“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় বন্দনা পাল রায়

    0
    15
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    সবকিছু জানতে নেই…..

    মিলির বিয়ে উপলক্ষে বাড়িতে প্রচুর আত্মীয় সমাগম হয়েছে। এদের মধ্যে নানারকম সামাজিক শ্রেণীর মানুষ আছেন। কেউ বড় ডাক্তার তো কেউ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক , কারো ছেলে ছোটখাটো সাহিত্যচর্চা করে নাম করতে শুরু করেছে তো কারো মেয়ে ঝকঝকে আইটি সেক্টরে কর্মরতা।

    তবে এদের মধ্যে দুজন মানুষ আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ।

    একজন হল জয়ন্ত, মিলির কাকার শালীর ছেলে। তার বয়স বছর ছাব্বিশ।

    সে একজন জ্যোতিষী । দুষ্টু লোকে বলে, সে নাকি তন্ত্র সাধনা করে প্রচুর শক্তি অর্জন করেছে। তার চাকরি না করলেও টাকাপয়সার কোন অভাব নেই।
    পৈতৃক বাড়িতে সে থাকে না, কোথায় থাকে, সঠিকভাবে আত্মীয়কুটুমরা জানেনও না। কিন্তু দরকার পরলে সে বিনা আমন্ত্রণেই এসে হাজির হয়।
    বিনা পয়সায় সে চেনাজানা দের ভাগ্য গণনা করে, কাউকে খারাপ কোন ঘটনার আভাস দেয় না। শুধু ভালো ভালো কথা বলে।

    এই তো, গতবছর এক জ্ঞাতিপুত্রের অন্নপ্রাশনের দিন এক সম্পর্কিত জেঠিমা জয়ন্তের সামনে নিজের বাঁহাতখানি মেলে ধরে বললেন, ” দ্যাখো তো বাবা, আমার ছেলেটার সরকারি চাকরি হবে কিনা, বাড়িটা তিনতলা করতে পারবো কিনা”!

    জয়ন্ত মুচকি হেসে বলেছিল, ” আর কিছু জানতে চাও না, জেম্মা? জেঠুর টাকাগুলো যে যে কোম্পানির শেয়ারে লাগানো আছে, সেগুলো র দাম বাড়বে কিনা”?
    জেম্মা ভারি লজ্জা পেয়েছিলেন।

    তা তাঁর সবই হয়েছিল । ছেলের সরকারি চাকরি , শেয়ারে প্রচুর লাভ, বাড়ির তিনতলায় নতুন ঘর, কিন্তু তাঁর ভাগ্যে এসব সইল না।

    একবছরের মধ্যে সিঁড়ি থেকে পরে গিয়ে পা ভেঙে হুইলচেয়ার -বন্দী হয়ে পরলেন।

    তা জয়ন্ত কি সেটা তাঁর হাত দেখে বোঝে নি? নিশ্চয় বুঝেছিল। কিন্তু খারাপ কথা তো, তাই বলে নি।

    দ্বিতীয় অতিথিটি হল মেখলা। মিলির মা শিবানীর মাসতুতো বোন।
    বছর বিয়াল্লিশের এই মহিলা একটি কনভেন্ট স্কুলের টিচার, ভালোবেসে একজন খ্রিস্টান ছেলেকে বিয়ে করে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন।
    মেয়ের জন্মের পর বাপের বাড়ি গেছিলেনও। কিন্তু তাও বাপ-মায়ের মন গলেনি। তারপর থেকে সম্পর্কের সুতো একেবারেই ছিঁড়ে গেছে।

    গত তিন-চার বছর হল মেখলার স্বামী ও মেয়ে তাঁকে ছেড়ে বিদেশে চলে গেছে। এখন তিনি একাই বাড়িতে থাকেন, চাকরি করেন, আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিয়ে দিব্যি আছেন। এবং এই কারণেই লোকের অশেষ কৌতূহলের পাত্রী হয়েছেন।

    বাসি বিয়ের দিন কনে বিদায় হল মিলির শ্বশুর বাড়ির নিয়ম মেনে সকাল বেলাতেই। তারপর বাড়ির লোকের অখন্ড অবসর। খাওয়া দাওয়া ক্যাটারারের, তত্ত্ব সাজাতে লোক আসবে।

    সকলে জয়ন্তকে ঘিরে ধরল। আগ্রহীরা নিজের, বিশ্বাসীরা নিজের সাথে সাথে পরিবারের লোকেদের এবং কৌতূহলীরা অন্যের ভবিষ্যৎ জানতে গুড়ের চারদিকে পিঁপড়ের মত জমিয়ে বসলো ।
    জয়ন্ত জানে যে এসব পরিস্থিতি এড়ানো যায় না। সে হাসিমুখে সকলের দাবিদাওয়া যতটা সম্ভব পূরণ করতে লাগলো । অবশ্য মহিলাকুলের কারো কারো হাতে মেহেন্দি থাকায় তারা বাদ গেল।

    সব ঠিকঠাকই চলছিল, হঠাৎ করে শিবানীর বড় জা সুনন্দা বলে উঠলেন, ” জয়ন্ত বাবা, আমাদের মেখলার হাতটা একটু দেখে দাও তো দেখি। ওর বর আর মেয়ে বিদেশ থেকে ফিরবে , না কি ওর হাতে বিদেশ যাওয়ার যোগ আছে, তা আমরাও জানি”!

    জয়ন্ত ইতস্তত করে বলল, ” বড় পিসিমা , যিনি নিজের ভাগ্য জানতে চান না, তাঁর ভাগ্যবিচারের অধিকার তো আমার নেই”!

    সুনন্দা খলবল করে উঠলেন , ” কে জানতে চায় না তা বলো তো ? একটা মেয়েকে তার বর ছেড়ে দিয়ে চলে গেল, একমাত্র সন্তানকেও সঙ্গে নিয়ে গেল, সে ফিরবে কিনা, ওখানে আরেকটা বিয়ে করেছে কিনা , তার বউ সেটা জানতে চাইবে না? তাই কখনো হয় নাকি! ও লজ্জায় বোধহয় তোমাকে বলতে পারছে না। কই, মেখলা, কই গেলে গো? এদিকে একবার এসো, জয়ন্তকে হাতটা দেখিয়ে যাও”!

    শিবানী একবার বলার চেষ্টা করেছিলেন, “থাক না দিদি, কি হবে এসব জেনে”?

    সুনন্দা বাঁকা চোখে মেজ জায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ” বেশ দিদি তুমি যা হোক! নিজের ছোটবোনের এমন দুর্দশা কবে শেষ হবে , তা জানতে চাও না! কেমন পাষাণ মেয়েমানুষ গো তুমি? আমরা কোথায় মেয়েটার চিন্তায় মরছি, আর নিজের দিদির কোন হুঁশই নেই”!

    ততক্ষণে ডাকাডাকি শুনে মেখলা এসে দাঁড়িয়েছেন। “আমায় ডাকছিলেন , সুনন্দা দি “?
    ” হ্যাঁ তো! এই আমাদের জয়ন্ত কত বড় জ্যোতিষী তা তো জানোই। তা তুমিও তোমার হাতটা একবার দেখিয়ে নাও, দেখো, তোমার বর মেয়ের কোন খবর জানা যায় কি না”!

    মৃদু হেসে মেখলা নিজের বাঁ হাতটা জয়ন্তর দিকে বাড়িয়ে দেন।
    অনিচ্ছা স্বত্তেও জয়ন্তকে দেখতে হয়। একঝলক দেখেই জয়ন্ত হাতখানা সরিয়ে দেয়। তার চোখেমুখে স্পষ্ট অস্বস্তি ।

    ” কি গো, কি হল ভাই, হাত দেখলে না”? মেখলা ঝরঝর করে হেসে ওঠেন।
    এমন সময় কুটুম বাড়ি থেকে মিলির ফোন আসে, তারা পৌঁছে গেছে।
    বাবা, মা, জেঠু, দিদি, ভাই — সবার ফোনালাপ শেষ হতে হতে দুপুরের খাবার সময় হয়ে গেল। তাই হাত দেখার বিষয়টি তখনকার মত চাপা পরে গেল।

    খেয়ে উঠে হাত ধোবার জায়গায় মেখলার সাথে সুনন্দার প্রায় ধাক্কা লাগার জোগাড় । আসলে সুনন্দা মেখলার পিছু ছাড়ছিলেন না, তাঁর অদম্য কৌতূহল মেখলার জীবনে স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষ আছে কিনা তা জানার।

    ” তুমি আজ রাতে সময় করে জয়ন্তকে নিজের হাতখানা দেখিয়ে নিয়ো, কেমন”?

    ” আমার স্বামী যদি জানতে পারতো যে আপনার মত সুন্দরী মহিলা তার খবরাখবর জানতে এত আগ্রহী, তাহলে বড্ড খুশি হত”!
    খোঁচাটা গায়েই মাখলেন না সুনন্দা।

    “তুমি চিন্তা কোরো না, আমিও তোমার সঙ্গে থাকবো “।
    মেখলা মনে মনে ভাবেন, —-তাতো থাকবেই।! আমার হাঁড়ির খবর না জানতে পারলে তোমার যে পেটের ভাত হজম হবে না, তা কি আমি জানি না!

    সুনন্দা মরিয়া। অবশ্য তার কারণও আছে। তাঁর স্বামীর লাম্পট্য তিনি বিয়ের পর থেকেই সহ্য করে আসছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে অনেক অশান্তিও হয়েছে । কিন্তু কাজ কিছু হয় নি।

    মিলির বিয়েতে মেখলাকে দেখে, বা বলা চলে একাকী মেখলাকে দেখে পরেশের মধ্যে কামনা চাড়া দিয়ে উঠেছে । তিনি, মেখলা এবাড়িতে পা দেওয়া মাত্র কুশল বিনিময়ের অছিলায় সেই যে তাঁর সাথে সেঁটে বসেছেন, দৃষ্টিকটু ভাবে সেটা চলছে। সুনন্দা বারবার বোঝানোর চেষ্টা করব, লোকলজ্জার দোহাই দিয়ে, নতুন কুটুমদের কাছে মাথা হেঁট হবার ভয় দেখিয়েও নিরস্ত করতে পারেন নি।
    তিনি কায়মনোবাক্যে চাইছিলেন যে জয়ন্ত বলুক, যে, মেখলার স্বামী ফিরে আসবে।

    দুপুরের খাওয়ার পর আরেকপ্রস্থ হাতদেখাদেখি হল। এবার প্রধান আগ্রহী স্ব্য়ং পরেশ।
    নির্লজ্জের মত খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসতে হাসতে তিনি নিজের ডান হাতখানা জয়ন্তর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখো তো ভায়া, এই বয়সে নতুন করে সেবাযত্ন পাবার যোগ আছে নাকি”?

    বাড়ির বাকিরা নিজের নিজের মান বাঁচাতে রণে ভঙ্গ দিল।
    জয়ন্ত মুখ গম্ভীর করে বলল, “দাদা, ভালো বুঝছিনা, আপনার জন্য একটা কাজ করানো প্রয়োজন , ইমিডিয়েটলি । যদি বলেন তো, সামনের অমাবস্যায় আয়োজন করি”।

    ” কি হয়েছে তা শুনি আগে”?

    ” কি আর বলব দাদা, আপনি তো গুরুজন মানুষ ! তবে বহু লোকের সাথে মেলামেশা থাকলে, বুঝতেই তো পারছেন, রোগব্যাধিই তো একমাত্র বিপদ নয়, সবারই ভাগ্যটাগ্য আছে। ভুল ভাগ্যের লোকের সাথে জড়িয়ে পরলে সেটা কাটান দিতে হয়, নইলে মুশকিল “।

    পরেশের শরীরটা খুব ভার ভার লাগছে। আজ অমাবস্যা। জয়ন্তর কথামতো তিনি তারই বলে দেওয়া জায়গায় এসেছেন। ভালো ফল পাবার আশায় নিজের সহধর্মিণী সুনন্দাকেও নিয়ে এসেছেন। যদিও সুনন্দা আসতে চায় নি, কিন্তু মেয়েদের তো স্বামীই সব, তাই না! স্বামীর মঙ্গল হয় এমন কাজে বউ সাথে না থাকলে যদি পুরো ফল পাওয়া না যায়, তাই জোর করেই তাকে নিয়ে এসেছেন তিনি।
    জায়গাটা শহরের মধ্যেই, তবে বাড়িটা বেশ একটেরে। অনেক পুরনো বাড়ি, চারপাশে উঁচু পাঁচিল,বাড়ির হাতায় একটা পুকুরও রয়েছে।

    জয়ন্তর কথা মতো বাড়ির গাড়ি আনা হয় নি। রাস্তার মোড়ে জয়ন্তর পাঠানো গাড়ি অপেক্ষা করছিল। বাড়িতে সত্যি বলাও বারণ ছিল।

    এখানে আসার পর জয়ন্ত তাঁদের দুজনকেই কি একটা শরবত খেতে দিয়েছিল। ওটা খেয়ে যেন ঘুমিয়ে পরেছিলেন দুজনেই। এখন ঘুমটা ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু শরীর নড়ছে না।

    বহুকষ্টে ঘাড় নাড়িয়ে পাশে তাকিয়ে দেখলেন সুনন্দা একটা চেয়ারে বসে শূন্যদৃষ্টিতে তাঁরই দিকে চেয়ে রয়েছেন। চেয়ারের সাথে আষ্টেপৃষ্টে তিনি বাঁধা । চমকে উঠে নিজের দিকে তাকানোর চেষ্টা করলেন পরেশ।

    তাঁরও একই অবস্থা । গলা দিয়ে স্বরও বেরোচ্ছে না।

    ছেলেটা তাহলে তাঁদেরকে ফাঁদে ফেলেছে? ভাবতে ভাবতেই সামনের দরজা খুলে স্বয়ং জয়ন্ত ভিতরে এল। তার মুখে ক্রুর হাসি।

    “যারা আমার কাছে ভাগ্যগণনা করতে আসে, তাদের ভাগ্য আমি চুরি করে নিই, জানেন তো?
    “গৌরী জেঠিমার কথা শুনেছেন তো? ওনার দারুণ স্বাস্থ্য ছিল। আমি নিয়ে নিয়েছি। বেচারী”!
    ” আপনার তো লম্বা আয়ু। ওটাও এবার আমার হবে “।

    পরেশ বলার চেষ্টা যে সুনন্দার কি দোষ?

    বোধহয় সেকথার উত্তর দেবার জন্যই এবার মেখলা প্রবেশ করল।

    “ওই মেয়েমানুষটা আমার”, সুনন্দার কাছে গিয়ে তাঁর চুলের মুঠি ধরে হেলে পরা মাথাটা সোজা করে নেয় মেখলা—” সবার সামনে আমার বরের জন্য ভারী দরদ উপচে পরছিল তোর, তাই না? লোকের সামনে আমায় অপমান করার মজা এবার টের পাবি”।

    ” ও দিদি, দুটোই মরলে ফেঁসে যাবো যে”?

    “কেন, কাউকে জানিয়ে আসতে বারণ করো নি”?

    ” তা তো করেছিলাম। কিন্তু এরা কি করে এসেছে তা কে জানে “?

    ” কিন্তু এখন তো এরা সব জেনে গেছে! ছেড়ে দিলেও আমরা ফাঁসবো”।

    সামনে হোমকুণ্ড রাখা, তার চারপাশে নানা পরিচিত -অপরিচিত জিনিস রাখা। জয়ন্ত আর মেখলা দুজনে দুটো আসন পেতে হোমে বসে।

    ” আমার হাঁড়ির খবর যারা নিতে চায়, তারা আমার হাঁড়িতে সেদ্ধ হয়”— মেখলার স্বর গমগম করে ওঠে, ” তাই তো সবচেয়ে কাছের মানুষ দুজনকে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছি, বুঝলেন, সুনন্দা দেবী? কি করি, ওটাই যে আমার খাদ্য”!

    আজ মিলিদের বাড়িতে পরেশ ও সুনন্দার কাজ। সেদিন সন্ধ্যায় তাঁরা দুজনে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন । অনেক রাত হয়ে যাওয়ার পরেও না ফেরায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। ভোরের দিকে বাড়ির কাছেই রাস্তাতে পুলিশ তাঁদের দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে। দুজনেই কি করে একসঙ্গে হার্টফেল করলেন, আর সন্ধ্যা থেকে একাধিকবার ওই রাস্তায় খোঁজার পরও কেন ভোরের আগে তাঁদের দেহ কারো চোখে পরল না, সেটা অনেকের কাছেই রহস্য হয়ে থেকে গেল ।

    তবে এইবার নিমন্ত্রিত হওয়া স্বত্তেও মেখলা আর জয়ন্ত, দুজনের কেউই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আসে নি।


    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •