মেঘ প্রবন্ধে সুষ্মিতা রায়চৌধুরী (নিউ জার্সি, আমেরিকা)

    0
    23
    আমার রক্তমাংসের শরীরটা নিউজার্সিতে অন্তরাত্মা কলকাতায়।ব্লগার এবং লেখিকা।ভালোবাসা নাচ,ভ্রমণ এবং নতুন রান্না।আমার পরিচয় আমার কলম।
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    পুনশ্চ বইপাড়া

    সময়টা ২০০৭
    তখন কলেজস্ট্রিট আমার কাছে বড়ো হওয়ার মাপকাঠি। সুদূর বেহালা থেকে রোজ গলদঘর্ম হয়ে বা বৃষ্টিতে ভিজে ছুটতে ছুটতে সাদা থামের উঁচু রেলিংওয়ালা বিল্ডিংটায় পৌছনো। প্রাণের কলকাতা ইউনিভার্সিটি। প্রথম একমাসের শুরুতে সত্যি বলতে আর কিছু দেখিনি। ক্যন্টিনের ধূমায়িত চা আর পকোড়ায় বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটা তখন “হোক কলরব”। কখনও টেবিল বাজিয়ে আর্চিস গ্যালারি আবার কখনও তর্ক-বিতর্কে পাঁচ-ইয়ারী কথা। অমোঘ টানটা বুঝলাম যখন প্রথমবার কস্টিং আর একাউন্টটেন্সির বইয়ের দরকার পড়লো। সেই আমার প্রথম পদক্ষেপ….ঐতিহ্যের বইপাড়া।
    বাউন্ডুলে হলো মেয়েবেলা। গল্প পড়ার শখটাকে যেনো চাগাড় দিয়ে বাড়িয়ে দিয়েছিলো এই ভিড়ে ঠাসা একফালি “বই-পড়াকলকাতা”। তখন মনে হতো এখানে কোনও মেয়ে দোকানি নেই কেনো, আমি তাহলে হবো একজন। বেশ সারাদিন কাটবে এই চত্ত্বরে। এখন বুঝি ওসব শুধুই হুজুগ বা রক্তগরম করা বহিঃপ্রকাশ। শুধু কি তাই? বইপাড়া যদি শুধুই লেখাপড়া হয় তাহলে তো বাঙালি হওয়াই বৃথা। কলকাতার কলেজস্ট্রিটের সাথে প্রায় সমস্ত আড্ডাবাগীস মানুষের এক অলিখিত সম্পর্ক। তাই ট্রামের দুলকি চাল, হলুদ ট্যাক্সির বিহারী চালকের পানের পিক আর উত্তুরে কলতান পেরিয়ে আমার দক্ষিণী পরিপাটি সাজ যেখানে অবিন্যস্ত হতো তা “নিখিল, মঈদুল, সুজাতার” কফি হাউস। আপামর তারুণ্যের পীঠস্থান এই ইন্ডিয়ান কফিহাউস।
    বাঙালির রন্ধ্রে বইয়ের গন্ধ, আর তার খনি – আমাদের কলেজস্ট্রিট বই পাড়া। পুরনো বইয়ের গন্ধে, নতুন বইয়ের চটকে তখন আমাদের স্ব-সৃষ্ট বুর্জোয়া আধিপত্য। বাড়িতে লিটল্ ম্যাগাজিন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার চল থাকায়, আরো বেশী করে প্রতিবাদী হতো তারুণ্য। কলকাতা বইমেলার কোনঘেঁষা একটা স্টলের কলম বা মাঠের মাঝখানে শতরঞ্চিতে জায়গা পাওয়া দশ-কুড়ি পাতার একটা বই চোখ এড়িয়ে যেতো অনেকেরই। হয়তো অনেক নামীদামী লেখকের ভীড়ে এরা কোনওদিন জায়গা পায়নি কিন্তু এদের কলমে শান দিয়েছে বইপাড়া। জুতোর সোল খুইয়ে নিদারুণ প্রচেষ্টা ডায়েরী চাপা অগ্নিদগ্ধ লেখাগুলোকে মানুষের সামনে আনার। আমিও তখন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, তসলিমা নাসরিন, সুনীল-শক্তি, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, লীলা মজুমদার নিয়ে সুখনিদ্রায় ঢলে পড়লেও, স্বপ্নে তখন টিনের চালের ঘুপচি দোকান, একটা রঙবেরঙের ঝুলঝাড়া দিয়ে প্রতিনিয়ত বইয়ের ধুলো ঝাড়া, টুলের ওপর রাখা মাটির ভাঁড়ের চা আর কি আশ্চর্য নিপুণ কৌশলে পরপর সাজিয়ে রাখা বইয়ের সিঁড়ি। সেই স্বপ্নের ফলপ্রসূত আমার নিজের কলম। পকেটমানিতে টান পড়ায় তখন উঠে এলো নতুন তথ্য, “ভাড়া দেওয়া হয় বই”। কিন্তু কৌতুকমিশ্রিত প্রশ্ন, “বাঙালি তো বইচোর, বই ফেরত পাবেন তো”। হ্যাঁ, ফেরত দিয়ে যেতো সবাই। আমার কাছে অনেক নষ্টের গোড়া এই বইপাড়া। সুতীর পাঞ্জাবী, রংচটা জিন্স আর হাওয়াই চপ্পল, চশমাটা ঠিক করে নিয়ে জয় গোস্বামী আওড়ানো অগোছালো সুন্দরের প্রেমে পড়া ওই তখন থেকেই।
    কিন্তু তখনও বৃষ্টিতে ত্রিপল খাটানোর তোড়জোড়ে নষ্ট হতো বই। তখনও একটু ঝড়ে লন্ডভন্ড হতো ছোট ব্যবসা। কিন্তু সব প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক যুদ্ধেই মনে হতো, আমিও তো লড়ছি। মিটিং মিছিলের স্লোগানে তখন অনেক “বইকাকুর” স্নেহধন্যা আমি। গোটা শহরটা তখন সপ্তাহের সাতদিন বউবাজার অঞ্চলের গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ’র মোড় থেকে মহাত্মাগান্ধী রোডের মোড় পর্যন্ত, প্রায় ১.৫ কি.মি. রাস্তার দুধারে প্রসারিত। উত্তর-মধ্য কলকাতা কার্পণ্য করেনি এই “পলিসড্” দক্ষিণীকে কাছে টানতে বরং পাল্টে দিয়েছিলো অনেকটাই।
    চিন্তাশীল বাঙালি, রুচিশীল বাঙালি, প্রতিবাদী বাঙালি, আন্দোলনকারী বাঙালি….কে না স্থান পায় এখানে? চিন্তাচেতনায় বই পাড়ার অবদান অনস্বীকার্য। যেখানে সময় অতিবাহিত হয় কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া। বা হয়তো একটাই কারণে, কলকাতার ঘ্রাণ ভালোবেসে।
    সন্ধ্যা নামে আলোকিত দুপুরে পেরিয়ে। টিমটিম করা টিউবের আলোয় বা হলুদ বাল্বের আলোয় ঝাঁপি ফেলে দৈনন্দিন রোজনামচা। বৃষ্টির টুপটাপ বিন্দু মিশে যায় পরিত্যক্ত চায়ের খুঁড়িতে। ধূসর হয় বইপাড়া…..

    সময়টা ২০১৯
    মার্কিনী ঢঙে ঢঙী আমি এখন বাসে উঠতে গেলেই কুপোকাৎ। অতএব বন্ধুদের দাপটের সাথে বললেও “চল আবার আগের মতন বইপাড়া”, বুঝলাম আগের মতন অনেক কিছুই আর নেই। কিন্তু কুছ পরোয়া নেহি। ইনহেলারে ফুসফুসকে বন্দক রেখে পা ফেললাম রৌদ্রস্নাত স্মৃতিসরণীতে। চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ সেই সাদা বিল্ডিং-এর সামনে। সেই বই হাতে একদঙ্গল বন্ধু, হেডফোন কানে দেওয়া সদ্য বড়ো হয়ে ওঠা, সেই একরকম হাতটানা রিক্সার টুং-টাং, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্টে সারমেয়দের ভীড়। যেনো আমায় মধ্যমণি করে আমার চারদিকে ঘুরছে লক্ষাধিক বই, ভারতীয় ভাষার সাথে ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও ইংল্যান্ডে ‘আউট-অফ-প্রিন্ট’ হয়ে যাওয়া অগুন্তি বই, সেকেন্ড হ্যান্ড বই, গল্পের বই, পাঠ্য বই। তাদের একএক রকম রং, একএক রকম মলাট, আলাদা ঘ্রাণ। সম্বিৎ ফেরে রাস্তার ওপারে দাঁড়ানো পুরনো বন্ধুদের ডাকে। সামনে দাঁড়িয়ে আভিজাত্যের কফিহাউস। ঢাউস পাখাগুলো, প্লাস্টিকের চেয়ার, চৌকো টেবিল, বড়ো জানলা আর সাদা উর্দি, কালো বেল্ট পরিহিত ওয়েটার আর তাদের সাদা চোং ওঠা পাগড়ী। কিছু জিনিস পাল্টায় না। যেখানে তারুণ্য তোলপাড় ভাষা-রাজ্য-ধর্ম নির্বিশেষে। সেদিন সময় থেমে থাকেনি আমাদের জন্য কিন্তু নতুন মোড়কেও বইপাড়া একটুও ম্লান হতে দেয়না পুরনো চেনা গন্ধ। প্যরামাসের সরবতে চুমুক দিয়ে সেদিন তাই আমি আবার ফিরে এসেছিলাম একা। তখন আমি অগোছালোর খোঁজে। পড়ন্ত বিকেলের আলসেমিতে তখন বই-পড়া কলকাতা। খুঁজে বার করলাম পুরনো দোকান কিন্তু বইকাকু আজ পাল্টে গেছে। বগলদাবা করলাম শেষের কবিতা, ভালোবাসার বারান্দা, জোনাকির বাড়ি। পুরনো বই খোঁজাটা একটা নেশার মতন। তাই মার্কিনমুলুকে নতুন বাড়ি সাজাতে হাত পড়লো পুরনো বইয়ের সম্ভারে। কথা হলো বইবিক্রেতাদের সাথে। বুঝলাম যে দোকানটা সস্তায় কেনা হয়েছিলো একদিন, আজ তার জন্য বিক্রীবাটায় এতোটা টান পড়েছে যে তাকে নতুন করে সাজানো অসম্ভব। কদিন আগের দেখা কুমোরটুলির হাল মনে পড়লো। মা দুর্গার চোখে তুলির টান আঁকবে কি শিল্পী, দুদিনের বৃষ্টিতে তখন মা দুগ্গাকে বাঁচাতেই হিমশিম কুমোরপাড়া। গল্পটা হলো, ঐতিহ্যের মোড়কে পরিকাঠামোর জরাজীর্ণতা ঢেকে রাখার চেষ্টা। নাহ, মাল্টিপ্লেক্স ডিজাইন এখানে বেমানান। তবে বাঙালীর জ্ঞানপীঠ হোক বা তর্কবাগীশ আড্ডা, বইপাড়ার আরো অনেকটা যত্ন দরকার। বই পড়ার অভ্যাস ও জনপ্রিয়তা হারিয়েছে অনেকটাই। আর যতটুকু বেঁচে আছে তা কিন্ডল বা পি.ডি.এফ সংস্করণ। লিটল ম্যাগাজিন আজকাল একটু মুখ তুলে চাইলেও তা কেনে কজন? এসব ভাবতে ভাবতেই সেদিন ধুলো মাখা রাস্তাটার মুখের ওপর কাঁচ তুলে দিয়েছিলাম আমি…কিন্তু সেদিনও এতটুকু কার্পণ্য করেনি বইপাড়া, আদরে আপন করে নিয়েছিলো গ্লোবাল বাঙালীয়ানাকে। পিছনে ক্রমশ ধূসর তখন ফুটপাথ-লাইব্রেরি।

    ২০২০, আম্ফানে বইপাড়া
    ক্রোশ দূরে বসে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো ছবিটা। বইগুলো যেনো বেনামী লাশের মতন ভেসে যাচ্ছে জলে। টিনের চাল হাওয়ায় উড়ে গেছে নিশ্চয়ই। টুলের ওপর রাখা চায়ের ভাঁড়ের সাথে গুঁড়িয়ে গেছে কতো স্বপ্নের কলম। জ্ঞান তো কবেই আক্রান্ত অমানবিকতায়। এবার আক্রান্ত বাঙালীর পীঠস্থান। তাহলে এই কি সমাপ্তির শুরু? ভয়াবহ পাশবিক আম্ফানে ক্ষতির পরিসংখ্যান অনেক কিন্তু এই বিশেষ ছবিটি যেনো চিরে দিয়ে যায় অন্তরটাকে। এক অসহায় নিষ্পাপ নির্বাক নির্জীব প্রাণের মৃত্যু। আপনি বলবেন বইয়ের আবার প্রাণ কোথায়? তাহলে সুদিন ফিরলে বইপাড়াতে একবার সময় কাটিয়ে আসুন। বই কিনতে হবে না, শুধু অস্তগামী সূর্যকে সাক্ষী রেখে একবার স্পর্শ করে দেখুন নতুন মলাট। কফি হাউসের ফিস পকোড়ায় আলতো কামড় দিয়ে একবার ঝালিয়ে নিন ফেলে আসা বন্ধুত্ব। বুঝতে পারবেন, প্রাণ কোথায় বইপাড়ায়। বই জিনিসটা কখনও পুরনো হওয়ার নয়। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখক যা লিখেছেন, পাঠক অন্তর দিয়ে তা আবিষ্কার করতে যখন সক্ষম হয়, তখন পাঠক নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করে, সিদ্ধিলাভ হয় লেখকের। তাই আসুন এগিয়ে আসি সকলে। ক্যামেরাবন্দী করে সাজিয়ে রাখতে ভালো লাগে যে বইপাড়াকে তাকে বই কিনে বা যেকোনো ভাবে সাহায্য করে বাঁচিয়ে নেওয়াটা এখন কর্তব্য। অনেকেই এগিয়ে আসছেন যোগাযোগ করতে। আম্ফানের আস্ফালন তছনছ করে দিয়েছে অনেকটা কিন্তু মনোবলের মেরুদন্ড ভাঙবে এমন শক্তিমান সে নয়। বইপাড়া ভালোবাসি তোমায়। ফিরে দেখবো আবার আমার মেয়েবেলা এবার নতুন প্রজন্মের চোখ দিয়ে। জেগে ওঠো “বই-পড়া কল্লোলিনী”…

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •