সাপ্তাহিক টুকরো হাসিতে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়-তেতাল্লিশ

0
98
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


টুকরো হাসি – তেতাল্লিশ

আমারেও তো বাঁচতে হইবে

     সাত সকালে গুলেদা বাড়িতে এসে হাজির। বলল, ‘আমার লগে একটু যাবি?’
বললাম, ‘কোথায়?’
গুলেদা বলল, ‘ডাক্তারের কাছে।’
গুলেদা আর ডাক্তার! মানতে পারলাম না। কোনোদিন ডাক্তারের কাছে যেতে দেখিনি গুলেদাকে। বললাম, তোমার কি হয়েছে?
‘আমার কি হইছে তা কি আমি কইতে পারুম? কইবে তো ডাক্তার।
    ‘তবু বল। তোমার কি অসুবিধা হচ্ছে?’
    আমি তর সব কথার জবাব দিতে পারুম না। লগে চল। ডাক্তার কি কইবে হেইয়া তো শোনতেই পারবি।’
   একটা টেনশন নিয়ে বেরুলাম। গুলেদা চট করে ডাক্তারের কাছে যায় না। বলে শরীর খারাপ নিয়ে মাথা বেশি না ঘামাতে। ভাবলাম আমার কিছু জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে না। নিজে যা বলার বলতে হলে বলবে। না হলে আগ বাড়িয়ে জানতে চাওয়ার দরকার নেই।
    গোটা রাস্তায় যেতে যেতে অনেক কথা হল। অসুখ নিয়ে গুলেদা কিছু বলল না। একথা সেকথা বলতে বলতে ডাক্তারের চেম্বারের সামনে আমরা হাজির হলাম।
    যখন ডাক পড়ল গুলেদার সঙ্গে ঢুকলাম ডাক্তারবাবুর চেম্বারে। গুলেদাকে শুয়ে পড়তে বললেন তিনি। বাধ্য ছেলের মতো গুলেদা ডাক্তারবাবু যা বললেন সব শুনল।
    গম্ভীর মুখে নিজের চেয়ারে বসলেন ডাক্তারবাবু। আমার পাশে এসে বসল গুলেদা।
    ডাক্তারবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘করেছেন কি? এতো একেবারে আধমরা করে আমার কাছে নিয়ে এসেছেন।’ 
    প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বললেন, ‘এখন আমি যেমন বলব সবকিছু তেমন করে মেনে চলতে হবে। দেখছি কতদূর কি করা যায়। আশা করছি ঠিক করে দিতে পারব। তবে অস্থির হলে চলবে না। আমার উপর ভরসা রাখতে হবে।’
    মোটা টাকা ভিজিট দিয়ে প্রেসক্রিপশন হাতে বেরিয়ে আসার আগে ডাক্তারবাবু বললেন, ‘আমি যে জায়গা থেকে টেস্টগুলি করতে বললাম সেটা মনে রাখবেন। অন্য কোথাও থেকে টেস্ট করালে আমি কিন্তু দেখব না।’
    গুলেদার এইরকম অবস্থা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। বউদিকে নিশ্চয়ই জানায়নি কিছু। গুলেদার বাড়িতে গিয়ে বউদিকে সব জানাতে হবে।
   ডাক্তারবাবু বললেন, ‘অন্য সবার টেস্ট ঠিক হয় না। ওগুলি দেখার কোনো মানে নেই। আর ওষুধগুলো যে দোকান থেকে কিনতে বলেছি সেখান থেকেই কিন্তু কিনবেন।’
   গুলেদা বলল, ‘ঠিক আছে আপনি যা কইলেন সবটাই পালন করুম।’ আমাকে বলল, ‘চল ওষুধ কিনা আনি।’
    সাজানো-গোছানো একটা ওষুধের দোকানে আমরা যেতেই প্রেসক্রিপশন দেখে একগাল হাসল কাউন্টারের লোকটি। বলল, ‘আগে তো দেখিনি।’
    গুলেদা বলল, ‘এহন ভালো কইরা দেইখ্যা লন। পরে যে আর দ্যাখতে পাইবেন, তার তো কোনো গ্যারান্টি নাই।’
    লোকটি বলল,  ‘অত চিন্তা করবেন না। যে ডাক্তারের কাছে গেছেন খুব ভালো ডাক্তার। আপনাকে কিছুদিন একটু লেগে থাকতে হবে। আমাদের দোকান থেকে ওষুধ নেবেন আপনাকে আর চিন্তা করতে হবে না। এই ওষুধগুলি তো আর এলিতেলি দোকানে পাবেন না।’
    ওষুধ আর প্রেসক্রিপশন নিয়ে গুলেদা বাইরে বেরিয়ে বলল,  ‘কি খাবি ক।’
    বললাম,  ‘না। এখন কিছু খাব না। চল আগে তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।’
    ‘ওই রকম দুক্কু দুক্কু মুখ কইরা কথা কইস না তো। চল।’ গুলেদা আমাকে টানতে টানতে নিয়ে ঢুকল একটা কচুড়ির দোকানে। খেতে খেতে বলল, আর  যা যা খাইতে ইচ্ছা করে কবি।’
    আমাকে বলতে হল না। গুলেদা একটার পর একটা আইটেম বলে গেল। খাওয়া হয়ে গেলে বাইরে বেরিয়ে বলল, ‘একটা কাজ আছে।’ এই বলে আমাকে নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল একটা হাইড্রেনের সামনে।
    ‘ভয় পেয়ে গেলাম। বললাম, শরীর খারাপ করছে নাকি তোমার? বমি করবে?’
    ‘আরে না।’ কথাটা বলতেই প্রেসক্রিপশন আর ওষুধগুলি গুলেদার হাত থেকে হাইড্রেনের ভিতর পড়ে গেল।
    আমি হায় হায় করে উঠলাম। বললাম,  ‘সবই তো পড়ে গেল তোমার হাত থেকে। শরীর খারাপ লাগছে?’
    বলল,  ‘না না আমার কিস্‌সু হয় নাই।’
    ‘মনে হচ্ছে তোমার হাতে কোনো সাড় নেই। তোমার হাত থেকে যে সব পড়ে গেল!’
    ‘পড়ে নাই। আমি নিজে থিকাই হেগুলানরে ফেইল্যা দিছি।’
   ‘কি বলছ? তাহলে তুমি ডাক্তারের কাছে গেলে কেন? কতগুলো টাকা ভিজিট দিলে!’
    ‘দ্যাখ আমি গেলাম কইয়াই তো ডাক্তারের অতগুলান টাকা রোজগার হইল। হ্যাসে কইল অমুক দোকান থিকা ওষুধগুলা কেনতে। টেস্ট করাইতে হইলে ওনার পছন্দ মতো জায়গা থিকাই করাইতে হইব।’
    ‘সবই তো জানি। আমি তো তোমার সঙ্গে ছিলাম।’
   গুলেদা বলল, ‘তাইলেই বোঝ। ফিয়ের টাকা তো পাইলই। এছাড়া ওনার পরামর্শে ওই ওষুধের দোকান থিকা  আর উনি যেহান থিকা কইছে সেহান থিকাই টেস্ট করাইতে হইব। ক তো ক্যান?’
    ‘কেন?’ আমি বললাম।
   ‘হেইয়া বুঝলি না? ওইহান থিকা তো ডাক্তারবাবু কমিশন পাইবে।’
    ‘পাবে তো পাক তাতে তোমার কি? তোমার অসুখ সারানো নিয়ে কথা।’
    ‘আমার তো কোনো অসুখই নাই।’
    ‘তাহলে এলে কেন?’
    ‘আমি না আইলে ডাক্তারবাবু কি অতগুলান টাকা পাইত?’
    ‘টাকা পেত না তো তাতে তোমার কি?’
    ‘আরে ডাক্তারবাবুরে তো বাঁচতে হইবে।’
    ‘তাহলে ওষুধগুলি কিনলে কেন?’
    ‘কও কি!ওষুধ কিনুম না? কত হুন্দর কইরা সাজাইছে দোকানডারে। খরচা হইছে না?’
    ‘ও তো অনেকেই সাজায়। তাতে কি হল?’
    ‘যদি ওষুধ বিক্রি না হয় তাহলে চলবে কি করে? দোকানদাররে তো বাঁচতে হইবে।’
    আমি বললাম, তাহলে ওষুধগুলি তুমি না খেয়ে ফেলে দিলে কেন?’
    ‘ফেলুম না? আমারেও তো বাঁচতে হইবে।’  

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •