সাপ্তাহিক শিল্পকলায় “রামকিঙ্কর বেইজ” – লিখেছেন আলবার্ট অশোক (পর্ব – ১)

    0
    98
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    Ramkinkar Baij Bengali Version

    সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
    রামকিঙ্কর বেইজ সাঁওতাল নন। অনেকের ধারণা তিনি বুঝি সাঁওতাল। তারা বৈদ্য, উচ্চারণ বেইদ থেকে বেইজ এ পরিণত।(বেইজ পদবি সংস্কৃত বৈদ্য ও প্রাকৃত বেজ্জ-এর মিলিত রূপ। ) তারা উপাদি লিখতেন প্রামাণিক। লোকের চুল দাড়ি কাটা পেশা। রামকিঙ্কর ২৬ শে মে ১৯০৬ সালে পশ্চিমবংগের বাঁকুড়া জেলায় যুগী পাড়ায় জন্মান।বাবা গ্রামের নাপিত চন্ডীচরণ প্রামাণিক। নাপিত পরিবার। তার আরো ৩ ভাইবোন ছিল। প্রত্যেকেই তাদের মতো জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিল রামকিঙ্কর শুধু শিল্পকে বেছে নিয়েছিলেন। ছোট বেলায় একটু বেয়াদপ বা অবাধ্য চরিত্রের বা এক গুঁয়ে ছিলেন। স্থানীয় প্রতিমা শিল্পীদের কাজ দেখে দেখে তিনি প্রাথমিক পাঠ নেন। এছাড়া বিষ্ণুপুরের মন্দিরের টেরাকোটা/ মৃৎশিল্পের ভাস্কর্য তাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।
    ১৯২০ সালের ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যে স্বাধীনতা্র আন্দোলন চলছিল, তেমনই এক আন্দোলন, অসহযোগিতা আন্দোলন (Non-Cooperation Movement in 1920 ) এর পোস্টার বানিয়েছিলেন কিশোর রামকিঙ্কর। সে এক সময় ছিল, রামকিঙ্কর অনেক স্বাধীনতা আন্দোলনকারীর ছবি আঁকতেন। তার রাজনৈতিক পোস্টারের নমূনা দেখে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়,(the editor of the Kolkata-based magazine, Modern Review, Ramananda Chattopadhyay) কলকাতার এক পত্রিকার সাংবাদিক ও সম্পাদক, খুশি হন, তাকে নন্দলাল বসু ও রবি ঠাকুরের কাছে পাঠিয়ে দেন ১৯২৫ সালে । কলাভবনে,বিশ্বভারতীতে ফাইন আর্টসের ছাত্র হবার জন্য। নন্দলাল ও রবি ঠাকুরের অধীনে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আরম্ভ করেন। তখন তার বয়েস ১৯ বছর।

    Ramananda Chattopadhyay

    Lovers by the sea, 1923

    Worshiping Woman Medium  Watercolour on paper  YearCirca 1960  Size 11 x 6.5

    Courtesy: Astaguru.com

    রামকিঙ্কর সোনার চামচ নিয়ে , সৌভাগ্যবানের মত জন্মাননি।তার ছবি অনেকেই পছন্দ করতনা। তিনি ছবি আঁকার শেষে অনেকবার নাম পাল্টেছেন। প্রবাসী জার্নালে তার একটা কাজের শেষ নাম ছিল রামকিঙ্কর প্রামাণিক। ১৯২০ সালের একটা কাজে নাম রামপ্রসাদ দাস। শান্তি নিকেতনেও তার কাজ কেউ পছন্দ করতনা। তিনি কখনো কে কি বলল, কার কি যশ , টাকাপয়সা ইত্যাদি নিয়ে ভাবতেননা। শুধু নিজের আর্ট ছিল তার একান্ত আপন বিষয়। ১৯৩৫ সালে তিনি যখন শান্তি নিকেতনে সুজাতা কংক্রীট দিয়ে বানান রবি ঠাকুর বলেন ক্যাম্পাসে এমন আরো কিছু বানাক।
    কে জি সুব্রাম্মনিয়াম তার ছাত্র, স্মরণ করে বলেন, তিনি ছিলেন ক্ষেপা বাউলের মত। সবকিছু ভুলে কাজ নিয়ে থাকতেন।
    রামকিঙ্করের কাজ দেশ বিদেশে ঘুরেছে, ১৯৫০ সালে, ( 1950 at the Salon des Réalités Nouvelles in Paris) ‘নতুন বাস্তব মেলা’ প্যারিসে ভারতকে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন।

    সৌজন্যঃ Outlookindia.

    রাম কিঙ্কর বেইজের বিখ্যাত ভাস্কর্য হল সাঁওতাল পরিবার। অধিকাংশ ভাস্কর্য আউটডোর বা ঘরের বাইরে উন্মুক্ত স্থানের জন্য। ভাস্কর্যগুলি বড় বড়,কংক্রীট- পাথর, সিমেন্ট, বালির তৈরি, বীরভূমের লালমাটির মাটি থেকে উইপোকার ঢিবির মত যেন বেড়ে উঠেছে। প্লাস্টার অফ প্যারিস দামী জিনিস, ল্যাটেরাইট পাথর বা নুড়ি, যা খোয়াই অঞ্চলেই পাওয়া যায় (laterite pebbles from the Khoai) তাই দিয়ে ভাস্কর্য গড়তেন। আগে একটা লোহার আর্মেচার বা কাঠামো বানিয়ে নিতেন, তার উপর সিমেন্টের আস্তরণ দিতেন, অতিরিক্ত আস্তরণ পরে বাটালি দিয়ে ঠিক করে নিতেন। ব্রিটিশদের যে ঘরানা ছিল, যেভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশিক আর্ট কলেজে শেখাত সেখান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে, একদম বাংলার বীরভূমের মৌলিক চরিত্র নিয়ে গড়া।
    রাম কিঙ্কর তার কাজের সময় বাস্তব মডেল, বা স্টিল ফটোর ধার ধারতেননা। তাতে তিনি বুঝতেন, সৃষ্টিকে ঐ মডেল বা ফটো নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করতেন খুব কাছ থেকে, দেখতেন জীবজন্তুর ও মানুষের চলাফেরা, ও তাদের আবেগ অভিব্যক্তি। তিনি সেখান থেকে তার ভাস্কর্যের আদল বা রুপ নিতেন। যেমন মিলকল, বা সাঁওতাল পরিবার ইত্যাদি প্রানবন্ত হওয়ার পিছনে এই দর্শনই কাজ করেছে। রামকিঙ্করের কাজে আধুনিকতা ছিল, কিন্তু বুদ্ধি বা মেধার কূটিল প্রকাশ ছিলনা। তার কাজ সাধারণ মানুষের বোধের কাছেই। তার সমসাময়িক ভাস্করদের কাজ দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ঠিকই, এবং কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষাও করেছিলেন, কিউবিজম বা জ্যামিতিক প্যাটার্ন ব্যবহার করেছিলেন অল্পসংখ্যক কাজে, কিন্তু সেগুলি তার মনে দানা বাঁধেনি বা সায় দেয়নি।
    ছবি আঁকতে গেলে, ভাস্কর্য গড়তে গেলে মডেল লাগে। আর্ট কলেজে লাইফ স্টাডি আবশ্যিক। বাংলা তথা ভারত তখনকার দিনে নগ্নমহিলার ছবি দেখার মতো সাবালক হয়নি। তাই মডেল হিসাবে কোন ভাল ঘরের মেয়ে পাওয়া যেতনা। আর্ট কলেজে আসত বেশ্যা বাড়ির মেয়ে। বেশ্যা মেয়ে দেখতে দেখতে বেশ্যার শরীর, মডেলের শরীর ভালবাসা ও অতিরিক্ত উৎসাহ অনুপ্রেরণা দেয়। রামকিঙ্কর মডেলের – বেশ্যার সঙ্গবাসে আসক্ত হয়ে পড়েন। একাধিক নারী সঙ্গ,যৌনতা জীবনে মধুর চাকের মত বাসা বাঁধে। রামকিঙ্কর সেই যে শান্তি নিকেতনে আসেন, সেখান থেকে আর ফিরে যাননি। মৃত্যু অবধি ছিলেন। শোনা যায় তার নারীপ্রীতি এতই চুম্বকের মত আকর্ষনের ছিল একবার দিল্লী যাবার পথে এক আদিবাসী রমণীর ডাকে নেমে যান কোন এক স্টেশনে।
    রামকিঙ্করের জীবনের সাথে জড়িয়ে রয়েছে প্রথম এক রমণী। বাঁকুড়ার শ্রেষ্ঠ শিল্পী রামাই পটুয়ার মেয়ে ধামাবতী। ধামাবতী ছিল রামকিঙ্করের বউদি বসন্তবালার বান্ধবী। বিবাহিত জীবনে ধামাবতীর সুখ ছিল না , মদ্যপ স্বামী, স্ত্রীর প্রতি উদাসীন। বসন্তবালার সাথে দে্খা করতে আসার সুবাদে কিশোর রামকিঙ্করের সাথে পরিচয় । রামকিঙ্কর ছবি আঁকতে পারে ধামাবতীরও জানত, সে নিজেও পারিবারিক পট আঁকা বিদ্যের চর্চা চালিয়ে নিচ্ছিল। একদিন কথা হলো— দু’জন দু’জনার ছবি আঁকবে, দেখা যাবে কার বিদ্যের কত জোর। এরকম বাজি ধরে রামকিঙ্করকে ধামাবতী নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলো। নির্জন বাড়িতে রামকিঙ্করকে বসিয়ে ধামাবতী প্রথমে রামকিঙ্করকে পটুয়ার নিপুণ রেখায় আঁকলো। তারপর রামকিঙ্করকে নীরবে সিটিং দিলো। রামকিঙ্কর রোমাঞ্চিত হয়ে দেখলো তার স্তনের উপর থেকে আলগোছে খসে পড়ছে কাপড়— তারপর জীবনের প্রথম রমণী রমণ
    মণিপুরের বিনোদিনী, আসামের নীলিমা, ভুবন্ডাঙ্গার খাঁদু, দক্ষিণের জয়া আপ্পাস্বামী আর রাধারাণি। যৌনতা শিল্প জগতের অমোঘ অস্ত্র। সৃষ্টি যৌনতা ছাড়া হয়না। যৌনতা ছাড়া জীবন বন্ধ্যা মনে হয়। যৌনতা হল জীবনকে ক্লান্তি মুক্ত করে নতুন করে জীবনকে পাওয়া। রামকিঙ্কর স্বীকার করেন, তিনি সব মেয়ের সাথে যৌন সহবাস করেছেন, যারাই তার কাছে এসেছেন। কাউকে এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপার নেই। যোউনতা থেকে তিনি কল্পনা অনুভব আর অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।এক নারী থেকে অন্য নারী, যেন পিকাশোর মত বল্গাহীন ঘোড়া খুড়ের চিহ্ন ফেলে ফেলে যাওয়া। জীবনের শেষ অব্ধি রাধারানিই ছিল।

    রামকিঙ্কর কখনো বিয়ে করেননি, যে নারীর কাছেই গেছেন আবার ফিরে এসেছেন রাধারাণির কাছে, সেই ছিল তার সারা জীবনের সঙ্গিনী।
    আকন্ঠ মদ পান করে অপার আনন্দে করতেন শিল্প কর্ম।

    A watercolour drawing in Baij’s expressionistic style Picture source: DAG
    রাম কিঙ্কর জলরঙয়ের অনেক কাজ করতেন। তার জল রঙয়ের কাজ অদ্ভুত ধরণের। মূলতঃ রামকিঙ্কর স্বশিক্ষিত মানুষ। ফলে অ্যাকাদেমিক স্টাইল তাকে ছুঁতে পারেনি। এর জন্য তার কাজ এক মৌলিক আলাদা গোত্রের। তিনি কাগজে জল রঙ দিয়ে হাল্কা করে রঙ মেখে নিতেন। এবং দ্রুততার সাথে। তারুপর কালো তুলির রেখা তড়িৎগতিতে অবয়বগুলির আউটলাইন দিতেন। এরকম জলরং অনন্য প্যাটার্ণ আমি আর কারুর দেখিনি। বিন্দু মাত্র অ্যাকাদেমিক ব্রিটিশ স্টাইল, বা ন্যাচুরাল রিয়ালিজমের ধার দিয়ে যাননি। আমরা ছাত্রদের বলি, তোমরা মনের ছবি আঁক। paint your mind. মানে তুমি যা ভাবছ, যা করতে চাইছ, বলতে চাইছ তা প্রকাশ কর। তাহলেই মৌলিকতা ১০০ ভাগ আসার সুযোগ থাকে। আমাদের অ্যাকাদেমিক পাঠ নেওয়া শিল্পীদের এই ঘাটতি অনেক আছে। তারা মনের ছবি আঁকেনা। তারা আঁকে টাকা আর যশ কিভাবে আসবে তা নিরূপন করে, সেই মতো কাউকে নকল করে, বা প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের ছায়া হয়ে চলে। ফলে ৯৫ শতাংশ শিল্পী নাম যশ পায়না, আধা রাস্তাতেই তারা মরে যায়। এই নিরিখে রাম কিঙ্করের ১০০ভাগ খাঁটি ছবি। রাম কিঙ্কর তার মনের ছবি, বাঁকুড়া বীরভূমের লাল মাটির মানুষ জীবজন্তুর চলার ছন্দ, জীবন এঁকেছেন। আদিবাসী জীবনই ছিল তার ভাস্কর্য ও ছবির বিষয়। তার কাজ post-expressionist দের মত। তার কাজ দেখতে দেখতে মনে হয়েছিল ভ্যান গঘের কথা। প্যাশন দিয়ে ছবি আঁকা। এই সততা রাম কিঙ্করকে তারকা বানিয়েছে। এছাড়া বুদ্ধির কূট-কাঁচালি, ব্যকরণের মাপ কাঠি, সমসাময়িক রাজনীতি, অবচেতন মনের ফ্যান্টাসি ইত্যাদি অনেককে খ্যাতি দিয়েছে, কিন্তু রাম কিঙ্কর এসব বাদেই মহান। রামকিঙ্করের কাছে টাকা পয়সা বা যশ এর মোহ ছিলনা। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, শিল্পী ও শিক্ষক দিনকর কৌশিক, রাম কিঙ্করের একটা উক্তি তুলে ধরেছিলেনঃ যখন এক অপরিহার্য তাড়না ও শক্তি আমি অনুভব করি তখনই আমি আঁকি। কে আমার ছবি কাজ কিনল না কিনল তা আমাকে ভাবায়না।

    The master. (Source: Jyoti Bhatt Image Courtesy: Asia Art Archive)
    রাম কিঙ্কর বেইজ, ভারতের আধুনিক ভাস্করদের মধ্যে প্রথম সারির; তার সাথে শঙ্খ চৌধুরী, দেবী প্রসাদ রায়চৌধুরী ও প্রদোষ দাশগুপ্তের নাম উল্লেখ্য।

    ১৯৫০ সালে জহরলাল নেহেরু, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রিজার্ব ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার জন্য রামকিঙ্করকে দুটি দ্বারপাল( মন্দিরের বা প্রাসাদের দরজার প্রহরী) বানাবার জন্য নিযুক্ত করে। তারা সেগুলি দিল্লীর অফিসের সামনে রাখবে।রামকিঙ্কর সরকারি কাজের বিষয় বুঝতেননা। কাজের একটা টাইম লিমিট ছিল। রাম কিঙ্কর যক্ষ ও যক্ষী র রুপকল্প নিয়ে কাজ করেন। অনেক স্টাডি করেন,অনেক জায়গা পাথরের সন্ধানে ভ্রমণ করেন, কাংরা থেকে বৈজনাথ। অনেক টাকা খরচ করে হিমাচল প্রদেশের বৈজনাথ থেকে দুটি পাথর আনেন। ফলে কিছু বিলম্ব হয়েছিল কাজটি করতে। যক্ষের একহাতে কারখানার প্রতীক পিনিওন (pinion) দাঁত ওয়ালা ছোট চাকা, অন্য হাতে টাকার থলে ধরে আছে। আর যক্ষীর এক হাতে ফুল অন্য হাতে একটি হাল- কৃষি ও গতির প্রতীক। কাজটি ১৯৬৬ সালে সমাপ্ত করেন। তখন তার খরচের বরাদ্দ টাকা ফুরিয়ে গেছিল। এ নিয়ে তিনি কষ্টের শিকার হন।

    সিমেন্ট দিয়ে তার প্রথম দিকের কাজ হল সুজাতা, শিল্পী ও শিল্প সমালোচক জয়া আপ্পাস্বামীকে (Jaya Appasamy 1917-1989)মডেল করে বানিয়েছিলেন ১৯৩৫ সালে। ৩২ বছর বয়েসে সাঁওতাল পরিবার (Santhal Family 1938)বানিয়েছিলেন ১৯৩৮ সালে, মিল কল (Mill Call 1956)) বানিয়েছিলেন ১৯৫৬ সালে। এই কাজগুলি তার বিখ্যাত কাজ, খ্যাতি এনে দিয়েছিল।

    রাম কিঙ্করের কাজে প্রাণ ছিল। তিনি তার সমকালীন অনেকের ভাস্কর্য পছন্দ করতেননা। বলতেন , ঐগুলি স্ট্যাচু।নড়েনা। রামকিঙ্করের সাঁওতাল পরিবারের মধ্যে দেখা যায় মানুষ গুলির গতি। যেন ছুটে যাচ্ছে।
    রামকিঙ্করের গলার আওয়াজ ছিল ভাল তিনি লালন ফকির, ভাটিয়ালী। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে ভালবাসতেন।
    রাম কিঙ্করের কাজে প্রাণ ছিল। তিনি তার সমকালীন অনেকের ভাস্কর্য পছন্দ করতেননা। বলতেন , ঐগুলি স্ট্যাচু।নড়েনা। রামকিঙ্করের সাঁওতাল পরিবারের মধ্যে দেখা যায় মানুষ গুলির গতি। যেন ছুটে যাচ্ছে।
    রামকিঙ্করের গলার আওয়াজ ছিল ভাল তিনি লালন ফকির, ভাটিয়ালী। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে ভালবাসতেন।

    Hindu widow courtesy:  NGMA

    বাস্তব রীতি ছাড়াও রামকিঙ্কর কিছু ভেঙে গড়ে বিমূর্ততা কাজে আনতেন।এই ভেঙ্গে গড়ে বিমূর্ত কাজে অনেকের আপত্তি ও অসন্তোষ ছিল। এমনকি রাজনৈতিক কোপেও পড়তে হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে
    পশ্চিমবঙ্গের এক মন্ত্রী , যতীন চক্রবর্তী, বলেছিলেন রবি ঠাকুরের হাত টাত নেই শুধু বুক অব্ধি, তাও মুখের মিল নেই। হাঙ্গারীতে রবি ঠাকুরের মূর্তী (a bust of Rabindranath Tagore removed from the town of Balatonfured in Hungary) সরিয়ে দিয়েছিল।পরে ঐ স্ট্যাচুটার একটু এদিক ওদিক করে হাঙ্গারির স্টেট হৃদ্‌রোগের হাসপাতালের ২২০ নং রুমের সামনে , যেখানে রবি ঠাকুর চিকিৎসা ১৯২৬ সালে, করিয়েছিলেন সেখানে স্থানান্তরিত করা হয়। একই ভাবে বিজেপি র সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য, গৌহাটির (Guwahati) এক রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করে, মহাত্মা গান্ধীর মূর্তী না কি ঠিক হয়নি।

    রাম কিঙ্কর বিশ্বাস করতেন প্রাণ যদি মূর্তীতে স্থাপন করতে হয় তাহলে শুধু প্রতিনিধিত্বমূলক কাজ করলে চলবেনা, একটু ভাঙ্গাগড়া খেলতে হবে। আর তিনি লোকের সমালোচনা পাত্তা দিতেননা।
    ১৯৩৭ সালের রবি ঠাকুরের বানানো মূর্তী কিছুটা প্রতিকী ও কিছুটা ঘনকবাদীদের (symbolist and post-cubist) মত করে সৃষ্টি করে ছিলেন। কপাল ছোট , নাক লম্বা, দাড়ি গোফ ইত্যাদি প্যাটার্ন করে করা।কাজটা নন্দলাল বসু খুব প্রশংসা করেছিলেন।

    ‘Summer noon’, oil on gunny cloth
    টাকা পয়সার অভাবে প্লাস্টার অফ প্যারিস ব্যবহার করতে পারতেননা। লোহার আর্মেচারের উপর সরাসরি কংক্রীত দিয়ে কাজ করতেন। ভাল ক্যান ভাসের অভাবে বিছানার চাদরে দিয়ে ক্যানভাস করে ছবি আঁকতেন। অনেক ছবি পাটের বা চটের উপর করেছেন অয়েল কালার দিয়ে।

    ১৯৭৫ সালে ঋত্বিক ঘটক একটা ডকুমেন্টারি প্রস্তুত করছিলেন, রামকিঙ্করের বয়েস তখন ৬৯বছর, ৪দিন কাজ হয়, (In 1975, Ghatak spent four days between July 4 and 10 shooting this film in Shantiniketan.) কাজটা অসম্পূর্ণ থাকে । ঋত্বিক ঘটক ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মারা যাওয়াতে চলচ্চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
    রামকিঙ্কর বেইজ একটু কঠিন প্রকৃতিরও ছিলেন হুট হাট কারুর সাথে মিশতেন না বা কথা বলতেননা। ১৯৭৪ সালে, কলাভব্ন থেকে অবসর নেওয়ার পর শর্বরী রায় চৌধুরি ভাস্কর্য বিভাগ দেখতেন। KS Radhakrishnan দক্ষিণ ভারতের কেরালার (Kottayam) কলাভবনে পাঠ নিয়েছেন ভাস্কর্যের। তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেন রামকিঙ্করের সাথে দেখা করবেন। কিন্তু রামকিঙ্করের মেজাজ ভয় পেতেন। তার এই ভয় সমীহের কথা শর্ববী রায়চৌধুরিকে বললে, রায়চৌধুরী এক উপায় বাতলে দেন। বলেন শাপলা ফুল এক গোছা নিয়ে যা, দেখবি অনায়াসে পরিচিতি হয়ে যাবে। রাধাকৃষ্ণন তাই করলেন। রাম কিঙ্কর বিকেলে ঘরের দরজার কাছেই ছিলেন, কোন কিছু রাধা কৃষ্ণনকে বলতে হয়নি, রাম কিঙ্কর নিজেই তাকে দেকে নিলেন।
    ধ্রুপদি কথাশিল্পী সমরেশ বসু ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে ‘দেশ’পত্রিকায় ধারাবাহিক রচনা ‘দেখি নাই ফিরে’ শুরু করেন। ১৯৮৮ সালের ৮ মার্চ তাঁর মৃত্যুতে উপন্যাসটি সম্পূর্ণ হয়নি। বিকাশ ভট্টাচার্যের অলংকরণ সমৃদ্ধ অসম্পূর্ণ গ্রন্থটি আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশ করে ১ জানুয়ারি ১৯৯২।
    রামকিঙ্কর জীবনে অনেক সম্মান ও পুরস্কার পান।১৯৪৫ সালে, নেপাল সরকার বুদ্ধের ভাস্কর্য বানাবার জন্য আমন্ত্রণ জানান। ১৯৫৫ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের জন্য ভারত সরকার যক্ষ ও যক্ষী দ্বারপাল নির্মাণের অনুরোধ জানান। ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণে পুরস্কৃত করেন।১৯৭৫ সালে আনন্দবাজার তাকে সম্বর্ধনা দেয়। ১৯৭৭ সালে বিশ্বাভারতীর শান্তি নিকেতন তাকে দেশিকোত্তম প্রদান করেন। ১৯৭৯ সালে তাকে রবীন্দ্রভারতী ডিলিট উপাধি দেন।
    ১৯৮০ সালের ২৩শে মার্চ রামকিঙ্করকে পি জি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়
    রাম কিঙ্কর বেইজ মারা যান ২রা আগস্ট ১৯৮০ সালে ৭৪ বছর বয়সে প্রশটেট গ্রন্থির অসুখে।
    সূত্রঃবন্দনা কালরা (Vandana Kalra) , ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। ২০১৭ ২৭ আগস্ট
    আউটলুক ইন্ডিয়া Sreevalsan Thiyyadi ৩২শে জুলাই ২০১৭, শতদীপ মৈত্র DAG, ২ আগস্ট ২০১৯
    (Photo Source: Jyoti Bhatt Image Courtesy: Asia Art Archive)
    Firstpost, Arshia Dhar May 28, 2019.

    (চলবে)


    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •