সাপ্তাহিক শিল্পকলায় “ভারত ও পাকিস্থানের দুই পিকাশো – ৬”- লিখেছেন আলবার্ট অশোক (পর্ব – ২১)

    0
    19
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের নারীগণ

    হোসেনের বিয়ে প্রসঙ্গে হোসেন বলেছেন,  ‘আমি যখন সিনেমার বিলবোর্ড, ব্যানার আঁকতাম, আর রাতে ফুটপাতে শুয়ে থাকতাম, (১৯৪১ সাল) তখন আমার ভাবী শ্বাশুড়ীর সাথে পরিচয় হয়েছিল। আমি যেখানটায় কাজ করতেম তার পাশের বিল্ডিংযে তিনি থাকতেন। বিধবা।তার সন্তানদের নিয়ে থাকতেন, তিনি প্রতিদিনই আমাকে দেখতেন একদিন আমন্ত্রণ করে তার বাড়িতে খাওয়াতে নিয়ে গেলেন।’ এইভাবে দেখাশুনা হয়। তার কিছুদিন পর তার মেয়ে ফাজিলাকে হোসেন বিয়ে করেন। বিয়ের আগে ফাজিলার মুখ তিনি দেখেননি কারণ সে প্রায়ই বুর্কা পরে থাকত। একটু গোঁড়া মুসলিম স্বভাবের। বিয়ের পর  সাত বছর তিনি একটি কাঠের খেলনা ও ফার্নিচারের দোকানে নকশা ও পেইন্টিঙয়ের কাজ করেন। ফাজিলা বিবির ঘোরে হুসেন ৬ টি সন্তান দিয়েছেন। এবং ফাজিলা বিবি হুসেনের উপর সংসারের কোন চাপ রাখেননি। হুসেনন ও ঘরের ও সংসারের কোন কিছু মাথায় রাখতেননা। তার সন্তানদের দায় দায়িত্ব এড়িয়ে চলেছিলেন।
    ইলা পাল, মকবুলের এক বান্ধবী ও ছবির ছাত্রী, তার ছোট্ট শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে মকবুল তাকে দেখতে যান সেই হাসপাতালে। ঘটনাক্রমে পাকীজা সিনেমার নায়িকা মীনাকুমারীও সেই হাসপাতালে অসুস্থ হয়ে ভর্তি ছিলেন। মকবুলের গলার আওয়াজটা অনেক মহিলার কাছেই আকর্ষনীয়। তার গলার আওয়াজে আর চেহারায় মীনা কুমারী মুগ্ধ হয়ে তার সাথে কথা বলেন ও পান খেতে দেন। মকবুল মীনা কুমারীর হাতের পান নিলেন যা বলেছেন সব কথার জন্য মাথা নাড়িয়েছেন। কিন্তু কোন কথা বলতে পারেননি। খুবই লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। পরবর্তী জীবনে ইলা পাল হোসেনের উপর একটা বই (‘Husain: Portrait of an artist’ )লিখেছেন ও ঘটনাটা বর্ণনা করেছেন। ইলা পাল জিজ্ঞেস করেছিলেন, সুযোগ থাকা সত্বেও তিনি কেন কথা বলেননি। হোসেন উত্তর করেছিলেন,’ তিনি এমন করে আমার চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন আমি কথা বলার শক্তি হারয়ে ফেলেছিলাম (kambakht ne is andaaz se meri taraf dekha, meri to zabaan hi kat gai! )  সূত্রঃ নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। মীনা কুমারীর তখন সবার সাথে বিচ্ছিন্ন। তার প্রেমিক জীবন বিরহ পূর্ণ। মীনা কুমারীর ভাল নাম মেহজাবীন বানু (Mahjabeen Bano) ডাকনাম মুন্না। জন্ম ১৯৩৩ সালে।
     ১৯৫৫ সালে, হোসেনের শক্তিশালী একটি ছবি, টাইটেল, ” জমিন”Zameen ললিতকলা একাডেমিতে জাতীয় পুরস্কার জিতেছিল এবং পরের বছর প্রাগে ( Prague) আরও একটি একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৬ সালে, সে বছর হুসেনকে চেকোস্লোভাকিয়ায় (Czechoslovakia) ৩৪ টি শিল্পকর্মের প্রদর্শনীর জন্য আমন্ত্রণ পান। প্রদর্শনীটি যখন এক সন্ধ্যায় শেষ হয় তখন মকবুল  লক্ষ্য করেছেন এক যুবতী মহিলা এক দৃষ্টিতে তার আঁকা চিত্রগুলি দেখছেন। উৎসাহী হয়ে মকবুল,  তার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং হাসি মুখে  কথা  নেই, পরিচয় নেই, শুধু মহিলার মুখ দেখে মুগ্ধ হয়ে ৩৪টি ছবি উপহার দেবার প্রস্তাব দেন। বিস্মিত হয়ে, মহিলা লজ্জা্য লাল হয়ে গেলেন, সে মকবুলে্র দাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং বললেন, “আপনাকে একজন ভারতীয় শিল্পীর মতোই লাগে।” সেই মহিলার নাম মেরি জুরকোভা (Marie Zurkova)। জুরকোভা ধর্মতত্ত্বের একজন স্কলার এবং ভাষাতত্ত্ববিদ ছাড়াও হিন্দু দর্শনের ছাত্রী ছিলেন। তিনি ছবি ভাস্কর্য সম্পর্কে খুব আগ্রহী ছিলেন। তিনি গ্যালারীর কাছেই একটি মহিলা সন্ন্যাসীদের মঠে থাকতেন, ন্যানারি (nunnery)।
    পরের দিন মকবুল রেডিমেড পোশাক, নেকটাই সহ কিনে পরলেন, দাড়ি কেটে ফেললেন। নিজেকে খুব সুন্দর করে রোমান্টিক হিরো  সাজিয়ে গ্যালারীতে যান। সেখানে গ্যালারীর স্টাফেরা তাকে চিনতেই পারেনি দাড়ি কেটে ফেলার জন্য। মারিয়া (Marie Zurkova) কাছেই ছিল সে ছূটে এসে মকবুলকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মকবুল আমি তোমার দাড়ি খুব পছন্দ করতাম। হাসতে হাসতে আরো বলল ‘তুমি একটা জোকার, তোমাকে না ভালবেসে কেউ থাকতে পারবেনা।‘

    Maria Zourkova – an artwork by Husain. (Photo courtesy: Khalid Mohamed)
    প্রদর্শনীটি শেষ হয়ে যাওয়ার পরে, হোসেন প্রাগে থেকে গেলেন। মারিয়া তার গাইড, সহচর এবং দোভাষী হয়েছিলেন। তাদের সাহচর্য ছয় বছর ধরে স্থায়ীভাবে চলেছিল।দেন। হুসেন বলেন, তার কাছ থেকে তিনি পশ্চিমের মানসিকতা বুঝতে এবং তাদের প্রশংসা করতে শিখেছিলেন।
    হোসেন ভারতে ফিরে এসে তার স্ত্রীকে জুরকোভা সম্পর্কে জানালেন এবং বলেছিলেন যে তিনি তাকে বিয়ে করতে চান। তাঁর স্ত্রী যা অনিবার্য বলে মনে হয়েছিল তা গ্রহণ করেছিলেন
     মকবুল স্মৃতি থেকে বললেন, “আমরা প্রাগের রাস্তায় হেঁটেছি, যেন স্বপ্নে। আমি তার সাথে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের দর্শনের কথা বলতাম এবং সে কাফকার বিষয়ে কথা বলত।  একদিন
    “যদি আমি তোমাকে পরিবর্তে আমাকে বিয়ে করতে বলি তবে কী হবে?” মকবুল সাহস করে প্রস্তাব দিলেন। মারিয়া ঘটনার আকস্মিকতায় বাক্‌স্তব্দ হয়েছিল। হোসেন  মারিয়াকে স্তব্দ দেখে ভাবলেন মারিয়া তার প্রস্তাবে সম্মত। তিনি তার জন্য একটি বিয়ের পোশাক নির্বাচন করতে লন্ডনে এবং পরে ভক্সওয়াগেন গাড়ি (Volkswagen car) কেনার জন্য জার্মানিতে গিয়েছিলেন। বিয়ের পোশাক এবং গাড়িটি কিনে মারিয়া যে ন্যানারি (nunnery) থাকতেন তার দ্বারে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। মারিয়া অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ছয় বছর সম্পর্ক চলেছে।এবং হুসেন এবং মেরির বিয়ের প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গেছিল।
    তবে মারিয়া ইতিমধ্যে একজন বিজ্ঞানীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। হুসেনকে তা মেনে নিতে হয়েছিল এবং তাকে ৩৪ টি চিত্রকর্ম যৌতুক হিসাবে দিতে চেয়েছিলেন। একদিন সকালে, মারিয়া ন্যানারি থেকে এসে হোসেনের সাথে দেখা করেন।হঠাৎ জুরকোভা তার মন পরিবর্তন করেন । বলেছিলেন যে তিনি নিজের দেশ ছেড়ে ভারতে স্থায়ী বাসিন্দা হতেপারবেন না।  হুসেন বুঝতে পেরেছিলেন যে মারিয়া তাকে বিয়ে করবেন না। মারিয়া মকবুলকে বোঝালেন যে তারা ভিন্ন দেশ  থেকে এসেছে, ‘ভিন্ন সংস্কৃতি র লোক’। ্তাদের মধ্যে বিয়ে হলে সঠিক কাজ হবেনা। মকবুলকে বিয়ে করলে মারিয়ার পরিবার এবং তার বাগদত্তা স্বামী  মনে আঘাত পাবে। মারিয়া বিয়ের পোশাক এবং গাড়ির চাবি  মকবুলকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মকবুলের নিঃশর্ত জেদ ধরায় মারিয়া ৩৪ টি শিল্পকর্ম গ্রহণ করেছিলেন। (মারিয়া এরপর বিবাহিত হন, ও হোসেন তার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ রেখেছিলেন।)
    Tabu in a still from Meenaxi: A Tale of 3 Cities.
    মকবুল তার জীবনের এই গল্পের একটি অংশ  তাঁর চলচ্চিত্র মীনাক্ষী: এ টেল অফ থ্রি সিটিতে পুনর্গঠন করেছিলেন। মারিয়ার চরিত্রে টাবুকে দিয়ে অভিনয় করান।
    এবং হুসেন মারিয়া  জুরকোভাকে, এই চলচ্চিত্রটি দেখানোর ইচ্ছা করেছিলেন, মারিয়া কয়েক দশক ধরে স্বামীর সাথে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন ।
    হুসেন তার ঠিকানা মেলবোর্ণ,( Melbourne) অস্ট্রলিয়ায়, সংগ্রহ করেন। ৪৫ বছর পর ; হুসেন তার সাথে দেখা হওয়ার সাথে সাথে তাদের বয়স কীভাবে বেড়েছে ও ওজন বেড়েছে সেসব সৌজন্যতা বিনিময়ের মত কথোপকথন করেন। এবং তারপরে মারিয়া অনুরোধ করেন মকবুলকে তার শিল্প কর্মগুলি ফেরত নিয়ে যেতে। কারণ তিনি ও তার স্বামী শিল্পকর্মগুলি দেখলেই অপরাধী মনে করেন। মানসিক অশান্তি পান। মকবুল না আসলে মারিয়া নিজেই মকবুলকে খোঁজ করে ছবিগুলি ফেরত দিয়ে দিতেন। মকবুল তার  ৩৪ টি চিত্রকর্ম ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। ছবি গুলি তিনি দোহাতে মারিয়া জুরকোভা মিউজিয়াম বানিয়ে সাজিয়ে রাখেন।
    চিত্রশিল্পী এমএফ-এর সাথে রাশদা সিদ্দিকীর (Rashda Siddiqui) আবেশ হুসেনের সাথে দেখা হওয়ার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল (১৯৭৬ সালে দিল্লির হোটেল অশোকের একটি পার্টিতে), তখন তিনি লখনৌতে কলেজের ছাত্রী ছিলেন “স্থানীয় আর্ট কলেজের” ক্লাস ফাঁকি দিয়ে  গ্যালারীতে ছবি দেখতে আসতেন। কারণতখনকার দিনে পরিবার আপনাকে আর্ট পড়তে দিতনা “।
    রাশদা খবরের কাগজ থেকে হুসেনের প্রকাশিত ছবি ভাস্কর্যের খবর কেটে রাখতেন, আর মনে মনে তাকে কল্পনা করতেন তার প্রিয়জন বলে। আর যখন দিল্লীর হোটেলে দেখা হলো তখন তিনি একেবারে বাক্‌রহিত হয়ে যান, কোন মনের কথা বলতে পারেননি।  তারপর আকবর হোটেলে আবার দেখা হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন তাকে হুসেন ছবি আঁকা শেখাবেন কিনা। এইভাবে পরিচয় ও প্রেম পরিণতির দিকে এগিয়েছিল। হুসেন তাকে প্রেমিকা ও বন্ধুর মত আচরণ করতেন। ১০০র মত ছবি রাশদার উপর আঁকেন।  রাশদা সিদ্দিকীর এটাই গর্ব। হুসেনের মত তিনি একজন নামী ও দামী প্রেমিক পেয়েছিলেন।
     রাশদা দিল্লীতে তার পরিবারের সাথে থাকেন। হুসেনের উপর তার একটি বই (In Conversation With Husain Paintings) প্রকাশ হয়েছে।বইটাতে হুসেনের অনেক ছবি স্মৃতি ইত্যাদি আছে যা দেখলে মনে হবে, হুসেনের উল্লেখযোগ্য শ্রেষ্ঠ প্রেমিকা। হুসেন মহিলাদের আকর্ষণ করতে পারতেন, যেন চিনি দেখে মাছি ভন ভন করার মতো।  আর নতুন মহিলা দেখলেই প্রস্তাব দিতেন।
    Rashda Siddiqui
    আর উচ্চবিত্তঘরের – শিল্পপতি মহিলারা হুসেনকে নিয়ে অনেক উৎসাহী ছিলেন। হুসেনের ছবির জন্য তার ঘনিষ্ঠতা অর্জন করতেন। যেমন socialite Parmeshwar Godrej ।
    যৌনতা বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে নরনারীর বন্ধন জীবনকে অনেক  দুর্স্প্রাপ্য জিনিস দেয়। যা টাকায় কেনা যায়না বা অন্য কিছুর বিনিময়ে পাওয়া যায়না।যারা সামাজিক প্রেম মেনে নিতে পারে তাদের জীবন ও কেরিয়ার অনেক পূর্ণতা দেখে। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে এ চিরন্তন দৃশ্য। তবে অনেকেই অহং বা ভুলবশতঃ অশান্তি সৃষ্টি করে। তখন উভয় পক্ষই ক্ষতি গ্রস্থ হয়। প্রেম মূদ্রার মত দুটি পিঠ, একদিকে স্বর্গ অন্যদিকে নরক। যে যেইভাবে পায় বা নেয়। হুসেনের মহিলারা বা হুসেন  কেউই ভুল করেনি ফলে তারা আজ গৌরবের অধিকারী।
    M.F. Husain with Madhuri Dixit
    মকবুল হোসেন বলিউডের মাধুরী দীক্ষিতের প্রেমে পড়েছিলেন। মাধুরীর ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ ছবিটি ৬৭ বার দেখেন। ‘আজা নাচলে’ দেখার জন্য পুরো প্রেক্ষাগৃহটি বুক করেছিলেন।
    মাধুরী দীক্ষিত, উর্মিলা মাটন্ডকার, অমৃতা রাও, বিদ্যা বালান, আনুশকা শর্মা,সুস্মিতা সেন, টাবু। টাবুকে দিয়ে  Meenaxi: A Tale of Three Cities সিনেমা বানান। মকবুল সিনেমার অনেক নায়িকার ছবি ৮/১০ বার করে দেখতেন ও তাদের দিয়ে কিছু সিনেমা করবেন প্রস্তাব দিতেন। সুস্মিতা সেনকে বলে ছিলেন তাকে দিয়ে একটি সিনেমা বানাবেন Do Kadam Chalke Dekho। বিদ্যা বালানকে নগ্ন করে একটা পেইন্টিং করবেন প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিদ্যা বালান সেটা প্রত্যাখ্যান করেন।

    THE BETTER HALF: Fazila and Maqbool Fida Husain in Mumbai
    ঋণ স্বীকারঃ
    The quint, The Hindu Businessline, BBC,NewsIndian Express,Times Of India,Free Expression Journal, Outlook India,Hindu Blog,The Guardian,Frontline, The Hindu,The Telegraph India,The Scroll,Art Info, Wikipedia, The newyork times, Quackreview, Dailyo.in, Hubpages, Dawn, asian art,rekhta.org,Hindusthan Times,Livemint,IndiaToday,Business Standard, হয়তো আরো কিছু মাধ্যম যার নাম আমার এক্ষুনি মনে পড়ছেনা।

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •