সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শিল্পী নাজনীন (পর্ব – ২৩)

    0
    22
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    বেনু মশলাঘর

    আলেয়ার সময়টা যেন থমকে গেছে হঠাৎ। কাটতেই চায় না আর। হাসপাতালে ডিউটির সময়টুকু বাদ দিলে বাকি সময়টা শামুক গতিতে হাঁটে আজকাল। ঝিম ধরে থাকে। আলেয়ার কেমন ঘুম-ঘুম পায়। অকারণে হাই ওঠে। নিজেকে অলস আর অকর্মণ‍্য মনে হয় তার। রেজা এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আলেয়ার জীবনেও হঠাৎই ছন্দ পতন হল যেন। দৈনন্দিন জীবনটা কেমন বদলে গেল দুম করে। হাসপাতালে রেজা বেশ আছে। ডাক্তাররা সারাক্ষণ তার দেখভাল করছে। সুন্দরী ইন্টার্নি ডাক্তার খবর নিচ্ছে দিনের মধ্যে কয়েকবার। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বরং স্বর্গভ্রমণের সুখ উপভোগ করছে রেজা। কপাল আরো খুলে গেছে তার। আলেয়ার মতো দু পয়সার আয়াকে আর একদমই প্রয়োজন নাই রেজার। তবু কয়েকদিন শুকনো মুখে তার কেবিনের সামনে গিয়ে উঁকিঝুঁকি করেছে আলেয়া। প্রথম দিকে সে চেষ্টা করেছে নিয়মিত খোঁজখবর নেয়ার। কিন্তু পাত্তা পায়নি তেমন। কেবিনগুলো পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব তার নয়। আর হাসপাতালে তার ডিউটিও শিফট অনুযায়ী ভাগ করা। ফলে কেবিনের ভেতরে কোনো কারণ ছাড়া তার প্রবেশের অনুমতি নেই, কেউ ভালো চোখে দেখে না ব‍্যাপারটা। তাছাড়া ডিউটির সময় বাদে হাসপাতালে নিজের উপস্থিতির কারণ ব‍্যাখ‍্যা করতেও গলদঘর্ম হতে হয় তাকে। রেজা তার এমন কেউ নয় যে পরিচয়ের দোহাই দিয়ে সে রেজার কেবিনে প্রবেশের অনুমতি চাইবে যখন তখন। আর রেজার মনোভাবও বোঝে সে। তার উপস্থিতি চায় না রেজা। বিরক্ত হয় বরং। রেজা সুন্দরী ইন্টার্নি ডাক্তার কেয়ার উপস্থিতি চায়। কেয়া যখন তখন হাজির হয় গিয়ে। রেজার পালস মাপে। বিপি মাপে। আর কী মাপে আল্লাহ মালুম। হারামজাদি। থু করে থুতু ফেলে গায়ের ঝাল ঝাড়ে আলেয়া। চিড়বিড় করে রাগে। বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে সে। দেখতে বিশেষ পারেনি কিছুই। তবে অনুমানে সে বুঝে নিয়েছে ঢের। আর রেজাকেও ভালোমতোই চেনে সে। ফলে তার কেবিনে কেয়ার ঘন ঘন উপস্থিতি আর যেচে গিয়ে ডাক্তারি ফলানোর খায়েশের কারণ বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি আলেয়ার। আজকাল আর তাই ওদিকটায় যায় না সে তেমন। থাক। দুধের মাছি নিয়ে ভালো থাক রেজা। আলেয়াকে এখন আর প্রয়োজন নাই তার। আলেয়াও দেখতে চায় রেজা কতদিন চলতে পারে তাকে ছাড়া। কিংবা সে নিজেই কতটা অচল রেজাকে বাদ দিয়ে। জগতে কেউ কারো নয়। কাউকে ছাড়াই থেমে থাকে না জীবন। তাহলে সে-ই বা কেন রেজার স্বার্থপরতায় কেঁদে বুক ভাসাতে যাবে! তাকে ছাড়া রেজার যদি সুখে দিন যেতে পারে তাহলে রেজাকে ছাড়া তার দিনও অসুখে পোড়ার কোনো কারণ নেই। থাকা উচিত নয় অন্তত। ভেবে, গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসল আলেয়া। অনেক শোক পালন হয়েছে এতদিন। আর নয়। এবার নিজের মতো বাঁচবে সে। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে স্নান সারল আলেয়া। অনেকদিন পর তেল-কাজল মাখল শরীরে। রোশনির টেবিলের সামনে গিয়ে সুগন্ধি মাখল খানিকটা। মনটা ফুরফুরে লাগল বেশ। রোশনি সাত-সকালে বেরিয়েছে আজও। কখন ফিরবে কে জানে। আজ নাইট ডিউটি আছে আলেয়ার। বিকেল গড়িয়ে গেছে। বেরোতে হবে তাকে। মেয়েটার কোনো আক্কেলজ্ঞান নেই। ফোন দিল আলেয়া অতঃপর। একবার রিং হতেই ধরল রোশনি। তার কণ্ঠের আহ্লাদ ধরতে সময় লাগল না আলেয়ার। কানে বাজল খুব। মনে মনে নিজের মেয়েটাকে হিংসে হলো হঠাৎ। বেশ আছে রোশনি। সে নিজে কোনোদিন এমন আনন্দের খোঁজ পায়নি জীবনে। তার জীবন গেল রোশনির বাপের স্বেচ্ছাচারিতা আর রেজাদের মতো স্বার্থপরদের পাল্টি খাওয়া দেখে। সত‍্যিকার ভালোবাসার স্বাদ তার জীবনে কোনোকালে মিলল না আর। মিলার কাছে রোশনির জন্য ঘরের চাবি রেখে বের হলো আলেয়া। হাসপাতাল কোয়ার্টারের এদিকটা খানিকটা নির্জন। রোশনির রাতে একা থাকাটা নিরাপদ নয় জেনেই আলেয়ার নাইট ডিউটি থাকলে মিলা এসে রোশনির সঙ্গে ঘুমায়। মিলার মা কুলসুমের ডিউটি পড়লে রোশনি যায় মিলার কাছে। শিফট ভাগ করা আছে তাদের। একই সঙ্গে দুজন নাইট ডিউটি নেয় না তারা। কুলসুমের আজ ডে শিফটে কাজ। চাবি দেয়ার সময় উঁকি দিয়ে ঘরের ভেতরটা একবার দেখল আলেয়া। নাই। কুলসুম ডিউটি সেরে আসেনি এখনও। ধীরে-সুস্থে হাসপাতালের দিকে এগোলো আলেয়া। হঠাৎই ভীষণ হালকা লাগল শরীর। মনে হলো একলাফে অনেকগুলো বছরের ভার নেমে গেল শরীর থেকে। ফুঃ। কোথাকার কোন রেজা। তার জন্য সে কেন কষ্ট পেতে যাবে গায়ে পড়ে। আলেয়াকে সে ব‍্যবহার করেছে। প্রয়োজন শেষ এখন ফেলে দিতে চাইছে ব‍্যবহৃত পোশাকের মতো। নাকি ঘৃণ্য আবর্জনার মতো? প্রশ্নটা মনে করে নিজেই ঘৃণায় মুখ বাঁকাল আলেয়া। সে অশিক্ষিত। মূর্খ। সমাজের উঁচুতলার মানুষদের সহবত, সভ‍্যতা-ভব‍্যতা কোনোটাই তার ভেতরে নাই। কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধটুকু তার টনটনে। তাকে যে ছুড়ে ফেলতে চায় অবহেলায়, অবলীলায় সেইজনকে সে-ও ত‍্যাগ করতে পারে নিমেষেই। রোশনির বাপকেও সেই কারণেই ছুড়ে ফেলেছিল সে। কোথায় যাবে, কী খাবে, রোশনিকেই বা কী করে বড় করবে, একমুহূর্তও এসব ভাবেনি সেদিন। আর আজ কোথাকার কোন রেজাকে ছুড়ে ফেলতে কেন দ্বিধায় পুড়বে সে! কেন সে বলি দিতে যাবে নিজের আত্মাহংকার! বরং বুক ফুলিয়ে চলবে সে রেজার সামনে। কারণ তার তো কোনো সংকোচ নেই মনে। সে তো অন‍্যায় কিছু করেনি কারো সঙ্গে। রেজাই বরং মুখ লুকোবে তাকে দেখে। আড়াল খুঁজবে নিজের জন্য। কেননা তার ভেতরে আছে অন‍্যকে ঠকানোর অপরাধবোধ, স্বার্থপরতার তীব্র কটুগন্ধ। আলেয়ার কাছে নগ্ন সেসব। আড়ালহীন। তার কাছ থেকে তাই একছুটে পালাতে চাইবে রেজা। লুকোতে চাইবে নিজের মুখোশহীন নগ্ন মুখ। সে যদি জোঁক এখন, আলেয়া তবে নুন। তাই আড়াল দরকার হবে তার। দরকার হবে লুকোচুরির। হাসল আলেয়া। শক্ত করে শরীরে প‍্যাঁচানো শাড়ির আঁচল টেনে হাসিটা আড়াল করল একবার। তারপর ছেড়ে দিল। না। হাসি আড়াল করবে কেন সে। সে হাসবে। জগত দেখুক। তার হাসি দেখে জ্বলুক তারা। কুঁকড়ে থাকুক রোদের তীব্র তাপে। তবেই তো সুখ তার! বুক চিতিয়ে এগোলো আলেয়া। মুখে হাসি। গুনগুনিয়ে ছোটবেলায় শোনা একটা গানের ভুলে যাওয়া কথার সুর ভাঁজল খুশিমনে।

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •