সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে তনিমা হাজরা (পর্ব – ৫)

    0
    20
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    ছড়িয়ে জড়িয়ে

    ছড়ার একটি বিরাট অংশ জুড়ে আছে ছেলে ভুলানো গল্পের ছন্দরূপ অথবা ঘুমপাড়ানি গান, অথবা বিভিন্ন বারব্রত অথবা গৃহ কর্মের বর্ণনা। তাহলে কি ধরে নেব এইসব ছড়াগুলির অধিকাংশই মহিলাদের দ্বারা সৃষ্ট। ছেলেপুলেদের ঘুম পাড়াতে একটু অবসর। ঘরের বারব্রতে কিছু ইচ্ছেপূরণের আকুতি ঈশ্বরের কাছে। সেই অবসরেই ছন্দে বাঁধা পড়ে নিত্যব্যবহার্য অক্ষর মালা। অথচ অধিকাংশেরই লেখার বর্ণমালায় অক্ষর পরিচয় নেই। অগত্যা মুখে মুখে চলে সেই প্রবাহ। একজনের কাছে শুনে আরেকজনের ছড়াগানে। আবার যেহেতু এর কোনো লিখিত ভার্সন ছিল না প্রথমে । তাই একই ছড়ার বিভিন্ন রূপ পাওয়া যায়। কিছু সংযোজন, কিছু বিয়োজন বা কিছু নিজস্ব পরিমার্জন ঘটে যায় একই মূল বক্তব্যের ছড়াটির শরীরে।
    যেমন ধরি এই ছড়াটি,
    ঘুমপাড়ানি মাসীপিসি মোদের বাড়ি এসো,
    খাট নেই, পালঙ্ক নাই, চৌকি পেতে বসো,
    বাটাভরা পান দেব গাল ভরে খেয়ো,
    শানবাঁধানো ঘাট দেবো বেসম মেখে যেয়ো,
    আম কাঁঠালের বাগান দেব ছায়ায় ছায়ায় যাবে,
    চার বেহারা সাথে দেব কাঁধে করে নেবে,
    দুই বাঁদী সাথে দেব পায়ে তেল দেবে।
    উড়কি ধানের মুড়কি দেব, নারাঙ্গি ধানের খই,
    গাছপাকা রম্ভা দেব, পাতিল ভরা দই।।
    এটিই আবার কোথাও ভাষায় পরিবর্তিত হয়ে অন্য রূপে, অথচ মূল অর্থ প্রায় একই –
    নিদ্রালি মাইয়ো রে আমার বাটিত আইও,
    উঠানেত শঙখনদী পা পাখাইলা যাইও,
    হাতিনাতে কানির বোচকা পা মুছিয়া যাইও,
    বাড়ির পিছে কচুপাতা মাথত তৈকা দিয়ো,
    গাল ভরি গুয়া দিবাম, বাটা ভরি পান,
    ডাইল দিতাম, চাউল দিতাম,
    সরু সুতার থান,
    পাকনা কাঁঠাল ভাইঙ্গা দিতাম ডালে বইস্যা খাইও,
    পোলার চক্ষে নিদ্রা নাই, নিদ থুইয়া যাইও।।
    অর্থ্যাৎ কিনা দামাল ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর জন্যই যত সাধ্য সাধন। তার জন্য যেন এক ঐন্দ্রজালিক বাতাবরণের সৃষ্টি করা শব্দের মাধ্যমে। ঘুমের ঘোর ছড়িয়ে দেওয়া নানা পরিচর্যার আয়োজনে।। নিদ্রা দেবী যেন মাসি পিসির রূপ ধারণ করে আবির্ভূতা।।
    আয় রে আয় হুমো,
    দিব তুষের ধূমো,
    খোকন রে নিয়ে ঘুমো,
    আয় রে পাখি লেজঝোলা,
    খেতে দেব দুধকলা,
    খোকন সোনার চোখের উপর
    ঘুমের বাতাস দে দোলা।।
    কল্পনার শব্দচয়ন কি অক্ষর জ্ঞানের ধার ধারে, নাকি ছন্দের গতির উন্মুক্ততা তাকে আটকে রাখতে পারে।।
    প্রশ্ন মেশানো তেঁতুল বিচির কিংবা পাথর কুচি নিয়ে মেয়েলি গুন্তি খেলার ছড়াতেও সেই ছন্দের সৌকুমার্য।।
    জোড় না বিজোড়,
    না ফাক্কা না ফুক্কা?
    ইচিং বিচিং চিচিং চা,
    প্রজাপতি উড়ে যা।
    মুঠায় রাখা কি,
    ঝন ঝন ঝন গুনে বলো
    কটি তেঁতুল বিচি?
    এলের পাত, বেলের পাত,
    মধ্যে ঠুঁটোজগন্নাথ,
    বলো দেখি চাঁদ বদনী,
    ভরা নাকি শূন্য হাত।।
    এসবই কিন্তু এক অনাবিল ছড়াযাপন। তাহলে কি বলা যেতে পারে ছন্দসৃষ্টির মধ্যেই এক অক্ষরজ্ঞানহীন শ্রেণীর এক অপূর্ব কাব্যিক অনুসঙ্গ যা কল্পনার মাধ্যমে পাখা মেলেছে উন্মুক্ত চরাচরে। সেই বিস্মৃত কবিদের গভীর কল্পনার ফসল গুলি ছড়িয়ে রয়ে গেছে নামহীন রচয়িতাদের সৃষ্টিকর্মের অমৃত অবয়বে।।
    চিঁড়া বলো, মুড়ি বলো, ভাতের বাড়া নাই,
    মাসি বলো পিসি বলো মায়ের বাড়া নাই,
    কিসের মাসী, কিসের পিসি, কিসের বৃন্দাবন,
    মরা গাছে ফুল ফুটেছে, মা যে বড় ধন।
    মা নাই যার, না নাই তার।
    হাটে বাটে ঘুরে এলাম, ঘাটে নাই নাও।
    বনে জনে ঘুরে এলাম, ঘরে নাই মা’ও।
    অশথ ছায়াই ছায়া, মায়ের মায়াই মায়া।
    মায়ের চেয়ে দরদ বেশি, তারে বলি ডান,
    অধিক চুনে জিভ পোড়ে খাইতে গিয়ে পান
    যতই বলো কালো কালো,
    যার ছা তার মায়ের ভালো।।
    এ যেন সন্তান আঁকড়ে লেখা মায়ের ছড়া। ছত্রে ছত্রে সরল অসূয়া, সরল মমতা।।
    শুধু কি সংসার নির্বাহ, ছড়ায় কি ছড়ানো নেই রাজনৈতিক শক্ত কঠিন বেদনার পাথর ছন্দের বাথানে?
    সেই দেশভাগের উপর বিখ্যাত ছড়াটি অন্নদা শঙ্কর রায়ের লেখা..
    তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর পরে রাগ করো,
    আর তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো, তার বেলা।
    ভাঙছো প্রদেশ, ভাঙছো জেলা, জমিজমা ঘরবাড়ি,
    পাটের আড়ত, ধানের গোলা,
    কারখানা আর রেলগাড়ি।
    চায়ের বাগান, কয়লাখনি,
    কলেজ থানা, আপিস ঘর,
    চেয়ার টেবিল দেয়াল ঘড়ি,
    পিয়ন পুলিশ প্রফেসর,
    যুদ্ধ জাহাজ, জঙ্গি মোটর,
    কামান বিমান অশ্ব উট,
    ভাঙাভাঙির, ভাগাভাগির চলছে যেন হরির লুট….

    চলবে


    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •