কন্ঠস্বর চয়ন মুখার্জি (পর্ব – ৪)

    0
    25
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    ।। পর্ব চার ।।

    “Did I once suffer, Subhash at your hand?”
    জীবন সায়াহ্নে পাড়ি দেওয়া এক বৃদ্ধ , এককালে প্রতাপশালী ইংরেজি সাহিত্য এবং পরবর্তীতে ইতিহাসের অধ্যাপক, তার বিখ্যাত এবং স্বদেশবাসীর রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া এক ছাত্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এই কাতর প্রশ্ন রাখছেন।
    অধ্যাপকের নাম? এডওয়ার্ড ফার্লে ওটেন।
    আর ছাত্রের নাম? সুভাষচন্দ্র বসু। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
    ওয়েবসিরিজের কল্যাণে দৃশ্যটা এখন খুব পরিচিত। ব্রিটিশ কোট টাই পড়া ছাত্রাবস্থার সুভাষ পায়ের জুতো খুলে প্রেসিডেন্সির শিক্ষক ওটেন সাহেবকে পেটাচ্ছেন। তবে এর বহু আগে একটি বাংলা সিনেমাতেও এই দৃশ্য একইভাবে দেখানো হয়েছিল। বাঙালির নিজস্ব সুপারম্যানের এই হিরোগিরি , প্রত্যেকের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছিল।
    ওটেন সাহেবের এই কান্ডকে কেন্দ্র করে বাংলায় সংঘটিত হয়েছিল প্রথম ছাত্র ধর্মঘট , ঝড় উঠেছিল বাংলার সমাজ জীবনে, জড়িয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ সহ আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের নাম। তদন্তের নামে প্রহসন হয়, কলেজ অধ্যক্ষ মিঃ জেমস সুভাষচন্দ্র বসু, বিপিন দে, ভোলানাথ রায়, অনঙ্গমোহন দামকে চিরতরে কলেজ থেকে বিতাড়িত করেন।যদিও পরবর্তীকালে শুধুমাত্র সুভাষচন্দ্র ও অনঙ্গমোহন শাস্তি পেলেন এবং যথাক্রমে এক বছর পরে সুভাষচন্দ্র ১৯১৭ সালে এবং অনঙ্গমোহন ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ যে কোনো কলেজে পড়ার অনুমতি পান কিন্তু তাঁরা আর প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিরে আসেননি।
    কিন্তু আদতে সত্যিই কি সুভাষ ওটেন সাহেবকে হেনস্থা করেছিলেন?
    ইউরোপে থাকাকালীন স্বয়ং সুভাষচন্দ্রকে এই প্রশ্ন অনেকেই করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র মৃদু হেসে চুপ থাকতেন ।
    আসুন একবার দেখে নেওয়া যাক। আদতে সেইদিন কী ঘটেছিল।
    সন ১৯১৫।
    প্রেসিডেন্সির তৎকালীন অধ্যক্ষ হেনরি জেমস ছাত্রদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তেমন না রাখলেও “The Student’s Consultative Committee” গঠন করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু ওই কমিটির সদস্য ছিলেন তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণির কলা বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে।
    একত্রিশ বছরের ফার্লে ওটেন প্রাথমিকভাবে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন এবং পরবর্তীতে গ্রিক ও পাশ্চাত্য ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষক পদে নিযুক্ত হোন। কিন্তু তাঁর ভারতীয় ইতিহাস জ্ঞান নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।
    হিন্দু কলেজ তথা প্রেসিডেন্সি কলেজে পাঠরত বহু ছাত্র নিকটবর্তী ইডেন হিন্দু হোস্টেলে থাকতেন। মোট ২৫২ জন আবাসিক ছাত্র পাঁচটি ওয়ার্ডে বাস করতেন এবং প্রত্যেকটি ওয়ার্ড আলাদা ভাবে নিজেদের বার্ষিক অনুষ্ঠান পালন করতো।
    ১৯১৫ সালে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বার্ষিক উৎসবে আমন্ত্রিত হলেন ওটেন। তাঁর কোনো এক গুণমুগ্ধ ছাত্র আমন্ত্রণ করেছিলেন বলে শোনা যায়।এছাড়া অনুষ্ঠানে ছিলেন মনোবিজ্ঞানের খগেন্দ্রনাথ মিত্র, ইংরেজির প্রফুল্ল ঘোষ ও বিজ্ঞানের শিক্ষক পিক সাহেব। খগেন্দ্রনাথ মিত্র ছাত্রদের অনুরোধে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বিরচিত ” বঙ্গ আমার, জননী আমার” গানটি ছাত্রদের সঙ্গে গেয়েছিলেন। এদিকে গুজব রটেছিল যে ব্রিটিশ সরকার এই গানটি নিষিদ্ধ করতে চলেছে।
    স্বভাবতই প্রবল রাজভক্ত ওটেন এই ঘটনা ভালোভাবে নেননি এবং পরে ওই একই অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি বলেন যে ভারতীয়রা “বর্বর” এবং ইংরেজদের এদেশে আসার কারণ নাকি বর্বরদের সভ্য করা – England’s mission in India is to civilise the barbarians ।পরবর্তীকালে ছাত্রবিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে একটু ঘুরিয়ে ভাষ্য করা হয়, ” As the Greeks had hellenised the barbarian people with whom they came in contact, so the mission of the English is to civilise Indians”.
    ওটেনের এই ভারত বিদ্বেষ অনেক ছাত্রই ভুলতে পারেননি এবং ছাত্রমহলে এটাও প্রবলভাবে চর্চিত হতে থাকে যে অর্থের জন্যই ওটেন এই দেশে অধ্যাপনা করতে এসেছেন।
    কিন্তু এই ঘটনার রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আরো একটি ঘটনায় ওটেনের চরম অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ ঘটলো।
    ১৯১৬ সালের ১০ ই জানুয়ারি , সোমবার।
    কলেজ চত্বর সংলগ্ন হিন্দু হেয়ার স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। স্কুলের প্রায় পনেরো জন ছাত্র প্রেসিডেন্সিতে পড়তেন। আমন্ত্রিত ছাত্ররা বেলা সোয়া বারোটা নাগাদ তিন চারজনের ছোট ছোট দলে কলেজে ফিরছিলেন।মেইন বিল্ডিং এর তিন তলার তিন নম্বর ঘরে ক্লাস নিচ্ছিলেন ওটেন। একদল ছাত্র সেই ঘরের পাশ দিয়ে তাদের ইংরেজি ক্লাসরুম , এক নম্বর ঘরে যাচ্ছিলেন।ছাত্রদের কথাবার্তা ও পথচলার শব্দে ক্ষিপ্ত হয়ে ওটেন সাহেব ক্লাসরুম থেকে ছাত্রদের বকুনি দেন ও জরিমানা করার ভয় দেখান।
    এদিকে বেলা সাড়ে বারোটা বেজে যাওয়ায় ইংরেজির অধ্যাপক ও ওটেন সাহেবের সহকর্মী রবীন্দ্রনারায়ণ ঘোষ ছাত্রদের ক্লাস না নিয়ে ছুটি দিয়ে দেন এবং তিনি বেরিয়ে আসতে, স্বাভাবিকভাবেই ছাত্ররাও বেরিয়ে আসতে থাকে দলে দলে। ফলে, সবরকম সৌজন্য হারিয়ে ওটেন ক্লাস থেকে বেরিয়ে ছাত্রদের গালমন্দ ও শারীরিকভাবে নিগ্রহ করেন।
    সেদিন ওটেনের হাতে ঘাড়ধাক্কা খাওয়া ছাত্র, পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেবেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ৭৭ বছর বয়সে “মডার্ন রিভিউ” পত্রিকায় লেখেন যে , ১ নম্বর ঘরে প্রথম বর্ষের বিএ ইংরেজি ক্লাসের ঘরের বাইরে করিডর ধরে তারা যখন হেঁটে আসছিলেন , ওটেন তাকে ঘর ছাড়ার কারণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
    সেই সময় দেবেন্দ্রনাথ বাবুকে প্রায় ১০ ফুট দূর থেকে অনুসরণ করে আসছিলেন বিভূতি বন্দ্যোপাধ্যায় নামক এক সহপাঠী। ওটেন তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে কিঞ্চিৎ ধাক্কা (push) দিয়ে তাঁকে ১ নম্বর ঘরে চলে যাওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু বিভূতি দাঁড়িয়েই থাকেন। ওটেন তখন দেবেন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে ক্লাসরুমে ঢুকে যেতে বলেন , কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ বাবু পাল্টা তর্ক করেন কারণ ভারতীয় অধ্যাপকের নির্দেশেই তারা ক্লাসরুম ছেড়েছিলেন।
    সংযম হারিয়ে ওটেন তখন ভারতবিদ্বেষী তাড়নায় দেবেন্দ্রনাথকে ডান হাত দিয়ে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ক্লাসরুমে ঢুকে যেতে বলেন।সুভাষচন্দ্র তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী “Indian Pilgrim” বা “ভারত পথিক” এর “The Presidency College Trouble , a true version” শীর্ষক প্রতিবেদনে সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন যে ওটেন অন্যায়ভাবে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ছাত্রদের অপমান করেছেন।
    এইসব ঘটনা যখন ঘটছে, তখন সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন কলেজ গ্রন্থাগারে। সংবাদ পাওয়া মাত্রই তিনি কলেজের স্টুডেন্টস কনসালটেটিভ কমিটির সদস্য হিসাবে অধ্যক্ষ হেনরি জেমসের সঙ্গে দেখা করেন এবং ওটেনকে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করার দাবী জানান।কিন্তু অধ্যক্ষ জেমস, ওটেনের সঙ্গে আপোষ মীমাংসার প্রস্তাব দেন যা স্বাভাবিকভাবেই সুভাষচন্দ্র এবং অন্যান্য ছাত্রদের মনঃপুত হয়নি।
    ফলে পরদিন থেকেই প্রেসিডেন্সি কলেজে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে শুরু হয়ে গেল লাগাতার ছাত্র ধর্মঘট ব্রিটিশ ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে এটিই ছিল পরাধীন ভারতের প্রথম ছাত্র ধর্মঘট যা তৎকালীন বাঙালি সমাজে তুললো আলোড়ন।
    এই ঘটনার পরের দিন হিন্দু হোস্টেলের দোতলার চার নম্বর ওয়ার্ডে বিপিনচন্দ্র দের (পরবর্তী কালে ঈশান-স্কলার এবং সিলেট কলেজের অধ্যক্ষ ) ঘরে এক সভায় মিলিত হয়ে সুভাষচন্দ্র তাঁর সতীর্থ চারুচন্দ্র গাঙ্গুলি , ভোলানাথ রায়, অনঙ্গমোহন দাম প্রমুখ সতীর্থকে ধীর স্থিরভাবে বোঝান যে – হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে কিছু করা ঠিক নয়।
    সুভাষচন্দ্র আরো বলেন যে, প্রেসিডেন্সি কলেজ হচ্ছে সরকারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে লোকে ছেলেদের পড়তে পাঠায় ভবিষ্যতে বড় সরকারি চাকরির আশায়। এখানে যদি ধর্মঘট হয়, তাহলে সরকার আতঙ্কিত হবে এই ভেবে যে ছেলেরা তাদের চাকরি তুচ্ছ করার কথাও ভাবতে শুরু করেছে। বাকিরা সুভাষচন্দ্রের যুক্তির সঙ্গে একমত হোন।
    ফলস্বরূপ পরের দিন থেকেই প্রেসিডেন্সি কলেজে লাগাতার ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয়ে গেলো। পরাধীন ভারতে এটিই ছিল প্রথম ছাত্র ধর্মঘট।বাঙালি সমাজে আলোড়ন উঠলো।
    ধর্মঘটের সংবাদ প্রকাশের জন্য সুভাষচন্দ্র, অনঙ্গমোহন ও বিপিনচন্দ্র অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক দেশভক্ত মতিলাল ঘোষের কাছে যান । সংবাদ শুনেই খুশি হয়ে মতিলাল ঘোষ ছাত্রদের কাছে গান শুনতে চান। সুভাষচন্দ্র শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের প্রিয় গান “চিন্তায় মন মানস হরি” গেয়ে শোনান।
    অমৃতবাজার পত্রিকা ছাড়াও “দ্য বেঙ্গলি”, “ইংলিশম্যান” ইত্যাদি পত্রিকার মাধ্যমে ধর্মঘটের খবর বাংলা ও ইংরাজি দুই ভাষার পাঠকের কাছেও পৌঁছে গেল ।
    ধর্মঘটের তৃতীয় দিনে ওটেন নিঃশর্ত দুঃখ প্রকাশের প্রস্তাব দিলে ছাত্ররা সে প্রস্তাবে রাজী হোন এবং ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। ১৯১৬ সালের ১৩ ই জানুয়ারি শেষ হয় বাংলা তথা ভারতের প্রথম ছাত্র ধর্মঘট। চারিদিকে ছাত্রদের নামে ধন্য ধন্য পড়ে গেলো ।
    কিন্তু ওটেন সাহেব তাঁর মনের বিদ্বেষ কমাতে পারেননি এবং ক্ষমা চাওয়ার স্মৃতি ভুলতে পারেননি। ফলে আবার ছাত্র নির্যাতনের ঘটনা ঘটলো যার জল গড়ালো বহুদূর।
    ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ১৯১৬, মঙ্গলবার, সকাল সাড়ে দশটা।ধর্মঘট শেষ হওয়ার ঠিক একমাস দুই দিন পরের ঘটনা।
    সেইদিন রসায়নাগারে ফসফরাসের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তা সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর ক্লাস ছুটি হয়ে যাওয়ায় ওটেনের ঘরের পাশ দিয়ে ছাত্ররা গল্প করতে করতে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তারা যাতে গল্প না করে ক্লাসে যায় তার জন্য ওটেন বেরিয়ে আসেন। ঠিক সেই সময় প্রথম বার্ষিক আই এস সি র ছাত্র কমলাভূষণ বসু কাউকে দেখে কিংবা কোনো কারণে “পঞ্চানন, পঞ্চানন” বলে চেঁচিয়ে ওঠে।
    ওটেন কমলাভূষণকে ধরে “College Steward” এর কাছে নিয়ে গিয়ে নিয়মমাফিক এক টাকা জরিমানা করান। কিন্তু পরবর্তীকালে খোদ প্রেসিডেন্সি অনুসন্ধান কমিটি এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছিল যে ,”There is no reason to suppose that the boy did so with intent to create a disturbance or annoy Mr. Oaten”.
    জরিমানার অর্থ দিয়ে সোয়া বারোটা নাগাদ কমলাভূষণ অধ্যক্ষ জেমসের কাছে মৌখিক অভিযোগ জানান যে ওটেন তাকে অকারণে ঘাড় ধরে College Steward এর কাছে জরিমানা করিয়েছেন এবং তাকে রাস্কেল বলেছেন। দ্রুত ছাত্রমহলে রটে যায় অকারণে চড় মারা, গলাধাক্কা, জরিমানা, রাস্কেল ও ভারতীয়দের বর্বর বলার নানা বার্তা।
    এর কিছুকাল আগেই উল্লাসকর দত্ত এক ব্রিটিশ অধ্যাপকের অভব্য আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ওই অধ্যাপককে জুতো খুলে পিটিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি ছাত্রদের মনে গুঞ্জরিত হতে থাকে।
    সুভাষচন্দ্রকে এড়িয়েই তাঁর সতীর্থরা এবার নিজেরাই হিন্দু হোস্টেলে এক গোপন বৈঠকে বসে ” একশন স্কোয়াড” গড়ে তুলেন।বৃহত্তর রাজনীতির ছায়া এসে পড়লো প্রেসিডেন্সির ছাত্র আন্দোলনে।
    সুভাষচন্দ্রকে এড়িয়েই তাঁর সতীর্থরা হিন্দু হোস্টেলে বসে ” একশন স্কোয়াড ” গড়ে তুললেন। এই স্কোয়াডের সদস্য ছিলেন অনঙ্গমোহন দাম , চন্দ্রমোহন বক্সী , বিপিনচন্দ্র দে , বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ( সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ নন) , সুভাষচন্দ্রের নিজের মামা রণেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ।
    একশন স্কোয়াডের সদস্যরা ঠিক করলেন তাদের কর্মপন্থা সুভাষচন্দ্রকে জানাবেন না। তাঁরা অনুমান করেছিলেন যে প্রাজ্ঞ, স্বভাবগম্ভীর, ধীর স্থির সুভাষচন্দ্র তাদের পাল্টা মারের কর্মসূচী কিছুতেই সমর্থন করবেন না।
    বাস্তবিকই তাই। সুভাষচন্দ্র চেয়েছিলেন ওটেনের সঙ্গে অন্যভাবে বোঝাপড়া করতে। তিনি স্থির করেছিলেন একা ওটেন সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর অন্যায় আচরণের জন্য কৈফিয়ত চাইবেন। সুভাষচন্দ্রের এই সিদ্ধান্তই পরবর্তী কালে তাঁর ওপর অবিচারের সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
    এরপরের ঘটনাপ্রবাহ এইরকম।
    ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ১৯১৬। সকাল দশটা।
    সুভাষচন্দ্র ওটেনের চাপরাশির বংশীলালের কাছে গিয়ে খবর নেন, ওটেন সাহেব কখন আসবেন।
    বেলা দেড়টা।
    প্রথম বার্ষিক স্নাতকোত্তর ইতিহাস ক্লাস শেষ করে ওটেন সাহেব একতলায় নেমে নোটিশ বোর্ডে একটি বিজ্ঞপ্তি লাগাচ্ছিলেন। এমন সময় ১৩-১৫ জন ছাত্রের একটি দল তাকে ঘিরে ধরে এবং একজন হঠাৎ তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় এবং কেউ কেউ গায়ে আঘাত করে। ভূ লুণ্ঠিত অধ্যাপক কাউকে চিনতে পারেননি । শুধু দেখেছিলেন আক্রমণকারীরা বেকার ল্যাবরেটরির পাশ দিয়ে ইডেন হোস্টেলের দিকে চলে যায়।
    বহু বছর পরে ওটেন সাহেব তার স্মৃতিচারণে বলেছিলেন যে তাঁর শরীরে সামান্য কিছু ছড়ে যাওয়ার দাগ হয়েছিল। কোনও কোনও ছাত্র স্মৃতিচারণে বলেছিলেন যে ওটেন সাহেব যখন সিঁড়ি দিয়ে নামেন তখন সেখানে সাত আটজন ছাত্র মুখে রুমাল বেঁধে অপেক্ষা করছিল। এক দুই ঘা খাওয়ার পরে ওটেন নাকি বলেন, ” এনাফ বয়েজ এনাফ”। ওটেন সাহেব পড়ে গেলে তাকে ছেড়ে ছাত্ররা হিন্দু হোস্টেলে পালায় । ওই ছাত্রদের দলে ছিলেন সুভাষচন্দ্রের আপন মামা রণেন দত্ত।
    স্বভাবতই এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং শোনামাত্র বাঙালি সমাজ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। ব্রিটিশ শক্তি এই ঘটনা চুপচাপ হজম করার পাত্র ছিল না।
    পরের দিন , অর্থাৎ , ১৬ ই ফেব্রুয়ারি , ১৯১৬ , প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ জেমস , ওটেন সাহেবের চাপরাশি বংশীলালকে আড়ালে রেখে Identification Parade এর ব্যবস্থা করেন। এই বংশীলালের কাছেই আগের দিন সুভাষচন্দ্র খোঁজ নিয়েছিলেন ওটেন সাহেব কখন আসবেন। বংশীলাল অপেক্ষাকৃত খর্বাকৃতি অনঙ্গমোহন দাম , এম এ (দর্শন) ফাইনাল ইয়ার, এবং সুভাষচন্দ্র বসু , তৃতীয় বার্ষিক , বিএ ( দর্শন) ক্লাসের দীর্ঘাকৃতি ছাত্র, যিনি কলেজে ছাত্রনেতা বলেও সুপরিচিত, এই দুজনকে সনাক্ত করেন ওটেন সাহেবকে প্রহরকারী হিসেবে।
    তদন্ত কমিশন গঠিত হয় যার প্রধান ছিলেন অধ্যক্ষ জেমস । সুভাষচন্দ্রকে জেমস সাহেব জিজ্ঞাসা করেন,
    -” তুমি কি ওটেন সাহেবকে মেরেছো?”
    -” না”
    -“তুমি জানো , কে মেরেছে?”
    -” জানলেও বলবো না । পরের নামে বলা আমার স্বভাব নয়।”
    সারা জীবনেও সুভাষচন্দ্র কাউকে , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এমনকি নিজের পিতা জানকীনাথ দত্তকেও বলেননি, কে আসল দোষী ছিল। চিরকালের জন্য ছাত্রজীবনের পরিসমাপ্তির সম্ভাবনা মাথায় নিয়েও সহপাঠীদের আড়াল করেছেন তিনি।
    বর্ন লিডার । বিবেকানন্দ কথিত , ” শিরদার তো সর্দার” এর মূর্ত প্রতিচ্ছবি ছিলেন সুভাষচন্দ্র।
    কিন্তু বলাই বাহুল্য , জেমস সাহেব এই ঘটনাকে ভালোভাবে নেননি। এবং তাঁরই প্ররোচনায় প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ না থাকা সত্বেও সুভাষচন্দ্র এবং অনঙ্গমোহনকে বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত নেয় তদন্ত কমিশন।ঘটনার অভিঘাতে কলেজ কিছুদিন বন্ধ থাকে।
    স্বভাবতই সংবাদমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। দেশের অনেক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ছাত্রদের নিন্দা করলেও ব্যতিক্রম ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বিবৃতি দেন যে , ” যাদের উচিত ছিল জেলের দারোগা বা ড্রিল সার্জেন্ট বা ভূতের ওঝা হওয়া, তাদের কোনো মতেই উচিত হয় না ছাত্রদিগের মানুষ করিবার ভার নেওয়া…”( ছাত্র শাসনতন্ত্র- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
    এবার দেখে নেওয়া যাক তৎকালীন নানা ব্যক্তিত্বের সাক্ষ্য কী বলে যাদের মধ্যে ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও আছেন।
    প্ৰথমেই অপর বিতাড়িত ছাত্র অনঙ্গমোহন দামের বক্তব্য।
    তিনি স্পষ্ট লিখেছেন , ” এই মারামারির মধ্যে সুভাষচন্দ্র ছিলেন না। তবে ছাত্রদের আন্দোলনের পুরোবর্তীদের অন্যতম ছিলেন বলিয়াই তাঁর নাম উঠিয়াছিল। এ ব্যাপারে তাঁহার ও আমার, দুজনের শাস্তি হইয়াছিল।”
    সুভাষচন্দ্রের সহপাঠী নলিনীকিশোর রায় লিখেছেন, -” এই ঘটনাকে নিয়ে রচিত হয়েছে কত গল্প, লিখিত হয়েছে সুভাষচন্দ্রের জীবনীর এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার প্রায় সর্বত্রই সুভাষচন্দ্রকে মিঃ ওটেনের প্রহারকারী দলপতিরূপে চিত্রিত করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ জ্ঞানে মুক্ত কন্ঠে বলছি, – না , এই কথা সত্য নয়। মিঃ ওটেনের প্রহারের ব্যাপারে কোনো স্তরেই সুভাষের কোনো রূপ সহযোগিতা ছিল না।না তার নেপথ্য পরিকল্পনায়, না তার প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে। বস্তুত সুভাষ ছিলেন মিঃ ওটেনের ত্রাতা ও প্রাণরক্ষক।”
    সুভাষচন্দ্রের মামী নিশাপতি দেবীর পুত্র প্র্দ্যুৎ বসুর এক স্মৃতিকথায় জানা যায় , ওই প্রহারকারী ছাত্রদের দলে সুভাষচন্দ্রের নিজের মামা রণেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন এবং সুভাষচন্দ্র আদৌ ছিলেন না। চাপরাশির কাছে ওটেন কখন আসবেন খোঁজ নেবার কারণেই তাঁকে দলের পান্ডা বলে সন্দেহ করা হয়।
    ভাষাচার্য ডঃ সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য দেখা যাক। তিনি লিখেছেন ,” ১৯১৮ সালে একটি আন্তর্কলেজ অনুষ্ঠানে সুভাষচন্দ্রকে আমি প্রথম দেখি। তাঁর বলিষ্ঠ দীর্ঘ দেহ এবং প্রতিভাদীপ্ত আননে অসামান্য বুদ্ধি গভীরতা লক্ষ্য করে তাঁকে স্বতন্ত্র বলে মনে হয়েছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপক ওটেন সম্পর্কিত ঘটবে আমি দুঃখ বোধ করেছিলাম। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে সুভাষ এ ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত ছিলেন না। ছাত্রনেতা হিসেবেই তিনি দন্ডিত হয়েছিলেন।”
    এরপরে অধিক আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। আশা করা যায় , পাঠক বুঝতেই পারছেন , ওটেন সাহেবকে হেনস্থা করা সংক্রান্ত কোনো ঘটনায় সুভাষচন্দ্র জড়িত ছিলেন না। ওয়েব সিরিজ , সিনেমা যতই দেখাক, তা মিথ্যা।
    ভারত বিদ্বেষী হলেও সুভাষচন্দ্রের প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলেন ওটেন সাহেব। যেমন নেতাজির আজন্ম শত্রু ব্রিটিশদেরও কেউ কেউ পরবর্তীকালে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। ওটেন সাহেব যখন শিক্ষা বিভাগের অধিকর্তা হয়েছিলেন তখন সুভাষচন্দ্র ইউনিভার্সিটি ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। ওটেন সাহেব পরিদর্শনে এসে সুভাষচন্দ্রের কার্যকলাপ দেখে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে নন কমিশনার অফিসার পদ দিয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্রকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন ওটেন সাহেব যার একটি অংশ এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লিখিত হয়েছে।
    যদিও পাঠক এতক্ষণে বুঝতেই সক্ষম হয়েছেন যে কেন তদন্ত কমিশনের সামনে সুভাষ দোষী ছাত্রদের নাম প্রকাশ করেননি, তবু , চলুন এ ব্যাপারে আরেকজন ভদ্রলোকের বক্তব্য জেনে নেওয়া যাক। ভদ্রলোকের নাম , সন্ন্যাসী ভগবানজী বা গণমাধ্যম বর্ণিত গুমনামীবাবা অথবা …..
    …… স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
    অতীত জীবনের কথা একদা অন্তরঙ্গ চারনিককে শুনিয়েছিলেন এই সন্ন্যাসী। বলেছিলেন, এক আত্মীয় ( সম্ভবত রণেন্দ্রনাথ দত্তের মা) হাত ধরে তাঁর কাছে সেই সময় অনুরোধ করেছিলেন, ” আমার ছেলেকে বাঁচা” ।
    সুভাষচন্দ্র কথা দিয়েছিলেন, বাঁচাবেন। সারাজীবন সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে গেছেন।
    নেতা আসবেন যাবেন। কিন্তু নেতাজি আর কেউ হবেন না, ওই একজনই, ওই রাসটিকেট হওয়া ছেলেটাই।
    গান্ধীর ভাষায় , স্পয়েলড চাইল্ড।
    তাঁর জন্ম আছে, কিন্তু মৃত্যু নেই। তার নামে বা ছবিতে নোট ছাপা হয় না, মূর্তি গড়া হয় না। কিন্তু কোটি কোটি ভারতবাসীর মনে তিনি অমর।
    জয় হিন্দ। জয়তু নেতাজি।
    তথ্যসূত্র :
    ১/ সুভাষচন্দ্র কি আদৌ ওটেন প্রহার পর্বে ছিলেন- জয়ন্ত চৌধুরী
    ২/ ভারতপথিক – সুভাষচন্দ্র বসু
    ৩/ Subhas Chandra Bose – Edward Farley Oaten
    ৪/ ” What led to ‘Oatenization’in Presidency College, Calcutta”- D N Banerjee
    ৫/ শ্রীযুক্ত ওটেন ও সুভাষচন্দ্র বসু – সুধীন্দ্রলাল রায়
    ৬/ ওটেন ও সুভাষচন্দ্র – বিমান বিহারী মজুমদার
    ৭/ সুভাষ কি ওটেনকে মেরেছিলেন ?- বারিদবরণ রায়
    ৮/ আমার ভারত স্মৃতি – ই এফ ওটেন (অনুবাদ- সুবল গাঙ্গুলি )
    ৯/ Report of the Presidency College Enquiry Committee
    ১০/ Oaten Incident, 1916 A Chapter in the life of Subhas Chandra Bose – Bholanath Roy
    ১১/ Song of Aton and other verses by Oaten
    ১২/ ছাত্র শাসনতন্ত্র – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    ক্রমশ…


    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •