গল্পেরা জোনাকি -তে অনিন্দিতা মিত্র

    0
    35
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    তবু ছুঁয়ে থাকা

    অলস ঘুম ঘুম বিকেল। ঘড়ি বলছে সাড়ে চারটে বাজে। বারান্দায় এসে দাঁড়ালো রূপাঞ্জলি। চারদিকে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা! সজলের সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেল প্রায় বছর খানেক, মা বাবাও নেই। সবে ধন নীলমণি একমাত্র দাদা প্রবুদ্ধও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চলে গেল না ফেরার দেশে। বৌদি রাহি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, একমাত্র মেয়ে পিয়াসাকে নিয়ে চেন্নাইতে থাকে, কথাবার্তা, যাতায়াত সবই আছে। রূপাঞ্জলি কলকাতার ফ্ল্যাটের মায়া ত্যাগ করে এসে উঠেছে বাবার করে যাওয়া শান্তিনিকেতনের সীমান্তপল্লীর বাড়িতে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার পর রূপাঞ্জলির বাবা এই বাড়িটি করেন, এই বাড়ির প্রতিটি ইঁট পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুজন বসুর ভালোবাসা। জীবনের শেষের সময়টা তিনি এখানেই কাটান। আজ বিকেলটা একদম অন্যরকম। মেঘের পরে জমছে মেঘ। কয়েক ঘণ্টা আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। শান্তিনিকেতনের বৃষ্টির নিজস্ব রূপ আছে, দূর থেকে আসতে আসতে কখন যে বৃষ্টির জলধারা ভিজিয়ে চলে যায় বোঝা যায় না। দূরে দেখা যাচ্ছে বকুল বিছানো লাল কাঁকুড়ে পথ । রূপাঞ্জলি ওরফে রূপ ভাবলো একটু ঘুরে আসি। ঘরে গিয়ে চুল আঁচড়ে, কালো টিপ পরলো রূপ। আয়নায় অনেক কাল পর নিজের মুখ ভালো করে দেখলো রূপ, ত্রিকোণ মুখে লেগেছে সুখ-দুঃখের আলোছায়া। ” দিদি কোথায় চললে? ফিরবে কখন?” ” ফিরে আসবো, তুমি চা খেয়ে নাও। ” ” করে দেবো? খেয়ে যাও।” ” না গো। ভালো লাগছে না এখন।” মীনাদি বোস বাড়ির বহুদিনের বিশ্বস্ত লোক। রূপাঞ্জলি মীনাদি বলতে অজ্ঞান। সুজনবাবু মারা যাবার পরেও মীনা এই বাড়ি ছেড়ে যায়নি। নিজের বাড়ি কাছেই। ” আসি মীনাদি, আসি গো।” ঘড়ি পরতে পরতে বেরিয়ে গেল রূপ। মীনা মনে মনে বললো, ” যাক, মেয়েটা একটু ঘুরে আসুক। কম ঝড় তো গেল না রূপের ওপর দিয়ে। শোক, বিচ্ছেদ, বিশ্বাসঘাতকতা সব একা একা সহ্য করেছে মেয়েটা। ” পায়ে পায়ে হাঁটতে শুরু করলো রূপ, বৃষ্টিভেজা হাওয়া ছুঁলো রূপের কপাল আর চুল। কোথা থেকে ভেসে আসছে, ” আমাদের শান্তিনিকেতন আমাদের সব হতে আপন।…………।” সত্যিই শান্তিনিকেতন আরামের নিকেতন, ইউরোপের রাজ্য থেকে যখন একরাশ হতাশা আর যন্ত্রণা নিয়ে রূপ এখানে এলো, গোটা পৃথিবী আত্মীয়স্বজন সবাই মুখ ফেরালেও শান্তিনিকেতন ফেরাইনি। বুক দিয়ে আগলে রেখেছে বহু অসহনীয় উত্তাপ থেকে। রূপাঞ্জলি যখন কোপাই নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছলো তখন গোধূলির রঙ পড়েছে নদীর জলে। কালো মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে স্বপ্নের রোদ্দুর। একদল ছেলে জলকেলি করছে নদীতে , কৈশোরের চঞ্চলতা ভেঙে দিচ্ছে চারপাশের নিস্তব্ধতাকে। নদীর স্বচ্ছ জলে পরম আনন্দে খেলে বেড়াচ্ছে পেখমী মাছ। নদীর হাওয়া খাওয়ার পর রূপ রওনা দিল খোয়াইয়ের পথে। এখন সেই মেঠো রাস্তা আর নেই, কালো পিচের রাস্তা দেখলে ফেলে আসা দিনের কথা খুব মনে পড়ে রূপের। ভোরের শিশিরের মতো টুপটাপ ঝরে পড়তে চায় স্মৃতিগুলো। ক্লাসের পর অনেক সময়ই বন্ধুদের সঙ্গে এখানে আসা হত, শত শত না বলা কথার সাক্ষী হয়ে আছে এই জঙ্গল, গাছেরা। হিমঝুরি আর সোনাঝুরির জঙ্গল বৃষ্টির জলে স্নান করে মোলায়েম সবুজ হয়েছে। একটা গাছের গুঁড়ির সামনে বসলো রূপ, খোয়াইয়ের জঙ্গলের মধ্যে কলকল শব্দে বইছে ছোট্ট ঝোরা, নাকে আসছে মাটির গন্ধ। হাট প্রায় ভেঙে গেছে। ক্লান্ত মুখে সবাই হাঁটছে ঘরের মুখে। দুটো ছেলেমেয়ে হেসে হেসে খুনসুটি করছে, মেয়েটির গালে এসে পড়েছে বিদায়ী রোদ্দুরের ক্ষীণ আভা। ছেলেটি হঠাৎ চুমু খেল মেয়েটির ঠোঁটে, আড়ষ্টতার সব আড়াল গেল ভেঙে। হাত ধরাধরি করে দুজনে হারিয়ে গেল জঙ্গলের বাঁকে। ধুলোবালিতে খানিক ডুবে দুটো বাঁশপাতি পাখি উড়ে গেল আকাশের মধ্যে। খুব মনে পড়ছে অয়ন, শোভন,জলি,অঞ্জলি, সুমনদের কথা। সবাই এখন সবার থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে। রূপ ভাবলো, “উঠি এবার। ছাতা নিয়ে বেরোয়নি , ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলে মুশকিল।” তবে আকাশ এখন বেশ পরিস্কার। হাঁটতে হাঁটতে বিশ্বভারতীর ক্যাম্পাসে ঢুকলো রূপ, কিছুটা নীরবতা চারদিকে। মাঝে মাঝে কানে আসছে ছাত্রছাত্রীদের টুকটাক বাক্যালাপ। ঘন্টাতলায় একদল বসে গান ধরেছে,” কুসুমে কুসুমে চরণ চিহ্ন দিয়ে যাও……বাঁশরির ডাকে কুঁড়ি ধরে শাখে…..” গুলঞ্চ গাছে থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে, রূপের মনে পড়ছে অতীতের কথা। শান্তিনিকেতনের ফুলের কাজ আর সাজ দুইই জগত বিখ্যাত। ঝরে যাওয়া গুলঞ্চ দিয়ে যে কতবার সে নিজের খোঁপা সাজিয়েছে, তা গুণে শেষ করা যাবে না। একজন চাইনিজ মেয়ে ইজেল আর ব্রাশ আঁকছে আম্রকুঞ্জে বসে। লাল,নীল, সব রঙ মিলেমিশে হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তের রূপকথা। এটাই শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য, অহংকার, কৃত্রিমতাকে দূরে ঠেলে শান্তিনিকেতন যা কিছু নিখাদ, সেটাকেই আপন করে নিতে জানে। একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে কিছুক্ষণ ছিল রূপ। ঝুপ করে কখন যে সন্ধে নেমে গেছে বুঝতে পারেনি সে। বাড়ির দিকে রওনা হলো রূপ। ঘরে গিয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালো রূপ। দূরের কোনো আখড়া থেকে ভেসে আসছে বাউলের গান, এখানে মাঝ রাতেও শোনা যায় বাউলের গান। ” দিদি, ফোন নিয়ে যাওনি? তোমার বন্ধু নূপুরদিদি ফোন করেছিল। আমাকে বললো তোমাকে বলতে। ফোন করো।” ” ওহ্, একদম ভুলে গিয়েছিলাম ফোন নিয়ে যেতে। আমি নূপুরকে করছি।” “একটু টিভি দেখছি দিদি। খাবে যখন বলো।” ” হুম,তুমি যাও।” নুপূরের নাম শুনে রূপের চোখেমুখে খেলে গেল হাসির ঝিলিক। সেই কবেকার বন্ধুত্ব! সময়ের চাপে এখনও ম্লান হয়ে যায়নি। সবসময় কথা বলতে না পারলেও বন্ধুত্ব অটুট আছে। নুপূর চাকরি করে, সিঙ্গল ওম্যান, চুটিয়ে জীবন উপভোগ করছে। ” হ্যালো নূপুর।” ওপার থেকে জবাব এল” আমি ভীষণ রেগে গেছি। কতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি বল তো! শোন এখনও অফিস থেকে বাড়ি যাইনি। তবুও বলেই ফেলি। সামনে বেশ কিছুদিন আমার ছুটি আছে, চলে আয় কলকাতায়। তোর সঙ্গে একটু সময় কাটাতে চাই ডার্লিং। কোনো না শুনতেই চাই না। আসবি আমার বাড়িতে ব্যাস।” পলকের জন্য থেমে গেল রূপ। ইতালি থেকে সব মিটিয়ে মাত্র মাস কয়েক কলকাতায় ছিল রূপ। তারপর সেই যে কলকাতার মায়া ত্যাগ করে শান্তিনিকেতনে এসেছে আর কোনো মুখো হয়নি সে। ” দাঁড়া দেখি কোনো কাজ আছে কিনা। কাল বলবো। তুই তো সব জানিস। কলকাতায় গেলে মাসিদের নানা প্রশ্ন, উত্তর দিতে দিতে আমি ক্লান্ত। ভাবছি আবার আঁকার কাজকর্ম শুরু করবো। আমার আর এসব ভালো লাগে না নূপুর। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজেদের ইচ্ছেতে আলাদা থাকছে ,তাতে লোকজনের এত মাথাব্যথা কেন বুঝি না। ” ” তুই কিছু মানুষের কথার ভয়ে কুঁকড়ে কুঁকড়ে থাকবি, নিজের স্বাভাবিক জীবন অস্বাভাবিক করবি? তোর জীবন, তুই যা বুঝেছিস করেছিস। তোর জন্য কেউ ভাবে? সজল একটা খবর নেয়? একটা সম্পর্কে সব দায় দুজনেরই। তোর একার নয়। তুই নিজেকে কষ্ট দিবি কেন? জানি মুখে বলা সোজা, তবু বলছি নিজেকে একটু একটু করে বোঝা, স্বাভাবিক ছন্দে ফের। তোর ব্যক্তিগত বিষয় একান্ত তোরই। ” ” আচ্ছা ডার্লিং কাল বুধবার তো? কাল যদি ভোরে যাই তোর অসুবিধা হবে না তো?” ” আরে অসুবিধা হবে কেন? মিনতি মাসি থাকবে, তোকে সারাটা দিন একা থাকতে হবে। মা বাবা দিল্লিতে, দিদির কাছে। কাল সারাদিন অফিসে সাংঘাতিক কাজ, তুই চলে আয়। রাত আটটার পর থেকে তোর সঙ্গে থাকবো।” ” আমি কাল খুব ভোরে বেরোনোর চেষ্টা করছি। জেনারেলে টিকিট কেটেই যাবো।” ” এই তো, সোনা মেয়ে আমার, লাভ ইউ, দেখা হচ্ছে।” ফোন রেখে দিল রূপ। এই সময়টা ভীষণ একা লাগে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ট্যুইটার কিছুই ভালো লাগে না। বিষাদের কুয়াশায় কুঁকড়ে যায় ভেতরটা। বুকসেল্ফ খুলে রূপ হাতে নিল একটা গল্পের বই, চোখ চলে গেল একটা কবিতার বইয়ের দিকে। উদীয়মান কবি ঋত্বিক কুণ্ডুর কবিতার বই হাতে তুলে নিল রূপ। ঋত্বিক অসাধারণ কবিতা লেখেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঋত্বিকের কিছু কিছু টুকটাক লেখা পড়ে রূপ। সম্প্রতি কবি কবিতার বই ‘ফিরে আসা’ ভানুসিংহ স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন। এই বইটির নাম ‘গোধূলির মুখোমুখি’। বইটির পাতায় ডুবে যেতে লাগলো রূপ। ” তারপর!! তারপর নেমে আসুক ঘুমন্ত বিকেল, কুমারী মেঘ চোখ মেলে চেয়ে থাকুক অনাগত প্রত্যাশার পানে, হতে চাই স্মৃতির মুখোমুখি, আধভেজা অভিমান ভেসে যাক দুঃখের সরলরেখা বেয়ে। ” ” উফ্ অপূর্ব লেখেন ঋত্বিক! কবির লেখা পড়লেই এক আলতো ভালোলাগা ছুঁয়ে যায় মনকে, অদ্ভুত অনুভূতি। ” নিজের মনের সঙ্গে কয়েক দণ্ড কথা বললো রূপ, তারপর ট্যাব খুলে দেখলো ঋত্বিকের কবিতার পেজ। আজ কয়েকটি লাইন আপলোড করেছেন কবি। ” গভীর নিশায় তবে সত্য হোক ভালোলাগা, নির্জন অবেলার ধুলো কুড়িয়ে উড়ে যাক সহস্র বছরের জমা ক্ষোভ। নিষিদ্ধ নগরীর দেওয়ালে বিমূর্ত ভাবনার নগ্ন মুখ, সভ্যতার বৈভব পেরিয়ে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে রডোডেনড্রনের দেশে। ” খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো রূপ আপন মনে, ওঁর লেখা পড়লে মনে হয় সব কথা হারিয়ে গেছে শূন্যের বাঁকে। রাত আর দিন সব এক হয়ে সব মিশে গেছে নির্জনতার অচেতন গহ্বরে। পরদিন খুব সকাল সকাল বেরিয়ে গেল রূপ, ভোরের ট্রেন সাধারণত ফাঁকা থাকে। সময়টা আলো আর আঁধারের মাঝামাঝি, কানে আসছে পাখির কলতান। সাড়ে পাঁচটায় স্টেশন প্রায় ফাঁকা। একটা ট্রেন আসার কথা। সবকিছুর মধ্যেও নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ লাগে রূপের, সবের মধ্যেও যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা তাড়িয়ে বেড়ায়, স্থির থাকতে পারা যায় না। মন খুব খারাপ করে, মনে হয় জীবনে কিছুই করা হলো না ,পাশেও কেউ ……” ট্রেন এসে গেছে, নরম রোদ্দুর ক্রমশ উপচে পড়ছে। জানলার ধারে জায়গা পেল রূপ। ট্রেন চলতে শুরু করেছে। ” সব লোকে কয় লালন ……” দুজন বোষ্টম বোষ্টমী গাইছে, বোষ্টমী অন্ধ আর বোষ্টমের একটি পা নেই, সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে দুজনে গানে মেতে আছে। ” মা দুটো পয়সা দাও।” – বুকটা হঠাৎ যেন কেমন করে উঠলো, মনে হলো জীবনটাতে কোনো মানুষের পাশে দাঁড়ানো হলো না, যদি কোনো উপায়ে একটু কিছু করা যেত? ট্রেন চলছে, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ খেত আর লাল কাঁকুড়ে পথ পেরিয়ে এগিয়ে চলছে ট্রেন। রূপ যখন নূপুরের বাড়িতে গেল তখন বেলা বারোটা বেজে গেছে। নূপুর যথারীতি নেই। কৃষ্ণা মাসি রান্না করে দিল। ভাতঘুম নষ্ট হয়ে গেল নুপূরের উল্লাসে। সেই একইরকম আছে নূপুর,সেই মিষ্টি হাসি ছেয়ে আছে মুখে। দেখা মাত্রই রূপকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে লাগলো নুপূর। ” কতকাল পর তোকে দেখলাম রূপ! রোগা হয়েছিস বেশ। তোর জন্য আগেই চলে এলাম ছুটি করে। চল একটু ঘুরতে যাই। একেবারে এসে চেঞ্জ করবো। তুই পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নেয়। ” সিটি সেন্টারে গিয়ে রূপ বললো, ” নূপুর একটু স্টারমার্কসে যাই বই কিনতে হবে রে! ” ” উফ্ এখানেও বই!” ” হুম রে। তুই চল না আমার সঙ্গে।” বইয়ের দোকানে হালকা ভিড়, কিছুজন একজন কাউকে ঘিরে আছে। হঠাৎ একজনের চিৎকার “ঋত্বিক কুণ্ডু না?” মূহুর্তে বিস্ময়ের চরম বিন্দুতে পৌঁছে গেল রূপ। নূপুর বললো ” ওই দেখ রূপ তোর প্রিয় কবি ঋত্বিক!” ” হুম দেখলাম। সত্যি এই সময়ের অন্যতম সেরা কবি হলেন ঋত্বিক। শুনছি একটি উপন্যাস “অগোছালো কবিতা” নিয়মিত শনিবারের চিঠিতে বেরোচ্ছে, আমার পড়া হচ্ছে না যদিও, দেখি জোগাড় করবো।” “রূপ, তুই একটা খবর জানিস? আমি শুনলাম কানাঘুঁষো। কবি ঋত্বিকের কিডনির সমস্যা ধরা পড়েছে, সম্ভবত ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হবে। ” মুহূর্তে কথাটা তিরের মতো বিঁধলো রূপের বুকে। এক মিনিট চুপ থেকে রূপ বললো, ” এই দুঃসংবাদ পাইনি রে! মুখে কোনো কথা আসছে না। এবার চল বাড়ি।” অনেক কাল পর নূপুরের সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটলো রূপের, অনেক দিনের জমে থাকা কথা, ব্যথা দুজনে দুজনকে বললো। রাতে যখন রূপ শুতে গেল তখন রাত প্রায় বারোটা। বিছানা গোছাতে গোছাতে হঠাৎ চোখ পড়লো খবরের কাগজে। একটা ছোট্ট বিজ্ঞাপন, ঋত্বিক কুণ্ডুর ছবি, তাতে লেখকের জন্য কিডনির ডোনার চাওয়া হয়েছে। ” তাহলে নূপুর ঠিক বলেছে!” মনে মনে বিড়বিড় করলো রূপ। বিজ্ঞাপনের তলায় ফোন নাম্বার আছে, রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ। হঠাৎ মনের গোপন ঘরে খেলে গেল অদ্ভুত এক ভাবনা, ” আমি দিতে পারি না? সংসার, মা বাবা কোনো দায়িত্ব কিছুই তো নেই আমার। আমার একটা কিডনিতে যদি কবির জীবন বাঁচে, বাঁচুক। আমার থেকে কবিকে সমাজের বেশি দরকার। সমাজের সব গরল পান করে সৃষ্টিশীল মানুষ সমাজকে অমৃত দেন। যদি কোনো অবস্থাতে আমি চলে যাই , আমি থেকে যাবো কবির শরীরে। নাহ্ ফোন করি। এখানে তো লেখা আছে রাত আটটার পর । কোনো নির্দিষ্ট সময় বলা নেই। দেখি করে।” ফোন করলো রূপ,বেজে গেল ফোন। খানিক পরে আবার বেজে উঠলো রূপের ফোন। ওপার থেকে গম্ভীর গলার আওয়াজ “কে বলছেন?” ” আমি রূপাঞ্জলি বলেছিলাম, একটু কথা ছিল। আজকের কাগজে একটি বিজ্ঞাপন ……….” ” আমি ঋত্বিক কুণ্ডু বলছি, আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বিজ্ঞাপন দিয়েছি। আশা করি বিজ্ঞাপন পড়েছেন। ডোনার কে? আপনিই না অন্য কেউ?” কিছুটা থমকে উত্তর দিল রূপ। ” আমি দিতে চাই।” ” দেখুন, আমার আপনার সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার। কাল একটু কোথাও আসতে পারবেন। নিরিবিলি জায়গায় বসে কথা বলতে চাই। ধরুন আপনাকে যদি কাল সকাল দশটায় মধুবন মার্কেটের সামনে দাঁড়াতে বলি ?” ” পারবো।” ” ওকে। আসবেন তাহলে কথা হবে। গুডনাইট।” ফোন রেখে একফালি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো রূপাঞ্জলি। লাল,কমলা রঙের ক্যাকটাস ফুলের দল ফুটে আছে ছোট ছোট টবে। কালো আকাশের কোলে নক্ষত্রের মিছিল। কয়েকটি ঘরে জ্বলছে নিবু নিবু আলো। শান্ত পৃথিবী, ছোট ছোট দৈনন্দিন ঘটনাপ্রবাহ চলছে নিজস্ব গতিতে। রাতের দীপ নিভে জ্বলে উঠলো দিনের আলো। সকাল দশটার যখন রূপ গেল তখন ঋত্বিক এসে গেছেন। রূপ পরেছে লাল রঙের কুর্তি আর আকাশি নীল জিন্স, আসার সময় কবির জন্য কিনেছে জলভেজা চন্দ্রমল্লিকার একটা তোড়া। কবির চোখেমুখে পড়ন্ত যৌবনের ছাপ, এলোমেলো রুক্ষ্ম সাদাকালো চুল,পরনে নীল জিন্স আর ছাপা সুতির শার্ট। রূপের চিনতে অসুবিধা হলো না। নিজেই এগিয়ে গেল সে। ” হ্যালো, আপনিই তো কবি ঋত্বিক কুণ্ডু? আমি রূপাঞ্জলি, কাল ফোনে কথা হলো। নমস্কার। ” টুকরো কথা বলে রূপাঞ্জলি চন্দ্রমল্লিকার তোড়া দিল কবির হাতে। ” ওহ্। অনেক ধন্যবাদ। প্লিজ, চলুন। আমি একজন পাবলিশার্সের সঙ্গে কথা বলছিলাম, হয়ে গেছে। চলুন বসা যাক।” মধুবন মার্কেটে একটা ছোট্ট ক্যাফে মৌসম, সেখানেই বসলো দুজনে। রূপ কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো কবির দিকে, কবির বয়স চল্লিশের আশেপাশে হবে। ” কফি খাবেন ম্যাডাম?” ” নাহ্। ” ” আসলে কিছু না নিলে হয়তো এখানে বসতে দেবে না। আমার অনেক কিছু খাওয়া বারণ আছে। চা,কফিতেও নিষেধাজ্ঞা আছে। যাইহোক ……আপনাকে চিনি না, তবুও কিছু প্রশ্ন করতেই হবে।” ” আমি আপনাকে চিনি। আপনার লেখা আপনাকে চিনিয়েছে। আমি আপনার কবিতা অনান্য লেখার নিয়মিত পাঠক। ঝরা কুয়াশায় ঝরে যায় অশরীরী আক্ষেপ, জেগে থাকে পূর্ণিমার চাঁদ, বুকে তার বয়ে চলে প্রবল বাসনার রক্তক্ষরণের অবিরাম ধারা।” কিছুটা থেমে ঋত্বিক বললেন, ” নির্জনতার সীমাহীন গহ্বরে তলিয়ে যায় মৃত বিশ্বাস, অবিশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে শুধুই নিরন্তর দীর্ঘশ্বাস। আপনার বেশ চর্চা আছে বলে মনে হচ্ছে, কবিতা লেখেন অথবা পাঠ করেন?” ” নাহ্, আমি লিখি না, পাঠও করি না। তবে পড়তে খুব ভালোবাসি। আপনি ভীষণ ভালো লেখেন। ” হাসির রূপালী রেখা দেখা গেল ঋত্বিকের চোখেমুখে। “আপনারাই আমার শক্তি, পাঠকদের শুভেচ্ছাই আমার লেখক জীবনের পরম সম্পদ। জীবন, লেখা সব তো চলছিল, এই অসুখ আমার জীবনে ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে নেমে এলো। মাঝেমধ্যে খুব দিশেহারা লাগে। ডাক্তার এখন বলছেন একটা ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতেই হবে, ডায়ালিসিস করে আর কতদিন! বোন আর বোনের বর অরিত্র আছে বলেই চালানো যাচ্ছে। নিজের সংস্থান খুব আহামরি কিছু নয়। লিখে আর কত রোজগার হয়? গান লিখি বলেই …….” ” ওহ্ আপনি গান লেখেন?জানা ছিল না। ” ” যাইহোক ম্যাডাম কাজের কথায় আসি। কিছু মনে করবেন না, একটা প্রশ্ন করতে পারি? প্রথম আলাপেই এসব জিজ্ঞেস করা উচিত নয়, তবু অনুমতি চেয়ে নিয়ে বলছি। ” আপনি যখন এই বিষয়ে আগ্রহী, তখন ঝুঁকির কথা নিশ্চয়ই জানেন, হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত? আমি জিজ্ঞেস করতাম না, তবুও ভাবলাম করি। আপনার বয়েস এমন কিছু হয়নি, জীবনের এখনও একটা উজ্জ্বল অধ্যায় পড়ে আছে, জেনেশুনে এই পথে পা বাড়াচ্ছেন কেন? পরে অনুশোচনা হবে না তো? এখনও ভাবুন। সময় নিন। তারপর ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলা যাবে।” ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলল রূপ।” “জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায় আমার? ” বিদ্রূপের হাসি হাসলো রূপ। ” এখন আমি জীবনের ওপর রাগ করি না, তাকে তার পথে চলতে দিই। হঠাৎ কিছু করার ইচ্ছে হলে করি । আগে সফলতা আর ব্যর্থতার অঙ্কের হিসেব কষতাম, এখন কষি না। আমি ভেবেচিন্তে বলেছি। নিজেকে নিয়ে তো এতদিন ভাবলাম, পরিস্থিতির কাছে হার মানতেই হয়েছে, আটকাতে পারিনি মা বাবা ও দাদার চলে যাওয়া, সম্পর্ক ভেঙেছে সজলের সঙ্গে……… কিছু সময় আমাদের নির্বাক দর্শকের ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়, জীবন সত্যিই রঙ্গমঞ্চ।” কথাগুলো বলতে বলতে থেমে গেল প, গলা কান্নায় বুজে আসছে। ” আপনি ঠিক আছেন তো?” ” হুম।” ” সজল……” ঋত্বিকের কিছু বলার আগেই কথা কেড়ে নিল রূপ। ” সজলের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল। ” আপনার মনে হতেই পারে একজন মহিলা অচেনা অজানা একজন পুরুষকে নিজের একান্তই নিজের কথা বলছে কেন? জীবনটা এখন আমার কাছে একেবারে উন্মুক্ত খোলা খাতার মতো, গোপন করার কিছু নেই। আপনার যদি কোনো উপকার হয়, তবে হোক। মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত আগেও এই অনুভূতি থাকবে যে একটু হলেও পৃথিবীর কাজে জীবনটা লেগেছে। আর যদি মরে যাই তখন একজনের শরীরে তো থেকে যাবে শেষ চিহ্ন…………” থমকে গেলেন ঋত্বিক, এই বয়সে এত গভীর জীবনবোধ!” আমার বাবা একটি কলেজে পড়াতেন। স্কুল জীবনে থেকেছি কলকাতায়। নূপুরের সঙ্গে আমার স্কুলেই বন্ধুত্ব, এখন ওর কাছেই এসেছি। তারপর চলে যাই পড়তে বিশ্বভারতীতে। বিশ্বভারতী থেকে আঁকা নিয়ে পড়াশোনা করি। বাবাও রিটায়ার করার পর শান্তিনিকেতনে বাড়ি করে। স্নাতক স্তরের পড়াশোনা কমপ্লিট করে একটি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পাই। হঠাৎ মায়ের মৃত্যু হয়, দাদা কাজের সূত্রে বাইরে থাকায় বাবা খুব ভেঙে পড়ে। বাবার বন্ধুর ছেলের সঙ্গে বিয়ে স্থির হয়। আমি চাকরি ছাড়তে হবে দেখে একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হই। আমাদের সমাজে মেয়েরা নিজেদের কথা ভাবার কতটাই বা অবকাশ পায়? সবার মন রাখতে রাখতেই জীবন কেটে যায়। সজল ইতালির একটি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করতো, এখনও আছে। দুচোখ জুড়ে গ্রাস করতে থাকে মোলায়েম জীবনযাত্রা নির্বাহ করার জলছবি। ক্রমশ আগ্রহ কমতে থাকে নিজের পায়ের তলার মাটি সম্পর্কে । চোখের সামনে ভাসতে থাকে ইউরোপের বরফের রাজ্য, টিউলিপের রকমারি বাগান, ভেনিসের গণ্ডোলার দৃশ্য। কিছু বন্ধু উসকানি দেয়, অনেকেই বলে যে কটা টাকার জন্য এখানে পড়ে থাকার দরকার নেই। আজ বুঝি নিজের আইডেন্টিটির সঙ্গে আপোস করার ফল কতটা মারাত্মক হতে পারে। সেইসব বন্ধুরা কেউ আমার পাশে নেই, আজ সম্পূর্ণ একা লড়ছি। ভেবে দেখতে বলেছিল একমাত্র নূপুর, সে আজ পাশে আছে। বিয়ের পরেই চলে যাই ইতালি। কিছুদিন ছিলাম ঘোরের মধ্যে, নতুন শহর, নতুন জীবন, সবকিছু কেতাদুরস্ত, সাজানো। কিছুদিনের মধ্যেই রূপকথার ঘোর কেটে গেল। বিয়ের পর থেকেই দেখতাম সজলের মধ্যে একটা অদ্ভুত নিস্পৃহ ভাব, মনে হচ্ছিল আমি যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। আমার ভাবনায় ভুল ছিল, ভেবেছিলাম আস্তে আস্তে পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে। যখন আসল সত্যি জানতে পারলাম তখন…….” দীর্ঘশ্বাস ফেলল রূপ। ” এত চাপ নিচ্ছেন কেন ? আপনার কিছু অতি ব্যক্তিগত বিষয় থাকাতেই পারে, আমি শুধু জানতে চাইলাম এই সিদ্ধান্তে এলেন কেন ? পরে আপনার অনুশোচনা হলে আমার অনুতাপের সীমা থাকবে না। ” ” আমার আর গোপন করার কিছু নেই, আমি একদিন সজলকে ওর কলিগ মাইকেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখি, সজল হোমোসেক্সুয়াল, ও হেটারোসেক্সুয়াল সম্পর্কে বিশ্বাস করে না। আমি দুঃখ পাইনি, প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে পছন্দমতো জীবন চালানোর। কষ্ট এটা ভেবেই পেলাম যে আমাকে কেন জড়ালো? সব দোষের দাগ লাগলো আমার গায়ে, মেয়ে তো ! মুখ বুজে সহ্য করার দায় আমার। সব হারালাম, নিজের চাকরি, স্বপ্ন। বাবাও বাঁচেননি। ফিরে এলাম ইতালি থেকে। তারপর দাদাটাও ক্যান্সারে চলে গেল ……..আপনাকে কথাগুলো সহানুভূতি কুড়োনোর জন্য বলছি না, ভেবে দেখলাম জীবন নিয়ে আর টানাহেঁচড়া করে লাভ নেই, নিজের মধ্যে যেটুকু আলো আছে ছড়িয়ে দিই। মহান হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, তবে বিলিয়ে দেওয়ার শান্তিটুকু শুষে নেওয়ায় বাসনা আছে। ” রোদ্দুরের কমলা আভা এসে পড়েছে রূপাঞ্জলির মুখে, দ্বিধা আর দ্বন্দ্বের বিরোধ ছাপিয়ে যাচ্ছে প্রসন্নতার হিমেল স্রোত। দুদিন পর …… দুদিন প্রায় কাটতে চললো, খবর দেবেন বলেছিলেন, ঋত্বিক কুণ্ডু আর যোগাযোগ করেননি। রূপাঞ্জলিরও ফেরার সময় চলে এল। রূপ ভাবলো ফোন করবে কিনা, করেনি আর। হঠাৎ চোখে পড়লো ফেসবুকে একটা পোস্ট। পোস্টে লেখা আছে কবি খুব অসুস্থ, হেরিটেজ নার্সিংহোমে ভর্তি আছেন। খবর পেয়ে ছুটে গেল রূপ। চারদিক নিস্তব্ধ, শোনা যাচ্ছে শুধু স্যালাইনের টপ- টপ শব্দ। মুখে একরাশ উদ্বেগ আর আশঙ্কা নিয়ে নার্সিংহোমের লনে পায়চারি করছে নূপুূর। নিজের নিশ্বাস আর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ একাই শুনছে নিজে। মনে মনে বলছে, ” একবারও বললি না রূপ………নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবো না …” বেরিয়ে এলেন ডাক্তারবাবু, বিনয় গাঙ্গুলী। দৌড়ে গেল নুপূর। ” ঋত্বিক কুণ্ডু হয়তো সুস্থ হবেন কিন্তু ……………..” কিছু মানুষ রয়ে যায় বিবর্ণ আলো হয়ে ।

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •