সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৪৪)

0
32
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালিশির রায়

কিস্তি – ৪৪

আচমকা উঠোনে কিছু ভারি পায়ের শব্দে ছিঁড়ে যায় তার চিন্তাজাল। মনে পড়ে যায় সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে দরজা দিতেই ভুলে গিয়েছিল সে। মুখ তুলে দেখে দরজা খোলা পেয়ে বিনা বাধায় উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে মুখে কাপড় বাঁধা ৮/১০ জন লোক। সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই ওদের মধ্যে ষণ্ডা মার্কা একটা লোক বলে ওঠে , যা বলছি কান খুলে শুনে রাখ। কাল সকালে থানায় গিয়ে অভিযোগটা তুলে নিবি।আর তারপরে পুলিশ যাদের ধরে নিয়ে গিয়েছে তাদের চেনাতে নিয়ে গেলে বলবি ওরা কোন দোষের দোষী নয়। না হলে ওরা ১৩ জন ধর্ষণ করেছে, আমারা ৫০ জন মিলে তোদের মা–মেয়েকে ধর্ষণ করে রাতারাতি সোনাগাছিতে বেচে দেব। কেউ জানতে ও পারবে না। কি, বুঝতে পারলি কিছু ?
অঞ্জলি বুঝতে পারে লোকগুলো আসলে সুহাসবাবুর দলের। এতদিনে সে বুঝে গিয়েছে শঠের সঙ্গে লড়তে গেলে শঠতার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তাই সে সেই পথই ধরে। খুব মোলায়েম গলায় বলে , সুহাসবাবুও আমাকে ওই কথাই বলেছিলেন। তখন অবশ্য আমি রাজী হই নি। পরে ভেবে দেখলাম যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে। ওরা শাস্তি পেলেও তো আমার কিছু লাভ হবে না।বরং অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্রের চাকরিটা পেলে আমরা দুটো খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারব।
—- এই তো বুদ্ধিমানের মতো কথা। তাহলে সকালেই থানায় চলে যাবি। অফিসারকে
আমাদের সবকিছু বলা থাকবে। যা করার উনিই করে দেবেন।
—– কিন্তু আমার চাকরিটা যাতে হয় তা দেখবেন কিন্তু।
—- সে হবে ক্ষণ। লোকগুলো আগে তো জেল থেকে বেরিয়ে আসুক, তারপর চাকরির ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
সুহাসদা যখন বলেছেন তখন কাজটা হয়ে গেলে চাকরিও পাকা। তাহলে সেই কথাই রইল। সকালেই থানা চলে যাবি।
বলেই বিজয় গর্বে বেরিয়ে যায়। ওরা ভাবতেও পারে নি এত সহজে তাকে রাজী করানো যাবে। তাদের সুহাসদা যে কাজ করতে পারে নি সেই কাজ তারা এক হুমকিতেই হাসিল করে ফেলল , তাই বিজয় গর্ব তো হবেই। সুহাসদার কাছেও তাদের প্রেস্টিজ অনেকখানিই বেড়ে যাবে। ওরা যে আসলে সুহাসবাবুরই লোক তা তো ওদের কথাতেই প্রমান হয়ে গেল। তার পাতা ফাঁদে মাথা গলিয়ে সব তো নিজেরাই উগলে দিল। নিজে চাকরির প্রলোভন দেখিয়েও তাকে মামলা থেকে সরে দাঁড়াতে রাজী করাতে না পেরে হুমকি দিতে লোক পাঠিয়েছিলেন সুহাসবাবু। রাজনৈতিক নেতারা কাজ হাসিলের জন্য সব পারে।চিন্তায় চিন্তায় বাকি রাতটুকু আর দুচোখের পাতা এক হয় না তার। শুয়ে শুয়েই সে তার পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করে নেয়।সকাল হতেই মা’কে নিয়ে প্রথমেই পৌঁছোয় অরুনস্যারের বাড়ি। সাত সকালেই সেখানে তখন হাজির বোলপুরের সেই সুব্রত স্যারও।তার সঙ্গে দেখা করার জন্য সকাল সকাল এসেছেন। গতরাতের ঘটনার কথা সে স্যারদের খুলে সব বলে। বলে তার পরিকল্পিত কর্মপন্থার কথাও। সব শুনে অরুণস্যার বলেন , সুব্রত তুমি বরং যাওয়ার পথে তোমার বাইকে ওদের থানায় পৌঁচ্ছে দিয়ে যাও। কেউ তাহলে কিছু টের পাবে না। সেই মতো সুব্রতস্যার তাদের থানায় পৌঁছে দিয়ে যান। বাইক থেকে নেমেই তারা এগিয়ে যায় জ্যেঠুর দোকানের দিকে। তাদের দেখেই অবাক হয়ে যান জ্যেঠু। গতকাল সন্ধ্যাতেই তো তাদের বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছেন তিনি। তাই এরই মধ্যে আবার কি হতে পারে তা আন্দাজ করার চেষ্টা করেন। তার চোখে মুখে সেই চিন্তারই আভাস দেখা যায়। অঞ্জলি সব খুলে বলে দোকানী জ্যেঠুকে। সব শুনে জ্যেঠু বলেন , মারাত্মক ব্যাপার। এটা যে হতে পারে তা আমাদের ভাবা উচিত ছিল। দাড়াও ওদের একটা খবর পাঠাই। তোমরা ততক্ষণে চা খাও।
চা খেতে খেতেই সেই সাংবাদিক দু’জন পৌঁছে যান। তাদেরও সব খুলে বলে সে। সাংবাদিকরা বলেন , এটা যে হতে পারে সে আশংকা আমাদের ছিলই। সে যাই হোক , আমরা বাইরে আছি। আপনারা ডিউটি অফিসারকে গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করার কথা বলুন। অফিসার কি বলে দেখুন। তারপর আমরা দেখছি।
সেই মতো মা’কে নিয়ে গিয়ে দেখে সেদিনের সেই অফিসারই ডিউটিতে রয়েছেন।
তার হাবভাব দেখেই মনে হয় তিনি যেন এতক্ষণ তাদেরই প্রতীক্ষাতেই ছিলেন। তাই তাদের দেখেই গদগদ স্বরে বলে ওঠেন , আরে এসো এসো , শেষ পর্যন্ত সুমতি হলো তাহলে ? জানতাম হবেই , কত দেখলাম।
— হ্যা, আসতে হলো। তবে সুমতি কি দুর্মতি জানি না, আর আপনি কি জানতেন তাও জানি না। আমি এসেছি আসলে একটা অভিযোগ লেখাতে।
—- অভিযোগ, আবার কিসের অভিযোগ ? এরকম তো কথা ছিল না।
—- কি কথা ছিল তাহলে ? আপনি কি ভেবেছিলেন আমি সুরসুর করে ধর্ষণের অভিযোগটা প্রত্যাহার করে নেব ?
—- না, মানে সে রকমই তো কথা ছিল।
—- কি না মানে, না মানে করছেন ? সে আপনার সঙ্গে যাদের কথা হয়েছিল আপনি বরং তাদের সঙ্গেই বুঝে নেবেন।কাল রাতে আমাকে কিছু লোক মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে গিয়েছে। এখন সেই অভিযোগটা লিখে নিন দেখি।
—- অভিযোগ লিখে নিন বললেই হলো ? কে হুমকি দিল, কেন হুমকি দিল জানতে হবে না কিছু ?
—- কেন হুমকি দিয়েছে সেটা তো বললাম। তবে কারা হুমকি দিয়েছে সেটা বলতে পারব না। কারণ ওদের সবার মুখ ঢাকা ছিল।
—- তবে? তাহলে হুমকি দিল কারা ?
—- সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব তো আপনাদের। এক্ষেত্রে কারা হুমকিটা দিতে পারে সেটা তো আপনাদের না জানার কথা নয়। তাছাড়া যাদের মুখ ঢেকে হুমকি দিতে আসতে হয়েছে তারা নিশ্চয় বাইরে থেকে আসে নি, আকাশ থেকেও পড়ে নি।
— কিন্তু বড়বাবু তো ছুটিতে বাড়ি গিয়েছেন। তিনদিন পর ফিরবেন। তিনি না ফেরা পর্যন্ত তো কিছু করতে পারব না।
—- যারা হুমকি দিতে এসেছিল তারা বলে গিয়েছে, মামলা না তুললে আমাদের মা–মেয়েকে গণধর্ষণের পর পাচার করে দেবে। তাহলে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে ?
—- তাহলে তো ওদের কথা মেনে নিলেই ভালো হয়। আমি বলি কি, আর ঝঞ্ঝাট বাড়িয়ে লাভ
নেই। বরং একটা রফা করে নাও ওদের সঙ্গে বসে।
—- ধন্যবাদ , আপনার সুপরামর্শ মনে থাকবে। ভেবে দেখি কি করা যায়।
আর এক মুহুর্তও ডিউটি অফিসারের ঘরে দাঁড়ায় না অঞ্জলি। মাকে নিয়ে থানা থেকে বেড়িয়ে জ্যেঠুর দোকানের সামনে চলে আসে।তাদের দেখে সাংবাদিক দুজনও এগিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে সুস্মিত বলে , জানতাম কোন লাভ হবে না।
পুলিশ কিছুতেই ওই অভিযোগ নেবে না। বেশ এবার দেখি আমরা কি করতে পারি। একবার আসুন তো থানার গেটের সামনে দাঁড়ান তো দেখি।তারপর ক্যামেরার সামনে তাদের বক্তব্য নিয়ে দোকানে ফিরে আসে সবাই। কালকের মতোই আবার টিভিতে তার গলা শোনা যায়। কাল সকালের পর অবশ্য বার বার তার ঘটনাটা নিয়ে খবর দেখিয়েছে টিভিতে। সংবাদপত্রের পাতায়ও বড়ো বড়ো করে খবর ছাপা হয়েছে। কিন্তু আজকের খবরটা যেন অন্য একটা মাত্রা যোগ করে দেয়। আজ বেশ রাগী রাগী গলায় সুস্মিতকে বলতে শোনা যায় — চব্বিশ ঘন্টাও কাটে নি। মতিপুরের সেই গণধর্ষিতাকে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য ফের গণ ধর্ষণের হুমকি দিল একদল দুস্কৃতি । অভিযোগের তির শাসক দলের দিকে। অভিযোগ নেওয়ার পরিবর্তে থানা থেকে মিলল মিটমাট করে নেওয়ার পরামর্শ। নিরাপত্তার অভাবে গ্রামে ফিরতে পারছেন না ধর্ষিতা আর তার মা। নিরাপত্তার আর্জি নিয়ে জেলাশাসকের কাছে যাচ্ছেন ধর্ষিতা আর তার মা। মুক্তিপুর থানা চত্বর থেকে ক্যামেরায় অয়নের সঙ্গে সুস্মিত। খাসবার্তা, বীরভূম।
খবরটা শুনে কিছুটা অবাকই হয় অঞ্জলি। তারা তো থানা সামনেই পড়ে রয়েছে। কই জেলাশাসকের কাছে যাওয়ার কথা তো কিছু হয় নি। সাংবাদিকেরাও কি এমনি ভাবে মিথ্যা বলে নাকি ? কেমন যেন ধন্ধে পড়ে যায় সে।সাংবাদিকরাই সেই ধন্ধ দূর করে দেন। দুজনে দুটি বাইক নিয়ে এসে তাদের সামনে দাঁড় করিয়ে বলেন , উঠে আসুন, জেলা সদরে জেলা শাসকের কাছে যেতে হবে। এতক্ষণে ব্যাপারটা পরিস্কার হয় তার কাছে। তারা বাইকে চাপার পর ছুটতে ছুটতে বেড়িয়ে আসেন সেই অফিসার। হাত নেড়ে তাদের থামতে বলেন। কিন্তু ততক্ষণে বাইকের চাকা গড়াতে শুরু করেছে।

ক্রমশ


Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •