|| আঙ্কল টম’স কেবিন : গল্পের ভিতরের গল্প || লিখেছেন মৃদুল শ্রীমানী

0
29
Spread the love

আঙ্কল টম’স কেবিন : গল্পের ভিতরের গল্প

আজ থেকে ১৭০ বৎসর আগে, ১৮৫১ সালের ৫ জুন থেকে ‘ন‍্যাশনাল এরা’ সংবাদ পত্রে হ‍্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টো এর কলমে একটু একটু করে জন্ম নিতে থাকে ‘আঙ্কল টম’স কেবিন’। এই কাগজটি দাসপ্রথা উচ্ছেদের সমর্থনে কথা বলত। প্রকাশক ছিলেন জন পি জুয়েট। প্রথমে স্টো ভাবতে পারেন নি যে এতবড় একটা উপন্যাস তিনি লিখে ফেলবেন। ভদ্রমহিলা ছোটখাটো কয়েকটি পাতা লিখবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে লেখাটি প্রভাব বিস্তার করে ফেলায় কাগজের প্রকাশক তাঁকে লেখাটি চালু রাখতে অনুরোধ করেন। দীর্ঘ দশটি মাস ধরে লেখার পর ১৮৫২ সালে ‘আঙ্কল টম’স কেবিন’ বেরিয়েছিল। হ‍্যারিয়েট বিচার স্টো এর এই বইটি দারুণ ভাবে খ‍্যাতি পেয়েছিল। হ‍্যারিয়েট ছিলেন দাসপ্রথার উচ্ছেদের সমর্থক। এঁদের ‘অ্যাবলিশনিস্ট’ বলা হত। ‘ন‍্যাশনাল এরা’ কাগজের সঙ্গে তাঁর এই কারণেই মতের গভীর মিল ছিল। কাগজটির প্রকাশকই তাঁকে লেখাটি বই আকারে বের করতে উদ্বুদ্ধ করেন।
দাসত্ব অনেকদিন ধরে পৃথিবীর অনেক অংশে ছিল। তবে আমেরিকার ক্ষেত্রে জানা যায় যে, ১৬১৯ সালে পর্তুগিজ দাস জাহাজ সাও জাও বাউতিস্তা থেকে জনা কুড়ি আফ্রিকান দাসকে ছিনিয়ে আনে আমেরিকার শাদা চামড়ার কলোনীওয়ালারা। এর পর থেকে আটলান্টিকের উপর দিয়ে দাসব‍্যবসা শুরু হয়ে যায়। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে মানুষ পাকড়াও করে যথেষ্ট মূল‍্যে আমেরিকার কৃষকদের কাছে বিক্রি করত ব‍্যবসায়ী এবং বণিকেরা। শুধুমাত্র অষ্টাদশ শতাব্দীতেই ষাট থেকে সত্তর লক্ষ মানুষ ক্রীতদাস হয়ে আমেরিকার মাটিতে শ্রমদান করেছেন। অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা যন্ত্রণা সহ‍্য করেছেন। মেয়েরা ধর্ষিতা হয়েছেন। নিরুপায় হয়ে অবাঞ্ছিত গর্ভধারণের দায় বহন করেছেন।
১৮৫০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একত্রিশতম আমেরিকান কংগ্রেস পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসদের বিরুদ্ধে একটা অমানবিক আইন প্রণয়ন করেন। ১৮৫০ সালের এই আইনে বলা হয়েছিল, যদি কোনো ক্রীতদাস পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তাকে ধরে আবার তার মালিকের কাছে ফেরত দিতে হবে। যদি সেই ক্রীতদাস আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো রাজ‍্যে পালিয়ে গিয়ে থাকে, যেখানে ক্রীতদাস প্রথা নিষিদ্ধ, তবুও ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব হল, তেমন ক্রীতদাসকে খুঁজে বের করে তার মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া, এবং দাসটির উপযুক্ত শাস্তির বন্দোবস্ত করা। ১৭৯৩ সালে এইরকম পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসদের বিরুদ্ধে প্রথম আইন প্রণীত হয়। সাতান্ন বছর পরের আইনটির দাঁত নখের ধারালো ভাব আরেকটু বাড়ানো হয়।
ধর্মভাবাপন্ন মহিলা হিসেবে হ‍্যারিয়েট বিচার স্টো এর এমন আইনকে খুব কুৎসিত বলে মনে হয়েছিল। এই ১৮৫০ সালের আইনের বিরুদ্ধে নিজের কলমের জোরে জনমত তৈরি করার ইচ্ছায় স্টো আঙ্কল টমের গল্প লেখার উদ্যোগ নেন। এই আইন চালু হবার কিছু দিন আগে জোসিয়া হেনসন নামে মুক্তিপ্রাপ্ত এক ক্রীতদাস নিজের জীবনের যন্ত্রণা ও হয়রানির বিবরণী লিখিত আকারে প্রকাশ করেছিলেন। ক্রীতদাসদের কেউ কেউ শিক্ষিত ও আলোকপ্রাপ্ত হতেন। তাঁরা নিজের দাসজীবনের কথা লিখিতভাবে প্রকাশ করতেন। একে ‘স্লেভ ন‍্যারেটিভ’ বলে। ১৮৪৯ সালে প্রকাশিত জোসিয়া হেনসন ( ১৫ জুন ১৭৮৯ – ৫ মে ১৮৮৩) এর লেখা দাসজীবন কাহিনিটি তাঁকে খুব অনুপ্রাণিত করেছিল।
ক্রীতদাসদের বিরুদ্ধে অমানবিক আইন আর হেনসনের লেখা স্লেভ ন‍্যারেটিভ, এই দুইটি সূত্রে উদ্দীপনা পেয়ে ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ রচনা হয়।
বই আকারে প্রকাশ পাবার পর আঙ্কল টমস কেবিনের বিপুল জনপ্রিয়তা দেখা যায়। এক বছরের মধ্যে বইটির দশলক্ষ কপি বিক্রি হয়। শুধুমাত্র আমেরিকার বুকেই বিক্রি হয়েছিল তিনলক্ষ কপি। আটখানা মুদ্রণযন্ত্র একযোগে কাজ করেও চাহিদা অনুযায়ী বই যুগিয়ে উঠতে হিমশিম খেত।
 এই বইটির আঙ্কল টম চরিত্রটি যাঁকে দেখে আঁকা, সেই জোসিয়া হেনসনও স্টো এর বইটির বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে উদ্বুদ্ধ হলেন। তিনি ১৮৪৯ সালের বইটি আরো বিকশিত করে লিখে ‘ট্রুথ স্ট্রেঞ্জার দ‍্যান ফিকশন’ নাম দিয়ে একটি বই ১৮৫৮ সালে প্রকাশ করেন। ১৮৭৬ সালেহেনসন আঙ্কল টমস কেবিন নাম দিয়ে নিজের আত্মজীবনী প্রকাশ করেন।
হেনসনের এই ১৮৭৬ সালের বইটি নিয়ে ভাবতে গেলে তারও একশো বছর আগের একটা মহাঘটনার দিকে তাকাতে হয়। ১৭৭৬ সালের জুলাই মাসের চার তারিখে আমেরিকার মানুষ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আমেরিকার সেকেন্ড কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসে ছাপ্পান্ন জন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সে দেশের স্বাধীনতা সনদ গৃহীত হয়। ওই যে স্বাধীনতা সনদ, মানব সমাজের ইতিহাসে ওটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দলিল। ওটির মূল খসড়া তৈরি করেছিলেন টমাস জেফারসন। বিখ্যাত নেতা জন অ্যাডামসের পরামর্শ অনুযায়ী জেফারসন সাহেবকে ওই স্বাধীনতার সনদ লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁকে এই সনদ লিখতে জন অ্যাডামস আর বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন অনেক সাহায্য করেছিলেন। আমেরিকার মানুষ ব্রিটিশ রাজশক্তির কবল থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। তাঁরা আওয়াজ তুলেছিলেন, যে দেশের পার্লামেন্টে আমাদের কোনো প্রতিনিধি নেই, সেই পার্লামেন্ট আমাদের ওপর কর চাপাবে কেন? আমেরিকার মানুষ চাইছিলেন উদারপন্থী সাংবিধানিক গণতন্ত্র। ব্রিটিশ সরকার তাঁদের উপর ১৭৬৫ সালে স্ট‍্যাম্প আইন চাপিয়ে দিলে শোরগোল শুরু হয়। প্রতিরোধের মুখে কিঞ্চিৎ পিছু হঠে ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু তারপরেও দুটো বছর যেতে না যেতেই নতুন করে আরেক ফন্দি। ১৭৬৭ সালে চাপল টাউনসেন্ড অ্যাক্ট। বলা দরকার, আমেরিকার সবাই ব্রিটিশ সরকারের বিরোধী ছিলেন না। যাঁরা আমেরিকার উপর ব্রিটেনের খবরদারির বিপক্ষে ছিলেন, তাঁদের বলা হত প‍্যাট্রিয়ট। আর ব্রিটিশ সরকারের তোষামোদকারীদের বলা হত লয়ালিস্ট। লয়ালিস্টদের আরেকটি নাম ছিল টোরি। প‍্যাট্রিয়টদের নাম ছিল হুইগ। হুইগরা তুমুল লড়াই করে গেলেন ব্রিটিশ সম্রাট তৃতীয় জর্জের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে নতুন যে রাষ্ট্র হল, তার প্রতিষ্ঠাতা হলেন জর্জ ওয়াশিংটন ( ২২ ফেব্রুয়ারি ১৭৩২ – ১৪ ডিসেম্বর ১৭৯৯)। তিনিই হলেন আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি। ক্ষমতায় রইলেন ১৭৮৯ সাল থেকে ১৭৯৯ সাল অবধি।
এই যে ব্রিটিশ সরকারের কবল থেকে আমেরিকা ছিনিয়ে আনা, এ একটা রীতিমতো যুদ্ধ। এতে কিন্তু ক্রীতদাস ও কালো মানুষের অবদান ছিল যথেষ্ট। কিন্তু স্বাধীনতা আসার পর আমেরিকায় যে সংবিধান গঠিত হল, তা ক্রীতদাস ব‍্যবস্থার বিরুদ্ধে স্পষ্ট করে কিছু বলতে না পেরে সমস‍্যাকে পাশ কাটিয়ে গেল।
কথায় আছে না, যতই পরিবর্তন হয়, কিছুই পরিবর্তন হয় না, ক্রীতদাসদের ব‍্যাপারে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের হল তাই। দেশ স্বাধীন হল, কিন্তু ক্রীতদাসদের পরিস্থিতির উন্নতি হল না। হবার কথাও নয়। আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটনের কথাই ধরা যাক। তিনি ছিলেন ধনীর দুলাল। পৈতৃক সূত্রে বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তির অধিকারী ছিলেন। আর পৈতৃক সূত্রে আরো পেয়েছিলেন গোটা দশেক খাস ক্রীতদাস। তো এহেন ব‍্যক্তি এক কথায় ক্রীতদাসদের মুক্তি দেবেন, এটা খুব সহজ ব‍্যাপার নয়।
 তবে ১৭৭৪ সাল থেকে ১৮০৪ সালের মধ‍্যে আমেরিকার উত্তর অংশের রাজ‍্যগুলি ক্রীতদাস প্রথা বন্ধ করল। কিন্তু দক্ষিণের রাজ‍্যগুলি সে পথে হাঁটতে চাইল না। সেখানে রমরমিয়ে চলতে থাকল কুপ্রথাটি। ১৮০৮ সালে আমেরিকার কংগ্রেস আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাসদের ধরে আনা নিষিদ্ধ করল। কিন্তু এতদিন ধরে দেশের ভিতরে যে ক্রীতদাসদের আটকে রাখা হয়েছে, তাদের, এবং তাদের সন্তানদের নিয়ে কেনাবেচার ক্ষেত্রে কোনো বাধা তৈরি করা হল না। শুনলে রীতিমতো আশ্চর্য লাগবে, পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে ক্রীতদাসদের কেনাবেচার বাজারটি প্রভূত পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেল। ১৮৬০ সালের দিকে আমেরিকার মাটিতে চল্লিশ লক্ষ ক্রীতদাস। আর তার অর্ধেকের বেশি কাজ করত দক্ষিণ অংশের রাজ‍্যগুলির তূলাক্ষেতে। ক্রীতদাসদের মধ‍্যে সবাই যে দাসত্বের পরিস্থিতিকে অসীম করুণাময় ঈশ্বরের ইচ্ছা বলে নতমস্তকে মেনে নিত, তা কিন্তু নয়। তারাও এই নির্মমতার হাত থেকে রেহাই পেতে চাইত। অমানুষিক শোষণের হাত থেকে পালাবার ফন্দি করাটা অপরাধ মনে করত না। ক্রীতদাসদের এই পালানো ঠেকাতে আইন আনা হল। প্রথমে ১৭৯৩ সালে। তার সাতান্ন বছর পরে ১৮৫০ সালে। পরবর্তী আইনটি বলল, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসদের ধরে এনে মালিকের হাতে ফেরত দেওয়া। আর এমন দুষ্কর্ম ঘটানোর জন‍্য শাস্তিবিধান করা।
 এই কালা কানুনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে চেয়েই হ‍্যারিয়েট বিচার স্টো লিখলেন আঙ্কল টম’স কেবিন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন নাকি আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ঘনিয়ে তোলার জন‍্য আঙ্কল টমস কেবিন বই ও তার লেখকের উদ্দেশে আঙুল তুলেছিলেন।
আমেরিকার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন ( ১২ ফেব্রুয়ারি ১৮০৯ – ১৫ এপ্রিল ১৮৬৫)। লিঙ্কন সাহেব ছিলেন আমেরিকার ষোড়শতম রাষ্ট্রপতি। ভদ্রলোক ছিলেন মডারেট রিপাবলিকান। ১৮৬১ সালের মার্চ মাসের চার তারিখে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আর ১৮৬৫ সালের এপ্রিল মাসের পনের তারিখে তিনি খুন হয়ে যান। তাঁর খুন হয়ে যাওয়ার পিছনে রয়েছে ক্রীতদাসদের মুক্তি পাওয়া নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রশ্ন। গোটা ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে আমেরিকার রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে ক্রীতদাসদের মুক্তি পাওয়ার কথা নিয়ে। কিছু কিছু রাজ‍্য চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রীয় ঐক‍্য বজায় থাকুক। দক্ষিণ অংশের রাজ‍্যগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা হয়ে কনফেডারেট হতে চেয়েছিল। আব্রাহাম লিঙ্কন রাষ্ট্রপতি পদের জন‍্য ভোটে দাঁড়ালে উত্তর ও দক্ষিণের রাজ‍্যগুলির মধ‍্যে তীব্র বৈরিতা প্রকাশ হয়ে পড়ল। ভোটে তার ব‍্যাপক ছায়া পড়েছিল। দক্ষিণের পনেরটি রাজ‍্যের মধ‍্যে দশটিতে আব্রাহাম লিঙ্কন সাহেব একটিও ভোট পান নি। আবার দক্ষিণের মোট ৯৯৬ টি কাউন্টির মধ‍্যে মাত্রই দুটি কাউন্টিতে তিনি জয়লাভ করেছিলেন। দক্ষিণের রাজ‍্যগুলিতে লিঙ্কনের এমন  ভরাডুবি হলেও, ইলেকটরাল কলেজে তাঁর পক্ষে ভোট পড়ল ১৮০টি, আর বিপক্ষে ১২৩টি। লিঙ্কন রাষ্ট্রপতি হলেন। তারিখটা ছিল চার মার্চ, ১৮৬১; কিন্তু পরের মাসেই বারো এপ্রিল তারিখে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যুদ্ধ থামল চারটি বছর পরে আরেকটি এপ্রিল মাসে, ১৮৬৫ সালের এপ্রিল মাসের নয় তারিখে। শোনা যায়, আব্রাহাম লিঙ্কন আঙ্কল টমস কেবিন এর লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে বলেছিলেন, ও আপনিই সেই মহিলা, যিনি আমাদের দেশকে একটা গৃহযুদ্ধের ভিতরে ঠেলে দিয়েছেন!
যুদ্ধ থামার এক সপ্তাহ পরে ওই এপ্রিল মাসেরই পনের তারিখে আব্রাহাম লিঙ্কন খুন হয়ে গেলেন। ওয়াশিংটন ডি সি শহরে ফোর্ডস থিয়েটারে আওয়ার আমেরিকান কাজিন অভিনীত হচ্ছিল। ওই
থিয়েটার হলেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মাথায় গুলি করে লিঙ্কনকে খুন করলেন জনপ্রিয় তরুণ অভিনেতা জন উইলকিস বুথ। তখন বুথের ছাব্বিশ বছর বয়স। বুথ কনফেডারেটপন্থী ছিলেন। রাষ্ট্রপতির মাথায় গুলি করে বুথ পালালেন। কয়েকটি দিন পরেই পুলিশ তাঁকে ধরে ফেলল। তারিখটা এপ্রিল মাসের ছাব্বিশ।  বস্টন করবেট নামে পুলিশ কর্মী বুথকে বিনা বিচারে করলেন। এছাড়া ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে চারজনের ফাঁসি হয়। আরো চারজন শাস্তি পায়।
 আব্রাহাম লিঙ্কন ছিলেন আমেরিকার সবচেয়ে ভাল রাষ্ট্রপতি। তিনি অসাধারণ বক্তৃতা করতেন। ওঁর সবসেরা ভাষণগুলির মধ্যে অন‍্যতম গেটিসবার্গ ভাষণটি। ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বরের বিকেলে পেনসিলভানিয়া প্রদেশের গেটিসবার্গ এর সেনানীদের জাতীয় সমাধিক্ষেত্রে তিনি একটি ভাষণ দেন। অতি অল্প সময়ে বাছা বাছা শব্দ চয়নে অত‍্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষণটি ঐতিহাসিক হয়ে গিয়েছে। শোনা যায় এই সময়েই লিঙ্কন “গভর্ণমেন্ট অফ দি পিপল, বাই দি পিপল, ফর দি পিপল” বলে প্রকৃত গণতন্ত্রের ছবিটি সঞ্চারিত করে দেন। ১৮৬৫ সালের এগারো এপ্রিল তারিখে হোয়াইট হাউসের একটি জানালা দিয়ে বাইরে জড়ো হওয়া জনতার উদ্দেশে লিঙ্কন বলেছিলেন, আমি প্রাক্তন ক্রীতদাসদের রাজনৈতিক ভোটাধিকার দেবার পক্ষে। ওই জনতার মধ‍্যে ছিলেন জন উইলকিস বুথ। ক্রীতদাসদের প্রতি কোনোরকম বদান‍্যতাকে তিনি সহ‍্য করতে পারতেন না। লিঙ্কনের বক্তব্য শুনে বুথ বিরূপ হন। তাঁকে খুন করতে মনস্থ করেন বুথ। বুথের গুলিতে আহত হয়ে, পরদিন পনের এপ্রিল তারিখে সকালে লিঙ্কন সাহেবের জীবনদীপ নির্বাপিত হয়।
ওই ১৮৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৮ তারিখে আমেরিকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনের মাধ্যমে সরকারি পর্যায়ে ক্রীতদাসত্ব প্রথার অবসান ঘটানো হল। এরপরও অনেক দিন ধরে দক্ষিণ অংশের প্রদেশগুলিতে ক্রীতদাসদের অবস্থার খুব একটা ইতরবিশেষ হয় নি।
 (তেইশে আগস্ট দাস ব‍্যবসা ও তার অবসানের আন্তর্জাতিক স্মারক দিবস উপলক্ষে লিখিত)

Spread the love