সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্তী – ৪

    0
    19
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    জাত শিক্ষক

    || ৪ ||
    শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদানের জন্য একজন শিক্ষকের কতখানি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলেন রামতনু লাহিড়ী মহাশয় | এর সমর্থনে ঘটনা শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের লেখা থেকে লিপিবদ্ধ করব | শুধুমাত্র এই ঘটনাটিই তিনি যে জাত শিক্ষক -তার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ | ” একবার একটি বালক তাঁহার প্রদত্ত কোন ব্যাখ্যার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করিল | তখন তিনি আর একবার অধিকতর বিশদরূপে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন ; যখন কৃতকার্য্য হইলেন না , তখন শিক্ষক উমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয়কে ডাকিয়া আনিলেন ; ” তুমি ক্লাসের ছেলেদিগকে ব্যাখ্যা করিয়া বুঝাইয়া দাও | ” প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখি – তখন শিক্ষিত মহলে উমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয়ের ইংরাজী -ভাষাভিজ্ঞ বলে খ্যাতি ছিল |
    অনেক পণ্ডিত মানুষও এই কাজটি করতে সঙ্কোচ বোধ করতে পারেন | ছাত্রপ্রীতি ও হৃদয়ের অসম্ভব রকমের উদারতা ছাড়া এটা সম্ভব নয় |
    টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর ইংরেজরা তাঁর বংশের আর সকল লোককে বন্দী করে কলকাতার উপকণ্ঠে রসপাগলাতে রাখার ব্যবস্থা করেন | তাদের শিক্ষার জন্য এখানে একটি বিদ্যালয় স্থাপিত হয় | সালটা ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ | এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনৈক স্কট | রামতনু লাহিড়ী এখানে দ্বিতীয় শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন |
    এখানে তিনি ভূগোল , ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে পাঠদান করতেন | তাঁর পাঠদানের রীতি পূর্বেই উল্লেখ করেছি | ছাত্রেরা তাঁর পড়া মন্ত্র মুগ্ধের মতো শুনত | তবে তিনি এটা তখনোই চাইতেন না , ছেলেরা না বুঝে কতকগুলো নিরস তথ্য শিখে যাক ; বরং তিনি এটাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন | তিনি ছাত্রদেরকে উত্তমরূপে শেখানোর মানসে নানা গল্পের অবতারণা করতেন | পরে অভিযোজন স্তরে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যামে তা ছাত্রদের কাছ থেকে জেনে নেবার চেষ্টা করতেন | কখনো কখনো এমনও দেখা গেছে কোনো উৎসাহী ছাত্রের নিকট অধিক পাঠ দানের মানসে আত্মহারা হয়ে পড়তেন | তখন আর পাঠ্যবিষয়ে মন থাকত না | পাঠ্যাতিরিক্ত পাঠে চলে যেত | ফলে পাঠ্যগ্রন্থে পাঠের উন্নতি সিলেবাসভিত্তিক না হওয়ায় কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হতেন |
    এখানে আমরা তাঁর শিক্ষাদানের কৌশলটি আর একটু পরিষ্কার করার জন্য শ্রী ক্ষেত্রমোহন বসুর একটি পত্রের সহযোগিতা নেব | আহারের পরই তিনি কক্ষনো পড়াতে শুরু করতেন না | কারণ তাঁর মতে তা স্বাস্থ্যসম্মত নয় | ক্ষেত্রমোহন বসু লিখলেন ,” আহারের পর মানসিক চিন্তা অস্বাস্থ্যকর , এই জন্য স্কুল বসিলে ছাত্রদের প্রথমে হস্তলিপি লিখিবার নিয়ম করিয়াছিলেন ; এই সঙ্গে বানান শুদ্ধির কার্য্যও হইত | ” তারপর শিক্ষার্থী কার্যাবলি | ক্ষেত্রমোহন বাবু লিখলেন , ” আধঘণ্টা লেখার পর পড়া আরম্ভ হইত | পড়ার প্রথম অঙ্গ আবৃত্তি | যতক্ষণ না উচ্চারণ শুদ্ধি ও যতিচ্চেদ ঠিক না হইত ততক্ষণ আবৃত্তি করিতে হইত | তিনি নিজে বার বার আবৃত্তি করিয়া শিখাইতে ত্রুটি করিতেন না | পাঠের অনেক অংশ তাঁহার আবৃত্তি-গুণে আমাদের বোধগম্য হইয়া যাইত | আবৃত্তির পর পাঠের ব্যাখ্যা আরম্ভ হইত | শব্দের প্রতিশব্দ বলিতে পারিলে ব্যাখ্যা হয় না | প্রথমত : সহজ ভাষায় পাঠের অর্থ বলা হইত | তাহার পর প্রশ্ন দ্বারা লেখকের ভাব ছাত্রগণের হৃদয়ঙ্গম করিবার চেষ্টা করিতেন | তাহার পর পাঠ্য বিষয়ের আনুষঙ্গিক যাহা কিছু থাকিত সে সমস্ত আলোচিত হইত | সময়ে সময়ে এত ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের তর্ক উপস্থিত হইত যে , অবশেষে চেষ্টা করিয়া স্মরণ করিতে হইত আমরা কোন্ কোন্ পথ দিয়া পর্য্যটন পূর্ব্বক পাঠ্য বিষয় হইতে এত দূরে বিচরণ করিতেছি | ” ৮
    সেই সময় কয়েকজন খ্যাতনামা প্রধান শিক্ষক ছিলেন – বারাসতে প্যারীচরণ সরকার , হুগলীতে ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় , বোয়ালিয়াতে হরগোবিন্দ সেন , হাওড়ায় ভূদেব মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি | তাঁরা পাণ্ডিত্যে হয়তো রামতনুকে ছাড়িয়ে গেলেও যেতে পারেন , কিন্তু অধ্যাপনায় রামতনুর সমক্ষ ছিলেন কি না এতে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায় | এর কারণ হিসাবে ক্ষেত্রমোহন বসু উল্লেখ করেছেন : ” ছাত্রদের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আপনাকে সর্ব্বদা শিক্ষা দিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিতেন | তিনি চিরজীবন ছাত্র ছিলেন | লোকে ধন মান লাভের জন্য যে প্রকার অধ্যবসায় ও আগ্রহ প্রকাশ করে , তিনি জীবনের উৎকর্ষ সাধনের জন্য ততোধিক করিতেন | নিরন্তন এই উদ্দেশ্যের প্রতি তাঁহার লক্ষ্য ছিল ; এবং শেষ জীবন পর্যন্ত তাঁহার এই আশার নিবৃত্তি হয় নাই | ” ৯

    (চলবে )


    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •