সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায় (পর্ব – ৬)

    0
    48
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    গোলকচাঁপার গর্ভকেশর

    গাড়ির হর্নের কর্কশ আওয়াজে ধড়মড়িয়ে উঠে, সোজা হয়ে বসল ত্রিবেণী রঙ্গরাজন। এ,সির হালকা ঠান্ডায় সারাদিনের ক্লান্ত চোখদুটো কখন যে ঘুমে জড়িয়ে গিয়েছিল তা একেবারেই বুঝতে পারেনি। নেমে আসা চশমাটাকে ঠিক করে নিল ত্রিবেণী। তারপর ওর বাঁ-কাঁধের ওপর দিয়ে নেমে, বুক আর পেটের ওপর সাপের মতো শক্তভাবে জড়িয়ে থাকা বেল্টটাকে ক্লিপ থেকে আলগা করে দিল। ড্রাইভিং হুইলটাকে শক্ত করে চেপে ধরে আবার একবার কর্নবিদারী হর্ন বাজালো ঋতম। তীব্র আওয়াজের ঠেলায় বিরক্তিতে ত্রিবেণীর কপালের মাঝ বরাবর একটা গভীর যতি চিহ্নের উদয় হল। আর তখনই ছোট্ট সিএফএল লাগানো ঘুপচি ঘরটা থেকে ঘুম জড়ানো চোখে হাই তুলতে তুলতে, নেমে যাওয়া নীল প্যান্টটাকে ওপর দিকে টানতে টানতে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো রাজগৃহ হাউসিং সোসাইটির আধবুড়ো সিকিউরিটি গার্ড। ওদের দুজনকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে ধীরে ধীরে ঠেলে সরাতে লাগলো লাল-হলুদ রঙ করা লোহার মোটা গেটটাকে। কাঁচাঘুম ভেঙে যাওয়াতে কতো যে গালমন্দ করছে ওদের, সেটা ভেবেই এতো বিরক্তির মধ্যেও হাসি পেল ত্রিবেণীর। গার্ডটাকেও তেমন দোষ দেওয়া যায় না। ওদের ফেরার সময়ের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। ওরা ছাড়া এই হাউসিং সোসাইটির অন্যান্য বাসিন্দারা মোটামুটি বারোটা-সাড়ে বারোটার মধ্যে যে যার নিজের ঘরে ঢুকে পড়ে। অবশ্য উইকএন্ডের ব্যাপারটা আলাদা, তখন প্রায় সারারাত ধরেই চলতে থাকে যাওয়া-আসা।
    জানালার কাচ নামিয়ে গার্ডটাকে বকাবকি করছে ঋতম। ইদানিং অল্পেতেই মেজাজ সপ্তমে চড়ে যাচ্ছে ওর, মুখ চোখ দেখে মনে হয় ও খুব চিন্তায় রয়েছে, গভীর দুঃশ্চিন্তায়। ত্রিবেণী অনেকবার ভেবেছে ঋতমকে ওর দুঃশ্চিন্তার কারণটা জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেনি। যতই হোক ঋতম তো ত্রিবেণীর বস। ত্রিবেণীর দেখা সবচেয়ে কমবয়সী রেসিডেন্ট এডিটর; স্থীতধী, সজ্জন এবং সুদর্শনও বটে। বছর পাঁচেক আগে কোলকাতা থেকে এখানে এসেছে। সৎচরিত্র, ভালো মানুষ হিসাবে ঋতমের বেশ সুনাম আছে অফিসে। নিজে উচ্চপদস্থ হয়েও অধঃস্তনদের অধিকারের কথা মাথায় রাখে, তাদের বিপদে-আপদে সাধ্যমতো পাশে থাকার চেষ্টা করে। হঠাৎ করে কি যে হল মানুষটার? এমন বদমেজাজি, খিটখিটে হয়ে গেল। তাহলে কি কোনো কারণে পারিবারিক অশান্তি চলছে ওর ? বউয়ের সাথে লাগাতার মনোমালিন্য ?? কিন্তু তাই বা হবে কেন? ঋতমের স্ত্রী পারমিতা-র সাথে বেশ ভালোই পরিচয় আছে ত্রিবেণীর। দু-চারবার গিয়েছে ওদের ফ্ল্যাটে। ওদের বাচ্চাকাচ্চা নেই, তাই ঘরদোর বেশ পরিপাটি করে সাজানো। ঝুটঝামেলা বিহীন সুখের সংসার দুজনের। যত বারই ওখানে গিয়েছে তত বারই ত্রিবেণীকে ঝাল ঝাল নামকিন সহযোগে বেশি করে দুধ, চিনি দিয়ে তৈরি গরম মিল্কশেকের মতো কফি খাইয়েছে পারমিতা। পারমিতাকে দেখে শান্তশিষ্ট, ভালো মানুষ বলেই মনে হয়েছে ত্রিবেণীর। তাহলে এখন কি এমন হোলো…না, এর বেশি আর কিছু ভাবার ফুরসত পেলো না ত্রিবেণী। ‘এ’ বিল্ডিং-এর সামনে এসে গাড়ি থামিয়েছে ঋতম। এবার ত্রিবেণীর নামবার পালা, কম্পাউন্ড দিয়ে ওকে হেঁটে যেতে হবে ‘ডি’ বিল্ডিং অবধি; পার্কিং প্লেসে গাড়ি রেখে ঋতম উঠে যাবে সিঁড়ি বেয়ে, করোনা ভাইরাসের ভয়ে ও আর এখন লিফট ব্যাবহার করে না।
    সৌজন্যতার হাসি হেসে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ত্রিবেণী।
    পকেটের ওপর সিকিউরিটি এজেন্সির লোগো লাগানো আকাশি শার্ট আর নীল প্যান্ট পরা কমবয়সী ছেলেটা চারটে বাড়ির চারপাশে টহল দিচ্ছে। ও যে জেগে আছে, কাজে ফাঁকি দিচ্ছে না তা জানান দেওয়ার জন্য মাঝে মাঝেই হুইসিল বাজাচ্ছে, এতে ফার্স্ট ফ্লোরের আবাসিকদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলেও এখনও পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। ত্রিবেণীকে দেখতে পেয়ে মাস কয়েক আগে বহাল হওয়া ছেলেটা ওকে ইমপ্রেস করার জন্য, বাউন্ডারি ওয়ালের কাছে গিয়ে গাছপালার ফাঁক দিয়ে হাতের মোটা লাঠিটা উঁচু করে পাঁচিলের ওপর লাগানো লোহার মোটা মোটা বর্শাগুলোর গায়ে বীরদর্পে ঠুকে ঠুকে অদৃশ্য চোর-ডাকাতগুলোকে তাড়াবার ভান করল। ত্রিবেণীর বেশ মজা লাগলো ছেলেটার কার্যকলাপ দেখে। নিজের যোগ্যতা মালিকপক্ষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তাহলে সব চাকরিতেই আছে। না হলে এতো উঁচু পাঁচিল ডিঙ্গিয়ে চোর- ছ্যাঁচোড় তো দূর, রাস্তার কুকুর-বেড়ালও ভেতরে ঢুকতে পারবে না।
    কিন্তু ভয় তো বাইরে থেকে আসা চোর-ডাকাত, কুকুর-বেড়ালকে নিয়ে নয়, আসল ভয়ের কারণ রয়েছে এই রাজগৃহ হাউসিং সোসাইটির ভেতরেই, আর তা হল এই হাউসিং-এর বেশ কিছু টিন-এজার। ছেলেমেয়েগুলো এতদিন অন্ধকারের সু্যোগ নিয়ে সিগারেট খেতো, বিয়ার খেতো, সুযোগ বুঝে চুমু খেতো। কিন্তু মাসকয়েক আগে যে অপ্রিয় ঘটনাটা ঘটল, যার ফলে হাউসিং-এর ভেতরেও পাহারার ব্যাবস্থা করতে হল সেটার কথা মনে পড়লে ত্রিবেণীর এখনও বুকের ভেতর দুরদুর করে ওঠে।
    ‘সি-৩০৩’ এর কুহু শ্রীবাস্তব, স্বামী সৌরভ আর দুই ছেলে, বছর ষোলোর ইশান আর বছর ছয়েকের রাঘবকে নিয়ে বেশ শান্তিতে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাচ্ছিল। তবে সবার অজান্তে এই আপাতদৃষ্ট হ্যাপি ফ্যামিলিটির একজনের মনে দানা বাঁধছিল চরম অশান্তি। কুহুর ছোট ছেলে রাঘব ছিল প্রি-ম্যাচিওর বেবি; জন্মের সময় থেকেই বেশ দূর্বল, রুটিনের একটু হেরফের হলেই রাঘব কোনো না কোনো রোগে ভুগতো। তাই কুহুর বেশির ভাগ সময় কেটে যেতো রাঘবের পরিচর্যায়। মা হিসাবে যে নিয়মমাফিক কাজগুলো না করলেই নয় সেগুলোই দায়সারা ভাবে ইশানের জন্য করে যেতো কুহু।
    একেই দুই ভাইয়ের বয়সের তফাত ছিল অনেকটা তার ওপর এতো বছর ধরে একা একা বাবা-মায়ের সব ভালোবাসা ভোগ করার পর রাঘবের মতো এক অনাহুত অংশীদারকে একেবাতেই মেনে নিতে পারেনি ইশান। রুগ্ন ভাইয়ের প্রতি মায়ের টান দেখে ইশানের ঈর্ষার আগুনে ঘৃতাহুতি পড়তো। ওর কাছে তখন মনের জ্বালা মেটাবার উপায় একটাই, নেশা; প্রথমে সিগারেট, বিয়ার তারপর গাঁজা। একদিন ও যখন ‘এ’ আর ‘বি’ বিল্ডিং-এর মাঝে গোলকচাঁপা গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে পৃথিবী ভুলে গাঁজায় টান দিচ্ছিল তখনই ওকে হাতেনাতে ধরে ফেলে ওদেরই বিল্ডিং-এর বাসু সাকলানি। অন্য কেউ দেখলে হয়তো ব্যাপারটা অন্যরকম হোতো, কিন্তু নাতির বয়সী একটা ছেলেকে চোখের সামনে নেশা করতে দেখে একেবারে লঙ্কাকান্ড বাঁধিয়ে ফেলল বাসু আঙ্কল। কুহু আর সৌরভ কিছু বলার আগেই বেশ কিছু সিনিয়ার সিটিজেন আগ বাড়িয়ে চড়-থাপ্পড় লাগালো ইশানকে। তখন নেশার ঘোরে ব্যাপারটা ঠিকঠাক বুঝতে না পারলেও নেশা কাটার পর গালের ওপর অপমানের দাগগুলো বেশ ভালোমতোই বুঝতে পারলো ইশান। আর তাই বদলা নেওয়ার জন্য দিন দুয়েক পর, এক রাত্রে সবার অলক্ষ্যে ভাংচুর করলো হাউসিং সোসাইটির অফিসঘর, নষ্ট করে দিল প্রত্যেক বিল্ডিং-এর সামনে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরা। পরদিন সকালে নষ্টামির নমুনা দেখে খরব পাঠানো হল সিকিউরিটি এজেন্সিতে, ওদের কাছে সিসিটিভি ক্যামেরার রেকডিং থাকে, সেটা পেলেই লোকাল থানায় ডায়েরি করা হবে। কিন্তু রেকডিং দেখে সবার চক্ষু চড়কগাছ। কুহুর কান্নাভেজা চোখ আর সৌরভের করুণ মুখ দেখে সোসাইটির কেউ আর কোনো পুলিশ কমপ্লেন করলো না, সে বারের মতো শুধু ক্ষতিপূরন নিয়ে মাফ করে দেওয়া হল ইশানকে। তবে ভবিষ্যতে আবার যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে তার জন্য সন্ধ্যা সাতটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত হাউসিং-এর ভেতরেও কড়া পাহারার ব্যাবস্থা করা হল।
    হাঁটতে হাঁটতে ‘ডি’ বিল্ডিং-এর কাছে পৌঁছে গিয়েছিল ত্রিবেণী। শুনশান করিডোর পেরিয়ে লিফটে উঠে পড়ল ত্রিবেণী, তারপর চাপ দিল তিন নম্বর বোতামে।

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •