হৈচৈ ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী তে ঈশানী রায়চৌধুরী (পর্ব – ১০)

0
15
Spread the love

চললুম ইউরোপ

এসে দাঁড়ালাম মন্ত্র স্টেশনে আর একটুও সময় নষ্ট না করে চটপট সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলাম হ্রদের কাছে যাবার জন্যে। আহা আহা যেটুকু দেখতে পাচ্ছি , চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। স্রোতের মত লোক হাঁটছে চমৎকার পাথরবাঁধানো রাস্তা দিয়ে। এটা পৃথিবীর অন‍্যতম সেরা ক্রিসমাস মাকের্ট বলে শুনেছি। কত দেশের কত মানুষ এসেছে যেন রঙিন ফুলের মেলা । আর অনেকের সঙ্গে যারা রাজকীয় চালে হাঁটছে তাদের চেহারা যদি দেখাতে পারতাম ! রেশমকোমল রূপোলি রংয়ের শরীরে ঘন বাদামী ছোপ । সোনালি রংয়ের একজন, মহিলা প্রভুর কোলে চড়ে মনোযোগ সহকারে তার সুচারু নাকটা নিয়ে গবেষণা করতে করতে চলেছেন। আমি যে আমি, পারতপক্ষে কুকুরের আশেপাশে যাই না সেও একটু ছুঁয়ে দেখার জন‍্যে অস্থির হয়ে উঠলাম! ছবি তুলতে যেতেই ছেলে হাত চেপে ধরল ‘ আঃ মা, সব জায়গায় ছবি তোলা যায় না। এদের মালিকের পারমিশন নেওয়া উচিত। তোমরা তাড়তাড়ি হেঁটে এখন যাও সন্ধে হয়ে আসছে দারুণ দৃশ‍্য পাবে লেকের। বাবা, আমি লাগেজ নিয়ে হোম স্টে তে রেখে আসছি। তোমরা এনজয় কর ।’ কত দোকান,কত পশরা …. তবে আমার এই মানুষগুলোর ঝলমলে মুখ বেশি ভাল লাগছে। খুশির একটা আশ্চর্য ভাইভ আছে , মানুষকে ছুঁয়ে যাবেই! দুর্গাপুজোর সময় একবার রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম…. মানুষের আনন্দ দেখে আমি অবাক ! আসলে জন্ম থেকে বাড়ির পুজোয় বাড়িতেই…. কখনও বাইরে যাওয়া হয় নি। যাই হোক সে কথা প্রসঙ্গান্তরে বলব !

মন্ত্র একটা আশ্চর্য তুলিতে আঁকা সুইস শহর, জেনেভা লেকের ধারে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে Dents-du-midi পাহাড়। জলের শরীর থেকে একটা অনিবার্য ডাক উঠে আসছে। বরফের গা থেকে ছিটকে আসা সূর্যের লাল রং পর্যটকদের চোখে আর মনে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। সত‍্যি প্রকৃতির এই জাদুঘরে এসে আজ মনে হচ্ছে….. যা দেখেছি, যা পেয়েছি তুলনা তার নাই। একটা জেটির মত প্লাটফর্মে আমরা অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছি, সান্নিধ্য উপভোগ করছি বিস্তীর্ণ লেকের। বিদায়পথের সূর্য তাঁর অনির্বচনীয় আভিজাত‍্যে আকাশ ভ’রে আছেন। আমার তবু মন কেমন করছে ছেলেটা এখনও ফিরল না ! বলতে বলতে তিনি হাজির….। আমরা জলের গা ঘেঁষে বসলাম। ‘ ‘ ‘ ‘ শোনো,এখন তো ক্রিসমাসের জন‍্যে এত লোকজন দেখছো তবে প্রত‍্যেকবছর জুলাইমাসে এখানে জাজ ফেস্টিভ্যাল হয় সেইসময় যে উন্মাদনা চলে সেটা আনপ‍্যারালাল। আধুনিক সংগীতের সব শ্রেণীর বিশ্বমানের শিল্পীরা এখানে আসেন। তখন শহরটার শিরায় শিরায় যেন আগুন ছোটে। ‘ বাবান একটু চা খাই চল। একটু দুষ্টু হেসে বাবাই বলল ‘ চা কেন বাবা, চল তোমাদের একটা অন‍্য এক্সপিরিয়েন্স করাই। এই ওয়েদারে হট ওয়াইন দারুণ ম‍্যাচ করবে। মা, তুমি কিন্তু আপত্তি করবে না। অবশ‍্য করলেও আমি শুনবো না.. তোমরা এখন কেয়ার অফ মি। ‘ পাশের দোকান থেকে এল সেই ড্রিঙ্ক। আমি হাতে নিয়ে বসে আছি বলে একটা বড়সড় ধমক খেলাম। খুব ভয়ে ভয়ে একটা সিপ নিলাম! নাঃ কই গলা জ্বালা করছে না তো!তবে যে লোকে বলে!…. এই তিনটে গ্লাস আমরা স‍্যুভেনির হিসেবে নিয়ে যাব, ওর বাবার এই কথায় তৎক্ষনাৎ ছেলে গিয়ে…. দাম মিটিয়ে এল। লেকের গা দিয়ে পাথর বাঁধানো রাস্তা দিয়ে আমরা হাঁটছি…. সামনে দেখলাম একটা ছোটখাটো জটলা। দেখিতো কি হচ্ছে ভেবে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে ভিড়ের মধ‍্যে ঢুকে পড়লাম। ওমা দাউদাউ বিশাল বার্নারে রান্না করতে করতে একটা ছেলে দারুণ গান গাইছে আর তাকে ঘিরে পর্যটকরা অনেকেই শরীর দোলাচ্ছে আবার গানও গাইছে। হাতে হাতে খাবার যাচ্ছে আবার একজন থেকে আরেক জনের গলায় ছড়িয়ে যাচ্ছে গানটা। সুরটা যেন ঢেউয়ের মত দোলাচ্ছে সকলকে ! আহা আহা কি অসামান্য সংক্রমণ ! আমিও ক্রমশ মাতাল হয়ে যাচ্ছি ! সুরবিদ্ধ হয়ে আমারও তখন ঐ দোলায় গা ভাসিয়ে দেওয়ার জন‍্যে মন ছটফট করছে। তবে চাইলেই কি আর সব পাওয়া যায়…. সঙ্গে নবীন প্রবীণ দুই অভিভাবক ! আমাকে পাকড়াও করে নিয়ে এল ছেলে…..’ মা বৃষ্টি পড়ছে, নাচতে গিয়ে পাথরে পা স্লিপ করে যদি পড়…. তাহলে পুরো ট‍্যুরটা ক‍্যানসেল করতে হবে। এখন চল আমাদের সঙ্গে আরও একটা অসাধারণ দৃশ‍্য দেখবে ! ‘ অগত‍্যা আত্মসমর্পণ। এবার দেখলাম যে যেমন পারছে জলের কাছাকাছি এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও লোহার নিচু রেলিং পেরিয়ে লেকের খুব কাছে আসতে হল। ওরে বাবা কত রকমের ক‍্যামেরা নিয়ে সবাই তাক করে আছে একদিকে…..এ কি জলের ওপর আবার কি হতে চলেছে !

অন্ধকার দখল নিয়েছে বিশাল লেকের এবার…. এবার! একটা মৃদু হইচই শুনে তাকালাম…. অন্ধকার ফুঁড়ে অনেক দূর থেকে এগিয়ে আসছেন ফ্লায়িং সান্তাক্লজ। আলোর রথে চড়ে আসছেন তিনি। রোপওয়ে বেয়ে তাঁর এই ক্রমশ এগিয়ে আসা হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে আমার। বহুদূর থেকে যেন ভেসে আসছে সুখ, সমৃদ্ধি আনন্দ যা ক্রিশ্চানরা বিশ্বাস করেন। আলোর এই রথটা কি সুন্দর করে সাজানো…. কাছাকাছি আসতে দেখলাম সান্তাক্লজ আলোর জামা পরে হাত নাড়ছেন। ওমা মানুষ আছে নাকি ওর ভেতর….. তা নাহলে। পাশে দাঁড়ানো বাবাইকে ছুঁয়ে দিতেই বলল…’ নাড়িও না মা, ছবি তুলছি। সঙ্গে সঙ্গে আমিও মোবাইলটা তাক করে যতটা পারলাম তুললাম…. আমার তো ক‍্যামেরার ছবিতে হবে না! ঘরে গিয়েই এই ছবি বন্ধুদের পাঠাতে হবে। সবার সঙ্গে ভাগ করে না নিলে আবার কিসের সুখ! বাবাই বলল ‘ এই প্রদর্শনীটা চারবার হয়… বিকেল ৪টে – ৫টা- ৬টা -৭টা তোমরা সবচেয়ে ভাল সময়ে দেখলে, এখন অন্ধকারটা গাঢ় হয়েছে তো… তাই এত ভাল লাগল।’ আমি অবাক হয়ে বললাম তুই আগে দেখেছিস? কই আমায় তো কখনও বলিসনি!
” মা আমার সবসময় ইচ্ছা ছিল তোমাদের নিয়ে এসে এই সব দেখাব…. যা আমার ভাল লেগেছে… সব। তোমরা পারবে না , নাহলে আইসল‍্যান্ডে নিয়ে গিয়ে অরোরা বোরিয়ালিস ও দেখিয়ে আনতাম। ‘ এই কথাটাতে আমার স্বর্গদর্শন হয়ে গেল…. জলে ভরে গেল চোখ !
এবার এই চত্বর ছেড়ে হোম স্টে র দিকে রওয়ানা দিতে হবে। কাছাকাছি নাকি একটা ভারতীয় দোকান আছে তবে সেটা সেদিন বন্ধ তাই কিছু ফলটল কিনে আমরা রাতের খাবার খুঁজতে গেলাম….. অনেক দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে…. রাত আটটা বাজে এদের তো ডিনার টাইম ওভার। চটপট একটা দোকানে ঢুকে পড়লাম…. হ‍্যাঁ আমাদের প্রিয় চিকেন র‍্যাপ পাওয়া যাবে…. বেশ বেশ,তবে বলে দেওয়া হল চটপট খাওয়া শেষ করতে হবে। ওরে বাপু আমাদেরও তো বেজায় ক্ষিধে পেয়েছে…. দেরি কি আর আমরাই করতে পারবো! খেয়েদেয়ে রওয়ানা দিলাম…. এ কি খাড়াই রাস্তা রে বাবা। কতদূর যেতে হবে! আমার করুণ মুখ দেখে বাবাই বলল ‘ দাঁড়াও একটা ট‍্যাক্সি নিতে হবে… এই রাস্তায় আমি পারি তবে তোমরা পারবে না! ‘ ট‍্যাক্সি করে ওপরে উঠতে উঠতে ভাবছি কি চড়াই রাস্তা…. বাবাই লাগেজ নিয়ে উঠল কি করে? যাই হোক দশ মিনিটের মধ‍্যে পৌঁছে গেলাম। দোতলায় উঠে আমি অবাক….. এ তো রাজকীয় ব‍্যবস্থা। এত সুন্দর ঘর…. কার্পেটে পায়ের পাতা পুরো ডুবে যাচ্ছে। ড্রয়িং রুমটা অর্ধবৃত্তাকার কাঁচের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। কি সুন্দর সাজানো। হায়রে কালকেই এই জায়গাটা ছেড়ে যেতে হবে। একদিনের বুকিংয়ে দিনটা তো আমরা রাস্তাতেই কাটালাম….!

এবার রাতঠিকানায় স্বপ্ন দেখার পালা…. ছেলের গালে একটা চুমু দিয়ে বললাম পরের জন্মে আমি তোমারই মা হতে চাই !

চলবে


Spread the love