সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্ত্তী – ২১

    0
    25
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    বিপিনচন্দ্র পাল বলিয়াছেন, “নিবেদিতা ভারতবর্ষকে যেরূপ ভালবাসিতেন ভারতবাসীও ততটা ভালবাসিতে পারিয়াছি কিনা সন্দেহ |” অন্য আর একটি রচনায় এর সপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায় | “ভারতবর্ষের কথা উঠিলেই তিনি একেবারে ভাবমগ্না হইয়া যাইতেন | মেয়েদের বলিতেন , ‘ভারতবর্ষ ! ভারতবর্ষ ! ভারতবর্ষ ! মা ! মা ! মা ! ভারতের কন্যাগণ , সকলে জপ করিবে , ভারতবর্ষ ! ভারতবর্ষ ! ভারতবর্ষ ! মা ! মা ! মা !’ বলিয়া নিজের জপমালা হাতে হাতে লইয়া নিজেই জপ করিতে লাগিলেন ‘ মা ! মা ! মা!’ ” | ৭

    আর একদিনের কথা- “একদিন কোনো মেয়ে শ্লেটে দাগ টানিতে টানিতে বলিয়াছিল ‘লাইন টানিতেছি |’ ‘লাইন’ এই শব্দটি শুনিবামাত্র নিবেদিতা তাহার পাশে আসিয়া দাঁড়াইলেন এবং বলিলেন ‘ আপনার ভাষায় বল ‘ কিন্তু ‘লাইন’ এর বাংলা প্রতিশব্দটি যে কি তাহা ছোট মেয়েদের কেহই তখন ভাবিয়া পাইল না | সকলেই বলিতে লাগিল , ‘সিস্টার , আমরা তো বরাবরই লাইন বলি |’ ঐ কথা শুনিয়া দুঃখে বিরক্তিতে নিবেদিতার মুখ লাল হইয়া উঠিল , নিবেদিতা বলিলেন , ‘তোমরা আপনার ভাষাও ভুলিয়া গেলে ? ঐ সময়ে একটি ছোট্ট মেয়ে বলিয়া উঠিল , ‘লাইনের বাংলা রেখা |’ তখন নিবেদিতার আনন্দের সীমা রহিল না , তিনি যেন একটি হারানো জিনিস কুড়াইয়া পাইলেন এবং বার বার ‘রেখা , রেখা , রেখা ‘ উচ্চারণ করিতে লাগিলেন |” ৮
    অর্থাৎ তাঁর শিক্ষা দেওয়ার মধ্যে জাতীয়তাবোধের ভাবটি বজায় থাকত | তিনি হয়ে উঠেছিলেন মনে প্রাণে ভারতীয় এবং চাইতেন তাঁর ছাত্রীরাও তাই হয়ে উঠুক |
    তখন খুব কম ছাত্রীই বিদ্যালয়ে আসত | না আসার অবশ্য কিছু কারণ ছিল | প্রথমত – তাদের লেখাপড়া সম্বন্ধে অভিভাবকদের তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না | দ্বিতীয়ত – বাল্যবিবাহ প্রথা | বুদ্ধিমতী ও আগ্রহী কোনো ছাত্রীর প্রতি তিনি আগ্রহী উঠলেন ঠিক তখনই ছাত্রীটির বিয়ে হয়ে গেল | যাইহোক কেউ কয়েকদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে তিনি খোঁজখবর নিতে ভুলতেন না |
    মিশনারী বিদ্যালয়গুলিতে খ্রীষ্টধর্ম প্রচার এবং ঐ সব বিদ্যালয়ে পড়লে কন্যাগণ বিদেশী ভাবাপন্ন হয়ে পড়বে – এই ছিল সেই সময়কার অভিভাবকদের মানসিক স্থিতি |
    নিবেদিতা বোধহয় এটি আঁচ করতে পেরেছিলেন | তাই নিবেদিতা প্রাচীন পন্থী পরিবারের কন্যাগণ বা বধূদের জন্য পর্দাপ্রথা অক্ষুণ্ণ রেখে গাড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন |
    তাছাড়া বাগবাজার পল্লীর বাড়ি বাড়ি ঘুরে অভিভাবকদের নিকট করজোড়ে বিদ্যালয়ে কন্যাগণকে প্রেরণের জন্য প্রার্থনা জানাইতেন | নিবেদিতার ঐরূপ ঐকান্তিক প্রার্থনা , জীবনযাত্রার সরলতা অভিভাবকদের মনকে অনেকখানি সম্পৃক্ত করতে পারিয়াছিলেন বলে অনুমিত হয় |
    ইতিমধ্যে যে সব বালিকা বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ করছে তাদেরকে হিন্দু সংস্কৃতি ও রীতিনীতি অক্ষুণ্ণ রেখে দেশীয় ঢঙে শিক্ষা দানের ব্যবস্থা দেখে অভিভাবকদের তরফ থেকে কড়া মানসিকতা অনেকখানি কমে গিয়েছিল | ফলে ছাত্রীসংখ্যাও বেশ বেড়েছিল |
    ছাত্রীদের সংস্কারে যেন কোনোরূপ আঘাত না লাগে নিবেদিতা সেই বিষয়ে সচেতন থাকতেন | প্রতিবছরই স্কুলে সরস্বতী পূজা হতো | স্কুলে প্রথম যেবার সরস্বতী পূজা হয়েছিল সেবার দেবীকে গোটা ফল ভোগ দেওয়া হয়েছিল | কারণ ছাত্রীদের হিন্দু সংস্কারে যেন কোনোরূপ আঘাত না লাগে | পূজা শেষে মেয়েরা সেই প্রসাদ নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিল | পরবর্তীতে ছাত্রীদের আগ্রহেই সে সংস্কারের বেড়া ভেঙে গিয়েছিল | পরের বছর লুচি তরকারী প্রভৃতি রান্না করা ভোগ সরস্বতীকে নিবেদন করা হয় | কিন্তু তিনি ও ক্রিস্টিন দোতলা থেকে নিচে নামেননি সংস্কারের মর্যাদা রক্ষার জন্য | ছাত্রীরাই জোর করে তাদেরকে নিচে নামিয়ে এনে সকলে মিলে পরম আনন্দে প্রসাদ গ্রহণ করেন |
    সর্বোপরি নিবেদিতার ছিল একটি মাতৃহৃদয় | একাদশীর দিন তিনি স্কুলের বালবিধবাদিগকে ‘একাদশী ব্রত’ উপযোগী আহার করাতেন | স্কুলের এক ছাত্রী প্রফুল্ল দেবীর স্মৃতিচারণায় সেই দিনের একটি চিত্র সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে | “এক একাদশীর দিনে নানা কাজের ব্যবস্তার জন্য আমাকে খাওয়াতে তিনি ভুলে যান ; বিকালে জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়িতে চলে যান , সেখানে নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনাকালে হঠাৎ তাঁর ভুলের কথাটি মনে পড়ে যায় , সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার মাঝখানেই তিনি লাফিয়ে উঠে পড়েন এবং তাড়াতাড়ি স্কুলে ফিরে আসেন | তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে | দারোয়ান পাঠিয়ে আমাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান| আমি যাওয়ামাত্র তিনি আমাকে দু’হাতে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন , ‘ও আমার মেয়ে , আমি খেয়েছি কিন্তু তোমাকে খাওয়াতে ভুলে গিয়েছি |’ সেদিন তাঁর সেই স্বর্গীয় স্নেহসুধাসিক্ত হয়ে আমিও অভিভূত হয়েছিলাম এবং আজও অভিভূত হই |” ৯
    নিবেদিতার এই মাতৃহৃদয় তৎকালীন সমস্ত প্রতিবদ্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার মূলমন্ত্র ছিল |
    তিনি ভারতীয় ভাবধারার সঙ্গে যুরোপীয় শিক্ষা-প্রণালীর মেলবন্ধন ঘটানোর তাগিদ অনুভব করলেন এবং তা বাস্তবে রূপ দিলেন | প্রবাজিকা মুক্তিপ্রাণার রচনায় এর প্রমাণ আছে | “ভারতীয় নারী অধুনা রন্ধনবিদ্যায় পারদর্শিনী ; কিন্তু সূচীকর্মে তাহার অভিজ্ঞতা নাই , এবং দ্বিপ্রহরে বিশ্রামের পর সে শুধু গল্পগুজবেই অবকাশ যাপন করে | সুতরাং নিবেদিতা এবং তাঁহার সহকর্মী বিধবা ও বিবাহিতদিগকে বাংলা শিক্ষার সহিত সূচীশিল্প শিক্ষা দিতেন | কিন্তু প্রগতির স্রোত রক্ষণশীল পরিবারের মধ্যেও দেখা দিল | ফলে কন্যা এবং বধূগণকে ইংরেজী শিক্ষা দেবার ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তিনি দমন করিতে পারেন নাই , এবং বাধ্য হইয়াই পরে বাংলার সহিত ইংরেজী শিক্ষার ব্যবস্থা করিতে হইয়াছিল |”১০
    ( চলবে )

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •