|| বিশ্ব বই দিবসে আমার কথা || লিখেছেন মৃদুল শ্রীমানী

0
27
Spread the love

বিশ্ব বই দিবসে আমার কথা

কী রকম একটা আন্তর্জাতিক পরিবেশে আমি বড় হচ্ছিলাম সত্তর দশকের একেবারে শেষে আর আশির দশকের গোড়ায়। সুকান্ত আর নজরুলের পাশাপাশি পড়ছি নাজিম হিকমত আর পাবলো নেরুদার কবিতা। যদিও কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে। ঘুমাতে যাবার আগে অবধি হাতে থাকছে নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির ইস্পাত, বরিস পলেভয় এর মানুষের মতো মানুষ। বরানগরের কুঠিঘাটে গঙ্গার ঢেউ গুণতে গুণতে গাইতাম ভূপেন হাজারিকার বিস্তীর্ণ দুপারে, আর গাইতাম নিগ্রো ভাই আমার পল রোবসন । বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস আর শিবনারায়ণ রায়ের অশান্ত ব্রাহ্মণ।
আমি জানতাম রম‍্যাঁ রলাঁ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণকে, জানতাম জাপান ও রাশিয়ার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিবেকানন্দ শিকাগোর মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আমেরিকার মানুষকে ভাই ও বোন বলতে পেরেছিলেন। তখন ইবসেনের নাটক ডলস হাউসের নোরাকে চিনছি, চিনছি টলস্টয়ের আনা কারেনিনা কে। আর গান্ধীর মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ। অবশ‍্যই সব পড়ে উঠি নি, কিন্তু টের পেতে শুরু করে দিয়েছিলাম।
আমি একটা আন্তর্জাতিক পরিবেশ বুকে নিয়ে বড় হচ্ছিলাম।
মা, আমার মা বিয়েতে কয়েকটি বই উপহার পেয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি অমিয় চক্রবর্তীর ” ঘরে ফেরার দিন” । ছুটির দুপুরে লুকিয়ে বড়দের বই পড়ার অভ্যেস করেছিলাম সেই ক্লাস ফোর থেকে । সে সব কবিতার পংক্তি বেশ মনে আছে – ” জগৎ যাত্রী গাছের তলায় বসে / চেয়ে দেখে মাছ ছোটো পুকুরের জলে / সারা ভুবনে ভ্রমণের মন নিয়ে ” । নাভানা থেকে প্রকাশিত বইটা। তখন থেকেই জানি সুমুদ্রণ কাকে বলে।
কবির জন্ম ১৯০১ সালে। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠির সাথেও অমিয় চক্রবর্তী জড়িয়ে আছেন।
বিয়েতে বই দিলে এসব হয়। একজনের কথা ভেবে উপহার একটি প্রজন্ম পেরিয়ে কাজ করে।
আমার মা তাঁর বিয়েতে আরো কতকগুলি বই উপহার পেয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল “দীপিকা” । সেটি নানা ধরণের রবীন্দ্র রচনার একটি চয়ন। কবিতা গল্প প্রবন্ধ রস রচনা মিলিয়ে সেই আমার সিলেবাসের বাইরে রবীন্দ্র পাঠ । তখনো প্রাথমিক স্তরে পড়ি। আর ছিল ” ঘরে ফেরার দিন” । অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা। নাভানা থেকে প্রকাশিত। তখন কি আর জানি যে অমিয় চক্রবর্তী রাশিয়ার চিঠির সাথে যুক্ত ? তিনি মহত্তম কবির সচিবের কাজ করেছেন ? সেই শৈশবে পড়া কবিতাগুলির কয়েকটি এখনো মনে করতে পারি । সে সব দিনে লোকে বিয়েতে বই দিত। সে বই যে পেত সে তো পড়তোই , তার আপন জনেরাও পড়তো। আমি বিয়েতে বই দেবার পক্ষপাতী । কিন্তু সম্প্রতি দেখছি বই উপহার দিলে সে বই যাকে উপহার দিলাম, তিনি পড়ছেন না। জিজ্ঞাসা করলে বিব্রত বোধ করছেন। আমি ঠিক করেছি , যার সাথে কোনোদিন বই পড়ার সুখ নিয়ে তুমুল আলোচনা হয় নি, তার বিয়েতে যাব না। বই উপহার দিতে না পেলে সে সব বিয়েতে আমি নেই।
“মা “এই শব্দটা বললে আজ তো গোর্কির “মা” গ্রন্থের কথা মনে পড়বেই। আমার যে এক অসামান্য কবির মাকে মনে পড়ে। তিনি জীবনানন্দ দাশের মা। কুসুমকুমারী কবিতা লিখতেন। ঘরের কাজও করতেন। যেমন কিনা প্রতিটি শিক্ষিত পড়াশুনায় আগ্রহী কবিতাপ্রেমী মা বউ বোন করে থাকেন। কিন্তু কুসুমকুমারী আর একটা কাজ করতেন। সেটা হল দায়ে বিপদে প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো। সে সব দিনে মায়েদের প্রসবের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা চালু ছিল না। বাড়িতেই প্রসব হত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে সেই সব দিনেও মায়েদের কষ্ট যন্ত্রণা কিছু কম হত না। কুসুমকুমারী সেই সব দিনে প্রতিবেশী গর্ভবতী মেয়ের কাছে ছুটে গিয়ে তার সেবা শুশ্রূষা করতেন।
এমন ধাঁচের মা কিন্তু বলতে পারেন, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবার কথা। ওই পংক্তিটি লিখে ওই অসামান্য মা আমার প্রণাম পেয়েছেন। এই পংক্তিটিকে আমি একটি সার্থক কবিতা বলেই মনে করি।
মায়ের বিয়েতে উপহার পাওয়া বইগুলির মধ‍্যে দীপিকা নামে রবীন্দ্র সাহিত্যের একটি বাছাই সংকলন, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভ্রান্তিবিলাস, আর কবি অমিয় চক্রবর্তীর ঘরে ফেরার দিন, এগুলি ছাড়াও আরো কিছু বই ছিল। অভিশাপ তার একটি। লেখকের নাম মনে নেই। সেকালে যে বিয়ে বাড়িতে বই উপহার দেবার চল ছিল। বই উপহার দিলে মুখ বাঁকানোর রেওয়াজ ছিল না। স্বল্পশিক্ষিত নিম্নবিত্ত মানুষও বই দিয়ে মরমে মরে যাবার হাত থেকে বাঁচতে পেত। বিয়েবাড়িতে কোনো কোনো লেখকের বই বেশি চলত। শরৎ সাহিত্যের বামুনের মেয়ে, অভাগীর স্বর্গ, মহেশ, বড়দিদি, বিন্দুর ছেলে, বিরাজ বৌ ছিল ঘরে ঘরে। তুলনায় রবীন্দ্রনাথের বই ছিল কুলীন গোত্রের। বাবার থেকে সামান্য বড় আমার এক জ্যাঠামশায় রবীন্দ্র কাব্যগ্রন্থ “মহুয়া” দেবার পরামর্শ দিতেন। উপনয়নের নিমন্ত্রণ এলে ক্যুইজের বই দিত অনেকে। দেব সাহিত্য কুটিরের বেশ কিছু বিশ্ব সাহিত্যের অনুবাদের বই ছিল। তখনকার ছেলে মেয়ের হাতে থাকত গালিভারস ট্রাভেলস, আঙ্কল টমস কেবিন, ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, রবিনসন ক্রুসো, হাঞ্চ ব্যাক অফ নোৎরদাম, এরাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটটি ডেজ। এক মাসির বাড়ি গিয়ে দেখেছি বিয়েতে তিনি জন রিডের দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন পেয়েছিলেন। লোকে গোর্কির মা এর কথাও জানত। তার পরে সত্তর দশকের শেষে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে বিতর্ক প্রতিযোগিতার প্রাইজের তালিকায় আমাদের ক্রমশঃ চোখে পড়ল নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ইস্পাত, বরিস পলেভয় এর মানুষের মত মানুষ। এইসব বই পাওয়া মাত্র গভীর আগ্রহে পড়ে ফেললাম।
আমি গোঁ ধরতাম বিয়ে বাড়িতে বইই উপহার দাও। মা বলতেন, যে বই পড়ে না, তাকে বই উপহার দেওয়া মানে বইয়ের অপমান। আমি রাগ করতাম মুখভার করতাম। বই সে না পড়ুক, কেউ না কেউ পড়বে। আমার কথা খাটত না। শাড়ি আনতেন মেজ জ্যাঠা মশায়। বেগমপুরী, ধনেখালি, ফুলিয়ার তাঁতের শাড়ি। মা জ্যেঠিমা তার থেকে পছন্দ করে নিতেন।
এখন আমার মত বদলেছে। আমি বই উপহার দেবার জন্যে লাফালাফি ভুলে গিয়েছি। যে বাড়িতে নিয়মিত বই পড়ার চল নেই, সেইসব পরিবারের বিয়েবাড়িতে আমি যাওয়াই বাদ দিয়ে দিয়েছি।

কালকূটের “শাম্ব” পড়েছিলাম ছোটোবেলায়। বোধ হয় মেজমামার খাটের আড়ালে লুকিয়ে। লুকিয়ে, কেননা সেই বয়সে বড়দের বই লুকিয়ে পড়তে হত। কৃষ্ণের পুত্র নিজের পিতাকে গোপিনীদের সাথে রমণরত দেখে ফেলেছিলেন। তাইতে পিতা ভীষণ রেগে পুত্রকে কুষ্ঠ আক্রান্ত হবার অভিশাপ দেন। পরে তীর্থে গিয়ে শাম্বের শাপমুক্তি ঘটে ।
কুষ্ঠ পরিচিত ছিল সাংঘাতিক রোগ হিসেবে। কাজেই খুব স্বাভাবিক ভাবেই মনু মহাশয় বিধান দিয়েছিলেন যে কুষ্ঠ রোগ হলে রোগীকে সমাজ থেকে দূর করে দিও। ইংরেজ, যারা ভারতীয় কুসংস্কারগুলি দূর করতে পলিটিক্যালি ইচ্ছুক ছিলেন না, তারাও কুষ্ঠরোগীদের একঘরে করে রাখার সপক্ষে ফরমান জারি করেন। স্বাধীন ভারতেও এই ১৯৮৩ অবধি আইনটি চালু ছিল। স্বামীর কুষ্ঠ হলে স্ত্রী বিচ্ছেদ পেত সহজেই।
আশার কথা এই যে, ভারতের শীর্ষ বিচারালয় এই রোগ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিতে চাইছেন।
কিন্তু কেন? কেন না, নরওয়ের বিজ্ঞানী গেরহারড হ্যানসেন ( ২৯/০৭/১৮৪১ – ১২/০২/১৯১২) ১৮৭৩ সালে প্রমাণ করে দেন যে এই অসুখটি একটি ব্যাকটিরিয়ার অবদান। সেই ব্যাকটিরিয়ার নাম মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপ্রি । এই রোগের চিকিৎসা আছে আর চিকিৎসা সঠিক সময়ে শুরু হলে এই রোগ সেরেও যায়।
মুশকিলের কথা হল অপুষ্টি আর অভাবকে যক্ষ্মা বা আমাশয় বা ম্যালেরিয়া বা আরো পাঁচটা রোগের মতো কুষ্ঠরোগটাও ভারি পছন্দ করে। ভারতে যেহেতু সাধারণ মানুষের জীবন বড্ডো বেশিরকম লজ্জাজনকভাবে অবহেলিত, তাই বিশ্বের ৫৯% কুষ্ঠরোগী এই ২০১৫ সালেও ভারতের বাসিন্দা। ভারতের প্রশাসন এই নিয়ে গর্ববোধ করতে পারেন।
এক ফরাসী মানবতাবাদী, রাউল ফোলেরো ১৯৫৪ থেকে জানুয়ারির শেষ রবিবারে বিশ্ব কুষ্ঠদিবস পালন শুরু করেন। ওই দিনটা আমাদের মহাত্মা গান্ধীর শহীদ দিবসের কাছাকাছি পড়ে বলে ভারতে মহাত্মাজীর মৃত্যুদিনকেও কুষ্ঠ প্রতিরোধ উপলক্ষে পালন করা হয়।
যাই হোক, ভারতে যুক্তিচর্চা খুব শীর্ণ ও অবহেলিত হবার কারণে, এবং রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে কুসংস্কারের প্রশ্রয়দাতা হবার কারণে আজো কুষ্ঠরোগ নিয়ে আমাদের রাখঢাকের শেষ নেই। চিকিৎসা করার জন্য রাষ্ট্রীয় আরো উদ্যোগ দরকার বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের দাবি।
শাম্বর লেখক সমরেশ বসু ঘুরে ঘুরে ডিম বিক্রি করতেন। তারপর ইছাপুর রাইফেল ফ‍্যাকটরিতে শ্রমিকের কাজ ধরেছিলেন। সেটা ১৯৪৩ সাল। তখন তিনি বছর ঊনিশের তরতাজা তরুণ। জন্মেছিলেন ১৯২৪ সালের এগারো ডিসেম্বর। ১৯৪৬ সালে গল্প লিখলেন “আদাব”। প্রকাশ পেল “পরিচয়” পত্রিকার পাতায়। ১৯৪৯ অবধি রাইফেল ফ‍্যাকটরিতে শ্রমিকের জীবন। মজদুর ট্রেড ইউনিয়ন করতে করতে কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। তারপর কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী সন্দেহে কারারুদ্ধ হন।
আমাদের ছোটবেলায় সমরেশ বসু ছিলেন অসামান্য বিখ্যাত লেখক। ১৯৮০ সালে শাম্ব উপন্যাস লেখার সুবাদে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেলেন। শাম্ব এক অন‍্যরকম চরিত্র। তিনি মহাভারতের কৃষ্ণের পুত্র। নিজের পিতাকে যৌনসঙ্গিনীদের সাথে ক্রীড়ারত দেখে ফেলে তিনি অভিশপ্ত হয়ে কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত হন। তাঁর এই শাম্ব উপন‍্যাসটি আমি মামাবাড়িতে মেজোমামার ঘরে খাটের নিচে লুকিয়ে চোখ বুলিয়েছিলাম। এই বুঝি ধরা পড়ি ভয় নিয়ে দুরুদুরু বক্ষে উপন্যাসের পাতায় চোখ বুলাবার সময়ে আমি নির্ঘাৎ স্কুলের গণ্ডি পেরোই নি।
১৯৫২ সাল থেকে সমরেশ বসু কালকূট কলম নামে লিখতে শুরু করেন। বাবা অফিস লাইব্রেরি থেকে কালকূটের লেখা বই এনেছেন মায়ের পড়ার জন‍্য।
গোল বাধল প্রজাপতি আর বিবর নিয়ে। সমরেশ বসুর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার দায়ে মামলা হল। তখনকার বরেণ্য লেখক বুদ্ধদেব বসু লেখককে সমর্থন করলেন।
১৯৮৫ নিম্ন আদালতের রায়কে বাতিল ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট বললেন প্রজাপতি ও বিবর অশ্লীল নয়। আমি তখন উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর ছাত্র হিসেবে গোয়েঙ্কা কলেজে বাণিজ্য নিয়ে পড়ে সদ‍্য পাশ করে ওই কলেজে পড়ছি।
আজ ডি এইচ লরেন্সের জন্মদিনে সমরেশ বসুকে কেন যেন মনে এল। লরেন্স সাহেব এর উপন্যাস লেডি চ‍্যাটার্লিজ় লাভার নিয়েও অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছিল। লরেন্স জন্মেছিলেন ১৮৮৫ সালে। ১৯৮৫ তে একশত বৎসর পরে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সমরেশ বসুর লেখা উপন্যাস অশ্লীলতার দায় থেকে মুক্তি পেয়েছিল।
১৯৮৮ সালের বারো মার্চ তারিখে সমরেশ বসু প্রয়াত হন।
স‍্যামুয়েল ক্লিমেন্স, যিনি পরবর্তীকালে মার্ক টোয়েন নামে জগদ্বিখ্যাত প্রণম‍্য লেখক হয়েছিলেন, তিনি ১৮৩৫ সালের ত্রিশে নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ক্লিমেন্স তাঁর সদ‍্যকৈশোরে তেরো বৎসর বয়সে একটি ছাপাখানায় অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ শুরু করেন। শিশু শ্রমিক আর কি। পরে, ওঁর এক বড়ো দাদা, যিনি হানিব‍্যাল জার্নাল নামে একটি কাগজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁর কাছে কাজ করতেন। ১৮৫৭ সালে কিওকুক ডেলি পোস্ট নামে কাগজটি ক্লিমেন্সকে কমিক ভ্রমণপত্র লেখার কাজ দিয়েছিল। গোটা পাঁচ অমন পত্র লিখে ফেলার পর ক্লিমেন্স ওই কাজ ছেড়ে স্টিম বোটের পাইলটের কাজ শিখতে গেলেন। সেটা ১৮৫৭ সাল। আর দুটো বছর শিক্ষানবিশি করেই ১৮৫৯ সালে তেইশ বছর বয়সে তিনি পাইলটগিরির লাইসেন্স বাগিয়ে ফেললেন। মোটে বছর দুয়েক পাইলটগিরি করেছিলেন ক্লিমেন্স। স্টিম বোটের পাইলটগিরি কাজটা ওঁর জীবনে বিশেষ তাৎপর্যবহ। এই পাইলট গিরি করার সময় ই ক্লিমেন্স “মার্ক টোয়েন” ছদ্মনামটি নেন। মার্ক টোয়েন শব্দদুটি সে দেশের মাঝিগিরির ভাষা। নদীর জল যদি অন্ততঃপক্ষে দুই ফ‍্যাদম গভীরতা সম্পন্ন হয়, তবেই স্টিম বোট চালানো যায়। সাবধানে নৌ চালনার জন‍্য ওই দুই ফ‍্যাদম গভীরতার জলটুকু দরকার। মার্ক টোয়েন শব্দদ্বয়ের ওই অর্থ – দুই ফ‍্যাদম গভীরতা। ১৮৬১ সালে ক্লিমেন্স মাঝিগিরির পাট চুকিয়ে আবার ফিরলেন লেখালেখির জগতে। হাস‍্যরসপূর্ণ ভ্রমণগদ‍্য লিখে চললেন। কলমের নাম নিলেন মার্ক টোয়েন। এরপর প্রায় বছর পঞ্চাশ ধরে নিজেকে ওই মার্ক টোয়েন নামেই চেনালেন। ১৮৬৪ সালে তিনি চলে গেলেন সানফ্রান্সিসকো। সেখানে গিয়ে তিনি এক খাসা গল্প লিখলেন – দি সেলিব্রেটেড জাম্পিং ফ্রগ অফ ক‍্যালাভেরাস কাউন্টি। লিখেই বিখ্যাত হয়ে গেলেন। ১৮৭৫ এ প্রকাশ পেল টম সইয়ার। ১৮৮৩ তে লাইফ অন দি মিসিসিপি। ১৮৮৫ তে বেরিয়েছে তাঁর মাস্টার পিস, হাকলবেরি ফিন। ১৯১০ সালের ২১ এপ্রিল এই অনন্য সাধারণ কথাশিল্পী প্রয়াত হন।
তিনি বলতেন, The two most important days in your life are the day you born and the day you find out why. বলতেন, If you tell the truth, you don’t have to remember anything. আরো বলতেন, I have never let my schooling interfere with my education.
নাম তাঁর ও হেনরি। তাঁর একটি গল্প পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম কৈশোরেই । গিফট অফ দ্য ম্যাজাই। তার পর সুযোগ পেতেই একটার পর একটা গল্প। আর পড়তে পড়তে জেনে নিই
জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন এই গুণী লেখক। ১৯০১ সাল সেটা। ব্যাঙ্ক জালিয়াতি করে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তার পর ধরা পড়ার ভয়ে পিঠটান দিয়েছিলেন। শেষে কঠিন অসুখ হয়ে আর সামলাতে পারেন নি। ধরা পড়লেন। তিন বছর জেল খেটে উইলিয়ম সিডনি পোর্টার একে বারে আলাদা মানুষ। প্রতি সপ্তাহে গল্প লেখা ধরলেন নিউ ইয়রক ওয়ার্ল্ড কাগজে। তার পর খ্যাতি। তার গিফট অফ দ্য ম্যাজাই গল্পটা আছে দ্য ফোর মিলিয়ন গল্প সংগ্রহে । সে সংগ্রহটি ১৯০৬ সালে প্রকাশ পায়। ১৮৬২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জন্মেছিলেন। ১৯১০ সালে মারা গেলেন মানুষটি । মদ খেয়ে এতোল বেতোল নেশা করতেন মানুষটা। আর ভুগতেন অর্থকষ্টে । ১৯১০ সালে মৃত্যু এসে কোলে করে তুলে নিয়ে গেল বাণীর এই বরপুত্রকে।

বাবা যে ইংরেজি সাহিত্যের জাহাজ ছিলেন, তা তো নয়। তবুও বালক পুত্রটিকে কাছে নিয়ে তিনি ড‍্যাফোডিল ফুল নিয়ে লেখা ইংরেজি কবিতাটির সারমর্ম বলতেন। আর বলতেন আবু বেন আদেম এর কথা। আর বলতেন ইঞ্চকেপ রকের কথা। ইংরেজ কবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ ১৮৫০ সালে ২৩ এপ্রিল প্রয়াত হন।। ড্যাফোডিল নামে ফুলটি তাঁর কবিতায় বিখ্যাত হয়ে আছে। আমার বাবা আমাকে ছোটবেলায় কখনো সেই ফুলটির কথা একটু বলেছিলেন, স্মরণে আছে। পথে যেতে যেতে কোথাও এমন ফুল দেখলে কানে শোনা সেই ড্যাফোডিলের কথা ভেবেছি, মহান কবির কথা ভেবেছি। শ্রদ্ধায় নত হয়েছি, এই ভেবে যে, আমার অতি সাধারণ বাবা আমায় এই ড্যাফোডিলের কথা শৈশবেই শুনিয়ে সাহিত্য বোঝার মন ও রুচি উপহার দিয়েছিলেন।
বাবা মা সাহিত্যের স্বাদ দিলে শিশু তা কিছুতেই ভুলতে পারে না।
বাবা তাঁর বড়দাদার পুস্তক বিপণিতে কাজ করতে করতে স্বশিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন।
১০
ড্যানিয়েল ডিফো (১৩ সেপ্টেম্বর ১৬৬০ – ২৪ এপ্রিল ১৭৩১)র লেখা রবিনসন ক্রুসোর গল্প কৈশোরে কে না পড়েছি?
এই মানুষটিকে ১৭০৩ সালে পলিটিক্যাল ব্যঙ্গ লিফলেট লেখার দায়ে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। আচ্ছা, লেখকের পলিটিক্যাল দর্শন থাকবে না? তিনি তাঁর কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন না?
১১
এমন শাস্তি দিলে সে যুগে জনতা অপরাধীর দিকে পাথর ছুঁড়ত। কিন্তু লেখক ড্যানিয়েল ডিফোর দিকে জনতা ফুল ছুঁড়েছিল। আর দুঃখ পেয়েছিল। সমবেদনা জানিয়েছিল। এর পর তিনি জেলে যান। ১৭১৯ সালে লেখেন রবিনসন ক্রুসোর গল্প। অনুবাদ আর সংস্করণের সুবাদে বাইবেলের পরেই এই বইয়ের কথা মনে করেন অভিজ্ঞ পাঠক।
একজন লেখকের এর চাইতে বড় প্রাপ্য আর কি আছে , আমি জানি না।
১২
রবিনসন ক্রুশো বইটি ১৭১৯ সালে প্রকাশ পেয়েছিল। আলেকজান্ডার সেলকার্ক নামে এক স্কটিশ নাবিকের জীবন অবলম্বনে ড্যানিয়েল ডিফোর গল্প এই রবিনসন ক্রুশো। আঠাশ বছর একটানা একটা সভ্যতা বিরহিত দ্বীপে আটকে ছিলেন আলেকজান্ডার সেলকার্ক নামে সেই স্কটিশ নাবিক ।
রবিনসন ক্রুশো বইটি খুব জনপ্রিয়।
ড্যানিয়েল ডিফো প্রয়াত হয়েছিলেন ২৪ এপ্রিল, ১৭৩১ সালে।
১৩
আঙ্কল টম’স কেবিন, বা টম চাচার কুটির,
এই বইটি ছোটোবেলায় কে না পড়েছি! বইটি লিখেছিলেন হ্যারিয়েট বিচার স্টো … এক ভদ্রমহিলা। এমন বই পড়তে পড়তেই তো নিজেকে দরিদ্র মানুষের দলের লোক বলে চিনেছি। ছিনু সর্বহারা, হবো সর্বজয়ী … এভাবে ভাবতে চেয়েছি… কাজী নজরুলের কুলি মজুর কবিতা , রবীন্দ্রনাথের আফ্রিকা কবিতা, সুকান্তের রানার ছুটেছে রানার … আর বঙ্কিমের শিক্ষায় রামা কৈবর্ত আর হাসিম শেখের মুক্তি দাবি করতে শিখেছি।
সূচনায় কিন্তু ওই টম চাচার কুটির…।
১৮১১ সালে এই মহান লেখিকার জন্ম হয়েছিল।

১৪
আমাদের কৈশোরে একটু আধটু সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হত। তাতে বিতর্ক আর তাৎক্ষণিক বক্তৃতার বিভাগ থাকত। আমার নজর যেত ঐদিকে। প্রাইজ পেয়েছি নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ইস্পাত বইটি। পাভেল করচাগিন কে খুব ভাল লেগেছিল। দলের মধ্যে যান্ত্রিকতাও ছিল। রাজভালিখিনকেও মনে আছে। । এই বইটাই আমাকে মার্ক্সবাদের প্রতি শ্রদ্ধাবান করে তোলে।
১৫
আমি চিরকাল মূর্তি গড়ার বিপক্ষে। মূর্তিটি যাঁর, তাঁর পক্ষের লোকেরা যতদিন ক্ষমতায় আছে, মূর্তির আয়ু ততদিন। আমার সদ্যোতারুণ্যের দিনগুলিতে সোভিয়েত রাশিয়া টুকরো হয়েছিল। স্তালিনের মূর্তির গলায় শিকল পরিয়ে টেনে নামানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল সেই মূর্তির ধাতুতে বহুবিধ উন্নতির কাজ হবে। ভাল কথা। সকলেই উন্নতির কথা বলতে ভালবাসে। “উন্নতি” একটি চার অক্ষর শব্দ। এই মন্ত্র জপতে জপতে সব কিছু করা চলে। সিঙ্গুর সাক্ষী। মাও জে দং আমার শৈশবে মহাপরাক্রান্ত ছিলেন। হাঁটি হাঁটি পা পা করার দিনে মাওয়ের টেনসিল ছবি থাকত দেয়ালে। চীনের চেয়ারম্যান না কি আমাদের দেশেও কাদের চেয়ারম্যান। সেই মহামহিম মাওয়ের শবদেহ মমি করে রাখা ছিল চীনে। লোকে দেবতাজ্ঞানে দেখতে যেত। পীরের মাজারে যাবার মতো করেই যেত বোধ হয়। যাই হোক “উন্নতিশীল” চীন মরদেহটির সৎকার করে খরচ বাঁচাল। আমি কিছু মনে করি নি। মাও তো শবদেহের মধ্যে নেই। আমাদের আম্বেদকরের গলায় জুতোর মালা পরানোর ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে নজরে এসেছে। যে জাত গান্ধীর মতো মানুষকে খুন করতে পারে, তারা আম্বেদকরকে জুতোর মালা পরাতেই পারে। মূর্তি গড়লেই ওই হ্যাপা। কোন দিন না কোনদিন কে জুতোর মালা পরিয়ে দেবে, কন্ডোমের মালা পরিয়ে দেবে। পুরীষ মাখিয়ে দেবে। এইজন্যেই আমি মূর্তি গড়ার ঘোর বিরোধী। মূর্তি নয়, মহৎ দার্শনিকের বই পড়ুন। পারলে স্মৃতিতে ধরে রাখার স্পর্ধা নিন।
১৬
আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে বামপন্থা বলতে কি বোঝায়, পশ্চিমবঙ্গের লোকে কিছু কিছু জানত। বামপন্থী , র‍্যাডিক‍্যাল, সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট, অতিবাম, এইসব শব্দগুলোর ভিতরে তফাত আছে কি না, তাও জানত । আমরা কলেজে গিয়ে লিফলেট পেতে শুরু করি। আমাদের কানে পুঁজিবাদ ফ্যাসিবাদ শব্দগুলো অচেনা ছিল না। আমরা সামন্ততন্ত্র, আধা সামন্ততন্ত্র, গেরিলাবাহিনী, প্রতিক্রিয়াশীল, সংশোধনবাদ, নয়া সংশোধনবাদ , শ্রেণীশত্রু, জোতদার, কুলাক, পুড়িয়ে মারুন, অন্তরের নেতা, মহান শিক্ষক এই সব শব্দ শুনতে পেতাম।
আর সোভিয়েত দেশের সাথে শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করতাম কিউবা, বলিভিয়া এইসব দেশের কথা।
আর নজরুল, সুকান্ত, দিনেশ দাস, বীরেন চট্টোপাধ্যায় মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়দের কবিতার সাথে পাবলো নেরুদা, নাজিম হিকমত এর কবিতাও বাংলা ভাষায় পড়তাম।
মানুষের সর্বাঙ্গীণ মুক্তির কথা বলতে সে সময়ের কবিরা কুণ্ঠিত হতেন না।
তাদের একজন পাবলো নেরুদা ১৯০৪ সালে জন্মেছিলেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে, আমার বছর চারেক বয়সে মারা গিয়েছিলেন নেরুদা।
সেই যে আমরা দু একটি রাশিয়ান শব্দ জানতাম। প্রাভদা মানে সত্য, ইজভেস্তিয়া মানে খবর। এদুটি শব্দ নিয়ে কৌতুকীও ছিল। বলা হত ইজভেস্তিয়ায় প্রাভদা নেই। প্রাভদায় ইজভেস্তিয়া নেই। আসলে প্রাভদা ও ইজভেস্তিয়া সাবেক সোভিয়েত আমলের দু দুটি সরকারি কাগজ। দলতন্ত্রের আবদার মেটাতে প্রাভদা আর ইজভেস্তিয়া সরকারের নিতান্ত ধামাধরা হয়ে পড়ে সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। সত‍্য ঘটনা বাদ দিয়ে দল যেটুকু অনুমোদন করে, তাই রোজ রোজ বলতে গিয়ে ওই কাগজ দুটো জনমনে অপাংক্তেয় হয়ে গেল।
তার পর এল গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রৈকা শব্দ দুটি।
ম্যাক্সিম গোর্কি ( ১৮৬৮ – ১৯৩৬) র বই বাংলা ভূমিতে পরিচিত হয়ে ওঠে বামপন্থী আন্দোলন গড়ে তোলার দিনগুলিতে।
আমি যখন কলেজে পড়ি, সেই ১৭ বছর বয়স থেকেই আমি ম্যাক্সিম গোর্কির কথা জানতাম আর তার একটি মাত্র বইয়ের কথাই জানতাম। গোরকি অসাধারণ বড় সাহিত্যিক ছিলেন, এটা পাড়ায় বড়রা কেউ কোনোদিন বলেছিল। কিন্তু কেন যে, কি করে যে একজন লেখক বড় বলে পরিগণিত হয়, সমাজের প্রতি সাহিত্যিকের দায় কি, এ সব নিয়ে বিশেষ আলোচনা শুনি নি।
যাঁরা সাহিত্য লিখতেন না, শুধু দলীয় রাজনীতি, বা ভোট রাজনীতি করতেন, তাঁদের কাউকে কাউকে পূজার সময় বামপন্থীদের পুস্তক স্টলে বসতে দেখতাম। তা অনেকটাই বাধ্যতামূলক কৃত্যের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ , তাঁরা যে বামপন্থা বিশেষ বুঝতেন, তাও নয়, আবার সাহিত্য বুঝতেন, তাও নয়। বামপন্থা তাদের কাছে একটি দলের পতাকা বওয়া মাত্র ছিল। আর পতাকার নিচে লাঠিটাই ছিল আসল কাজের জিনিস। বিপক্ষগণ ওই লাঠির অস্তিত্ব বিলক্ষণ জানত, আর সেই জেনে বামপন্থা নিয়ে বেশি ঘাঁটাত না।
গোরকির বিখ্যাত যে বইটা বামপন্থীদের স্টলে অবশ্য অবশ্য থাকতো, তা হল মাদার। কিন্তু বাংলায় এই বইয়ের যে অনুবাদ ছিল, তার ভাষাবিন্যাস আমার মন টানে নি। আমি এই বইটি কিনেছি বলে মনেও পড়ে না। যদিও নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ইস্পাত আর বরিস পলেভয় এর মানুষের মত মানুষ খুব মন দিয়েই পড়েছিলাম।
বারটোল্ট ব্রেখট এর দ্বারা নাট্যায়িত ও অভিনীত হয়ে এই মাদার উপন্যাস খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। পাড়ার ছোট ছোট নাট্যগোষ্ঠীও মা নাটক করবে ভাবত। কিন্তু ১৯৮৪ সালটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। শাসন ক্ষমতায় থাকা বামপন্থীরা চাইতেন না ভোটের বাইরে আর বিশেষ বামপন্থা নিয়ে চর্চা হোক। ভোটের চিটে গুড়ে তাঁঁরা জড়িয়ে গিয়েছিলেন।
১৭
কার্ল মার্ক্স আমাদের ভাবনা জগতে নতুন দিগন্ত এনেছেন। কোন্ দেশে তাঁর জন্ম, আর কোন ভাষায় তিনি কথা বলতেন, সে সব নিয়ে আকচা আকচি না করে, আসুন, আমরা যে আগ্রহে নিউটন আইনস্টাইন গ্যালিলিও ডারউইনকে বিজ্ঞানী হিসেবে শ্রদ্ধা করে থাকি, যে আদরে শেকসপীয়র শেলি কীটসকে ভালবাসি, বাখ বিঠোফেন মোৎসার্টকে শ্রদ্ধা করি , লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আর মাইকেল অ্যাঞ্জেলোকে ভালবাসি, সেই ধরনের ভালবাসি কার্ল মার্ক্সকেও । জ্ঞানের কোনো দেশ বিদেশ নেই।
১৮
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়সকালে লেখা “রাশিয়ার চিঠি” পড়েছিলাম মন দিয়ে। সেখানে প্রদীপের পিলসুজ হয়ে থাকে সমাজের যে অংশ তাদের সার্বিক মুক্তির কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
সেই সব মনের মধ্যে হাঁচোড় পাঁচোড় করে।
জারের আমলের রাশিয়ায় প্রাসাদস্থাপত্য, শিল্পসংগ্রহ ইত্যাদি ছিল চোখ ধাঁধিয়ে দেবার মতো। রাশিয়া তো যাই নি। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠি পড়েই জেনেছি বিপ্লবের সময়ে বলশেভিক দলের লোকেরা অসামান্য শিল্পসুষমামণ্ডিত জিনিসগুলি নষ্ট করেন নি। এটা জানতে পেরে ভালো লেগেছিল। যারা যথার্থ মানুষ, তারা গড়বার পক্ষে। শিল্পকৃতি, যা কিছু সুন্দর, তাকে যত্নে রাখার আন্তরিক দায় তারা গ্রাহ্য করে।
১৯
আমার কানে কানে কথা কইতেন বার্টোল্ট ব্রেখট। পৃথিবী বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্বের নামটুকু যা জানি ক্লাস ইলেভেনের ছেলেটি। একটা কবিতাও মনের মধ্যে কোথাও গেঁথে গিয়েছিল – গুলি কোরো না, এখানে সবাই মানুষ।
ওদিকে ছোটবেলা থেকেই পাড়ার গলিতে আলকাতরা দিয়ে লেখা দেখেছিলাম – বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।
আমি মেনে নিতে পারি নি।
বন্দুকের নল ক্ষমতার উৎস হয়ে উঠলে সভ্যতা জিনিসটা হারিয়ে যায়।
২০
মার্ক্সের ঘন গোঁফ দাড়ির আড়ালে যে অমন একটা ঝকঝকে প্রেমিক মন ছিল আমাদের দিদিমণি তো মোটেও বিশ্বাস করবেন না। সেই যে দিদিমণি আমার “কলকাতা মেট্রো প্রেম প্রকাশ” ব্যাপারে বক্তব্যের বিরুদ্ধে আমায় ফেসবুকে তুলোধোনা করেছেন। মার্ক্সের প্রেমের কবিতা যে আমি পড়েছি, আর প্রকাশ্য সাহিত্যসভায় পড়ে শুনিয়েছি, এটা জানলে পরে দিদিমণি নির্ঘাৎ ভিরমি খাবেন।
দিদিমণিকে তারপর লেনিনের গপ্পো বলতে ইচ্ছে করে। সেই যে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ, যিনি রাশিয়াকে সোভিয়েত করে দিলেন। তাঁর সঙ্গিনী ছিলেন স্ক্রুপস্কায়া। ওঁরা নিয়মমতে বিয়ে করেন নি। একটা পুরুষ আর একটা নারী এক সাথে থাকবে, খাবে, সহবাস করবে, তাতে দুজনের ইচ্ছেই তো যথেষ্ট। আবার বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠান আসে কোত্থেকে?
শুনলে আমার দিদিমণিটির কি যে হবে!
২১
বাইবেলের বাজার পুরো নষ্ট করে চার্চের ক্ষমতাধরদের পথে বসিয়ে দিয়েছিলেন চার্লস ডারউইন।
বাইবেলে বলা ছিল…. ঈশ্বর ইচ্ছা করিলেন, আলো হউক, তাহাতে আলো হইল।… এইভাবে তাবৎ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের এক একটি জিনিস এক এক দিন সৃষ্টি হইল। সব কিছু সৃষ্টির পরে পরমপিতা ইচ্ছিলেন, মানব হউক। তাহাতে প্রথম মানব আদম জন্মিল। তাহার পর ঈশ্বর রবিবার বিশ্রাম করিলেন।….
বাইবেলের গল্প এইরকম। প্রথম মানব আদমকে ঈশ্বর সৃষ্টি করলেও প্রথম মানবী ইভ জন্মালেন আদমের পাঁজরের হাড় থেকে।
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ও প্রাণজগতের উদ্ভবের কথা হিন্দুর পুরাণেও আছে। সেখানে সপ্তদ্বীপা বসুন্ধরার কথা আছে। আছে সাপের মাথায় পৃথিবীর অবস্থানের কথা। জলমধ‍্যে শয়ান বিষ্ণু এবং প্রজাপতিগণের কথাও বলা হয়েছে। দক্ষ এবং কশ‍্যপ এই রকম প্রজাপতি। দ্বাদশ আদিত‍্যের কথা বলা আছে, অষ্ট বসুর কথা বলা আছে, সপ্তর্ষিগণ, দেব দানব দৈত‍্য, বৈবস্বত,স্বায়ম্ভূব সহ অনেকগুলি মনু, আর শ্বেতবরাহ প্রভৃতি অনেক গুলি কল্প মিলিয়ে হিন্দুর পুরাণ খুব রঙিন।
একই ভাবে, প্রাচীন সভ‍্যতার ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবিশ্বাস গুলিও যথেষ্ট উর্বর কল্পনাশক্তির পরিচয়বাহী।
কিন্তু গোল বাধল একের পর এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আর কিছু মানুষের তীব্র অনুসন্ধিৎসা আর জিজ্ঞাসার কারণে। জিজ্ঞাসাদীর্ণ হৃদয়ে তাঁরা নানাবিধ প্রশ্ন তুললেন, অভিযানে বেরোলেন, তথ‍্যসংগ্রহ করলেন, ও সংগৃহীত তথ‍্য বিশ্লেষণে ব্রতী হলেন।
চার্লস ডারউইন ( ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৮০৯ – ১৯ এপ্রিল, ১৮৮২) ছিলেন একজন প্রকৃতি পর্যবেক্ষক ও ভূতত্ত্ববিদ। জন্মপরিচয়ে তিনি ইংরেজ। ১৮৫৯ সালের ২৪ নভেম্বরে পঞ্চাশ বছর বয়সে তিনি একটি বই প্রকাশ করলেন। বইটির নাম, “অন দ‍্য অরিজিন অফ স্পিসিস বাই মিনস অফ ন‍্যাচারাল সিলেকশন অর দ‍্য প্রিজারভেশন অফ ফেভারড রেসেস ইন দ‍্য স্ট্রাগল ফর লাইফ”। সেকালে বইয়ের নাম অমন লম্বা লম্বা হত। ছোটো করে ওই বইকে পণ্ডিতেরা ডাকেন “অরিজিন অফ স্পিসিস” বলে।
এই বই যেন সেইসব দুনিয়া বদলে দেওয়া বইয়ের মতো। নিকোলাস কোপার্নিকাসের দ‍্য রেভলিউশনিবাস অরবিয়াম কোয়েলেসটিয়াম (১৫৪৩), ও আইজ‍্যাক নিউটনের ফিলজফিয়া ন‍্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম‍্যাথেমেটিকা ( ১৬৮৭) বইয়ের সাথেই যেন তুলনীয় এই বইটির ভূমিকা।
বাবা চেয়েছিলেন ছেলে হোন চিকিৎসক। সে ব‍্যাপারে আগ্রহ ছিল না ছেলের। তাঁর চেষ্টা গেল ধর্মীয় ব‍্যক্তিত্ব হতে। পাদ্রি হবেন। সেটাও জমে নি। পোকামাকড় নিয়ে পড়াশুনা করতেন। তারপর নেশা জাগল ভূতত্ত্ব নিয়ে গবেষণায়।
তারিখটা ছিল ১৮৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর। ব্রিটেনের প্লিমাউথ বন্দর থেকে দ্বিতীয় দফার সমুদ্রযাত্রা শুরু করল বিখ্যাত জাহাজ এইচএমএস বীগল। জাহাজের ক‍্যাপটেন ছিলেন রবার্ট ফিটজ়রয়। তিনি বছর বাইশের তরুণ চার্লস ডারউইনকে কাছে টেনে নিলেন। ঈশ্বরবিশ্বাসী ডারউইন চললেন অগাধ সমুদ্রে। বীগল জাহাজের ঘোষিত লক্ষ ও কাজ ছিল অতলান্তিক মহাসাগরে ঘুরে বেড়িয়ে জলবিষয়ক সার্ভে করা। আর দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ অংশ ঘুরে অস্ট্রেলিয়া ছুঁয়ে ফেরা।
এইসময় ডারউইন ভূতত্ত্বের আগ্রহী গবেষক এবং সেই বিষয়ে সন্দর্ভ তৈরিতে মনোযোগী। বীগল জাহাজে চড়ে আর্জেন্টিনা গিয়ে তিনি বিলুপ্ত স্তন‍্যপায়ী প্রাণীদের জীবাশ্মের একটি বড়োসড়ো সংগ্রহ দেখতে পেলেন। এখানে তিনি বেশ কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করলেন।
এই যে পর্যবেক্ষণ ও নমুনা সংগ্রহ করলেন, এতে তাঁর মনে প্রাকৃতিক নির্বচনের উসকানি জাগে। তারপর তো ইতিহাস। বিজ্ঞানীর মন তো আবেগে ভাসে না। নানাভাবে নিজেকে খুঁড়তে থাকে যুক্তি দিয়ে। “কেন?” , এই প্রশ্নটাই বিজ্ঞানীকে এগিয়ে নিয়ে চলে নতুন নতুন আবিষ্কারের পথে।
দুই বৎসর পরিক্রমা করবে বীগল জাহাজ। যাত্রা শুরুর কালে এমনই স্থির ছিল। কিন্তু সেটা বাড়তে বাড়তে গিয়ে ঠেকল প্রায় পাঁচ বৎসরে। এর মধ‍্যে তিন বৎসরের বেশি সময় ধরে ডারউইন ডাঙায় ঘুরে ঘুরে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ করেছেন। জাহাজ করে জলে ভেসেছেন তিনি মোটে বছর দেড়েক। ১৮৩৬ সালের ২ অক্টোবর দেশের বন্দরে ফিরল বীগল। কিন্তু ধর্মপিপাসু যুবকটি ফিরল না। যে ফিরে এল, সে এখন একজন জিজ্ঞাসু, সংশয়বাদী, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিগ্ধ মানুষ। সে এখন এমন এক বিশ্বের নাগরিক, যে বিশ্বটি ঈশ্বরের হাতে গড়া নয়। এখন সে একজন বদলে যেতে থাকা প্রশ্নশীল সংশয়ী মানুষ।
ওই যে বীগল জাহাজে চড়ে সে ঘুরে বেড়িয়েছিল, সেই সব বিবরণ সে দিনলিপির পাতায় লিখে রেখেছিল।
বীগল জাহাজ ফিরে আসার বছর ঘুরতে ঘুরতে তার বই লেখা হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুদের সঙ্গে একটি বড়ো বইয়ের তৃতীয় খণ্ড হিসেবে ডারউইনের ভ্রমণ বিবরণী প্রকাশ পায়।
অরিজিন অফ স্পিসিস তৈরি করতে আরো অনেক সময় নিলেন। ত্রিশ বছরের মতো। বছর বাইশের যুবক নিজের সংগৃহীত তথ‍্য নানাভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে পরিপ্রশ্নের মধ‍্য দিয়ে তিনটি দশক ধরে চলতে চলতে ১৮৫৯ সালে গড়ে তুললেন “অরিজিন অফ স্পিসিস”। ১৮৩৫ সালে সমুদ্রবেষ্টিত গ‍্যালাপাগোস দ্বীপমালায় ভ্রমণের মাধ‍্যমে তথ‍্য সংগ্রহ ডারউইনের অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচন করে। ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপে একই প্রজাতির পাখির ঠোঁটের গড়নে ভিন্নতা তাঁকে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এর আগেই যদিও কোনো কোনো পণ্ডিতের কলমে বিবর্তনবাদ আলগোছে উঁকি দিয়েছে, তবু সুসংহত সুগঠিত তত্ত্ব হিসেবে পর্যাপ্ত প্রমাণসহ তাকে বিদ্বৎসমাজে পেশ করলেন ডারউইন।
দুনিয়া গেল বদলে। ঈশ্বরের করুণা নয়, প্রকৃতির কারখানা ঘরে বহুদিনের মরণপণ চেষ্টায় প্রাণ বিকশিত হয়েছে, এমন উপলব্ধিতে পৌঁছে গেল মানুষ।
২২
উগ্র স্বৈরতন্ত্রী শাসক লেখকের কলমকে ভয় পায়। লেখককে নির্বাসন দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায় অত‍্যাচারী শাসক। এমন শাসকের পতন হলে ততদিন যদি লেখক প্রাণে বেঁচে থাকেন, তখন তাঁর ঘরে ফেরার দিন ।
আমার মা তাঁর বিয়েতে অমিয় চক্রবর্তীর কবিতার ব‍ই ‘ঘরে ফেরার দিন’ উপহার পেয়েছিলেন। বইটির প্রকাশক ছিলেন নাভানা। ওই সূত্রে এক সাহিত্যিকের ঘরে ফেরার দিন মনে পড়ে। তিনি “গুলাগ আর্কিপেলাগো” খ‍্যাত আলেকজান্ডার ইসায়েভিচ সলঝেনিৎসিন। ১৯১৮ এর ডিসেম্বরের এগারো তারিখে রাশিয়ায় জন্মেছিলেন। মারা যান ২০০৮ এর আগস্টের তিন তারিখে।
১৯৪৫ সালে এক বন্ধুর কাছে ব‍্যক্তিগত চিঠিতে রাষ্ট্র প্রধান ও পার্টির প্রধান স্ট‍্যালিনের সমালোচনা করার দায়ে সলঝেনিৎসিনের আট বৎসরের কঠোর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। ওই কারাবাসের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ওয়ান ডে ইন দ‍্য লাইফ অফ ইভান দেনিসোভিচ’। সে বই বের হল ১৯৬২ সালে। ১৯৬৮ সালে বের হল আরেক উপন্যাস ক‍্যানসার ওয়ার্ড। ১৯৭০ সালে পেলেন সাহিত্যকৃতির জন্য নোবেল পুরস্কার। সোভিয়েত ব‍্যবস্থার নাম করে যে বাস্তবে একটা নিষ্ঠুর পীড়নমূলক অমানবিক ব‍্যবস্থা চালানো হচ্ছে, এই ছিল সলঝেনিৎসিনের মূল প্রতিপাদ্য। আর যোসেফ স্ট‍্যালিনের সর্বময় কর্তৃত্বে সেই অমানবিক নির্যাতন যন্ত্র চালু আছে। ন‍্যূনতম বিরোধিতাকেও লৌহকঠিন হস্তে নিঃশেষে দমনে উদ‍্যত স্ট‍্যালিনের একনায়কতন্ত্র। এই সোভিয়েত রাষ্ট্রে ব‍্যক্তির মতপ্রকাশের কোনো পরিসর নেই, ব‍্যক্তিজীবনের কোনো আড়ালকে স্বীকার করে না স্ট‍্যালিনের নির্মম কর্তৃত্ব। এই বক্তব্য উঠে এল গুলাগ আর্কিপেলাগো উপন্যাসের পাতায় পাতায়। ১৯৭৩ সালে তা প্রকাশ পেল। এই বইটির বৈদেশিক প্রকাশের দায়ে ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সলঝেনিৎসিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনে ও নির্বাসন দণ্ড কার্যকর করে।
অবশ্য ১৯৫৩ তেই স্ট‍্যালিনের প্রয়াণ ঘটে। কিন্তু স্ট‍্যালিনের তৈরি বজ্রকঠিন নিষ্পেষণ নীতি কায়েম থাকে।
১৯৯০ তে দিন বদলায়। সরকার সলঝেনিৎসিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা তুলে নেয়।
নিরপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় সলঝেনিৎসিন দেশের মাটিতে ফেরার সুযোগ পান। ১৯৯৪ সালে সলঝেনিৎসিনের ঘরে ফেরার দিন।
২৩
ভাষা ভাবের বাহন। বিদ্যার কোনো পূর্ব পশ্চিম নেই। বাংলায় প্রকৃত শিক্ষিত ব্যক্তি ইংরেজি ভাষার অবদানকে অস্বীকার করতে পারেন না। ইংরেজি বাক্যের গঠনবিন্যাস যতিচিহ্নের প্রয়োগ বাংলা বাক্যগঠনকে ঋদ্ধ করেছে। বাঙালি মনীষীর চিন্তার বিস্তার বহুমুখীনতা বহুমাত্রিকতা বহুকৌণিক স্পর্ধা ইংরেজি পাঠাভ্যাসের কাছে বহুলাংশে ঋণী।
আধুনিক বাংলা কবিতার প্রবাদপুরুষ জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। বঙ্কিম ও মধু কবির প্রথম পরিচিত রচনা রাজমোহন’স ওয়াইফ এবং ক্যাপটিভ লেডি ইংরেজি ভাষায় লেখা। রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে নিজের লেখার ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। বিদ্যাসাগর মশায় শেক্সপিয়র অনুবাদ করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকায় ও লণ্ডনে গিয়ে ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় জীবনবোধকে তুলে ধরেছেন।
বাংলা নাটক, উপন্যাস, গদ্য রীতি, ব্যাকরণ চর্চা, পত্র পত্রিকা প্রকাশ ও বাংলা লিপির বিন্যাস ও মুদ্রণ সৌকর্যের প্রশ্নে বিদেশি মনীষীর অবদান রয়েছে।
বাংলায় শিক্ষাবিস্তারে উইলিয়াম কেরি, উইলিয়াম জোন্স, বেথুন, হেয়ার, বীডন, ডাফ, পরে সিস্টার নিবেদিতা সহ অজস্র বিদেশির অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ সম্বন্ধে সুনীতি চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের অসামান্য বইটিও ইংরেজি ভাষায় লেখা।
বাংলার সাথে ইংরেজি ভাষার বিরোধ কল্পনা অজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব।

২৪
অন্তর থেকে বিশুদ্ধতম ভালবাসা দিয়ে যাঁরা বাংলা কবিতা লিখবেন, তাঁরা নিশ্চয় খেয়াল করবেন যে, আধুনিক বাংলাভাষার মহাকবি মধুসূদন দত্তের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম “ক‍্যাপটিভ লেডি”। আধুনিক বাংলা গদ্য লিখেছেন বঙ্কিম, তাঁর প্রথম লেখা “রাজমোহন’স ওয়াইফ”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে বই নোবেল পুরস্কার এনে দিল, তার নাম “সং অফারিংস”। এর কবিতাগুলি কবি নিজেই অনুবাদ করেছিলেন। এই কবিতাগুলি গীতাঞ্জলি, গীতালি, গীতিমাল‍্য, খেয়া, নৈবেদ্য প্রমুখ দশটি গ্রন্থ থেকে রীতিমতো বাছাই করা । কোনও বিশেষ একটি কাব্যগ্রন্থের অনুবাদ মাত্র নয়। আর জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সমর সেন, অমিয় চক্রবর্তী, এঁরা সকলেই পেশায় ইংরেজিবিদ। হয় ইংরেজি ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপক, নয় তো জার্নালিস্ট বা খুব বড়ো চাকুরে।
নিজের ভাষাকে ভালবাসতে গিয়ে অন‍্য ভাষার প্রতি কোনো ঘৃণা আর বিদ্বেষ যেন প্রকাশ না পায়।
২৫
ভারতে গ্রীকবীর আলেকজান্ডার এসেছিলেন দিগ্বিজয়ী বেশে। ছোটো ছোটো রাজ্যগুলি জোট বাঁধতে জানত না। জোট বেঁধে ভারতীয়দের লড়াইয়ের ইতিহাস প্রাচীন যুগে ছিলই না। নিজেদের মধ্যে শত্রুতা বিশ্বাসঘাতকতাতেই প্রাচীন ভারতীয় রাজন্যবর্গ অভ্যস্ত ছিলেন। গ্রীক আক্রমণ, আর আলেকজান্ডারের চলে যাবার পরে কয়েকজন গ্রীক সেনানীর পরিচালনায় সৈন্যদের একটি অংশ থেকে গেলে তাঁদের কারণে ভারতীয় ভাষায় কিছু গ্রীক শব্দ স্থান করে নিয়েছিল। যে তেলের দাম নিয়ে আমরা সদা উদ্বিগ্ন উদব্যস্ত থাকি, সেই “দাম” শব্দটি এসেছে গ্রীক “দ্রাখমা” শব্দ থেকে। আজও দ্রাখমা গ্রীক মুদ্রার নাম। আর এসেছে ‘সিমুই’ ও ‘ময়দা’র মতো ভারি চেনা শব্দ। গ্রীক “সেমিদালিস” থেকে এ দুটি শব্দ গজিয়েছে।
আমাদের প্রাচীন ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে মিলনান্তক নাট্য এর কথাই বলা আছে। অর্থাৎ, ‘তারপর তারা পরম সুখে রাজত্ব করিতে লাগিল’ টাইপের বৃত্ত। “বৃত্ত” বলতে নাটকের প্লট। আখ্যান। বিয়োগান্ত নাটক শ্রদ্ধেয় ছিল গ্রীক ঐতিহ্যে। অশান্ত হাহাকার প্রাচ্যের আবেগপ্রবণ মানুষ সহ্য করতে পারত না। তাই, প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে নাটক মিলনান্তক। রসের কথাতেও তাই, শান্ত, দাস্য , সখ্য, বাৎসল্য হয়ে একেবারে সর্বোচ্চ রস মধুর। আমাদের শাস্ত্রে রাধা “মহাভাব স্বরূপিণী” । তাঁর রসটা মধুর।
বাংলাদেশে যে কবিতা ও নাটকের ধারা চলছিল, হারকিউলিস তুল‍্য বলিষ্ঠতায় তার বা‍ঁকবদল ঘটিয়ে দিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বড়ো কবির মেধা মনন আর স্পর্ধা ছিল তাঁর। ছাপোষা কেরানীর মন নিয়ে তো আর তাঁকে বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর পিতার অর্থ ছিল। ছিল চালু ওকালতি ব্যবসাও। কবি ছিলেন ব্যারিস্টার। বাবার মক্কেলদের যোগাযোগ যদি নাও পেতেন তবু কেজো বুদ্ধির লোকের পক্ষে ওই পেশায় রোজগারের অভাব তো হতো না।
কিন্তু তিনি কবিজীবনকে পেতে চেয়েছিলেন। অনিশ্চিতের পথে ঝাঁপাতে দ্বিধা তিনি করেন নি। যথার্থ কবি পা টিপে টিপে, শাসকের মন যুগিয়ে, সমকালের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেন না। তাঁরা যুগের জন্ম দেন। তাঁদের আশ্রয় করে ইতিহাসের বাঁক বদল হয়।
বাংলায় সে সময় যে নাটক অভিনীত হচ্ছিল, তা দেখে তাঁর মোটেও ভাল লাগে নি। অবশ্য বড় মানুষদের মধ্যে একটা মহৎ অতৃপ্তি বোধ কাজ করে। তিনি বলেছিলেন “অলীক কুনাট্য রঙ্গে মজে লোক রাঢ় বঙ্গে, নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়। ” তিনি নিজেই নাটক লিখে দেখিয়ে দিলেন নাটক কেমন হতে পারে।
নাটকের সাথে প্রহসনও লিখেছিলেন। সমকালীন বাঙালি জমিদার বড়লোকের নারীঘটিত কুঅভ্যাসকে ব্যঙ্গ করে দুটি নাটিকা। একেই কি বলে সভ্যতা, আর বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ ।
নারীমাংস ভোগের বেলা জমিদার মহাজনের জাতবিচার কোথায় থাকে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে জমিদার মহাজনেরা যে গরিবের ঘরের নারীর ইজ্জত লুটতে সমান দক্ষ ছিল, তিনি কলমের মুনশিয়ানায় সেটা দেখিয়েছেন। জাত নয়, এদের শ্রেণীচরিত্র উন্মুক্ত করেছেন কবি। শ্রেণীচরিত্র অনুধাবন করার ক্ষমতা তাঁর কলমের জাত চিনিয়ে দেয়।
ওই যে তিনি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হলেন, সেটা কেন? কেন না, ওঁর প্রবল ইচ্ছে ছিল গ্রীক রোমান ধ্রুপদী সাহিত্য সরাসরি পড়বেন। তাই সেই গ্রীক ল্যাটিন ভাষা শেখা প্রয়োজন ছিল। আর সেই সব সভ্যতার পুরাণকথা পড়তে, তাদের সংস্কৃতির ভিতর মহলের কথা জানতে পাদ্রীদের সঙ্গলাভ ছিল বাস্তব প্রয়োজন। ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি না করে উঠতে পারলে দত্তকুলোদ্ভব কবির পক্ষে সেই যুগে ওই ভাষা সংস্কৃতির নিবিড় পাঠ সম্ভব হত না। একে কবিধর্ম পালন ছাড়া আর কি বলব?
ওই যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বদলে দিলেন সাহিত্য পাঠের দৃষ্টিকোণখানা, রাবণকে দেখালেন স্বদেশব্রতী মহানাগরিক করে, রামকে দেখালেন অনুপ্রবেশকারী চেহারায়, গ্রীক লাতিন সাহিত্যের গভীরে ডুব না দিলে এই মৌলিক পরিবর্তন বাংলা সাহিত্যে আসত কি?
২৬
মার্ক্স ও রবীন্দ্রনাথকে আমার একসাথে পড়তে ইচ্ছে যায়। ওই যে প্রবীণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বলেন, কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন, তখনই কার্ল মার্ক্সের কথা মনে হয়। রবি ঠাকুরের “যাত্রা” কবিতা এবং “ওরা কাজ করে” কবিতা মনে আসে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘যাত্রা’ নামে কবিতাটি “বিচিত্রিতা” কাব্যগ্রন্থে লেখার অনেক পরে “ওরা কাজ করে” কবিতাটি লেখেন। মাঘ সংক্রান্তির শেষে, ১৩৪৭ বঙ্গাব্দের ১ ফাল্গুন তারিখে লেখেন কবিতাটি। ইংরেজি দিনপঞ্জীতে ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১ এ শান্তিনিকেতনে বসে লেখা কবিতাটি। স্থান পেয়েছে ‘আরোগ্য’ কাব্যগ্রন্থে। ১৯৪১ সাল কবির জীবনের অন্তিম বৎসর। মৃত্যু এসে মাঝে মাঝেই উঁকি দিয়ে যায় প্রবীণ কবির বোধের দুয়ারে। আর তার ওপারে ইতিহাস ও দর্শনের বোধ দিয়ে মহাজীবনকে খোঁজার চেষ্টা করেন দার্শনিক কবি। অথবা বলা ভাল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জীবনকে অতিক্রম করে পার্থিব মানবজীবনের ধারাবাহিক সংগ্রাম ও উত্তরণকে লক্ষ্য করেন কবি। ঘটনার ঘনঘটা বিপুল বিকট চেহারা নিয়ে এলেও তার ওপারে সত্যতর যা আছে, গভীর ইতিবাচক বোধ থেকে তাকে চিনতে চান রবীন্দ্রনাথ। “ওরা কাজ করে” কবিতায় সেই বৃহৎ জীবনসত্যকে খোঁজার চেষ্টাটি দেখতে পাই।
“যাত্রা” কবিতায় কলমের ছোটো ছোটো আঁচড়ে দেখিয়েছিলেন কিভাবে রাজায় রাজায় যুদ্ধ বাধে। কি করে রাজ দরবারের কুচক্রী কলাকুশলীরা সুতোর টানে কূটনৈতিক জটিলতা পাকিয়ে তোলে। কূটতর্কে মেতে থাকে রাজপ্রসাদজীবী পণ্ডিতের দল। আর তার পাশে ক্লান্ত খিন্ন অবসন্ন জনজীবন যা হোক করে প্রাণটুকু ধারণ করে চলে।
শৈশব থেকেই সম্ভ্রান্ত স্বচ্ছল সুশিক্ষিত সংস্কৃতিসম্পন্ন পরিবারে বড়ো হয়ে সমাজের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনকে লক্ষ্য করার এক ধরণের পারিবারিক উত্তরাধিকার রবীন্দ্রনাথের ছিল। দেশপ্রেম, ভদ্রতা, সততা ও চরিত্রবল ইত্যাদি গুণগুলিকে কিছুমাত্র তুচ্ছ না করেও অর্থনীতির বিচারে কবির পৈতৃক পরিবার ছিল পরশ্রমজীবী। পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্বে পুঁজির পক্ষে। জমিদারি মানসিকতার সমকালীন নজিরগুলির কুৎসিত দিকের থেকে অনেক অন্যরকম হলেও গোত্র বিচারে সেই জমিদারতন্ত্রের ধ্বজাধারী ছিল কবির পৈতৃক পরিবার।
সুতরাং দেশ জুড়ে ইংরাজের হাতে গরিব ভারতীয় নিপীড়িত হতে থাকলেও শোষক শোষিতের অমানবিক সম্পর্কের মূলোৎপাটন দূরস্থান, ইংরেজ শাসনের সামগ্রিক অবসানটুকু জমিদারি মানসিকতার লোকেরা ভাবতে চাইতেন না।
শ্রমজীবী মানুষের মাথা তুলে দাঁড়ানো, শ্রম ও পুঁজির অনিরসনীয় দ্বন্দ্বে শ্রমের মহত্ত্বকে হৃদয় ও মেধা দিয়ে উপলব্ধি করতে পারার চেষ্টাটাই ভারতীয় জমিদারদের ছিল না। শখ করে তো আর দিনবদল হয় না, বড়ো জোর রঙ বদল হয়। এক ধরণের শাসকের বদলে অন্য ধরণের শাসক, এক রঙের শোষকের বদলে অন্য রঙের শোষক। কিন্তু শাসক শাসিত সম্পর্কটা চিরতরে চুকিয়ে দেব, শোষণের অলাতচক্র নিঃশেষে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব, এমন একটা বিশ্বাসে নিজেকে দেখতে চাওয়া জমিদারি মানসিকতার ব্যক্তির পক্ষে সমস্ত রকম সম্ভাব্যতার বাইরে। রবীন্দ্রনাথের চৈতন্যলোকে সেই অলোকসম্ভব ঘটনাই ঘটেছিল। শ্রম ও পুঁজির অনিরসনীয় দ্বন্দ্বে কবি নিজেকে চিরকালের শ্রমজীবীর পাশে খুঁজে পেলেন।
সাধারণ কলমচি দুটি অন্নের দায়ে কলম পেষেন। মালিক তাঁকে যা লিখতে হুকুম করেন, তাই লিখে যোগান দেওয়া তাঁর অন্নদায়। পণ্ডিতের দল রাজপ্রসাদের লোভে সাদাকে কালো, আর কালোকে সাদা বলতে দ্বিধা করেন না। পুঁথিপোড়োর দল অনুস্বার চন্দ্রবিন্দুর মশলাযোগে রাজার নির্দেশকে ললাট লিখন বলে চালাতে চায়। বণিকের দল ভাবে মানুষের রক্ত মানুষ শোষণ করবে, এটাই চিরকালের নিয়ম। শোষণ, শাসন, প্রতারণা, ঠগবাজির বহু উর্দ্ধে যে কোনো মানুষী অভিজ্ঞান থাকতে পারে, সেটাই তাদের অজানা।
অতি সাধারণের দৈনন্দিন চোখ দেখে মাটির পৃথিবীটা স্থির, আর সূর্যটা পূবদিক থেকে উঠে রোজ অস্তাচলের অভিমুখে আকাশ পরিক্রমা করে। আর বিজ্ঞানীর চোখ দেখতে পায় প্রকাণ্ড নক্ষত্রটি অনেকগুলি গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু, আর ধূমকেতুর সংসার নিয়ে সুবিপুল গ্যালাক্সির অগণন নক্ষত্রের মাঝে এক কোণে ঘুরে চলেছে। এমন গ্যালাক্সির সংখ্যাও অনেক। আকার আয়তনের বর্ণাঢ্য বিপুলতায় এই সব গ্যালাক্সি সমন্বিত মহাজাগতিক অস্তিত্বের চেহারা সুদুরতম কল্পনাতে স্থান দেওয়াই অতি সাধারণের পক্ষে শক্ত।
আর বিজ্ঞানী ওই মহাজাগতিক অস্তিত্বের গণনা করবেন বলে চোখে টেলিস্কোপ সেঁটে আঁক কষেন।
ইতিহাসের দৈনন্দিনতায় রোজ রোজ গরিবের মার খাওয়া। গৃহহারা, আব্রুহারা, সম্মানহারা হওয়া তার নিয়মের মধ্যে পড়ে, বার্তাজীবী কলমচি একথা রোজ লেখে। ভিতরের সংবাদ যিনি জানেন, তিনি লক্ষ্য করেন, সংগ্রাম চলছে। বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু। ইতিহাসের পাতার লিপি বিন্যাসে বিজ্ঞানীর মেধা মনন অন্তর্দৃষ্টির কুশলতায় দেখা গেল শ্রেণীদ্বন্দ্বই সমাজের চালিকাশক্তি। আর শ্রমজীবী শ্রেণীই সর্বাপেক্ষা প্রগতিশীল। ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সমাজবিদ্যা, দর্শনকে বিজ্ঞানের আলোয় ছেঁকে নিয়ে দার্শনিক বললেন শ্রমজীবীর নেতৃত্বে দুনিয়ার বদল আসন্ন।
দার্শনিক এ কথাটা যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখালেন। সে বিষয়টা নজরে এল অজস্র বুদ্ধিজীবীর, যাঁরা বুদ্ধিকে নেহাৎ জীবিকার খুঁটিতে বেঁধে না রেখে জীবনের স্পন্দনের সাথে মেলাতে চেয়েছেন। পুঁজি যখন সাম্রাজ্য গড়তে চেয়ে একেবারে মানবিক হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গিয়েছে, সেই সংকটক্রান্তিতে বুদ্ধিজীবীরা সমাজতন্ত্রকে চিনলেন দিনবদলের হাতিয়ার বলে। ১৯১৭ সালে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ ওরফে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের অবসানে সোভিয়েত গড়ে উঠলো।
কবি রবীন্দ্রনাথ বিপ্লবোত্তর সংহতিকামী রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। সোভিয়েতের অসামান্য ভাবনাগুলি কতো সার্থকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তাও দেখলেন। রাশিয়া ভ্রমণকে বললেন “এ জন্মের তীর্থ দর্শন।”
শত অত্যাচার সত্ত্বেও সর্বহারা শ্রমিক জাগবে এ কথা বুঝতে রবীন্দ্রনাথের সময় লেগেছিল। কিন্তু সততার সাথে, মোহ বিমুক্ত মন নিয়ে সামাজিক সম্পর্ককে চেনার চেষ্টায় তাঁর ফাঁকি ছিল না।
প্রবীণ বয়সে ভারতে ইংরেজ শাসনের বিকট চেহারাটা দেখতে দেখতে, তার বিপরীতে আবেদন নিবেদনের মেরুদণ্ডহীনতায় লক্ষ্য করতে করতে আর হঠাৎ হঠাৎ আবেগের বুদবুদ হয়ে শাক্তপন্থী যৌবনের দিশাহীন ফেটে পড়া দেখতে দেখতে কবি চোখ রাখেন বিশ্বের প্রাঙ্গণে। ভারতীয় চরিত্রের মহত্ত্ব যা যে টুকু কোনো যুগে ছিল, তা যে নিঃশেষিত হয়ে নতুন করে মাথা তোলা দরকার রবীন্দ্রনাথ সেটা মেধা দিয়ে বুঝেছিলেন। পুঁজির সাম্রাজ্যলিপ্সাই যুদ্ধ ঘনিয়ে তোলে, পুঁজির নিজস্ব চরিত্রে এক সুগভীর অশান্তি রয়েছে, এই উপলব্ধিগুলি প্রবীণ কবির চিন্তায় এক বাঁকবদল ঘটিয়ে দেয়। তিনি হয়ে ওঠেন মানুষের কবি।
“কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন, কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন, যে আছে মাটির কাছাকাছি…”… নিজের মধ্যে নিজেকে তিনি এইভাবে খোঁজার চেষ্টা করেছেন প্রাণপণে।
“ওরা কাজ করে” কবিতাটিতে সেই জীবনে জীবন যোগ করার মেধাবী আয়োজন লক্ষ্য করি।
২৭
কিছু কিছু লোকে ডিএ ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারে না। যদি বলি জিওর্দানো ব্রুনোর প্রয়াণদিবস, কাঁদো কাঁদো চোখে সে বলে ডিএ;
যদি বলি জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথ শীর্ষক একটি চমৎকার কবিতা লিখেছেন, সে প‍্যাঁচামুখ করে বলে ডিএ…
কবিতা লেখে বলে অহমিকায় ভোগেন এমন কিছু লোকও বাংলা ভূমিতে আছেন। পুরস্কারের জন্য তাঁর লালা ঝরে। শাসকের রঙ বদলালে চটপট তাঁরা জামা বদল করে নেন। শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়ায় এই কবিযশঃপ্রার্থীরা অনিচ্ছুক।
মহৎ মন না অর্জন করতে চেয়ে যাঁরা কবিতা লিখতে চাইছেন, তাঁরা জেনে রাখুন, আপনাদের লেখাগুলি কিছুই হচ্ছে না। জীবনানন্দ এগুলি দেখলে বলতেন, “এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল ।” যাঁরা পুরস্কার পাবেন এই লক্ষ্য নিয়ে পাতার পর পাতা কবিতা লিখছেন, তাঁদের আশা সার্থক হক। কিন্তু ওই পুরস্কারটুকু পর্যন্তই । মানুষের কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে কথা বলতে না শিখলে কবিতা লেখার কোনো মানে নেই । পৃথিবীর সেরা কবিরা মানুষের সর্ববিধ মুক্তির কথা বলে আয়ুক্ষয় করেছেন। পুরস্কার লোলুপতায় কলম ধরেন নি। মানুষের চিন্তার মুক্তি আন্দোলনের শরিক না হলে, তেমন লোকের কবিতা আর প্রলাপ একই জিনিস।
২৮
ইংরেজ মহাকবি শেলিকে বুঝতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই খুঁটিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে আমার।
আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পরিশেষ’ কাব‍্যগ্রন্থের “প্রশ্ন” কবিতায় ভগবানকে প্রশ্ন করেছেন যারা পরিবেশ দূষণ করছে, সংস্কৃতিকে আক্রমণ করছে, বিচার ব‍্যবস্থাকে প্রহসনে পর্যবসিত করছে, তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে, অশেষ ক্ষমাশীল তিনি তাদেরকেও ক্ষমা করেছেন কি না। কিন্তু কবিতাটি আগাপাশতলা খুঁটিয়ে পড়লে বেশ বোঝা যায় কবি চান না, ভগবান ওদের ক্ষমা করুন। অথচ চালু অর্থে যারা ভক্ত, তারা জানেন ঈশ্বরের সকল কাজ মানুষের প্রশ্নের অতীত। এই চালু অভ‍্যাসটাকে আঘাত করেই কবি প্রশ্ন করছেন, তুমি কি বেসেছ ভাল? ভাবখানা যেন এই, তুমি যদি বেসেও থাকো, সে কাজটা ভালো করো নি। ঈশ্বরের দৈবী মাহাত্ম্যটাকেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন কবি, আর বললেন মানুষী যুক্তিবিচারের কাছে কৈফিয়ত দেবার দায় স্বয়ং ঈশ্বর পর্যন্ত এড়িয়ে যেতে পারেন না। “ধর্মমোহ” কবিতায় কবি এমন কি নাস্তিকের গুণগান পর্যন্ত করেছেন।
মহাকবি পি বি শেলি ( ৪ আগস্ট ১৭৯২ – ৮ জুলাই ১৮২২) র কবিতা আবার প্রকাশকেরা ছাপাতেই সাহস করতেন না। কেননা, তাঁরা আশঙ্কা করতেন শেলির লেখায় ঈশ্বরের মহানুভবতার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে ও রাষ্ট্রের সর্বাত্মক কর্তৃত্বকে প্রশ্নের সামনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
প্রকাশকদের আশঙ্কাকে অমূলক বলে লাভ নেই। কেননা, শেলি, ১৮১১ সালে বছর ঊনিশের কৈশোর ছাড়ানো সদ‍্যোতরুণটি, লিখেছেন দি নেসেসিটি অফ এথেইজ়ম। ১৮১২ তে লিখেছেন ডিক্লারেশন অফ রাইটস, ১৮১৫ তে লিখেছেন অন এ ফিউচার স্টেট। রাষ্ট্র ও তার বিচারব‍্যবস্থা প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের যৌক্তিকতা ন‍্যায়গ্রাহ‍্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে ধরেন শেলি। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে শেলি কি চোখে দেখতেন, তা তাঁর এই কবিতায় প্রতিভাত
ENGLAND IN 1819
An old, mad, blind, despised, and dying king,–
Princes, the dregs of their dull race, who flow
Through public scorn, mud from a muddy spring,–
Rulers who neither see, nor feel, nor know,
But leech-like to their fainting country cling,
Till they drop, blind in blood, without a blow,–
A people starved and stabbed in the untilled field,–
An army which liberticide and prey
Makes as a two-edged sword to all who wield,–
Golden and sanguine laws which tempt and slay;
Religion Christless, Godless, a book sealed,–
A Senate—Time’s worst statute unrepealed,–
Are graves from which a glorious Phantom may
Burst to illumine our tempestuous day.
কবিতা লিখে শেলি বিশ্বসেরা। ১৮১৯ এ লিখেছেন ওড টু দি ওয়েস্ট উইণ্ড, ১৮২০ তে যথাক্রমে প্রমিথিউস আনবাউণ্ড, টু এ স্কাই লার্ক, আর দি ক্লাউড।
তাঁর কবিতা প্রভাবিত করেছিল মহান দার্শনিকদের। কার্ল মার্ক্স, বার্ট্রান্ড রাসেল, মহাত্মা গান্ধী যাঁদের অন‍্যতম। লেখকদের মধ‍্যে বিশ্ববরেণ্য লিও টলস্টয়, বার্নার্ড শ, অস্কার ওয়াইল্ড এর রচনায় শেলির ভাবনার স্পষ্ট ছাপ আছে।
শেলি তাঁর গদ‍্য রচনায় জগৎ জীবন, রাষ্ট্রের একতিয়ার নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর লেখায় প্লেটো, ফ্রান্সিস বেকন, জাঁ জাক রুশো ও নেপোলিয়নের কথা এসেছে। তীব্র রোমান্টিক এই কবি আশাবাদীও। তিনি বলেন If winter comes, can spring be far behind? এক আলোকময় জগতে উত্তরণের কথা বলেন শেলি, যার চাবিকাঠি রয়েছে মুক্তিপিপাসু মানুষের হাতে।
ইংরেজ মহাকবি শেলি ১৮২২ সালে আট জুলাই তারিখে ২৯ বৎসর বয়সে নৌকাডুবির ঘটনায় মারা যান। জন্মেছিলেন ১৭৯২ এর আগস্টের ৪ তারিখে।
২৯
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভ্রান্তিবিলাস যে উইলিয়ম শেক্সপিয়র এর কমেডি অফ এররস এর মর্মানুবাদ তা কে জানত! কত বার যে পড়েছি বইটি।
পরে যখন জানলাম রুচিতে মননে বাঙালিকে দীপ্ত ইউরোপিয়ান প্রজ্ঞার ছোঁয়াচ দিতে চেয়ে বিদ্যাসাগর মশায় অমন রূপান্তর করেছিলেন, শ্রদ্ধায় মাথাটি নত হয়ে আসে। চিরঞ্জীব আর কিঙ্করদের কিছুতেই বিদেশি মনে হয় নি।
আমার ছোটবেলাতেই আমার অজান্তে শেক্সপিয়রকে আমার কাছে এনে দিয়েছিলেন এই অসাধারণ বাঙালিটি।
শেকসপীয়র এর অনুরাগী পাঠক হিসেবে রীণা ব্রাউন রূপী সুচিত্রা সেনকে বাঙালি ভুলতে পারে নি। উত্তম সুচিত্রা জুটিটাকেও। ডাক্তারি পড়তে থাকা সেই যে মেয়ে, যে নিজেকে খাঁটি সাহেব বলে জানে, সেই রীণা ব্রাউন নাটকের মঞ্চে ওঠার আগে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিল সতীর্থ কৃষ্ণেন্দু যেন তার শরীর কোনো ছলে স্পর্শ না করে। ওথেলো নাটকের সেই দৃশ্যায়ন কোন বাঙালি না জানে? তারাশঙ্কর বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের কলমপ্রসূত অত সাংঘাতিক পিতৃতান্ত্রিক একটি নিষ্ঠুর চরিত্র ভোলা শক্ত। উত্তম কুমারের ঠোঁটে বিশুদ্ধ মার্জিত ইংরেজি ভাষায় কথা কন উৎপল দত্ত। অত সুন্দর করে উত্তম যে বলতে পারবেন না, সে হিসেব পরিচালকের ছিল। সুচিত্রা সেনের ইংরেজি জ্ঞানের উপরেও কোনো ভরসা ছিল না তাঁর। ডেসডিমোনা হয়ে কথা বললেন জেনিফার কাপুর। সব মিলিয়ে সপ্তপদী সিনেমা হিসেবে খুব জনপ্রিয়। আর সপ্তপদীর হাত ধরে শেকসপীয়র ঢুকে পড়েন বাঙালির ভাঁড়ার ঘরে। তেইশ এপ্রিল শেক্সপিয়র এর প্রয়াণ দিবস। বাহান্ন বছর বয়সে ১৬১৬ সালে প্রয়াত হন।
৩০
বাংলার প্রথম গীতিকবি বিহারীলাল চক্রবর্তী ১৮৩৫ সালে জন্মেছিলেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে কবি বিহারীলালের গুণগ্রাহী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের নূতন বৌঠান কাদম্বরী দেবী। বাংলা কবিতার বাঁকবদলে বিহারীলালের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বাংলা গীতিকবিতার তিনি পথিকৃৎ। কাদম্বরী দেবী একটি আসন বুনে, তাতে ওঁর কবিতার পংক্তি “হে যোগেন্দ্র যোগাসনে…কাহারে ধেঁয়াও” লিখে উপহার দিয়েছিলেন। রবিকে বৌঠান বিহারীলালবাবুর মতো কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করতেন। জ‍্যোতিরিন্দ্রনাথ, বিহারীলাল ও রবীন্দ্রনাথ, এই তিন প্রতিভাধর কবির প্রেরণাদাত্রী ছিলেন বলে মজা করে তিন মাথাওয়ালা গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীর দেবী হেকেটি’র সাথে কাদম্বরী দেবীর তুলনা চলত। ‘শ্রীমতী হে’ এমনও বলা হত। “সারদা মঙ্গল” কাব‍্য লিখে বিহারীলাল কবিখ‍্যাতি বিস্তৃতি লাভ করে। রবীন্দ্রনাথ এই কবির এতদূর অনুরক্ত ছিলেন যে এঁর পুত্র শরৎকে নিজের বড়ো মেয়ে মাধুরীলতার সাথে বিয়ে দেন। তবে শরৎ বিয়ে করলেও রবীন্দ্রনাথের সাথে দুর্ব‍্যবহার করেছেন। পণের যন্ত্রণা দিয়েছেন।
৩১
তিনি বলেন, আলোয় আলোকময় করে হে এলে আলোর আলো। বলেন কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো। কতো রকম ভাবেই না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আলোর কথা বলেন। রক্তকরবী নাটকে যক্ষপুরে নন্দিনী লক্ষ্য করে, কেবল তার আর বিশুর মধ‍্যে চিলতে ফাঁক দিয়ে আলো আসছে। ৪৭ফ নামে যক্ষপুরের শ্রমিক ছুটি পেলেই মদ্যপান করতে অভ‍্যস্ত। সেই নিয়ে তার সাদামাটা স্ত্রী চন্দ্রা অনুযোগ করে। তখন ৪৭ফ এর মধ্য থেকে ফাগুলাল জেগে উঠে চন্দ্রাকে বোঝায় তারা গ্রামে ছিল মানুষ। সেখানে সূর্যের আলো গ্রামীণ মানুষের কাছে প্রাণদায়ী মদের কাজ করত। সূর্যের আলোকে যে মদ মনে করে অসামান্য নেশা করা চলে, সে নিয়ে ফাগুলালের বক্তব্য আমাকে সচকিত করে। খোলামেলা প্রাকৃতিক আলো হাওয়ার অভাব অনটনের জন‍্যই যক্ষপুরে শ্রমিককে গাঁজিয়ে ওঠা তরল নিয়ে নেশা করতে বসতে হয়।
ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে লেখা ছিন্নপত্রের অসাধারণ চিঠিগুলির একটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন প্রকৃতি তাঁর ভিতরে সূর্যের আলো ঢেলে দিয়ে তাঁকে দেবতাদের সমান করে দিচ্ছেন।
২৭ আষাঢ়, ১৩১৭ বঙ্গাব্দে গীতাঞ্জলি কাব‍্যগ্রন্থের ‘সীমায় প্রকাশ’ কবিতায় তিনি লেখেন, ‘তোমার আলোয় নাই তো ছায়া, আমার মাঝে পায় সে কায়া …’
আবার ওই গীতাঞ্জলিতেই ‘যাবার দিন’ কবিতায় ২০ শ্রাবণ, ১৩১৭ বঙ্গাব্দে লেখেন, ‘এই জ‍্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে তারি মধু পান করেছি ধন‍্য আমি তাই।’
‘পূজারিণী’ কবিতায় আলোকে অন‍্যরকম একটা তাৎপর্য নিয়ে দেখতে পাই। শ্রীমতীর সাথে আমরাও দেখতে পাই, অস্তরবির রশ্মি আভায় উন্মুক্ত বাতায়নের কাছে বসে রাজনন্দিনী শুক্লা কবিতা পড়ছিল। শ্রীমতী নামে দাসীও কি সেই অস্তরবির আলো স্নায়ুতে মনে মেখে অন‍্যমাত্রার জীবন অর্জন করল? সৌরবিভা কি দাসীটির মধ্যে একটি বিদ্রোহী সত্তাকে জাগিয়ে তুলল?
জীবনের উপান্তে পৌঁছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘সে’। সে গল্পে আলো নিয়ে কতো কি বলেন কবি। সে গল্পে বিজ্ঞান মাস্টার এসে বুঝিয়ে যান, বিশ্বজগতে সূক্ষ্ম আলোর কণাই বহুরূপী হয়ে স্থূলরূপের ভান করছে। আরো জানান, আলোকের অণুপরমাণু বৃষ্টির মতো কণাবর্ষণও বটে, আবার নদীর মতো তরঙ্গধারাও বটে।
সারাজীবন ধরে গানে গানে অসামান্য মাত্রায় আলোর কথা বলে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আলো তাঁর নয়নে, আলো তাঁর হৃদয়ে। আলোর কথা বলতে বলতে গানে গানে এক উত্তরণ ঘটে যায়।
আমাদের বলতে ইচ্ছে করে, “আলোয় আলোকময় করে হে এলে আলোর আলো”।
স্মরণ রাখি যে, ১৯০৫ সালে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রকাশ করেন। বুঝিয়ে বলেন আলো একই সাথে কণা, আবার তরঙ্গ।
৩২
নিজের লেখা কবিতার বাছাই করা কয়েকটির ইংরেজি অনুবাদ তিনি করেছিলেন নিজেই। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ “song offerings” সৃষ্টি করেন । গীতাঞ্জলি, গীতিমাল‍্য, নৈবেদ্য, খেয়া, অচলায়তন, শিশু, স্মরণ, কল্পনা, চৈতালি, উৎসর্গ, এই দশটি কাব‍্য থেকে পছন্দ করে করে নিজের মনের মতো কবিতা খুঁজে নিয়ে । সেই ইংরেজি অনুবাদের সঙ্কলনের একটি মুখবন্ধ লিখে দেন আইরিশ কবি ইয়েটস ( ১৮৬৫ – ১৯৩৯) । ইয়েটস এর জন্মদিন জুন মাসের ১৩ তারিখে , আর এই জুন মাসের ৩০ তারিখে গোটা পৃথিবীর রবীন্দ্র প্রেমীরা আন্তর্জাতিক রবীন্দ্র কাব্যপাঠ দিবস পালন করেন। । এই রকম কোনো সময়েই লন্ডনে রবীন্দ্রনাথ এই অনূদিত কবিতাগুলি পড়ে শুনিয়েছিলেন।
৩৩
আধুনিক বাঙালি কবি বিষ্ণু দে ছিলেন ইংরেজি ভাষা সাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও কল্লোল যুগের অগ্রণী কবি। ১৯৮২ সালে আজকের দিনে তিনি প্রয়াত হন।
মনে পড়ল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদা আরেক অগ্রণী কবি টমাস স্টার্নস এলিয়টের বিখ্যাত কবিতা “জার্নি অফ দি ম‍্যাজাই” অনুবাদ করেছিলেন। সেকথা মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে গেল। মনে পড়ল আধুনিক বাংলা ভাষার অন‍্যতম সেরা কবি বিষ্ণু দে’র জন্মদিনে আমি সে কথা ভেবে পোস্ট দিয়েছিলাম।
Journey of the Magi নামে তেতাল্লিশ লাইনের একটি কবিতা লিখেছিলেন ব্রিটিশ কবি টমাস স্টার্নস এলিয়ট (১৮৮৮ – ১৯৬৫)। সেই কবিতা ১৯২৭ সালে প্রকাশ পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “পুনশ্চ” কাব্যগ্রন্থে এই কবিতাটির একটি অনুবাদ সংকলন করেন।
এই অনুবাদ সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুজ বাংলা আধুনিক কবিরা একটু যুক্ত রয়েছেন।
ইংরেজি ভাষার অধ‍্যাপক বিষ্ণু দে ছিলেন কল্লোল যুগের অগ্রণী কবি। বাংলাভাষার আধুনিক কবিদের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বন্দ্ব মধুর সম্পর্ক ছিল। কবিতা কী, কেন, কবিতায় আধুনিকতা ঠিক কী, তা নিয়ে অনেক আলাপ ও বিতর্ক হত। কিন্তু অনুজদের তরফে সম্পর্কের মূল সুরটা ছিল গভীর শ্রদ্ধার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুনশ্চ ও লিপিকা আর তার গদ‍্যবুনোট দেখে বিষ্ণু দে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
তিনি “পুনশ্চ” গ্রন্থের কবিতার গদ্য ধাঁচটা আয়ত্ত করতে চেয়ে এলিয়টের “Journey of the Magi” কবিতাটির স্বকৃত অনুবাদ কবির কাছে পাঠিয়ে দেন। ওঁর প্রার্থনা ছিল ওঁর অনুবাদের সাথে পুনশ্চের গদ‍্যবুনোটের একটা মেলবন্ধন করে দেখিয়ে দিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথ বিষ্ণু দে কৃত সেই এলিয়টীয় কবিতার অনুবাদ আত্মস্থ করে “তীর্থযাত্রী” শীর্ষক একটি কবিতা লেখেন। বিষ্ণু দে তাঁর স্বকৃত অনুবাদের নাম দিয়েছিলেন “রাজর্ষিদের যাত্রা”।
৩৪
আধুনিক কবি সমর সেনের “বাবুবৃত্তান্ত” ছুঁয়ে নেড়েচেড়ে দেখেছিলাম আঠারো পূর্ণ হবার আগেই। এগারো ক্লাসেই আমায় সিলেবাস ডিঙিয়ে বাংলা সাহিত্য পড়তে বই জুগিয়ে দেন আমার ইংরেজি শিক্ষক শ্রদ্ধেয় সুভাষ মুখোপাধ্যায়। আর পড়তে দিতেন ফ্রন্টিয়ার। অতো সুন্দর ইংরেজি কাগজ কিনে পড়তে অভ‍্যস্ত হয়ে যাই তাঁরই অনুপ্রেরণায়।
ইংরেজিই ঝলসে তোলে বাংলাকে। আমার সদ‍্যোতারুণ‍্যে সে কথা কানে কানে বলেছিলেন জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সমর সেন।
সমর সেনের মৃত্যু হল আমার কুড়ি বছর বয়সে। সালটা ছিল ১৯৮৭।
কমলকুমার মজুমদার পড়তে বলেছিলেন আমার ইংরেজি শিক্ষক। না, সিলেবাসের বাইরে বই পড়ার শলাটুকু উনিই দিতেন। পরিতোষ সেনের জিন্দাবাহার, অশোক মিত্রের কবিতা থেকে মিছিলে, সমর সেনের বাবুবৃত্তান্ত আর বিষ্ণু দে’র উত্তরে থাকো মৌন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর অতসী মামী আর দিবা রাত্রির কাব‍্য। তারপর মতিলাল পাদরী, নিম অন্নপূর্ণার কথা শুনলাম। কমলকুমার মজুমদার অঙ্কের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাঁর নিজস্বতা, লেখার শৈলী খুব অন্য রকম। আমি পড়েছিলাম। যথেষ্ট আগ্রহ নিয়েই। কিন্তু অনুকরণ করবো না, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম। বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ ও শরৎ পুরো না পড়েই আমি মানিক, বিষ্ণু দে, কমলকুমার পড়লাম। সে মনে হয় বেশ ভালই হয়েছিল।
৩৫
র‍্যাগিং কাকে বলে জানতাম। তাই যখন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হল “তোমার প্রিয় সিনে অভিনেতা কে? ” তখন প্রশ্নকর্তার চোখে চোখ রেখে জবাব দিলাম “অমিতাভ বচ্চন।”
প্রশ্নকর্তার মুখে হাসি। তাকানো সহজ। জানি, উত্তর মনে ধরেছে।
বললেন ” হ্যাঁ , অমিতাভ বচ্চন তো বুঝলাম, কিন্তু বচ্চনের কোন ফিল্ম?”
এক ঝটকায় জবাব দিলাম “সওদাগর ।”
“সওদাগর? “
বলা গেল “হ্যাঁ , কথা সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের “রস” নামে বিখ্যাত গল্প অবলম্বনে ফিল্ম “সওদাগর”। আসলে কি জানেন, চমৎকার গল্প হলে ফিল্ম সহজেই উতরে যায়।”
লেডি চ্যাটারলির লাভার … সে সব গল্প বড় হবার সময় কে কে না শুনেছি?
অশ্লীলতা নিয়ে দারুণ মামলা। দোসরা নভেম্বর শেষ হয়েছিল। ১৯৬০ সালে।
আমার জন্ম ১৯৬৭ তে।
পরে সমরেশ বসুর বিবর নিয়ে আমাদের দেশেও …
সাহিত্য আর অশ্লীলতা নিয়ে বিতর্কে লেডি চ্যাটারলির লাভার একটা মানদণ্ড তৈরি করে দিল।
আমার মাস্টারমশাই আমাকে একটি কবিতার বই পড়তে দিলেন। কবির নাম বিষ্ণু দে। কাব্যগ্রন্থের নাম ” উত্তরে থাকো মৌন ” । তখন এগারো ক্লাসে পড়ি । জীবনানন্দের কবিতা আর অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা পড়লেও বিষ্ণু দে’র কবিতা পড়ি নি তখনো । দেখলাম কবিতার বইটির নাম দিয়ে একটি কবিতা আছে। এমন থাকেই অনেক সময়। বনলতা সেন এ দেখেছি । তার পরের একটি পংক্তি বেশ মনে আছে আমার … কবি লিখেছেন ” আকুতি কি শুধু যৌন ? “
কবিতায় স্তন, যোনি এই সব শব্দ গুলি লিখেছিলেন বলে সেরা আধুনিক কবি রূঢ় সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন শোনা যায় । সত্যি মিথ্যে জানি না , এই সব শব্দ তো অভিধানেও আছে। নাক সিঁঁটকানো পণ্ডিত মহল তাহলে কি শব্দ দূষণের দায়ে অভিধানকেও দূর করে দেবেন?
স্তন কথাটা জীবনানন্দ দাশের কবিতায় কতবার পড়েছি। বলেছেন “কাঁদিয়া উঠিল তার পীনস্তন, জননীর প্রাণ । ( সেদিন এ ধরণীর)। কিশোরীর স্তন / প্রথম জননী হয়ে যেমন নরম দুধে গলে ( দূর পৃথিবীর গন্ধে,) এমন অনেক। “স্তন” শব্দটি দেখলে যাঁদের আঁতকে ওঠার অভ্যেস আছে, অনুগ্রহ করে জীবনানন্দ পড়া বাদ দিন। বাদ দিন তরুণ রবীন্দ্রনাথের কবিতাও। একেবারে ব্যান করে দিন।
৩৬
একদিন সকালে এক লেখকের অপঘাত মৃত্যু নিয়ে ফেসবুক পাড়া খুব উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। সমবেদনা জানানো লেখাগুলি পড়ে মনে হল ভদ্রলোক আত্মহত্যা করেছেন। জীবনানন্দের কবিতার অমোঘ কিছু পংক্তি আমার মনে পড়ে গেল। ঘুম কেন ভেঙে গেল তার? অথবা হয় নি ঘুম বহুকাল, লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার। এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি? ১৮৯৯ তে জন্মে ১৯৫৪ অবধি বেঁচেছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। ওই বছরেই সাহিত্যে বড়ো মাপের স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের একবার ভারী সংকট হয়েছিল। কেবল ভাবছিলেন চলে যাই, চলে যাই। ষাট বছর বয়স তখন। নোবেল পাওয়া হয়ে গিয়েছে। তবু কি যেন নাম না জানা অশান্তি। শেষে “ডাকঘর” লিখে রেহাই পেলেন। দেখেছি, অমলের মধ্যে অমন চলে যাই চলে যাই ভাবটা সঞ্চারিত করে দিয়েছিলেন। বড় সাহিত্যিক আত্মহত্যা থেকে কিভাবে রেহাই পান, রবীন্দ্রনাথ তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
৩৭
রম‍্যাঁ রলাঁ তার বিপুল উপন্যাস জঁ ক্রিস্তফ এর জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। সালটা ১৯১৫। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও তাঁর সৌহার্দ্য হয়েছিল। আমাদের কাছে Jean-Christophe বইয়ের একটু অনুবাদ আছে। রল্যাঁর আরো একটি বই আমাদের পারিবারিক লাইব্রেরিতে আছে, ভারতবর্ষ। এটিও বাংলা অনুবাদ। ফরাসী ভাষা শিখি নি। শিখলে হত।
রলাঁ ভারত সম্পর্কে শ্রদ্ধাবান ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দ নিয়েও রলাঁর উল্লেখযোগ্য পুস্তক রয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত বা গসপেল নিয়েও রলাঁর একটি ইংরেজি বই আমাদের পারিবারিক লাইব্রেরিতে আছে।
৩৮
“বাঁশির শবদে মোর আউলাইল রান্ধন”, বাঁশি নিয়ে তো কাহ্ন রাধিকার মনে তুমুল টান দিয়েছেন, সে তো জানি, বাঁশি নিয়ে যে কত কথা, কিন্তু ওই আউলাইল কথাটা আমায় নাড়িয়ে দেয়। রান্না জিনিসটা রাধাকে করতেই হয়। সে যতই তুমি দুধ দোহন করো, বিহান বেলায় দধি মন্থন করো, ননী বিক্রি করতে যাও বাজারে, বাজারে যাওয়া আসার পথে যতোই কামার্ত হাত আর চোখ তোমাকে ছুঁক, তুমিই ঘরে ফিরে রান্না করবে। শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত মনে পড়ে গেল। বউ মানুষ বাচ্চাকে স্তন দিচ্ছে, কিন্তু মনটা আছে ঢেঁকির মুগুরের প্রতি। একটু বেখেয়াল হলেই হাত ছেঁচে যাবে। মনে পড়ে গেল গল্পগুচ্ছের একরাত্রি। রান্না ভালো হলে স্বামী গহনা গড়াতে দেন। খারাপ হলে সেদিন চিত্তির। রান্নাতেই তোমার পরিচয়। জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায়। তো সেই রান্ধন যদি আউলিয়ে যায়, তার চাইতে বড়ো দুর্বিপাক ঘরোয়া মেয়ের আর কি হতে পারে? বিয়ের সময় যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল, তাতে গৃহকর্মনিপুণা বলা ছিল যে?
শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন আমার ভিতর ধরে টান দেয়।
৩৯
আমি সেই সময়ের লোক যখন মানুষ মাথায় করে মানুষের মলবহন করে নিয়ে যেত। কবি সত্যেন দত্ত এই রকম মলবাহক দের নিয়ে “মেথর” নামে কবিতা লিখেছিলেন। তার কয়েকটি লাইন আমি আজ অবধি ভুলতে পারি নি। বিডিও হয়ে আমি সকালে গ্রামে গ্রামে ঘুরতাম। গ্রামবাসীকে বুঝাতাম টয়লেটের প্রয়োজনীয়তা। মাঠে প্রাতঃকৃত্য করা মানুষ ছোট করে ঘেরা জায়গায় মলত্যাগে স্বচ্ছন্দ হতেন না। তাদের মন ছোঁক ছোঁক করতো খোলা হাওয়ায় মুক্তাঙ্গনে বাহ্য যাবার। বাহ‍্য শব্দটি শ্রীরামকৃষ্ণের ব‍্যবহার করা। বলতেন বাহ্যে যাওয়া। কথামৃত পড়তে গিয়ে পেয়েছি। তো আমি এমন কি ঘরে ঘরে গিয়ে সদ্য বানানো শৌচাগার ব্যবহার করে জল দিয়ে মল সাফা করছেন কি না নিজে চোখে যাচাই করতাম। রাগ করতেন বাড়ির মেয়েরা। তাঁরা ওই সরকারি শৌচাগারে কাঠকুটো আর ঘুঁটে বা ছাগল রাখা অধিক বিবেচনার কাজ বলে অনুভব করতেন। সাত সকালে আমার কড়া কড়া বাক্যবাণ স্বাধীন দেশের নাগরিক সহ্য করবেন কেন? একদিন মলবাহক প্রথা দূর করার ব্যাপারে কমিটি গঠনের দায়িত্ব পেয়ে সে সব মনে পড়ে গেল। আর মনে পড়ল “মেথর “কবিতাটি। সত্যেন দত্ত লিখেছিলেন।
৪০
হেলেন অ্যাডামস কেলার ১৯৬৮তে প্রয়াত। কবিগুরুর লেখা সোনার তরীর “দুই পাখি” কবিতাটি হেলেন অনুবাদে পড়েছিলেন। কবির সাথে সাক্ষাৎ এর সুযোগ হতে কবির মাতৃভাষায় দুই পাখি শোনার ইচ্ছে হল হেলেনের। কবি জানলেন হেলেনের ইচ্ছার কথা। খুব উৎসাহ বোধ করেন নি প্রথমটায়। মেয়েটা সেই ঊনিশ মাস বয়স থেকে লিভারের অসুখে ভুগে চোখে দেখে না, কানে শোনে না, কথা বলতে পারে না। কি করে ওকে কবিতা বোঝানো যাবে ? কবি আড়ষ্ট হয়ে রয়েছেন। হেলেনের জন্যে রথীন্দ্র, কবিপুত্র বাবার উপর চাপ দিলেন। যেতে হল কবিকে। শোনাতেও হল “দুই পাখি”। হ্যাঁ বাংলায়। হেলেন খুশিতে ফেটে পড়ছেন। শোনা ? হ্যাঁ, আপনি ঠিক দেখছেন। কবিদের ওষ্ঠ স্পর্শ করে তার ভাবতরঙ্গ গ্রহণ করে বোঝার অন্য রকম শক্তি ছিল হেলেনের। আনন্দিত হেলেনকে তার শিক্ষিকা বোঝালেন, তুমি যেমন চোখে দ্যাখো না, কানে শোনো না, কথা বলতে পারো না, তুমি যেন একটা খাঁচায় বন্দিনী। মুহূর্তে আপত্তি জানালেন হেলেন। না না, তোমরা শোনো, হেলেনের একটা মন আছে। ওই মনের জোরে সে সব কিছু টের পায়। মনই সব। মনের ভেতর দিয়ে বিশ্বলোকের সাড়া পায় হেলেন। কবিগুরু হতবাক। বন্দিত্বকে কে কবে এভাবে অতিক্রম করেছেন?
নিজে দৃষ্টিহীন, শ্রবণক্ষমতাহীন আর বাকশক্তিহীন হয়েও সেই ধরনের মানুষের শিক্ষার বন্দোবস্ত করেছিলেন হেলেন কেলার। কেনই বা করবেন না, ইন্দ্রিয়গত প্রতিবন্ধকতা তো মানুষকে শেষ পর্যন্ত হারিয়ে দিতে পারে না, যদি মানুষটির চেষ্টায় ঘাটতি না থাকে। হেলেনের মনুষ্যত্ব ছিল সুউচ্চ পর্যায়ের। নিজের কঠিন হীরকপ্রভ মনটাকে তিনি জানতেন, আর নিজের মানুষী জীবনের অসামান্য তাৎপর্যময়তা উপলব্ধি করতে পারতেন।
৪১
ওই যে জর্জ অরওয়েল অ্যানিম্যাল ফার্ম বইতে লিখলেন অল আর ইকুয়াল, সাম আর মোর ইকুয়াল, কথাটা প্রবাদ হয়ে গেল। গণতন্ত্রের কথা বলতে বলতেই কি করে অগণতান্ত্রিক অভ্যাসের পূজা নিশ্চিত করা হতে থাকে, প্রগতিশীল কথা বলতে বলতে কোণে কোণে যে সব প্রতিক্রিয়ার বিগ্রহগুলিকে পূজা করা হয়, সে তো হরবখত দেখছি। আমাদের দেশের মানুষও বোধ হয় রাজতন্ত্রের মোহ ভেতর থেকে কাটিয়ে উঠতে পারে না। তাই গণতান্ত্রিক প্রথার মাধ্যমে নির্বাচিত লোকেও তার ক্ষমতার উত্তরাধিকারী নির্দিষ্ট করে দিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
পরিবর্তন কথাটা নামে থাকে। সব কিছু অনড় থেকে যায়।
আমাদের স্কুলে দু দুখানি লাইব্রেরি ছিল। তার একখানি এরিয়া লাইব্রেরি। সেটিতে সর্ব সাধারণ পড়তে পেতেন। অন্যটি বিদ্যালয়ের ছাত্রদের। প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন বই পড়ব এমন ইচ্ছে থাকলেও সেটা ফলবতী হত না। বইয়ের তালিকা, লেখকের তালিকা কোনো কিছুই পাই নি বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে। গ্রন্থাগারিক বোধ হয় চাইতেন না বালকগুলি ভাল পাঠক হোক। স্কুল থেকে বেরিয়ে আসার পর উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে গেলে এগারো ক্লাসের ছাত্র প্রথম এনসাইক্লোপিডিয়া দেখলো তার শিক্ষকের বাড়িতে। ছুটির দিনে শিক্ষকের বাড়ি গিয়ে বইয়ের আলমারি যতো খুশি ঘাঁটার অনুমতি ছিল। ওখানেই শিক্ষক হাতে তুলে দেন বিষ্ণু দে র কবিতার বই উত্তরে থাকো মৌন। আর সমর সেন এর বাবু বৃত্তান্ত আর পরিতোষ সেন এর জিন্দাবাহার। আর কৃত্তিবাস পত্রিকার একটি কপি। আরেক মাস্টার মশায় ধার দিয়েছিলেন জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কবিতা। এসব বই পড়ার অভিজ্ঞতা জীবনে ভোলার নয়।
বিয়ে বাড়ি যেতে ভয়ই করে আজকাল। আমার ভিতর গোঁ কাজ করে, উপহার দিলে বইই দেব। মানসী বলেন, যার বই পড়ার অভ্যাস নেই, তাকে বই দেওয়া মানে বইয়ের অপমান। মানসী এমন কিছু ভুল বলেন না। অনেক বিয়েতেই বাছাই করা সেরা সাহিত্য সংগ্রহ উপহার দিয়ে পরে বইটি পড়ছেন কি না জানতে চাইলে বিরক্তি ভরা মুখ দেখেছি। কিছুদিন আগে একজনকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলে কোঠার সেপাই আর খোয়াবনামা উপহার দিয়ে এখনো অবধি মৌখিক কোনো পাঠ প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত পাই নি। একজনকে যীশু চরিত দিয়ে জানতে পারি নি আদৌ বইয়ের মলাট উলটেছেন কি না।
একজনের বাড়িতে দেখেছিলাম বাংলা অনুবাদে জন রীডের দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন। বিয়েতে পাওয়া। তিনি বইটি পড়েন নি। আমি যতক্ষণ রইলুম, বইটা উলটে পালটে দেখে নিলুম।
অশোক মিত্রের কবিতা থেকে মিছিলে বইটি প্রথম হাতে পাই আমার শিক্ষক সুভাষ মুখোপাধ্যায় এর কাছে। ভাল বুদ্ধিদীপ্ত মার্জিত ঋজু বাংলা গদ‍্য কাকে বলে, চিনতে শিখছি তখন। বইটি খুব মন টেনেছিল। তার অনেকদিন পরে সহকর্মী বন্ধু অমিত দাসের বাড়িতে ওই বইটি দেখে ফিরে পড়ার ইচ্ছে করলে বন্ধু পারমিতা ওটি পড়তে দেন। সেই বই ফিরিয়ে দিই দিই করে আজো দেওয়া হল না। মাত্র কুড়ি বছর পেরিয়ে গিয়েছে।
বিয়ের আগে দু তিনবার মানসীর বাড়ি একা একা গিয়েছিলাম। আর উনি একবার একা একা আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। ওঁর বাড়ি গিয়ে দেখেছি ওঁর বইয়ের আলমারিতে ওঁর ছাত্রী জীবনের নিজস্ব সংগ্রহ। সংখ্যায় অনেক না হলেও নিয়মিত পড়ার চিহ্ন যুক্ত। একদিন আমার কাছে বসে আমার লেখা গল্প শুনতে শুনতে আমার নিয়ে যাওয়া লজেন্সের সেলোফেন পেপারের মোড়কটি দিয়ে একটা পুতুলের আদল গড়ে ফেললেন। বিয়ের আগে আমি ওঁর জন্য উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম সোমনাথ হোর এর তেভাগার ডায়েরি। ভূমি দপ্তরের কর্মীটির সামান্য আয়োজন।
আজ শেকসপীয়র ও ওয়ার্ডসওয়ার্থ এর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে কত কথাই যে মনে এল!

Spread the love