভাবে গাঁথা এবং সবই একটি বিশেষ কেন্দ্রীয় ভাবনার অধীন। চরিত্রগুলির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ নিপুণভাবে বিশ্লেষণের দ্বারা তাদের প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে। কোন চরিত্রের বাহ্যিক রূপ ও ক্রিয়ার প্রকৃতি অনুসরণ করে তার অন্তরের অন্তরতম স্থানে পৌঁছানো যায়। আর সেই ক্রিয়াসঞ্জাত প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করেই চরিত্রের ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয়বিধ সম্পর্কের বাস্তবসম্মত মূল্যায়ণ করা যায়।
৩. উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সমস্যার অস্তিত্ব। আধুনিক জীবনের জটিলতা ও যুগের যন্ত্রণা মানুষের জীবনে সমস্যার জন্ম দেয়। সমস্যা নানারকম হতে পারে – নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি। উপন্যাসের পাতায় এই সমস্যায় দীর্ণ, দ্বন্দ্বময় জীবনের সাহিত্যিক প্রকাশ ঘটে। সমাজ-জীবনের বিভিন্ন সমস্যা মধ্যে দিয়ে গিয়ে ব্যক্তিমানুষের নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়। উপন্যাসে সমস্যার জন্ম ও তার থেকে মুক্তির চেষ্টা দুইই স্বীকৃতি পেয়েছে।
৪. পুরুষ ও নারীর অন্তরঙ্গ জীবনের সামগ্রিক রূপায়নই মুখ্যত উপন্যাসের উপজীব্য। সুতরাং কাহিনীতে জীবনরস সঞ্চারিত করা একান্তভাবে আবশ্যক। সাধারণত নরনারীর প্রেমকে কেন্দ্র করে তাদের অর্ন্তলোকের কথা উদঘাটিত হয়।
৫. উপন্যাসের পটভূমি এবং সময়কাল নির্বাচন করে নিয়ে ঔপন্যাসিককে এগোতে হয়। একইসঙ্গে বিষয়বস্তু ও লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার করা দরকার।
৬. উপন্যাসে জীবন ও সমাজের বাস্তব রূপটি ধরা পড়ে। সমালোচকরা অনেকেই বাস্তবধর্মীতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট এই বাস্তবধর্মীতা কেবলমাত্র রূপগতই নয়, একইসঙ্গে তা ভাবগতও বটে।
৭. সামগ্রিকভাবে চরিত্রের রূপায়ণ করতে হলে কল্পনাশক্তির প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু তার মাত্রা যেন বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে না যায়। সেক্ষেত্রে উপন্যাসের মূলগত ধর্ম থেকে বিচ্যুতির আশঙ্কা থাকে।
৮. ঔপন্যাসিকের জীবন ও সমকালীন সমাজকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতার নির্যাস ও তৎসঞ্জাত উপলব্ধির উপর উপন্যাসের বিষয়বস্তু নির্ভর করে। এই কারণে উপন্যাসের অন্তর্নিহিত আবেদন পাঠকের জীবনবোধকে ছুঁয়ে যায়। এখানে মনে রাখতে হবে শুধুমাত্র লেখকের নিজের অভিজ্ঞতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাই সাহিত্য পদবাচ্য হয় না, তা বড়জোর সংবাদ (report) হতে পারে। সংবাদ ও সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য একেবারে মূলগত। লেখকের ভাবকল্পনা ও বর্ণনাশৈলী যখন রসের সঞ্চার করতে পারে, তখনই সংবাদ সাহিত্যের স্তরে উন্নীত হয়।
ই. এম. ফরস্টার বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ লক্ষণ মিলিয়ে উপন্যাসের সাতটি অপরিহার্য লক্ষণ বা উপাদানের কথা লিখেছেন। এই লক্ষণগুলি হল – story, people, plot, fantacy, prophecy, pattern, rhythm। তবে তিনি মোটের উপর জোর দিয়েছেন বহিরঙ্গ লক্ষণের উপর, অর্থাৎ – story, people ও plot তাঁর কাছে অপেক্ষাকৃত বেশী গুরুত্ব পেয়েছে। বহিরঙ্গ লক্ষণগুলি, অর্থাৎ – fantacy, prophecy, pattern ও rhythm তাঁর বিচারে উপন্যাসের অপ্রধান বিষয় (E. M. Forster :Aaspects of the Novel, Penguin Books, New York, 1982)।
শ্রেণীতত্ত্বের বিচারে বহিরঙ্গ বা গঠনগত রূপ ও অন্তরঙ্গ রূপ অনুসারে উপন্যাসের শ্রেণীবিভাগ করা হয়। আদিযুগ থেকে অদ্যাবধি উপন্যাসের শ্রেণীতত্ত্বের পর্যালোচনা করতে দেখব যে দুটি শ্রেণী প্রাধান্য পেয়েছে – Novel ও Romance। উপন্যাস বা Novel হল সমকালীন বাস্তব ঘটনা ও চরিত্রের উপর ভিত্তি করে রচিত কাহিনী। অন্যদিকে রোমান্স হল কোন অতীত বা ঐতিহাসিক ঘটনা বা চরিত্রের উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা কাল্পনিক কাহিনী।
উপন্যাসের মধ্যে কল্পনাবিলাসের সম্ভাবনা খুব একটা বেশী নেই। বরং সমাজচিত্র অঙ্কণ, সমাজজীবন তথা ব্যক্তিজীবনের বিশ্লেষণ এবং মানুষের মনের বিশ্লেষণ উপন্যাসের ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে ওঠে। রোমান্সের ক্ষেত্রে কিন্তু লেখক জীবনের গৌরবময় দিকগুলোর বা মুহুর্তগুলোর উপর তুলনায় বেশী নির্ভর করেন। ইংরেজী সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মধ্যযুগে ও এলিজাবেথীয় যুগে অনেক কাহিনী লেখা হয়েছিল যার মধ্যে অলৌকিক ও অসম্ভব ঘটনা, রহস্যঘেরা পরিবেশ ও উর্বর কল্পনাশক্তি প্রাধান্য পেয়েছিল। এই কাহিনীগুলি রোমান্স বলে পরিচিত এবং এদের প্রভাবেই আধুনিক যুগে রোমান্স রচিত হয়েছিল। তবে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি থাকলেও রোমান্স-এর মধ্যে যে বাস্তবের সঙ্গে ঐক্য থাকেনা তা নয়। ঘটনা যদি অতিপ্রাকৃত হয়েও থাকে, তাহলেও সেই ঘটনাকে সম্ভাব্যতার রূপ দিয়ে বাস্তবের যতটা সম্ভব কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা করতে হয়।
অষ্টাদশ শতকের লেখক Horace Walpole-এর‘The Castle of Otranto’ (১৭৬৪),Ann Radcliffe-এর‘The Mysteries of Udolpho’ (১৭৯৪), Matthew Gregory Lewis-এর ‘The Monk’ (১৭৯৬) প্রভৃতি সাহিত্যকর্ম Gothic romance নামে পরিচিত। সাহিত্যমূল্যের বিচারে এই রচনাগুলি যেমনই হোক না কেন পরবর্তী যুগের ইংরেজি উপন্যাসে এদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে।ব্রন্টি বোনেদের রচনায় এবং ডিকেন্সের রচনায় রোমান্সের ছায়া দেখা যায়। ওয়ালটার স্কটের ‘Ivanhoe’, ‘Kenilworth’, ‘The Bride of Lammermuir’ ইত্যাদি উপন্যাস সার্থক রোমান্সের উদাহরণ, যেখানে অতীতের জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে।


Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •