ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ২৫)

0
79
Spread the love

আলাপ

হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুংরী ঘরানার সফর শেষে এবার অল্প করে কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কথা বলতেই হবে। কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মূলতঃ দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলি, যেমন তামিলনাড়ু, কর্নাটক, কেরালা ও অন্ধ্রপ্রদেশে প্রচলিত হলেও এর মূল কেন্দ্রস্থল হলো তামিলনাড়ু।
ভারতীয় সঙ্গীতের জন্ম বৈদিক যুগে শামবেদ গানের মাধ্যমে, যেখানে ঋষিদের মুখনিঃসৃত বাণী তাঁরা গানের মতো বা মন্ত্রের মতো করে উচ্চারণ করতেন এবং শিষ্যরা সেই গান শুনে শুনেই মনে রাখতেন। হিন্দুস্থানী ও কর্নাটকী দুই সঙ্গীতেরই জন্ম এই বেদগান থেকে এবং দুইয়েরই আদি বাণী রচিত হয় সংস্কৃতে । কিন্তু পরবর্তী কালে উত্তরভারতে বারোশো ও তেরোশো শতকে সুলতানী আমলে সঙ্গীতে ইসলামী ও পার্সি প্রভাব এসে পড়ে। আমীর খুসরোর সময়ে কাওয়ালী ইত্যাদি গানের সঙ্গে ভারতীয় হাভেলী সঙ্গীত ও ভক্তি সঙ্গীতের মিশ্রণে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জন্ম হয়। এরপর মুঘল সম্রাট আকবরের সময় মিয়াঁ তানসেন উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ধ্রুপদ ও খেয়াল গায়নের সূচনা করেন। তাই তাকেই হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জনক বলা হয়।   
কিন্তু দক্ষিণ ভারতে এর প্রভাব পড়েনি। দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতের পদ্ধতি ও নিয়মকানুন তখনো দৃঢ়বদ্ধ হয়নি।
অষ্টম শতাব্দী থেকে দক্ষিণ ভারতে ভক্তি আন্দোলন শুরু হয়। বিভিন্ন সাধু সন্ন্যাসীরা ভারতীয় সনাতন হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থান ঘটানোর প্রচেষ্টা শুরু করেন। বৈষ্ণব বা যারা বিষ্ণুভক্ত, শৈব বা যারা শিবের ভক্ত, শাক্ত বা যারা শক্তির উপাসক ও স্মার্ত বা স্মৃতিশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ এই চারভাগে ভক্তি আন্দোলন চলে এবং ক্রমে দক্ষিণ থেকে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে উত্তরভারতেও ছড়িয়ে পড়ে। কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রকৃত উত্থান এই ভক্তি আন্দোলনের সময় ও ভক্তি সঙ্গীত থেকে।
তেরোশো ও চোদ্দশো শতাব্দীতে দক্ষিণভারতের বিজয়নগর সভ্যতা অত্যন্ত শক্তিশালী রূপধারণ করে। বিজয়নগরের হিন্দু রাজারা এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপনে সমর্থ হন। সেই সময় বিজয়নগরে কর্নাটকী শাস্ত্রীয়সঙ্গীত প্রচলিত হয়। পুরন্দরদাস নামে এক সন্ন্যাসীকেই কর্ণাটকী সঙ্গীতের জনক বলা হয়। তিনি কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল পদ্ধতিগুলি ও গায়নশৈলী নির্ধারণ করেন। এরপর রঘুনাথা নায়ক এই পদ্ধতিগুলি লিখিত আকারে “সঙ্গীত সুধা” বলে একটি বইতে লিপিবদ্ধ করেন। রঘুনাথা নায়কের ছেলে ভিজয়রাঘব নায়ক এবং ভেঙ্কটমাখি এই বইয়ের কাজ সম্পূর্ণ করেন ও কর্ণাটকী সঙ্গীতকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন।
তবে উত্তর ও দক্ষিণ ভারত দুই অঞ্চলেই ভারতীয় সঙ্গীতের ভিত ছিলো স্বর, শ্রুতি, রাগ ও তাল এর ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এরপর আঠেরশো ও উনিশশো শতাব্দীতে মাইসোর, ট্রাভাঙ্কোর-এর রাজারা ও তাঞ্জোরের মারাঠা শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আরো প্রতিষ্ঠা লাভ করে।    
এবার দেখে নেওয়া যাক এই দুই ধরণের সঙ্গীতের মূল তফাত কোথায় কোথায়। আমরা জানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভিত হল সাতটি স্বর সা রে গা মা পা ধা নি। হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এই সাতটি স্বরের আরো রূপান্তর ঘটিয়ে সাতটি শুদ্ধ, চারটি কোমল ও একটি কড়ি অর্থাৎ মোট বারোটি স্বর তৈরী করা হয়। সা, কোমল রে, শুদ্ধ রে, কোমল গা, শুদ্ধ গা, শুদ্ধ মা, কড়ি মা, পা, কোমল ধা, শুদ্ধ ধা, কোমল নি, শুদ্ধ নি এই বারোটি স্বর নিয়েই হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। এই স্বরগুলির নানারকম সমন্বয়েই বিভিন্ন রাগ গড়ে উঠেছে। উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ছয়টি ঠাট থেকে ছয় রাগ ও ছত্রিশ রাগিনী তৈরী হয়েছে।
অপর পক্ষে, কর্নাটকী সঙ্গীতে সাতটি স্বরের নানা রূপান্তর ঘটিয়ে মোট সতেরোটি স্বর তৈরী করা হয়েছে। ভরত মুনীর নাট্যশাস্ত্রে যে বাইশটি স্বরের উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলির মধ্যে কয়েকটি লুপ্ত হয়ে বা মিশে গিয়ে এই সতেরোটি স্বরের জন্ম। এগুলি হলো সা, কোমল রে, শুদ্ধ রে, তীব্র রে, কোমল গা, শুদ্ধ গা, তীব্র গা, মা, কড়ি মা, তীব্র মা, পা, কোমল ধা, শুদ্ধ ধা, তীব্র ধা, কোমল নি, শুদ্ধ নি, তীব্র নি। এই তীব্র রে শুনতে প্রায় গা এর কাছাকাছি, তীব্র মা প্রায় পা এর কাছাকাছি ইত্যাদি। এর ফলে এই সতেরোটি স্বরের নানা সমন্বয়ে মোট বাহাত্তরটি রাগ তৈরী হয়েছে। এই সম্পূর্ণ রাগগুলিকে বলে মেলকান্তা রাগ। এর মধ্যে ছত্রিশটিতে শুদ্ধ মা ব্যবহার হয়েছে আর বাকী ছত্রিশটিতে কড়ি মা বা তীব্র মা ব্যবহার হয়েছে। 
উত্তরভারতীয় সঙ্গীতে সা রে গা মা পা ধা নি সা স্বরগুলি সোজা উচ্চারিত হয়। স্বরের কোন আন্দোলন ঘটানো হয় না। যদিও বিভিন্ন রাগ গাওয়ার সময় সোজা এক স্বর থেকে অন্য স্বরে না গিয়ে মীড় বা দুই স্বরের মধ্যের অসংখ্য স্বরের ওপর দিয়ে সুরেলা ভাবে গলা নিয়ে যাওয়া হয়। বিভিন্ন রাগ গাওয়ার সময় এই মীড় কীভাবে ব্যাবহার করতে হবে, তা সম্পূর্ণ গুরু-শিষ্য পরম্পরায় শিখতে হয়। কোথাও তা লিখিত নয়। উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রাগগুলি স্বরের ওপর নির্ভরশীল।
অপর পক্ষে কর্ণাটকী সঙ্গীতে প্রতিটি স্বর উচ্চারণের নিজস্ব লিখিত পদ্ধতি আছে। স্বরগুলি সোজা উচ্চারিত হয় না। প্রতিটি স্বর এক একরকম ভাবে আন্দোলিত হয়ে উচ্চারিত হয়। এই আন্দোলনের সময় মূল স্বরের দুদিকে যে সব মাত্রায় গলা লাগে সেগুলিকে বলে শ্রুতি। দক্ষিণভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রতিটি স্বরের সঙ্গে ব্যবহৃত শ্রুতিগুলি লিখিত থাকে। শ্রুতি হলো দুটি স্বরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছোট মাত্রা যা আমাদের কানে ধরা পড়ে। দক্ষিণভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রাগগুলি স্বর ও শ্রুতির ওপর নির্ভরশীল।
উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রাগগুলি গাওয়া এবং বাজানো যায়। গানের পাশাপাশি একক ভাবে সেতার, সরোদ, সানাই ইত্যাদি নানাধরণের যন্ত্র বাদন শোনা যায়। অপর পক্ষে কর্ণাটকী সঙ্গীতে রাগগুলি মূলতঃ গায়নের জন্যই তৈরী করা হয়। গায়নের জন্য যে বন্দিশগুলি তৈরী করা হয়, তাকে বলা হয় কৃতি।
উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে যে ধরণের বাদ্যযন্ত্রগুলি শোনা যায় তা হলো তানপুরা, তবলা, পাখোয়াজ, সেতার, সরোদ, বাঁশী ইত্যাদি এবং হারমোনিয়াম। অপরপক্ষে দক্ষিণভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে যে বাদ্যসন্ত্রগুলি শোনা যায় তা হলো বীণা, রুদ্রবীণা, ঘটম, মৃদঙ্গম, বেহালা ইত্যাদি।
উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারাগুলি হলো ধ্রুপদ, খেয়াল, তারানা, ঠুমরী, দাদরা, গজল ইত্যাদি। কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারাগুলি হলো আলপনা, নিরাভল, পল্লবী, রাগম, স্বরকল্পনা, তানম, তানি আবর্তনম । তবে উত্তরভারতীয় সঙ্গীতে প্রতিটি ধারার সঙ্গীত সাধারণতঃ আলাদাভাবে গীত হয়।  দক্ষিণভারতীয় সঙ্গীতে বিভিন্ন ধারাগুলি একই রাগে একসঙ্গে পরিবেশিত হতে পারে।
উত্তরভারতীয় সঙ্গীতে বিভিন্ন রাগ কিভাবে প্রয়োগ করে গান গাওয়া হবে, তা একেবারেই লিপিবদ্ধ নয়। একদিকে রাগগুলিতে কী কী স্বর লাগবে এবং বাদী ও সমবাদী স্বর কোনগুলি তা একেবারে নির্ধারিত এবং লিখিত। অপরদিকে বন্দিশগুলি বিখ্যাত গুরু বা শিল্পীরা মুখে মুখে রচনা করে গাইতেন এবং তা যুগ যুগ ধরে প্রচলিত হয়ে আজকের যুগে এসে পৌঁছেছে। খেয়ালের প্রচলন হওয়ার পর রাগ গায়নের পদ্ধতি, রাগের বিস্তার ও বঢ়হত সম্পূর্ণ ভাবে গায়কের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। গুরু শিষ্য পরম্পরায় বিভিন্ন ঘরানায় তার প্রসার ঘটে। আজও একজন শিল্পী যখন খেয়াল গান তখন প্রতিবার একই রাগ তিনি একরকম ভাবে গাইতে পারেন না। তারানা, ঠুমরী, গজল প্রতিটি ধারাতেই এই স্বাধীনতা আছে।  
দক্ষিণভারতীয় সঙ্গীতে এই স্বাধীনতা কম। প্রতিটি রাগ এবং তার বিস্তার ও বাঢ়হত পদ্ধতি পূর্ব নির্ধারিত এবং লিখিত। তবে কিছু কিছু পরিবর্তন করা যায়, যাকে স্বরকল্পনা বলা হয়।
আলপনা যখন গাওয়া হয় তখন তাল ছাড়া অতি ধীর লয়ে একটি রাগকে বিস্তারের মতো গাওয়া হয়। প্রথমে নিচের স্বরগুলি প্রয়োগ করে, তারপর মধ্যস্বরের প্রয়োগে ও শেষে উঁচুর দিকে স্বরপ্রয়োগে ধীরে ধীরে রাগের প্রকাশ ঘটানো হয় এবং একেবারে শেষে অল্প বন্দিশও থাকে।
নিরাভলে সাধারণতঃ বন্দিশের একটি বা দুটি লাইনই বারবার তাল ও সুরের নানারকম পরিবর্তন করে করে গাওয়া হয়।
কল্পনাস্বরমে রাগের বিভিন্ন স্বরকে নানা সুরে এবং তালের পরিবর্তন করে গাওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবার ঘুরে এসে সমে পড়তে হয়। মূল তাল কিন্তু একই আবর্তনে ঘুরবে। তালের আবর্তনের মধ্যেই যা কিছু সুরের ও লয়ের পরিবর্তন ঘটবে।
তানমে থা, নোম, তোম, আ, নোম, তা ইত্যাদি কথা দিয়ে রাগের প্রকাশ ঘটানো হয়।
রাগম তানম পল্লবী – দক্ষিণভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যে কোন বড়ো অনুষ্ঠানে গাওয়ার সময় এটি করা হয়। এর শুরু হয় আলপনা অংশ দিয়ে। তারপর তানম করা হয়। সবশেষে পল্লবী। পল্লবী হলো একটি গানের থিম বা মূলভাব প্রকাশক লাইন। অনেক সময় গায়কই এই লাইনটি রচনা করেন। নিরাভল ব্যবহার করে নানা তালে ও সুরের পরিবর্তনে এই পল্লবী লাইনটি গাওয়া হয়।
তানি আবর্তনম – একটি বড়ো অনুষ্ঠানে গায়ক তাঁর অংশগুলি অর্থাৎ রাগম তানম পল্লবী সম্পূর্ণ করার পর তালবাদক মৃদঙ্গম বা ঘটমে অনেক ধরণের লয় অনেকক্ষণ বাজিয়ে অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। একেই তানি আবর্তনম বলা হয়।
উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালের ব্যবহার আছে ঠিকই কিন্তু গানে তালই একমাত্র প্রধাণ নয়। সাধারণতঃ উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয়সঙ্গীতে ত্রিতাল, আদ্ধা, যৎ, একতাল, চৌতাল, ঝাঁপ, দাদরা ইত্যাদি ব্যবহার হয়। অপরপক্ষে কর্নাটকী শাস্ত্রীয়সঙ্গীতে লয় এবং তালের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন এবং লয়ের বিভাগ সুনির্দিষ্ট। মধ্য বা অনুদ্রুতম লয় হলো বিলম্ব লয়ের দ্বিগুণ আর দ্রুতম লয় মধ্য লয়ের দ্বিগুণ। সবসময় হাতে তাল দিয়ে লয়, তালি এবং খালি অর্থাৎ সম ও ফাঁক দেখিয়ে গান করা হয়। যে তালগুলি মূলতঃ ব্যবহার হয়, তা হলো অত, ধ্রুব, এক, ঝম্প, মত্ত, রূপক, ত্রিপুট।
আর বিশেষ গভীর আলোচনায় না গিয়ে উত্তরভারতীয় মালকোশ এবং দক্ষিণভারতীয় সমতুল্য রাগ হিন্দোলম পাশাপাশি শুনুন। তাহলেই দুই ধরণের সঙ্গীতের তফাত স্পষ্ট হবে। গেয়েছেন শ্রীরঞ্জিনি (দক্ষিণভারতীয়) এবং গায়ত্রী (উত্তরভারতীয়)।


Spread the love