ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ১৬)

0
19
Spread the love

সুমনা ও জাদু পালক 

হ্যাঁ ,ওইতো তার নাম ধরেই তো কে যেন ডাকছে। খুব মিষ্টি আর সুরেলা কণ্ঠ। একটু যেন চাপা স্বরে কেউ ডাকছে, সুমনা ,ও সুমনা, ঘুম থেকেওঠো তাড়াতাড়ি।
সুমনা এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না। পাশে অঘোরে ঘুমোচ্ছে মা। মায়ের মুখে জানলার ফাঁক দিয়ে এক টুকরো চাঁদের আলো এসে পড়েছে ।কি মায়াবী দেখাচ্ছে মায়ের মুখটা।। সুমনা চোখ ফেরাতে পারে না। ঠিক তখনই আবার তার নাম ধরে ডাক ভেসে আসে রান্নাঘরের দিক থেকে। চুপি চুপি চৌকি থেকে নামে সুমনা। পা টিপে টিপে পেরিয়ে যায় ঘরটা ।বারান্দা পেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতেই আবারো ডাক ভেসে আসে, তাড়াতাড়ি এসো সুমনা, দেরি হয়ে যাচ্ছে যে ।অনেকটা পথ যেতে হবে তো ।
সুমনা বিস্মিত হয় ।কোথায় যাওয়ার কথা বলছে? কে বলছে? কোথায় যেতে হবে তাকে? রান্না ঘরের দরজাটা খুলতেই হতবাক হয়ে যায় সুমনা। পুরো রান্নাঘর টা ভরে গেছে পূর্ণিমা রাতের জোছনার মত মিষ্টি হালকা নীল আলোয়। কোত্থেকে আসছে আলো ?ভালো করে লক্ষ্য করে সুমনা দেখে যে ,ঘুঁটের বস্তার পিছনে পড়ে থাকা ভাঙ্গা পুতুলটার পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে আলো ।আরে,ওখানেই তো সুমনা লুকিয়ে রেখেছে পালক টা। প্রায় দৌড়ে গিয়ে পুতুলটা হাতে তুলে নিল সুমনা। ওর পেটের ভেতর থেকে পালকটা বের করতে যেতেই ওটা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ভাসতে থাকে বাতাসে। সুমনা অবাক হয়ে দেখে যে, পালক টার সারা গা থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে উজ্জ্বল নীল আলো ।পালক টা ভাসতে ভাসতে সুমনার মাথার উপর এসে স্থির হয়ে যায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সুমনার কানে ভেসে আসে—- খটা খট খটা খট আওয়াজ ।আরে, এটাতো ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ !

অনেকদিন আগে তাঁকে আর মাকে নিয়ে বাবা শহরে গেছিল সার্কাস দেখাতে ।সেখানে ঘোড়ার খেলা দেখেছিল ।খেলা শুরু হওয়ার আগে হঠাৎ সুমনা শুনতে পেয়েছিল এইরকম খটা খট খটা খট আওয়াজ। শব্দটা আসছিল সার্কাসের তাঁবুর চারদিক থেকে ।সুমনা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, বাবা, কিসের শব্দ ওটা ?
বাবা বলেছিল, ওটা ঘোড়ার খুরের শব্দ ।একটু পরেই ঘোড়ার খেলা হবে। তার আগে যে খেলা দেখাবে, সে ঘোড়াটাকে নিয়ে সার্কাসের তাঁবুর চারিদিকে পাক খাচ্ছে ।
——কেন বাবা, পাক খাচ্ছে কেন ঘোড়াটা?—————-অনেকক্ষণ হয়তো কোথাও দাঁড়িয়েছিল ঘোড়াটা। তাই ওকে দৌড় করিয়ে খেলা দেখাবার জন্য তৈরি করছে।
ঠিক তাই । একটু পরেই সার্কাসের তাঁবুর দরজা দিয়ে ,একটা সুসজ্জিত সাদা ঘোড়ার পিঠে চেপে বিচিত্র পোশাক পরা একটা লোক টুপি পরে ঢুকে এসেছিল। তারপর দেখিয়েছিল নানা রকম খেলা।

এতদিন পরে ঠিক সেইরকম ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পেল সুমনা। কিন্তু এত রাতে এখানে ঘোড়া এলো কোত্থেকে? হঠাৎ আবার সেই অদৃশ্য কন্ঠ ভেসে এলো। কেউ যেন প্রাচীরের বাইরে বকুলতলা থেকে ডাকছে তাকে।
সুমনা এগিয়ে চলল উঠন পেরিয়ে প্রাচীরের গায়ের পিলার ওয়ালা সেই দরজার দিকে ।তার সামনে সামনে ভেসে চলল পালক টা। মন্ত্রমুগ্ধের মত দরজা খুলে বাইরে যায় সুমনা ।

একি! বকুল গাছের নিচে ওই দুধসাদা ঘোড়া টা কোত্থেকে এলো ?আরে ওটার পিঠের উপরে কি সুন্দর কারুকাজ করা রঙিন আসন পাতা ।সুমনা জানে, ওটা কে জিন বলে ।কিন্তু এই ঘোড়াটা বকুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কেন? ধারেকাছে কাউকে দেখাও তো যাচ্ছে না। তাহলে কে ?কে এল ওই ঘোড়ায় চেপে ?
সুমনার মনে হলো, ওই ঘোড়াটা তাকে যেন আকর্ষণ করছে। পায়ে পায়ে ঘোড়ার কাছে পৌঁছে যায় সুমনা ।আর ওখানে পৌঁছাতেই কে যেন তাকে দুই হাত ধরে বসিয়ে দিল ঘোড়ার পিঠের উপরে ।

চলতে শুরু করল ঘোড়াটা। সামনে ভাসছে সেই পালক ।আকাশের দিকে তাকায় সুমনা। দেখতে পায় ,পূর্ণিমার চাঁদ ছড়িয়ে চলেছে ফটফটে সাদা মিষ্টি আলো। কিন্তু তাকে নিয়ে কোথায় চলেছে ঘোড়াটা? মা যে একলা আছে ঘরে ।মাকে তো কিছু বলা হলো না। খুব ভয় পায় সুমনা ।আর সেই মুহূর্তে শুনতে পায় কে যেন আবার বলছে, ভয় পেয়ো না সুমনা। আমি তো আছি তোমার সঙ্গেে।

চলবে


Spread the love