সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ২৮

0
36
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

গল্প নেই – ২৮

ছেলেটি সিঁড়ি দিয়ে এমন ভাবে উঠছিল মনে হচ্ছিল মাঠে ছোটার মতো। এতটাই গতি ছিল বাধ্য হলাম থামাতে। বললাম, ‘ওখানে দাঁড়াও।’
ছেলেটি বলল, ‘কেন?’
বললাম, ‘সারাক্ষণ দূরত্ববিধি মানতে বলছে শোনোনি? এখানে দু’গজ হয়ত সম্ভব নয় তবে দু’ফুট দূরে তো দাঁড়ান যেতে পারে।’
‘কেন? আপনার কি অসুবিধা হচ্ছে?’
তুমি এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়াবে তাতে আমার অসুবিধা হবে না তো কার হবে?
‘অনেকদিন হয়ে গেল, এখন আর ওসব কেউ মানছে না।’ ছেলেটি বলল।
বললাম, ‘আমি মানছি।’
ছেলেটি আমার কথা শুনে আর উঠল না।
আমি পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলাম। পেন হাতে নিয়ে কিছু লিখছি এমন ভাব করে বললাম,
‘তুমি কি আমার উপর রেগে গেলে?’
‘আপনি কি লিখছেন?’
‘আমি কি লিখছি এটা তোমাকে বলব কেন? তবু যখন জানতে চাইছ তখন বলি। আজ সকাল থেকে আমি পনেরোজন লোককে দূরত্ব বজায় রাখতে বলেছি। দশজন আমার কথা শুনেছেন। চারজন প্রথমে শুনতে চান নি, তবে অল্প কথায় তা মেনে নিয়েছেন। একজনের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে আমার ঝগড়া হয়েছে। উনি হাতাহাতি করতে চাইছিলেন। আমি ভদ্রলোককের বলেছি দু’গজ দূরে দাঁড়িয়ে যত খুশি হাতাহাতি করতে। উনি আমার কথা শুনে রাগে ঘোলাটে চোখ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। তুমি হচ্ছ ষোলোনম্বর। আমি কাগজে তোমার প্রতিক্রিয়া লিখে রাখছি।’
ছেলেটি রেগে গিয়ে আমাকে বলল, ‘আমার বিষয়ে আপনি কি লিখছেন?’
আমি কিছুই লিখছিলাম না। সকাল থেকে রাস্তায়, বাজারে, দোকানে তেমন ঘটনা ঘটতে দিইনি।
তবু ছেলেটিকে বললাম, ‘তোমার বিষয়ে লিখব তুমি খুব ভালো ছেলে। যা বলেছি বিষয়টি তুমি বুঝে নিয়েছ। এইরকম ছেলে আমাদের সমাজে দরকার। যারা সব রকম নিয়ম মেনে চলে। সবকিছু কিভাবে সবাই মেনে চলছে এই নিয়ে একটা সমীক্ষা করা হচ্ছে।’
‘আমি ভালো ছেলে এইকথা আপনি কেন লিখবেন?’
‘লিখব না! আমি বলতেই তো তুমি একটু দূরে দাঁড়ালে।’
নিজেকে একটা সমীক্ষার অংশগ্রহণকারী হিসেবে ভেবে খুশি হল ছেলেটি। আরও একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। তার পিছনের লোকটিকে বলল পিছিয়ে দাঁড়াতে। এইভাবে সবাই পিছিয়ে দাঁড়ানোতে লাইনটা একটু লম্বা হল।
পিছন থেকে একজন বলল, ‘এটা ভালোই হয়েছে।’
ছেলেটি শুনে হাসল। বলল, ‘জানেন কাকু, কেউ নিয়ম মানছে না। রাস্তায় বেরোলে মনে হয় সবাই বেপরোয়া।’
আমি কাগজ-কলম পকেটে রাখলাম। আমার সামনে ব্যাংকের দরজা বন্ধ। ভিতরে লোক আছে। পিছনের দরজা দিয়ে তাদের বের করে আমার সামনের দরজা খুলে দেবে।
ছেলেটিকে বললাম, ‘আমি তোমার আগে এসেছি। কাজেই দরজা খুললে আমি আগে যাব। তারপর তুমি। দরজা খুললে তুমি নিশ্চয়ই আমাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকবে না।’
ছেলেটি লজ্জা পেল। বলল, ‘ছিঃ ছিঃ তা কখনো হয়? আপনি আগে আছেন, আপনিই আগে যাবেন।’
আমি বললাম, ‘তাহলে তুমি তোমার পরের লোককে এই কথা বলে তাকে বলে দাও কথাটা আরেকজনকে বলে দিতে।’
ছেলেটি খুশি হয়ে কাজ শুরু করল।
আগে এরকম হলে তীব্র বাধা দিতাম। তাতে ঝামেলা হয়েছে। যেখানে দাঁড়িয়েছি কোনো কাজের জন্য, পিছনে যে দাঁড়িয়ে সে খুবই অস্থির হয়ে বৃহৎ পেট দিয়ে ঠেলেছে। অসুবিধা সব জায়গাতেই। বাসে বা ট্রেনে উঠবার সময় সবাই মনে করে একমাত্র তারই আগে যাওয়ার প্রয়োজন আছে।
টিকিট নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে পিছন থেকে যখন কেউ ঠেলেছে কখনো তাকে বোঝানো যাযনি যে কাউন্টার থেকে টিকিট ও ফেরত টাকা গুনে নিয়ে বেরোবার আগে ঘাড়ের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে কোনো লাভ হবে না।
আপনি দোকানে কিছু কিনছেন তার মধ্যেই পিছন থেকে তিনজন মিলে দোকানদারকে বলে যাচ্ছে কিছু না কিছু দিতে। আপনি যে সামনে দাঁড়িয়ে কিছু নিচ্ছেন আপনার নেওয়া না হলে দোকানদার যে অন্য কাউকে কিছু দিতে পারবে না এটা বোঝার কোনো ইচ্ছে নেই।
করোনাকালে নানান বিধিনিষেধের মধ্যে একটি হচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা। ভেবেছিলাম এতে খানিকটা নিশিন্ত হওয়া যাবে। কোথায় কি! সারাক্ষণই নিয়ম ভাঙ্গার খেলা।
একসময় যখন কলকাতা শহরে মিনিবাস চালু হল। লোকজনকে দেখা গেছে কেতা করে বাসের ভিতরে সিগারেট ধরাতে। রাতে দূরপাল্লার বাসে বসে থাকতে কষ্ট হত সিগারেট ও বিড়ির ধোঁয়ায়। কড়া আইন করে সব বন্ধ করতে হল।
একটু অসাবধান হলে করোনা কাউকে রেহাই দেবে না। তবু কেন এই নিয়ম ভাঙ্গার মনোভাব? দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কিছু হলে তিন চারটে হাসপাতাল ঘুরে কোথাও জায়গা না পেয়ে বেঘোরে মরছে মানুষ। কোনো কার্ড সময় মতো কাজে লাগছে না।
পঞ্চাশবছর আগে আমাদের ছোটোবেলায় বাড়ির বড়োরাই শুধু অভিভাবক ছিলেন না। যেখানে বসবাস করতাম সেখানে অন্য বাড়ির বড়োরা যাঁরা ছিলেন তাঁরা সবাই ছিলেন আমাদের অভিভাবক। তাঁরা যা বলতেন আমরা শুনতাম। একটা শ্রদ্ধা মেশানো ভয় ছিল আমাদের মধ্যে।
এখন কাউকে কিছু বলতে গেলে অভিবাবকেরা তেড়ে আসেন। ‘আমার ছেলে মেয়েকে আপনি বলার কে?’
ভাবি সত্যিই তো আমি বলার কে?
কিন্তু, আপনিও তো কিছু বলছেন না!

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •