সাপ্তাহিক T3 অরিজিনাল মিনি সিরিজে নীলাঞ্জন মুখার্জ্জী (অন্তিম পর্ব)

    0
    29
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    ইংরেজ কখনও এদেশে আসেনি – ৭ (অন্তিম পর্ব)

    বলিউডের এক স্বল্পখ্যাত অভিনেত্রী একবার বলেছিলেন যে, মুম্বইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে মাত্র দুটো ব্যাপার বিক্রি করা যায়। দুটোরই অদ্যাক্ষর ‘এস’ দিয়ে। সেক্স ও শাহরুখ খান। এই বাংলাতেও এক ‘এস’ দিয়ে এই কয়েকদশক আগেও জনমানসে প্রবল আগ্রহের সঞ্চার করা যেত। সিরাজ। সিরাজের নাম করলেই দু ধরনের মানুষ দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রথম দল যারা তাকে শহীদের মর্যাদা দেয়, পলাশীর যুদ্ধ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম সংগ্রাম ধরে নিয়ে ভক্তিতে গদগদ তারা। তাদের চোখে সিরাজ বিরাট ট্রাজিক হিরো , তারা তাঁর প্রতিটি কাজে সরলতা দেখতে পান এবং প্রতিটি পদক্ষেপকে সঠিক বলে মনে করেন। দ্বিতীয় দল হল সিরাজ হেটার্সদের। যত দোষ নন্দ ঘোষের মত তাদের মতে পলাশীর যুদ্ধের যাবতীয় দায় সিরাজের। কিন্তু সিরাজ সত্যিই কেমন ছিলেন? আমরা সিরাজের কথায় একটু পরে যাব, তার আগে আসা যাক আলীবর্দী খানের কথা।
    তবে রাজা- রাজড়া, নবাব- শাহজাদাদের কথার আগে জানতে ইচ্ছে করে কেমন ছিল সেই নবাবী যুগের সাধারণ মানুষ? কেমন করে বেঁচে ছিল বাঙালিরা? আসুন এক প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখা যাক।
    বলা হয়, একটি জাতির ইতিহাস কোন বইতে নয়, লেখা থাকে লোককথা বা ছড়ায়, সমসাময়িক পাঁচালী কাব্যে, লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গানে, লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন চিহ্নে। যে ছড়াটা বাংলার প্রায় সব শিশুরাই শুনে বড় হয়েছে তা হল –
    খোকা ঘুমলো
    পাড়া জুড়ালো
    বর্গী এলো দেশে
    বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
    খাজনা দিবো কিসে
    খোকা, ঘুম, পাড়া, বর্গী, বুলবুলির ধান খাওয়া তো সকলেই জানে। কিন্তু এই ছড়ার সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং কথা কী জানেন? খাজনা! কী এমন ব্যাপার সেই খাজনা? কী এমন সেই জিনিস যে বর্গী হামলার ভয়াবহ সময়েও যার মাফ নেই। বাংলার সাধারণ মানুষ কেন ত্রস্ত হয়ে রয়েছে সেই ব্যাপারের জন্য? তবে কি তা বর্গী আক্রমণের মতো বা তার চেয়েও বেশি ভীতিপ্রদ? তাই মৃত্যু, নির্মম গণধর্ষণের যন্ত্রণা, ঘর-বাড়ি হারিয়ে, বেঘর হয়ে যাওয়া সেই অবস্থাতেও তারা ভুলতে পারছে না – বাকি রাখা খাজনা মোটে ভাল কাজ না। বাকি রাখা খাজনা মোটে ভাল কাজ না। বাকি রাখা খাজনা …
    তাহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যেটা থেকে যায়, তা হল সময়মতো খাজনা দেওয়ার পরেও তৎকালীন শাহী শক্তি তাদের দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করার নূন্যতম সামাজিক সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয় কী করে? এবং সেই ব্যর্থতার দায় কার?
    ওরঙ্গজেবের দরকার ছিল এমন একজন লোকের, যে তার জন্যে যে ভাবে হোক রেভিনিউ জোগাড় করে আনবে। তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মোহাম্মদ হাদিকে। পরীক্ষা করার জন্য আলমগীর তাকে প্রথমে হায়দ্রাবাদ এবং পরে ইয়েলকোন্ডানলে কিছু কাজ দিয়েছিলেন। সততা ও কর্ম দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ১৭০০ সালে হাদিকে বাংলার দিওয়ান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
    হাদির কাজকর্মের তারিকাই ছিল আলাদা। শাহেনশাহের খাজনা যাতে ঠিকমত আদায় পত্র হয় সেজন্য হাদি যে কোন পথ নিতে প্রস্তুত ছিলেন। পুরনো কিছু কর্মচারী – এতটা বাড়াবাড়ি ঠিক নয় বলে আলমগীরের কাছে অভিযোগ করলেও, হাদির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন বোধ তিনি করতেন না। হাদির টাকা পয়সা তোলার মুন্সিয়ানায় খুশ হয়ে তিনি তাকে উপাধি দেন মুর্শিদকুলি খান। ওরঙ্গজেবের যখনই টাকার দরকার হতো, তা সে নিজের সৈন্যদের মাইনে মেটাতেই হোক বা দক্ষিণে যুদ্ধযাত্রা, মুর্শিদকুলি খাঁ তাকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাঠাতেন। দিল্লিতে মুর্শিদকুলি খানের এই গৌরী সেন মার্কা ভাবমূর্তি তাকে ওরঙ্গজেব ও আগত বাদশাদের কাছে নয়নের মনি করে তুলেছিল।
    ওরঙ্গজেব মারা যাওয়ার পরে তার বংশধরদের মধ্যে সিংহাসনের লোভে লড়াই বাঁধল। তার কয়েক বছর পর মুর্শিদকুলি খাঁ রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে আনেন মুর্শিদাবাদে। এই কাজের জন্য কিছুদিনের জন্য তাকে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়। কিন্তু মুর্শিদকুলি খাঁ ধুরন্ধর ধরনের ব্যক্তি ছিলেন, কোথায় কতখানি ঘুষ দিলে নিজের জায়গা ফিরে পাওয়া যায় তা তিনি জানতেন। লক্ষ লক্ষ টাকা নজরানা দেওয়ার পর ১৭১৭ সালের মধ্যে তিনি বাংলায় আবার নিজের জায়গায় ফিরে পান। তিনি হন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব।স্যার যদুনাথ সরকারের মতে ১৭১৭ শুধু মুর্শিদকুলির জন্য নয়, গোটা বাংলার জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এদিকে মুর্শিদকুলি যখন মোগলদের তখতে তাউস দখলের ফায়দা তুলে স্বাধীন নবাব হন, ওদিকে ফারুকশিয়ারকে পটিয়ে পাটিয়ে এক বিদেশি জাতি বাংলায় ডিউটি ফ্রি ব্যবসার সনদ নিয়ে ফেলে। জাতির নাম ইংরেজ। এই জাতি ফরাসি, ডাচ ও পর্তুগিজদের সাথে টক্করে ভারতে ব্যবসায় পেরে উঠছিল না। ফারুকশিয়রের সনদ এই বাংলায় তাদের একটু দাঁড়ানোর জায়গা দেয়। মোগলরা এবার পুকুর নয়, খাল কাটে এবং তাতে কুমির ছাড়ে। যে কুমির বড় হয়ে শুধু বাঙালি নয়, তাদের ভবিষ্যতকেও খোরাক বানাতে চলেছে। ট্যাক্স ফ্রি ধান্দার সেই পারমিশন, বাংলার দিওয়ান কাম নওয়াব মানেন না। ইংরেজদের সাথে নবাবদের ঝামেলার প্রথম বীজটি বপন করেন মুর্শিদকুলি। ইংরেজদের ব্যবসা করতে না দিতে চেয়ে। এক বিদেশি আর এক বিদেশিকে এই সাধের বাংলায় নিজের মৌরসীপাট্টা ছাড়তে রাজি হয় না।
    মুর্শিদকুলির পর বাংলার নবাব হন সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খান। যথারীতি ইনিও বাঙালি ছিলেন না। ছিলেন দক্ষিণের বুরহানপুর নামের এক জায়গার লোক। বাঙালির অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে না। এতদিনে পরাধীনতা শব্দের অর্থ সে বেমালুম ভুলে গিয়েছে। ছোট ছোট জমিদারি, পত্তন, তালুকা নিয়ে সে মশগুল। বাংলাকে কোন বিদেশি শাসন করছে, তা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই।
    সুজাউদ্দিনের আগে বলে নেওয়া যাক আর একজনের সম্পর্কে। লোকটির নাম মির্জা মোহাম্মদ আলী। মির্জা মোহাম্মদ আলীও দক্ষিণের মানুষ। এর আব্বা হুজুর ছিলেন ওরঙ্গজেব এর পুত্র আযম শাহের কর্মচারী। মির্জার আব্বার ইন্তেকালের পর তিনি ও তার বড় ভাই হাজী আহমেদ আযম শাহের তাঁবে আসেন। তবে, মির্জা ও হাজী তাঁদের মালিক আজম শাহ মারা গেলে মুশকিলে পরেন। মোগল খানদানি খেয়োখেয়ি তখন চুড়ান্ত। একে অন্যের কর্মচারীকে কাজ দেওয়া দুরের কথা, খুনখারাপি করতেও তারা কসুর করে না। মির্জা ও হাজির আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। এরা আসেন মুর্শিদকুলির তৎকালীন উড়িষ্যার সুবেদার সুজাউদ্দিনের কাছে। মোগল ডিপ্লোম্যাসিতে পটু দুভাই ধীরে ধীরে সুজাউদ্দিনের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। সুজাউদ্দিন মির্জা মোহাম্মদ আলীকে রাজমহলের জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত করেন । উপাধি দেন আলীবর্দী খাঁ।
    মুর্শিদকুলি খান ছিলেন মোগল বাদশাহের স্বীকৃত নবাব। মুর্শিদকুলির দুই মেয়ের শাদী হয়েছিল সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খানের সাথে। মুর্শিদকুলির এন্তেকালের সময় তার কাছে ছিল আদরের নাতি সারফারাজ। সিংহাসন খালি রাখা সে যুগে ছিল খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার। মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর সাত তাড়াতাড়ি সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়া হল সারফরাজ খানকে। মরহুম নবাবের তেমনই ইচ্ছে ছিল।
    এদিকে সুজাউদ্দিনের অতি কাছের পরামর্শদাতা তখন হাজী আহমেদ ও তার ভাই আলীবর্দী খান। হাজী আহমেদ সুজাকে বললেন – ছি ছি এ কী কান্ড! আপনি শেষ অবধি নিজের ছেলের নৌকর হবেন নাকি?
    সুজাউদ্দিন তখন শ্বশুরের দেওয়া উড়িষ্যার সুবাদারের দায়িত্ব ছেড়ে তড়িঘড়ি মুরশিদাবাদের দিকে মার্চ করেন। আলীবর্দী ও হাজী তাকে সাহায্য করলেন। ক্ষমতা বিশেষ না থাকলেও দিল্লির সুলতান তখনও ধোঁকার টাটির মতো রয়েছেন। সুজাউদ্দিনকে তিনি প্রচুর উপাধি টুপাধি দিলেন। সেসময় ছোটখাট জমিদারও এমন সব টাইটেল নিত যেন সে পৃথিবীর অধীশ্বর। সুজাউদ্দিনের টাইটেল হল মোতামূল উল মূলক, মানে এই দেশের অভিভাবক, সুজা-উদ-দৌলা , অর্থ সবথেকে বড় বীর, আসাদ জঙ্গ, যে সিংহের মতো পরাক্রমী। এসব বড়সড় উপাধি দেখে হয়তো হাজী আহমেদ ও তাঁর ভাই আলীবর্দী খান মুচকি হেসেছিলেন।
    সুজাউদ্দিন দক্ষ শাসক ছিলেন। খুব তাড়াতাড়ি তিনি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যাকে অনেকরকম ট্যাক্স দিয়ে বেঁধে ফেললেন। দক্ষ শাসকেরা পাবলিকের কাছ থেকে পয়সা উসুল করতে চিরকালই পটু। সুজাউদ্দিনের কাছের মানুষ হিসাবে হাজি আহমেদ, আলীবর্দী খান ছিলেনই। এলেন আর একজন, জগৎ শেঠ। নতুন নবাবের সাথে মিলে বাংলার মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হতে থাকল দুই দক্ষিনী – ইরানি এবং এক মাড়োয়ারির হাতে। ১৭৩৯ এ সুজাউদ্দিন মারা যাওয়ার পর সারফরাজ খান আবার নবাব হলেন।
    এর মধ্যে আলিবর্দী সরফরাজের বাবা সুজাউদ্দিনের কাছ থেকে প্রচুর উপকার পেয়েছেন। ১৭৩৩ এ তাকে বানানো হল নায়েব নাজিম, হাজী আহমেদ হলেন নায়েব। এর পরের বছর আলীবর্দী নবাবের কাছ থেকে উপাধি পেলেন সুজাউল মূলক বা দেশের নায়ক এবং হাসিমউদ্দৌলা বা স্বদেশের তরবারি। কিছুদিন পর তিনি পেলেন পাঁচ হাজারী মনসবদারি এবং উপাধি মহাবত খাঁ, যুদ্ধের সময় যিনি ভীতিকর। সুজাউদ্দিনের এইসব উপকারের প্রতিদান অবশ্য আলীবর্দী দিয়েছিলেন। ১৭৪০ সালের ১০ এপ্রিল গিরিয়ার কাছে তিনি বেইমানি করে খুন করে ফেললেন সুজাউদ্দিনের ছেলে সরফরাজ খানকে।
    যারা সিরাজের প্রতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ব্যথিত বোধ করেন, তারা বোধহয় ইতিহাসের পুরোটা জানেন না। অথবা জানলেও আলীবর্দী খাঁর কৃতঘ্নতার কথা তারা মনে করতে চান না। নবাবী আমলে সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ বলে পরিগনিত হত নিমকহারামি। মীরজাফরের নামে লোকে থুতু ফেলে সেই নিমকহারামির জন্য। আশা করি সকলের জানা আছে, আলীবর্দী কিভাবে নিমকহারামি করেছিলেন? তারা নিশ্চয়ই জানেন মসনদে বসার জন্য আলীবর্দী খাঁ ঠিক কী কী ভাবে অভিশাপ কুড়িয়েছিলেন?
    কথায় বলে ভালো মানুষকে ভগবান দেখেন। ভুল কথা নয়। ভালো মানুষকে শুধু ভগবানই দেখেন আশেপাশের মানুষ কেউ তাকে দেখতে পারে না। সরফরাজ খান ছিলেন একজন প্রকৃত ভালোমানুষ। অন্তত যে অর্থে সিরাজকে নিয়ে আদিখ্যেতা করা হয় তার থেকে অনেক বেশি ধার্মিক, অনেক সহজ সরল মানুষ। রমজানে তিনি তিন মাস উপবাস রাখতেন। মদ্যপান করতেন না। কোন নবাবি শখ তার ছিল না। এবং তার আব্বার আমলের বিশ্বস্ত মানুষের তিনি বিশ্বাস করতেন।
    সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর দুটো দল তৈরি হলো। প্রথম দল, হাজী আহমেদ, আলীবর্দী ও জগৎশেঠ। দ্বিতীয় দল, হাজী লুৎফুল্লাহ, মাদান আলি খান এবং মীর মুর্তাজা। সরফরাজ এবার জীবনের বড় ভুলটা করলেন। শাসনযন্ত্রের কোথায় কোথায় কী কী গলদ আছে তা বার করবার চেষ্টা করতে লাগলেন। দ্বিতীয় দলের কথায় প্রভাবিত হয়ে সারফারাজ, হাজী আহমেদকে নায়েবের পদ থেকে দুর্নীতির জন্য অপসারন করলেন। তার জায়গায় মীর মুর্তজাকে বসানো হলো। হাজী আহমেদের ছেলে আয়াতুল্লাহ খানকে সরিয়ে দেওয়া হল রাজমহলের সেনাপতির পর থেকে।
    কেউ কি এই ঘটনার সাথে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের ঘটনাচক্রের মিল পাচ্ছেন? সেই যে, একদিকে ইংরেজ আর অন্যদিকে দু তিনটে চক্রান্তকারী দল, মাঝখানে বসে আছেন অসহায় নবাব। সেই একইরকম ঘটনা অনেকদিন আগে ঘটিয়েছিলেন সেই ট্র্যাজিক নবাবের দাদাজানেরা।
    হাজী সাহেব তার সব অপমানের কথা লিখে জানালেন আলীবর্দীকে। আলীবর্দী খাঁ তখনও সরফরাজ খানের আপন লোক। আলীবর্দী তখন সরফরাজের কাছে কাছে থাকেন এবং তার প্রতিটি মুভমেন্ট, প্রতিটি কথা অভিযোগের মতো সাজিয়ে পৌঁছে দেন মোগল দরবারে।
    এবার মাঠে নামলেন মুর্শিদাবাদের আসল মালিক জগৎশেঠ। যার নামের সাথে জড়িয়ে আছে দুনিয়ার মালিক হওয়ার ইচ্ছাটা।
    সেই বিখ্যাত ব্যবসায়ী, যাকে নিয়ে কোনদিন একটা আলাদা লেখা লিখে ফেলা যায়, তাঁর এক একটা ছোট ছোট মুভ বাংলাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে সেইসব নিয়ে। জগৎশেঠ পাত্তা লাগালেন সরফরাজ খানের প্রধান সঙ্গী আসলে তার বিশ্বস্ত নয়। আলীবর্দী অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এরপর বাকি রইল, শুধু কিছু গোপন মিটিং। এবং জানানো, আমি তুমার সাতে আচি, শুধু লবাব হলে তুমি আমাকে একটু, উমহহ বুজলে তো –
    ১৭৪০ এর দশই মার্চ আলীবর্দী, নবাব সরফরাজ খানকে সালাম জানাতে আসেন এবং সেখানেই ঠান্ডা মাথায় তাঁকে প্ল্যানমাফিক খুন করেন।
    ইতিহাসের দুটো বিরাট দোষ। এক, তার প্রতিশোধ পরায়নতার কোন তুলনা হয় না। সে কিছু ভোলে না। দুই, সে কখনও কাউকে ক্ষমা করে না। আমরা মানুষেরা সব ভুলে যাই। অনেক কিছু মাফ করে দিন।
    আলীবর্দী যে কাজটা করেছিলেন সেটা কিন্তু মীরজাফরের থেকে কোনো অংশে কম নয়। শুধু মীরজাফরের সময় একটা ছোট্ট ফ্যাক্টর ছিল। ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। মীরজাফরের সময় ইংরেজরা নবাবী খেলাটা খেলতে শিখে গিয়েছিল। আলীবর্দীর সময় তখনও তারা ছিল শিক্ষানবিশ।
    নবাব হয়ে অবশ্য আলীবর্দী মুর্শিদকুলি খাঁর পুরনো নীতিতে ফিরে আসেন। বাংলার মানুষ তটস্থ হয়ে দেখে খাজনা তাকে দিতেই হবে। সে বর্গী আক্রমন হোক আর যাই হোক, খাজনা না দিলে তার নিস্তার নেই।
    আদতে কথা হল, এরা কেউ বাঙালি ছিলেন না। বাঙালির ভাগ্যে হাজার বছরেও গণেশ ও জালালউদ্দিন ছাড়া জাতিগতভাবে বাঙালি শাসক জোটেনি। হ্যাঁ, সেই সব বিদেশি নবাবদের মধ্যে অনেকেই বাংলায় জন্মেছেন, বাংলার জল হাওয়ায় বড় হয়েছেন কিন্তু তারা কেউ ভূমিপুত্র নন। যদি সিরাজ বাঙালি হন, তবে ওই একই যুক্তিতে ভারতের মাটিতে জন্মানো সে যুগের প্রতিটি পর্তুগিজ, ফরাসি বা ইংরেজও ভারতীয়। তবে আর গোয়ায় পর্তুগিজ, চন্দননগর আর পন্ডিচেরিতে ফ্রেঞ্চ বা ভারতের অন্য জায়গায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের প্রয়োজন কী ছিল? আর এটুকু বোঝার বোধ ছিল না বলেই, বাঙালি স্বজাতি শাসক পাওয়ার যোগ্য নয়। তাই সে এক সুদীর্ঘ কাল বাঙালি শাসক পায়নি।
    হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি কোনদিন স্বাধীন ছিল না। অন্যান্য তুর্কি ইরানি মোগল শাসকদের কথা না হয় ছেড়ে দেওয়া গেল, বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম টোটেম সিরাজ বা তার পূর্বসূরি আলীবর্দী বা মুর্শিদকুলি তিনজনেরই দরবারে ভাষা হিসেবে চলত শুধুমাত্র ফারসি ও আরবী। বাংলার সেখানে কোন জায়গা ছিল না। দরবারে কঠোরভাবে পালন করা হতো ইরানীয় বা মোগলাই আদব-কায়দা, বেশভূষা, রীতিনীতি সবকিছু। ভাষা বা সংস্কৃতির কথা না হয় বাদই দেওয়া যাক, এমনকি নবাবকে যারা ঘিরে থাকতেন যেসব বাংলার ভাগ্য নিয়ন্ত্রকরা, তাঁদের মধ্যে প্রায় কেউই বাঙালি ছিলেন না। আলীবর্দী খাঁর আমলে ফারসি সাহিত্যের খুব উন্নতি হয়েছিল। তিনি নিজে ফার্সি বিদ্বানদের খুব পছন্দ করতেন। তাঁর আমলে পারস্য সংস্কৃতি ও আদব-কায়দা বাংলাদেশ বিস্তার লাভ করে। তিনি বেশ চেষ্টা চালিয়েছিলেন বাংলাভাষা, সাহিত্য ইত্যাদি ফারসি সাহিত্য দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়। সিরাজ বেশি লেখাপড়া জানতেন না। তিনি আর ঠিক কী কী জানতেন না তা জানা নেই, তবে তিনি বাংলা ভাষা জানতেন না। এতে সিরাজের কোন দোষ নেই, শুধু সিরাজই নয়, আলীবর্দী খানের পরিবারের কেউ কখনও বাংলা ভাষা শেখেননি। শেখার অবশ্য কোনো কারণও ছিল না। তারা ছিলেন নবাব। তারা যে ভাষায় কথা বলবেন সেটাই দেশের ভাষা হতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানে একসময় যেমন উর্দুর চল শুরু হয়েছিল, এখন যেমন বহু বাঙালি কায়দা করে হিন্দি স্টাইলে বাঙলা বলেন, সে সময়ও আরবি আর ফার্সিও অন্যদের প্রাণের দায়ে শিখতে হত। জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, জানকিরাম, রায়রায়ান, রামসিং এরা সকলেই ফার্সিতে কথা বলতেন। নবাবদের সভাসদের সঙ্গে বাংলার কোন সম্পর্ক ছিল না। মুর্শিদকুলি জীবনের বড় অংশ দাক্ষিণাত্য এবং ইরানে প্রতিপালিত হন। বাংলা জানার কোন প্রশ্নই নেই। এখন প্রশ্ন হল, নবাব সিরাজউদ্দৌলা নামের মোটা দাগের শান্তিগোপালীয় দেশপ্রেম এক মুহূর্ত পাশে সরিয়ে রাখলে এই পুরোপুরি অবাঙালি খাজনা বুভূক্ষু নবাবদের ক্ষমতা রক্ষার লড়াই, আর পুরোপুরি বিদেশী ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের লড়াই। এতে তৎকালীন বাঙ্গালীর, বাংলার মানুষের যোগ কোথায় ছিল?
    ঘটনা হল, কোথাও তা ছিল না।
    আর সেই কারণেই পলাশী নামে এক জায়গার কাছে আমবাগানে যে একটা যুদ্ধ হয়েছিল সেটা জানতেই সাধারণ বাঙালির বেশ কয়েক মাস লেগে গিয়েছিল। সেই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ফল যে কী হতে পারে সে ব্যাপারে আপামর বাঙালির কোন আগ্রহ ছিল না। তারা এই যুদ্ধকে আরো পাঁচটা বড়লোকের লড়াইয়ের মতোই ধরে নিয়েছিল, যা আসলেই ছিল। কারণ, সেই যুদ্ধে কোন দেশপ্রেম তো দুরাস্ত, সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষার বিন্দুমাত্র কোন ভূমিকা ছিল না।
    সিরাজের বাবা জৈনুদ্দিন আহমেদ খান ছিলেন আলীবর্দী খানের দাদা হাজি আহমেদ খানের ছোট ছেলে। আলীবর্দী খান তার সাথে নিজের মেয়ে আমিনা বেগমের বিয়ে দেন। আফগান বিদ্রোহীদের হাতে বিহারে জৈনুদ্দিন আহমেদ খান মারা যান। আলীবর্দী সিরাজকে মানুষ করে। সিরাজ ছিলেন আলীবর্দী খানের নয়নের মনি।
    শঠভাবে ক্ষমতায় এলেও ব্যক্তিগত জীবনে আলীবর্দী সৎ ছিলেন। নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, মদ্যপান করতেন না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, সেই বে-লাগাম লম্পট যুগেও আলীবর্দী ছিলেন এক স্ত্রীতে অনুরক্ত। কিন্তু তার সময় বর্গীরা তারই দেশের প্রায় চার লাখ মানুষকে দশবছরে হত্যা করেছিল। একজন শাসক যদি রাজ্যের সমৃদ্ধির ক্রেডিট নিতে পারেন তবে প্রজাদের এই মর্মন্তুদ পরিণতির একমাত্র দায়িত্ব শাসকের উপরেই বর্তায়। রাজ্যের মানুষকে সুরক্ষা দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। আলীবর্দীকে ভয় বা ভক্তি, যা হোক একটা কিছু মানুষ করত। কিন্তু ছোকরা সিরাজকে দেশ তো দূরের কথা শহরের মানুষই মেনে নিতে পারল না।
    সিরাজকে নিয়ে যা কিছু কাহিনী উড়ে বেড়ায় তা সবই মন্দ। আজ যারা আবেগতাড়িত হয়ে সিরাজের প্রশংসা করেন তারা বলেন এ সবই ইংরেজদের রটনা। একথা অস্বীকার করবার কোন জায়গা নেই যে ইংরেজরা বহু ভুল ও পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়ে, যেসব মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থহানি সিরাজ করেছিলেন তাদের দিয়ে সিরাজের ব্যাপারে অনেককিছু লিখিয়েছিল। মোজাফফরনামা তেমনই একটি বই। সিরাজের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী গোলাম হোসেন সিরাজের ব্যাপারে বহু দুর্নাম করেছিল। তার সিরাজের সাথে ঝামেলা হয়েছিল। মৃত্যুর পর সিরাজের অনেক কুৎসা করে সে শোধ তুলেছিল। পরাজিত বা মৃত মানুষের চরিত্রহনন করা সহজ কাজ। কোন প্রতিবাদ আসে না। বাঙালিরা নিজেও সেসব কম করেনি। বিবেকানন্দ থেকে নেতাজি, সকলেই এর শিকার হয়েছেন।
    কিন্তু কথা হল সিরাজের লাম্পট্য, খামখেয়ালিপনা, নিষ্ঠুরতা প্রায় মিথের আকার নিয়েছে। সেসব নির্মম মিথের উল্লেখ এখানে করতে চাই না। যারা দাবি করেন, সিরাজ বড়ই ভালো মানুষ ছিলেন, তাদের কাছে প্রশ্ন – সিরাজ ক্ষমতায় আসবার আগে এবং ক্ষমতায় আসবার পরে নিজের চরিত্র বদলাবার চেষ্টা করেন। এমনকি আলিবর্দীর মৃত্যুশয্যায় কোরআন ছুঁয়ে তিনি শপথ করেন এ জীবনে আর কখনও মদ স্পর্শ করবেন না ও অন্যান্য বদভ্যাস ত্যাগ করবেন। এই ঘটনা একইভাবে আমাদের জানিয়ে দেয়, যে নিশ্চয়ই তিনি অত্যধিক মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিলেন অথবা তার আরও অন্যান্য বদভ্যাস ছিল।
    একজন মানুষ যদি সত্যিই ভালো হয় তার নামে একটিও ভালো কথা কেন শোনা যায় না? তিনি যদি সত্যিই ভালো চরিত্রের ছিলেন, তবে চরিত্র বদল করার প্রয়োজনটা কী ছিল?
    পলাশীর যুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাপক। কিন্তু যখন যুদ্ধটা হয়েছিল তখন কিন্তু তা কোন কোন মহান আদর্শের জন্য হয়নি। নিজের আঁতে ঘা লাগলে হরিপদ মুদিও লাঠি হাতে হুংকার ছাড়ে। সিরাজের যুদ্ধ সেসময় তার থেকে বেশি কিছু ছিল না। সাধারণ মানুষের কোনরকম স্বার্থরক্ষার জন্য যদি পলাশীর যুদ্ধ হত তবে অবশ্যই তা সমসাময়িক কালে অন্য মাত্রা পেত।
    এই লেখা কোনোভাবেই বাংলার শেষ কয়েকটি নবাবের ব্যক্তিগত চরিত্রকীর্তন বা হননের জন্য নয়। এই লেখা শুধু সেই সিনারিও এনালাইসিসের জন্য যা জানতে চায় যে বাংলার শেষ ‘স্বাধীন’ নবাবদের সময় কেমন ছিল সে দেশ?
    মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজউদ্দৌলা অবধি এদেশের মানুষের জীবনে কোনো রকম স্থিরতা ছিলনা। বর্গী আক্রমণ, অনাহার আর দারিদ্রে পুরো বাংলার ডেমোগ্রাফি বদলে গিয়েছিল। পূর্ববঙ্গ থেকে কাতারে কাতারে মানুষ তখনকার জঙ্গলাকীর্ণ উত্তরবঙ্গের দিকে পাড়ি দিয়েছিলেন । আবারও লিখছি, একটি দেশ যখন ভালো থাকে তখন সুশাসনের কৃতিত্ব যেমন সে দেশের প্রধান নেন, তখন একটি দেশ খারাপ থাকার কারণও তার প্রধান হন। আলীবর্দী বিভিন্ন ছোট ছোট যুদ্ধে এত ব্যস্ত ছিলেন যে সাধারণ প্রজার দিকে মনোযোগ দেওয়ার তাঁর কোন সময় ছিল না। প্রশাসনিক দিক থেকে তিনি ব্যর্থ ছিলেন। জীবনে একটি বলার মত কাজ তিনি করেছিলেন। তা হল ভাস্কর পন্ডিতের মত নিষ্ঠুর নির্মম অত্যাচারীকে খুন করা। পারিবারিক দিক থেকেও তিনি বিফল ছিলেন বলা যায়। ঈর্ষাকাতরতা, অবিশ্বাস এবং জ্ঞাতি শত্রুতা তার সময় থেকেই তাঁর পরিবারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুন পোকার মত ছেয়ে যায়। দেশের প্রধান পরিবারের সকলেই যদি একে অপরের পিঠে ছুরি বসাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে থাকে তাহলে বোঝাই যায় দেশের মানুষের কী অবস্থা হয়েছিল। প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। চতুর্দিকে ছোট ছোট জমিদারেরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। মেদিনীপুরের শোভা সিংয়ের মতো জমিদারেরা মানুষের উপর বর্গীদের চেয়ে থেকে কিছু কম অত্যাচার করেনি। শোভা সিংয়ের নারী লোলুপতা এবং সেই কারণে যুদ্ধ করে অন্যের রাজত্ব নষ্ট করা, সাধারণ মানুষের প্রাণহানি করা আজও প্রায় প্রবাদের মতো বর্ধমান, মেদিনীপুর, বিষ্ণুপুর অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে।
    ইংরেজরা ভারতের উপর কিছু অমানুষিক অত্যাচার করেছে। আমরা ভুলে যাইনি হিজলি, ভুলে যাইনি আন্দামান, ভুলে যাইনি জালিয়ানওয়ালাবাগ। এ দেশের সুযোগসন্ধানী মানুষদের ব্যবহার করে চালানো ইংরেজদের অসংখ্য দমননীতি তো আছেই। কিন্তু ইংরেজদের কাছ থেকে ভারতের সাধারণ মানুষ দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার শিখেছে। এক, এক দেশের কনসেপ্ট। অনেক ছোট ছোট রাজ্য লোকালয় বিভিন্ন ভাষা সংস্কৃতি ও মানুষ মিলে একসাথে এক ভাবে থাকা যায়, ভারতের মানুষ প্রথম উপলব্ধি করেছিল ইংরেজ আমলে। যার প্রথম আলোটা জ্বেলেছিলেন বাংলার রেনেসাঁর পুরোধারা। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, সংবিধান। একটা দেশ চালাতে যে লিখিত কিছু নিয়মকানুন থাকতে পারে এবং তা দেশের সমস্ত মানুষকে মেনে চলতে হয়, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র বিস্মৃত হওয়া মানুষদের সেটা বোঝার মত বোধ সেই যুগে পুনরুদ্ধার হয়েছিল।
    এ লেখার শিরোনাম ‘ইংরেজ এদেশে কখনও আসেনি’, কেন? ফিরে যাই সিনারিও এনালাইসিসে। ধরা যাক, জঘন্য, অতি খারাপ ইংরেজরা এদেশে কখনও পদার্পণ করেনি। তারা আমাদের পরাধীন করেনি। কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমরা কি কোনদিনই স্বাধীন ছিলাম? বাঙালি হিসেবে আমরা কোনদিনই স্ব-শাসন পেয়েছি? রাজা গণেশ আর জালালুদ্দিন ছাড়া একটি জাতি নশো বছরে নিজের মাটির, নিজের রক্তের কোন প্রধান শাসক পেল না, যার মাতৃভাষা বাংলা। একটি এথেনিক জাতির পক্ষে এ অতি দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার । পলাশীর যুদ্ধ ইংরেজদের সাথে না হলে, পর্তুগিজ বা ফরাসিদের সাথে হত। সিরাজ না হলে অন্য কারোর সঙ্গে হত এবং তা অবশ্যম্ভাবী ছিল।
    দেখা যাক এই নশো বছরে বাঙালির ক্ষয়ক্ষতির একটা ছোট্ট হিসাব।
    ধরা যাক এক বাঙালিকে জিজ্ঞেস করা হলো- দাদা, বাঙালি হিসাবে পলিটিক্সের ব্যাপারে আপনার কী মতামত?
    তিনি উত্তর দেবেন – পলিটিক্স!পলিটিক্স বাঙালির রক্তে। কলকাতা হল মিছিলের শহর। আমাদের জাতীয় স্লোগান হলো করব লড়ব মরব। রাজনীতি আর বাঙালি সারা ভারতের মানুষের কাছে সমার্থক। আমাদের ব্রিগেড আছে, হাংরি আছে, তেভাগা আছে, নকশাল আছে, এছাড়া ছোটখাটো বিপ্লব –
    এবার যদি বলা হয় – আচ্ছা বেশ।বাঙালি এত পলিটিক্স ভালবাসে তবু আজ সর্বভারতীয় রাজনীতিতে একজনও বাঙালি নেতা নেই, কেন বলুন তো?
    অন্য বাঙালিটির কাছে কোন উত্তর থাকবে না
    যদি তাঁকে আবার প্রশ্ন করা হয় – রাজনীতিতে বাঙালির হেরিটেজ কিন্তু অনেক প্রাচীন। আপনি জানেন দাদা, এক বাঙালি রাজার রাজত্ব আফগানিস্তান অবধি বিস্তৃত ছিল?
    অন্য বাঙালি – আপনি কে বলুন তো? কোন পার্টি? ডান না বাম? নাকি গোবলয়?
    কথোপকথন প্রায় সেখানেই শেষ হয়ে যাবে। ডান, বাম ছাড়াও একজন ‘বাঙালি’র যে একটি পরিচয় আছে তা বুঝতে অন্য বাঙালির অসুবিধা হয়। একজন বিহারী, রাজপুত, মারাঠি, গুজরাতি, মাড়োয়ারি, পাঞ্জাবি কখনও এই দোটানায় ভোগে না।
    টাটা বিড়লা আম্বানির কাছে চাকরি করে শ্লাঘা বোধ করেন এমন কোন বাঙালিকে যদি বলা হয় – জানেন একসময় এই ভারতে ব্যবসায়ী জাতি বলতে মারোয়ারি, গুজরাটি, পার্সিদের নয়, বাঙালিদের বোঝানো হত। বাঙালি কেরানি হয়, এটা তো এই সেদিনের ব্রেনওয়াশ এর ফল। তার আগে বাঙালি ব্যবসায়ীদের পৃথিবীজোড়া নাম ছিল। তাদের হাজার বাণিজ্যপোত সারা পৃথিবীর সাগরে –
    তিনি বড়জোর কাষ্ঠ হাসি হাসবেন। যার অনেক রকম মানে হয়। তার একটা মানে হলো – কবে ঘি খেয়েছিলে সেই হিসেব এখনও!
    এই নশো বছরে আমরা বাঙালি হিসাবে আমাদের মূল্যবোধ, গরিমা, আত্মমর্যাদা, স্বাত্যন্ত্র, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আরও কত শিকড় যে হারিয়েছি। বিনিময়ে অর্জন করেছি নিজেদের হেরিটেজের প্রতি সীমাহীন অবজ্ঞা, চেতনার মূলে ঢুকে যাওয়া এক পরাধীনতা, যার প্রকৃত পরিমাপ সম্ভবত বাঙালির নিজের কাছেও নেই। লেখা আছে মহাকালের কোনও অদৃশ্য দস্তাবেজে।
    ডাচ, পর্তুগিজরা আমাদের দাস বানিয়েছিল। কিন্তু তার বহু আগে থেকেই বাঙালি দাস হয়েছিল। মায়ানমারের মত একটি অনুন্নত পার্বত্য অঞ্চলের দেশ, তাদের ত্রাসে বাঙালি কাতর হয়েছিল, এ বড় গ্লানির কথা। একের পর এক বিদেশী জাতি এসে আমাদের উপর অধিকার ফলিয়ে গিয়েছে। কেন তা সম্ভব হয়েছিল? কেন?
    আমার এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই।
    ইংরেজ কখনও এদেশে না এসে থাকলে আমরা কেমন ছিলাম? কেমন থাকতাম? তার একটা পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করতে চেয়েছিলাম সীমিত জ্ঞান বুদ্ধিতে। তা করলাম। আজকের লেখা এখানেই শেষ করছি। টেক টাচ টককে অনেক ধন্যবাদ আমাকে রচনাটি এখানে লেখবার সুযোগ দেওয়ার জন্য। এই লেখার সময় কিছু রেফারেন্স ব্যবহার করেছি। কেউ যদি এ বিষয়ে আরও জানতে চান তথ্যপঞ্জিতে দেওয়া বইগুলো পড়ে দেখতে পারেন। লেখা শুরু করেছিলাম এক প্রিয় সাহিত্যিকের লেখার অংশ দিয়ে, লেখা শেষও করছি তেমনই আর এক প্রিয় সাহিত্যিকের রচনার অংশবিশেষ দিয়ে –
    ‘সেদিন ধীরে ধীরে নাট্যমঞ্চের উপর মহাকালের কৃষ্ণ যবনিকা নামিয়া আসিয়াছিল। প্রদীপ নিভিয়া গিয়াছিল। তারপর রঙ্গমঞ্চ যুগান্তকাল ধরিয়া তিমিরাবৃত ছিল। নৃত্য গীত হাস্য কৌতুক মূক হইয়া গিয়াছিল। মানুষ অন্ধকারে বাঁচিয়াছিল। নয়শত বর্ষ পরে আবার সেই রঙ্গমঞ্চে একটি একটি করিয়া দীপ জ্বলিয়া উঠিতেছে। কালের কৃষ্ণ যবনিকা সরিয়া যাইতেছে। এবার এই পুরাতন রঙ্গমঞ্চে জানি না কোন নাটকের অভিনয় হইবে।’

    সমাপ্ত

    ঋণ
    যশোর খুলনার ইতিহাস – সতীশ চন্দ্র মিত্র
    বাদশাহী আমল – বিনয় ঘোষ
    বাংলার ইতিহাস – কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়
    পূর্ববঙ্গ গীতিকা – আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন
    এশিয়ান টাইমস, লন্ডন, নভেম্বর – ১৯৯৩
    উইকিপিডিয়া
    বৃহৎ বঙ্গ আচার্য – দীনেশচন্দ্র সেন
    ময়মনসিংহ গীতিকা – আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন
    পলাশীর অজানা কাহিনী – সুশীল চৌধুরী
    রাজা গণেশ – সতীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বাংলাদেশের ইতিহাস – রমেশচন্দ্র মজুমদার
    ভারতের ইতিহাস – অতুল চন্দ্র রায়, প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায়
    বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস – নগেন্দ্রনাথ বসু
    কয়েন্স এন্ড ক্রনোলজি অফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট সুলতানস অফ বেঙ্গল – নলিনীকান্ত ভট্টশালী
    হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল – যদুনাথ সরকার
    বাংলাদেশের ইতিহাস – রমেশচন্দ্র মজুমদার
    প্রতাপাদিত্য – নিখিলনাথ রায়
    বেঙ্গল আন্ডার মুঘলস – রিচার্ড ইটন
    সত্যজিৎ রায় ও শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •