হৈচৈ ছোটগল্পে পূর্বা ঘোষ

    0
    33
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    নীলগ্রহের হাতছানি

    ইসাস6954 এইমাত্র ওর অ্যাপলিকেশনটা সেন্ড করল সুপিরিওর বোর্ড এর কাছে। ওদিকে পাঞ্চালিকা5419 জানাচ্ছে যে ওর অ্যাপলিকেশনটা অলরেডি সেন্ড করা হয়ে গেছে। আশা করা যায় আগামী দুদিনের মধ্যেই সমস্ত কিছু এনকয়ারি করার পর সুপিরিওর বোর্ড ইসাস6954 আর পাঞ্চালিকা5419 কে একবছরের জন্য একসঙ্গে থাকার অনূমতি দেবে।
    যদি একবছর একসাথে থাকার পর ওদের মনে হয় যে এরপরেও আরো কিছুদিন দুজন দুজনের সঙ্গে থাকবে এবং কোনও ঝগড়াঝাঁটি মনোমালিন্য ছাড়াই একসঙ্গে থাকা যাবে তখন এই একসাথে থাকাটা এক্সটেনশন করার জন্য আবেদন করতে হবে সুপিরিওর বোর্ডের কাছে এবং একই সাথে কমিট করতে যে এই যুগ্মভাবে থাকার কারনে করোর কোনরকম মানসিক দূষন ঘটবে না।
    ইসাস6954 পোডোস্ফেয়ারে সার্চ করে দেখেছে দুশো বছর আগে নাকি একজন ফিমেল আর একজন মেল একই সাথে থাকা শুরু করে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত একই সঙ্গে কাটাতো,যদি না বিশেষ কোন সমস্যা তৈরী হত।
    এতো ভাবতেই পারা যায় না, কিভাবে যে দুটো হিউম্যান বিয়িং এতদিন ধরে একসাথ থাকতে পারত কে জানে! তখনকার লেডিজরা আবার শিশুদের জন্ম দিত নিজেদের শরীরের ভিতরে দশমাস লালন করার পরে। ভাবলে অবাক লাগে কি টেরিবল্ সময় ছিল সেটা। একই সাথে একজন লেডিজের জীবনের ঝুঁকি শারীরিক কষ্ট এবং সময়ের অপচয়।
    সেই সময়টা সত্যিই খুব ভয়ঙ্কর ছিল , ঐ রকমই একটা সময়ে নীলগ্রহে নাকি প্রায় দু ক্রোর হিউম্যান বিইং এর মৃত্যু ঘটেছিল একটা ভাইরাসের আক্রমনে। আর ভাইরাসটার উৎপত্তি ঘটে ছিল একধরনের জংলী প্রানীর কাছ থেকে। তারপর থেকেই তো এই মহাজাগতিক স্পেসে একটা জোরালো এবং ধারাবাহিক গবেষনা শুরু হয়।
    সেই সময়কার বিজ্ঞানীগন প্রথমেই আবিস্কার করেন এক জীবনদায়ী ট্যবলেট। এই ট্যবলেটের বিশেষত্ব এইরকম যে প্রত্যেক হিউম্যান বিয়িংকে সপ্তাহে একটা করে ট্যাবলেট খেতে হবে। ঐ ট্যাবলেট শরীরের সমস্ত ধরনের খাদ্য ভিটামিন মিনারেল এবং ওষুধের চাহিদা পূরন করবে। আর অন্য কোন কিছু মানে জল পর্যন্ত পান করার কোন প্রয়োজন পরবে না। বিভিন্ন বয়সের জন্য আলাদা আলাদা পাওয়ার রয়েছে। এই ট্যাবলেটই হিউম্যান বিয়িংদের কাছে অমৃতের মতো কাজ করেছে। এই ট্যাবলেটের জন্যই গত পঞ্চাশ বছরে কোন মানুষের মৃত্যু ঘটেনি।। একশ বছরের মানুষেরাও এখন যথেষ্ঠ কর্মক্ষম এবং বয়স তাদের শরীরে থাবা বসাতে পারিনি।
    এইসময় থেকেই হিউম্যানরা নীলগ্রহ ছেড়ে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের গ্রহ, প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং কৃত্রিম উপগ্রহ মিলিয়ে মোট সাতাশটা সেন্ট্রামে থাকতে শুরু করে। এই সেন্ট্রামগুলোতে সমস্ত কিছুই কৃত্রিম, সবকিছুই হিউম্যান বিয়িং এর কন্টোলে যেমন ওয়েদার, ট্রাফিক ইত্যাদি। যে সকল কারনগুলোতে প্রচুর মৃত্যু ঘটত সেই সময়ে যেমন দূর্ঘটনা, জলোচ্ছ্বাস, ঝঞ্ঝা বা ভূমিকম্প হিউম্যান বিয়িংদের নতুন সেন্ট্রামগুলোতে সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রনাধীন তাই এইসবের দ্বারা কোনও মৃত্যুও নেই।
    ইসাস6954এর জন্ম বেড়ে ওঠা আর এখনকার কাজকর্ম সবই লালগ্রহ মানে মার্সে। ওর মা ইলিয়ারা2894 আর বাবা সাসান1837 চব্বিশ বছর আগে বোধহয় এরকমই একসাথে ছিলেন। তারপর সুপিরিওর বোর্ডের কাছে অনুমতি নিয়ে ওর জন্মদেবার ব্যবস্হা নিয়েছিলেন। ওনারা বার্থ হাবে ওর ইসাস নামটা ডিজিটালি এনক্লোজ করে যান। এখনকার সমস্ত শিশুর জন্ম বার্থ হাবগুলোতেই হয়। প্রথমে নাম এন্ট্রি করে বার্থহাবের দেওয়া সময় অনুসারে তাদের শরীরের নির্যাস দিয়ে আসতে হবে। তারপর নিষিক্তকরনের পর দশমাস দশদিন ট্রাঙ্কেজ করে নানা পর্যায়ের পর শিশুর জন্ম হওয়ানোর সম্পূর্ণ কার্যক্রমটাই টেকনিক্যালি হ্যান্ডেল করে বার্থহাব।
    কোন পেয়ার যদি মনে করে তারা তাদের বেবির নাম দিতে পারে। তখন তারা সেই নাম ঐ বার্থহাবে ডিজিট্যালি এনক্লোজ করে দিয়ে যেতে পারে। নাহলে বার্থহাব কমিটির পক্ষ থেকেই একটা নাম দেওয়া হয়। নামের সাথে যে নাম্বারটা যুক্ত থাকে সেটা জন্ম, বাসস্থান আর কোন গ্রহের বাসিন্দা সেই পরিচয় বহন করে যেমন ইসাসের6954 এর মানে হল ইসাস হল মার্স মানে যার নাম্বার দেওয়া হয়েছে চার সেই চার নম্বর গ্রহের পাঁচ নম্বর জোনের নয় নম্বর বার্থহাবের ছয় নং হিউম্যান।
    সমস্ত শিশুকেই বড় করে তোলা ,তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করার সব দায়িত্ব বার্থহাবের। এখন তো মৃত্যু প্রায় নেই সেইকারনে ব্যালেন্স রাখার জন্য জন্মহার অত্যন্ত কম। বছরে এই সাতাশটা সেন্ট্রাম মিলিয়ে একশর আশেপাশে শিশুর জন্মের ব্যবস্থা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এইসব শিশুরা তাদের জন্মদাতা জন্মদাত্রীদের চেনে না বা জানেনা আর এই প্রজন্মে এটাই স্বাভাবিক।ইসাসের বান্ধবী পাঞ্চালিকা শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসে থাকে সেইভাবেই তার নম্বর।
    হিউম্যান বিয়িংরা অতীতে কি কি ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা কোনও পরজিবী দ্বারা সংক্রামিত হয়ে অসুস্থ হয়েছিল বা তাদের মৃত্যু হয়েছিল তাই নিয়ে সার্চিং করাই ইসাস এবং পাঞ্চালিকার কাজ এবং গবেষনা। দুজন আলাদা সেন্ট্রামে থাকলেও একই কাজ করার সুবাদে তাদের পরিচয়।যদিও প্রায় সব রোগেরই প্রতিষেধক তৈরী হয়ে গিয়েছিল 2100 সালের আগে। তবুও এই সার্চিংটা চালিয়ে যেতেই হয়। কারন ভাইরাস, ব্যকটেরিয়া আর পরজীবীদের দল যেন নতুন কোন সংক্রমণ নতুন কোন অসুস্থতা তৈরী করতে না পারে। নীলগ্রহ থেকে অনেক দূরে হিউম্যান দের সরে যাওয়ার মূল কারনই হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ ও পশুপাখী থেকে হিউম্যান বিয়িংদের বিভিন্ন প্রকার রোগ সংক্রমণ।
    এখন হিউম্যান বিয়িং দের সেন্ট্রামগুলোতে কোন উদ্ভিদ কোন পশুপাখী নেই, তাই তাদের জন্যে এই ধরনের কোন সমস্যাও নেই। এই সেঞ্চুরির হিউম্যান বিয়িংরা পোডোস্ফেয়ারেই উদ্ভিদ পশুপাখীর ছবি দেখেছে। বাস্তবে দেখেনি।
    ইসাস আর পাঞ্চালিকা ঠিক করেছে ওদের এই একবছর একসঙ্গে থাকার সময়কালের কিছুটা সময় নীলগ্রহে কাটাবে। নীলগ্রহে যাবার এবং থাকার জন্য ওদের বিশেষ অনুমতি নিতে হয়েছে। ওখান থেকে ফিরে আসার পর ওদের একমাস কোয়ারান্টাইনে থাকতে হবে এবং নানা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে কারন নীলগ্রহ থেকে কোন অসুখই যাতে অন্য কোথাও সংক্রমিত না হয়।
    নীলগ্রহে ভারতবর্ষ বলে একটা জায়গা ছিল সেখানেই ওরা থাকবে। পাঞ্চালিকা ভারতবর্ষের বাঙালী নামে এক অরিজিনের হিউম্যান। ওর খুব দেখার জানার ইচ্ছা বাঙালিরা যেখানে থাকত সেটা কিরকম জায়গা। যদি তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে কোন আঁচ পাওয়া যায়! ইসাস অবশ্য গ্রীক নামক এক অরিজিনের। ওর বার্থকার্ডে তাই আছে।সমস্তরকমের অনুমতি হাতে পাবার পর একদিন ইসাস আর পাঞ্চালিকা স্পেশসিপে করে পৌঁছালো নীলগ্রহের দক্ষিন গোলার্ধে এক মহাসমুদ্রের তীরে।
    ওরা যা দেখে তাই দেখেই মোহিত হয়ে যায়। এত মনোমুগ্ধকর দৃশ্যাবলী ওরা কোনোদিন দেখেনি। ঘন সবুজ বন,নীল আকাশ আর নীল সমুদ্র, ধূসর আর সাদাবরফ ঢাকা পর্বতরাজি দেখে ভাবতে থাকে এতদিন এত বৈচিত্র্য এত সৌন্দর্য থেকে দূরে ছিল কিকরে! ইসাস আর পাঞ্চালিকা এত মোহিত হল বাঙলার প্রকৃতিতে যে ওদের মনে হল পুরো একবছরটা ওরা এখানেই কাটাবে।
    প্রথম দিনা পনের ওরা ওদের স্পেশসিপেই থাকছিল তারপর ভাবল নেচারের মধ্যেই থেকে দেখা যাক! সেইমত ওদের স্পেশসিপে যা জিনিসপত্র ছিল তাই দিয়ে স্বচ্ছ কিন্তু কঠিন একটা তাঁবুর মত ঘর বানিয়ে ফেলল। ওই ঘরের ভিতরকার সমস্ত ব্যবস্হা একদম আরামদায়ক। রাত্রে চাঁদের জোৎস্না ওদের তাঁবুর স্বচ্ছ দেওয়াল দিয়ে এসে ওদের বিছানায় খেলা করে ওদের সাথে। পাঞ্চালিকা আর ইসাসের মনে হয় এত সুন্দর জীবন আগেও কোনদিন কাটায়নি। ভবিষ্যতে? কে জানে?
    সুখে ভালোবাসায় আবেগে নীলগ্রহের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে কবে যে একবছর শেষ হয়ে এল ইসাস আর পাঞ্চালিকা বুঝতেই পারল না। ওরা একবছরের প্রস্তুতি নিয়ে নীলগ্রহে এসেছিল। আর এখানকার পারমিশন ও ছিল কেবলমাত্র একবছরের। ফিরতে তো হবেই যতই মন খারাপ হোক না কেন! ইসাস আর পাঞ্চালিকা ফিরল ওদের নিজের নিজের সেন্ট্রামে মানে ইসাস মার্সে আর পাঞ্চালিকা এনসেলাডাসে।
    ওরা আবার অ্যাপলাই করল একসাথে থাকার, ওরা আবার অ্যাপলাই করল নীলগ্রহে যাবার, না এবার একবছরের জন্য নয়, অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। অনেক সমস্যার সম্মুখীন হল অনুমতি পেতে, ওদের নাছোড় জেদের জন্যই সুপিরিওর বোর্ড ওদের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে ওদের কোন সমস্যারই দায়িত্ব আর বোর্ড নেবে না সেটা বোর্ড জানিয়ে দিয়েছে।ওরা আবার নীলগ্রহে। এবার ওরা দুজনেই মনে মনে জানে যে এখন থেকে পুরো জীবনটাই ওরা একসাথে থাকবে আর থাকবে এই নীলগ্রহতেই আস্তানা করে।
    দ্বিতীয় দফায় এসে প্রথমেই ওরা এবার গেল গ্রীসদেশ যেখানে ছিল নীলগ্রহের সেইখানে। ওখানে আর আরও সব জায়গায় ওরা ঘুরে বেড়ালো। কিন্তু পুরো নীলগ্রহ ঘুরে বেড়িয়ে এসে ইসাস আর পাঞ্চালিকার মনে হল ভারতবর্ষের বাংলার মতো এত সুন্দর জায়গা আর নেই। ওরা এখানে প্রথমেই একটা স্হায়ী থাকার সেল্টার তৈরী করে নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করল। ঠিক সেইরকম যেরকম বাড়ী তৈরী করে এখানকার হিউম্যান বিয়িংরা এই গ্রহে থাকাকালীন বসবাস করত। ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া, পরজিবী নিয়ে যে পরীক্ষা নিরীক্ষা গবেষনার কাজ ওরা করত সেই কাজ এইখানে শুরু করল। প্রতিদিন নতুন কিছু নিয়ে কাজ, প্রতিদিনই নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট ওদের উৎসাহকে বহুগুন বাড়িয়ে দিতে লাগল।
    নীলগ্রহে সবচেয়ে যেটা মজার মনে হল ওদের তা হল এখানকার উদ্ভিদ। তাদের কতরূপ, কত সৌন্দর্য আর কি সুন্দর নানারকমের গন্ধ ।
    ওরা পোডোস্ফেয়রের মাধ্যমে ওদের নতুন অভিজ্ঞতার কথা সমস্ত হিউম্যান বিয়িংদের কাছে শেয়ার করতে লাগল, অনেকেই খুব উৎসাহিত হয়ে পড়ল।
    যারাই অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় তাদেরকে ওরা আহ্বান জানালো যাতে তারা তাদের সুন্দর সময়ের কিছুটা যেন এই নীলগ্রহে এসে উপভোগ করে যায়।বেশ কিছুসময় পরে ইসাস আর পাঞ্চালিকার এক মেয়ে জন্মাল একদম প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে। ওরা তার নাম রাখল পৃথিবী। নিজেরাই আদর আহ্লাদ দিয়ে লালন করতে লাগল। ওরা বিশ্বাস করছিল যে কৃত্রিম জীবনযাপনের চেয়ে এই প্রাকৃতিক জীবন ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু বড় সুখের আনন্দের আর তৃপ্তির। ধীরে ধীরে ওদের মতোই হিউম্যান বিয়িং মানে মনুষেরা নীলগ্রহে আসতে শুরু করল তাদের সুখের সময় কাটাতে তারপর এই নীলগ্রহের আকর্ষণে এখানেই থেকে যেতে লাগল।
    আমার স্যামসাং গ্যালাক্সি স্মার্টফোন থেকে পাঠানো হয়েছে।

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •